- মানুষ ও বাঘের মধ্যকার সংঘাত সুন্দরবনের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মানসিক সুস্থতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। পাশাপাশি, বাঘের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এখানকার সাংস্কৃতিক কিছু বিশ্বাস। এ বিশ্বাস আবার প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে প্রভাবিত করে।
- ভারতের সুন্দরবনের বাঘ-বিধবাদের মধ্যে PTSD (Post Traumatic Stress Disorder) ও পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারার মানসিক সংকট দেখা দেয়। তবে তরুণ বিধবারা তুলনামূলক বেশি খাপ খাইয়ে নিতে পারেন। তাদের অনেকে শহরে চলে যান, কেউ কেউ অবশ্য উন্নত জীবিকার আশায় জীবনযাপন করতে থাকেন সুন্দরবনেই।
- বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনে বাঘ সংরক্ষণকে কার্যকর করতে হলে স্থানীয় সমাজের সংস্কৃতি, সেখানকার বাসিন্দাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও জীবিকার প্রশ্নকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
নিবন্ধটি মঙ্গাবে-ইন্ডিয়ার ভারতীয় সুন্দরবন ভ্রমণ থেকে তৈরি তিন পর্বের ধারাবাহিকের তৃতীয় পর্ব। সিরিজের প্রথম খণ্ডে আলোচিত হয়েছে, এই অঞ্চলের সফল দুগ্ধ সমবায় উদ্যোগ। তৃতীয় পর্বে আলোকপাত করা হয়েছে প্রায় উপেক্ষিত এক বাস্তবতার দিকে—সুন্দরবনের বাঘ-বিধবাদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকট।
“নদীতে কুমির আর ওপারের জমিতে লুকিয়ে থাকে বাঘ। অন্যদিক থেকে আমাদের গ্রাস করে ভাঙন” — জেলে গীতা মণ্ডল শোনাচ্ছিলেন তার প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার কথা। বঙ্গোপসাগরের ভারতীয় সুন্দরবন দ্বীপপুঞ্জে তখন অস্ত যাচ্ছিল সূর্য।
গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র এবং মেঘনা নদীর মিলিত মোহনার এই দ্বীপপুঞ্জ দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন এবং বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল।
৫৫ বছর বয়সী নারী গীতা মণ্ডল, জলবায়ু পরিবর্তনের এই হটস্পটে গত দশ বছর ধরে অনিচ্ছাসত্ত্বেও নদী আর জোয়ারের পানিতে মাছ ও কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন। কারণ বনের মধ্যে একদিন তার স্বামীকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল বাঘ।
বনের রক্ষাকর্তা হিসেবে পূজিত বনবিবির ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে, প্রতিরাতে একটি চরে দাঁড়িয়ে সামনের জলে জাল বিছিয়ে চুপচাপ অপেক্ষা করেন তিনি। তারপর মাছ ধরা শেষে প্রতিদিন সকালে সাতজেলিয়া দ্বীপে নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন। আসা-যাওয়ার পথে প্রায়ই গীতাকে বাঘের মুখোমুখি হতে হয়।
তার প্রতিবেশী ৪৫ বছর বয়সী সুভদ্রা সান্যাল এখনও সেই দিনের কথা মনে করে ভীত হন, পাঁচ বছর আগে যেদিন পার্শ্ববর্তী খালে মাছ ধরার সময় বাঘ তার স্বামীকে ঘাড় ধরে টেনে বনের মধ্যে নিয়ে গিয়েছিল।
এরপর আর কখনও বনে যাননি তিনি। এখন দ্বীপে গৃহকর্মীর কাজ করেই জীবন চলছে তার।
মে মাসে, সুমিত্রা মিধার স্বামী সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভের নিষিদ্ধ এলাকায় কাঁকড়া ধরতে গিয়ে বাঘের আক্রমণের শিকার হন। এ ঘটনার পর বনবিবির প্রতি তার বিশ্বাস ভেঙে যায়। বাঘের ভয়ে তিনি মাছ ধরা বন্ধ করে দেন। এখন তিনি কৃষি শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন এবং আরও ভালো কাজের আশায় দিন কাটান।
যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক গবেষক অরবিন্দ চৌধুরী, তিনি ইকো-সাইকিয়াট্রি প্রিজমের মাধ্যমে দ্বীপবাসীর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো নিয়ে নিবিড় গবেষণা করেছেন। তিনি বলেন, “সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমশ বেড়ে যাওয়া, ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙন এবং মানুষ-বন্যপ্রাণীর সংঘাতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সুন্দরবনের এই ‘বাঘ-বিধবাদের’ জীবন এক জটিল বৃত্তে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। তাদের জীবনের প্রতিটি স্তরে পরিবেশ, সাংস্কৃতিক বিশ্বাস এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মধ্যে একটি জটিল সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।”

বাঘের আক্রমণের ট্রমা কমিয়ে দিচ্ছে আয়ের সক্ষমতা
৪৫ লক্ষ মানুষ এবং ৮৬টি (ছবিযুক্ত) বাঘের আবাসস্থল, এই দ্বীপপুঞ্জটিতে শত শত বিধবার বসবাস। স্থানীয়ভাবে তারা ‘বাঘ বিধবা’ বলে পরিচিত।
২০০৮ সালের এক গবেষণায়, দীর্ঘদিন সাতজেলিয়া ও লাহিরপুর গ্রামে মানসিক স্বাস্থ্য ক্লিনিক পরিচালনাকারী অরবিন্দ চৌধুরী জানান- এই অঞ্চলের প্রকৃতি মানুষের জীবনকে, বিশেষত মাছ ধরা ও কৃষিকাজে অভ্যস্ত নারীদের গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
গ্রামসবাসীর সাথে তার আলাপচারিতায় উঠে আসে, বাঘের আক্রমণে স্বামী হারানো বিধবাদের সামাজিক কলঙ্কের পাশাপাশি মানসিক সমস্যাও সৃষ্টি হচ্ছে। পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের (PTSD) মতো মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন তারা।
PTSD আক্রান্তদের ঘটনাগুলোর মধ্যে ৭২ শতাংশই বাঘের আক্রমণের সাথে সম্পর্কিত ছিল।
তাদের মধ্যে সুমিত্রা এবং সুভদ্রার মতো কেউ কেউ চরম উদ্বেগ ও ভয়, আক্রমণের স্মৃতিচারণ এবং এড়িয়ে চলার আচরণের কারণে মানসিকভাবে প্রায় অক্ষম হয়ে পড়েছেন।
কুমির বা হাঙরের আক্রমণের সাথে সম্পর্কিত PTSD এর ঘটনাগুলোতে, নদী এড়িয়ে চলা এবং চিংড়ি বা কাঁকড়া সংগ্রহের কাজ করতে না পারার মতো পরিস্থিতি দেখা গেছে বলে জানান, অরবিন্দ চৌধুরী। তিনি বলেন, “স্পষ্টতই PTSD তাদের আয়ের ওপর গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।”
এই পরিস্থিতি বেশ জটিল, কারণ বাঘের জন্য সংরক্ষিত অঞ্চলে এ ধরনের মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ দেয় না সরকার।

ভারতের পূর্ব উপকূলে সুন্দরবন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এখানকার ১০৪টি দ্বীপের মধ্যে ৫৪টিতে মানব বসতি রয়েছে। এসব এলাকায় বনবিবি এবং মনসার বেশকিছু মন্দির ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।
মঙ্গাবে-ইন্ডিয়ার কাছে থাকা রেকর্ড অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভের ভেতরে বাঘের আক্রমণে ৫২ জন মানুষ মারা গেছেন।
২০০৮ সালের এক গবেষণায় চৌধুরী এবং তার সহ-গবেষক জানান, গত ১৫ বছরে ১১১ জন (৮৩ জন পুরুষ, ২৮ জন মহিলা) পশুর আক্রমণের শিকার হয়েছেন। আক্রমণকারী পশুদের তালিকায় রয়েছে বাঘ (৮২ শতাংশ), কুমির (১০ দশমিক ৮ শতাংশ) এবং হাঙর (৭ দশমিক ২ শতাংশ)। আক্রমণের শিকার হওয়া মানুষদের মধ্যে ৭৩ দশমিক ৯ শতাংশ মারা গেছেন। সেইসঙ্গে তথ্য-উপাত্ত বলছে, ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে জীবিকা অর্জনের সময় সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে বা আশপাশে এ ধরনের আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে।
তবে গ্রামবাসীরা মনে করেন, মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। কারণ অনেক মৃত্যু সংরক্ষিত এলাকার বাইরে হয় এবং সেগুলোর খবর প্রশাসনের কাছে পৌঁছায় না।
গীতা মণ্ডল বলেন, “দ্বীপে বেড়া বসানোর ফলে মানুষের বসতিতে ঢুকে বাঘের গবাদি পশু মারার ঘটনা কিছুটা কমেছে। তবে গভীর বনে মানুষকে আক্রমণ করা থেকে বাঘকে প্রতিহত করা সম্ভব হয় না।”
সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভের (STR) ফিল্ড ডিরেক্টর নীলাঞ্জন মল্লিক বলেন, “অবৈধ প্রবেশ রোধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইনগুলো সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।”


তিনি আরও বলেন, “আমাদের যৌথ বন ব্যবস্থাপনা কমিটি আছে, যার মধ্যে বন্যপশু আক্রমণের কারণে বিধবা হওয়া নারীদের কথা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। তবে বাঘ-বিধবাদের নিয়ে কাজ করতে গেলে আরও অনেক কিছু করা দরকার।”
কলকাতার ন্যাশনাল ফিশওয়ার্কার্স ফোরামের সেক্রেটারি প্রদীপ চট্টোপাধ্যায় মঙ্গাবে-ইন্ডিয়াকে বলেন, “বনের বাইরের দিকের অঞ্চলে যথেষ্ট মৎস আহরণ না হওয়ায় জেলেরা মূল অঞ্চলে প্রবেশ করে। STR-এর বাইরে থাকা সংরক্ষিত বনাঞ্চলেও পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। মূলত মাছ এবং কাঁকড়ার ব্যাপক চাহিদা ও উচ্চ মূল্যের কারণে তারা প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে গভীর বনে প্রবেশ করে। সেই মাছ ও কাঁকড়ার বিক্রি করেই তারা তাদের জীবনযাত্রার খরচ নির্বাহ করে।”
তিনি আরও বলেন, “স্থানীয়দের সাথে পরামর্শ না করেই, আকস্মিক এই বাঘ সংরক্ষণ এলাকা নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। আগে যথেষ্ট মাছ থাকলেও এখন আর নেই। একারণেই জেলেরা মূল এলাকায় প্রবেশ করে। এক্ষেত্রে তাদের প্রবেশই কেবল অবৈধ নয়, তাদের মৃত্যুও অবৈধ। তাই তাদের মৃত্যু রিপোর্ট করা হয় না।”
১৭৭০ থেকে ১৭৭৩ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনে প্রথমবার বন পরিষ্কার করে বসতি স্থাপনের চেষ্টা করা হয়।
মৎস্য শ্রমিকদের সমর্থনে পরিচালিত আন্তর্জাতিক সমিতি — Bay of Bengal Large Marine Ecosystem (BOBLME) এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ঔপনিবেশিক আমল থেকেই জেলে ও মধু সংগ্রহকারীরা সুন্দরবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন। এছাড়া তখন থেকেই জোয়ারের জলে মাছ ধরার অধিকার স্বীকৃত ছিল।
মনে রাখতে হবে, STR-এর প্রথম ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনাতেও মাছ ধরাকে একটি স্বাভাবিক বন-সম্পর্কিত কার্যক্রম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। সেখানে মধু ও গোলপাতা সংগ্রহের সঙ্গে এটি একত্রে নথিভুক্ত ছিল। জেলেদের জোয়ারের জলে মাছ ধরার স্বাধীনতার কথাও উল্লিখিত ছিল সেখানে।
সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভ ১৯৭৩ সালে গঠিত হয় এবং ১৯৭৮ সালে একে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বর্তমান মূল এলাকা ১৯৮৪ সালে একটি জাতীয় উদ্যান (১ হাজার ৩৩০ বর্গ কিলোমিটার) হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
বর্তমানে উত্তর ২৪ পরগনা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলাজুড়ে বিস্তৃত ভারতের সুন্দরবন। যার মধ্যে ৪ হাজার ২০০ বর্গ কিলোমিটার সংরক্ষিত বন এবং ৫ হাজার ৪০০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের অ-বনভূমি রয়েছে।
১৯৮৯ সালে, Man and Biosphere (MAB) প্রোগ্রামের আওতায় Sundarbans Biosphere Reserve (SBR) ঘোষণা করা হয়। যার মধ্যে STR এবং STR-এর বাইরের সংরক্ষিত বনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

গত তিন দশকে, মূল এলাকার সম্প্রসারণ (২৮ শতাংশ) এবং বাফার এলাকার একটি অংশকে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করার ফলে মাছ ধরার জন্য উপলব্ধ এলাকা (স্থল এবং জল উভয়) ৮৯২ দশমিক ৩৮ বর্গকিলোমিটার থেকে প্রায় ৫২৩ বর্গকিলোমিটারে নেমে এসেছে।
এমনকি STR-এর বাইরের সংরক্ষিত বনে, যেখানে কেবল লাইসেন্সধারি নৌকা মাছ ধরতে পারে সেখানেও মাছ ধরার জায়গা ক্রমশ কমে যাচ্ছে।
২০১৬ সালে সুন্দরবনে এক গণশুনানিতে বনের ওপর নির্ভরশীল অন্তত ২০০ জন মানুষ পর্যটনের চাপ বৃদ্ধি এবং ২০০৬ সালের বন অধিকার আইন (FRA) কার্যকর না হওয়ার অভিযোগ তোলেন।
অভিযোগকারীরা বলেন, পর্যটকদের মোটরচালিত নৌকা নিয়ে মূল এলাকায় ঢোকার অনুমতি দেওয়া হলেও বনের ওপর নির্ভরশীল বনজীবীদের সেখানে যেতে দেওয়া হয় না। একইসঙ্গে বন বিভাগ বা রাজ্য সরকার, কেউই বাঘের আক্রমণ বেড়ে যাওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ক্ষতিপূরণ নিয়ে চিন্তা করছে না।
তারা জোর দিয়ে বলেন, বাফার (নিরপেক্ষ এলাকা) ও মূল এলাকা চিহ্নিত করার পদ্ধতি এবং মূল এলাকার সম্প্রসারণ- FRA এর নিয়ম অনুসরণ না করে অবৈজ্ঞানিকভাবে করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে প্রদীপ চট্রোপাধ্যায় বলেন, “FRA বাস্তবায়নে বাধা থাকলেও রাজ্য সরকারের তা অতিক্রম করা উচিত ছিল।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা বাঘ-বিধবাদের নিয়ে একটি জরিপ করছি এবং তাদের জন্য একটি নেটওয়ার্ক তৈরির চেষ্টা করছি। তাদের ক্ষমতায়ন প্রয়োজন, যেন তারা নিজেরাই নিজেদের সাহায্য করতে পারেন।”
এছাড়া, এ অঞ্চলে তরুণ বিধবাদের সংখ্যা বেশি, কাজের জন্য অভিবাসিত হয়েছেন কেউ কেউ।

অরবিন্দ চৌধুরী বলেন, “পঞ্চায়েতের মাধ্যমে সরকারি সহায়তা উদ্যোগ ও এনজিওগুলোর আয় বৃদ্ধি প্রকল্প (যেমন হাঁস-মুরগি বা পশুপালন) বড় পরিসরে এ অঞ্চলে পৌঁছায়নি। যারা অবৈধভাবে বনে ঢোকেন, তাদের কাছে এগুলো পৌঁছায় না।”
সুমিত্রা মিধা প্রথমে এক এনজিওতে বুনন ও সেলাইয়ের কাজে যুক্ত হয়েছিলেন। তবে কাজের সময় ও আয়ের সামঞ্জস্য না থাকায় তিনি তা ছেড়ে দেন।
সাতজেলিয়ার ‘বিধবা পাড়া’ নামে পরিচিত এলাকার বাসিন্দা গীতা মণ্ডল জানান, অনেক তরুণ বিধবা বাইরে পাড়ি জমালেও তিনি তিন সন্তানকে নিয়ে এখানেই থেকে গেছেন।
অরবিন্দ চৌধুরী এই বিষয়টিকে টিকে থাকার বা পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার উদাহরণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, “বেশিরভাগ তরুণ বিধবা দীর্ঘ শোকের পর আবার জীবন গুছিয়ে নেন, সন্তান লালন-পালন করেন। তাদের কেউ কেউ শহরে গিয়ে দিনমুজুরি করছেন বা হোটেলে কাজ নিয়েছেন।”
তিনি আরও বলেন, “বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী বিধবারা খুব দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং অন্যের দয়া-দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভর করে থাকেন। পাশাপাশি কিছু আত্মহত্যার ঘটনাও সামনে এসেছে।”
বাঘের আক্রমণকে অনেকেই বনবিবির অসন্তুষ্টি বা প্রকোপ হিসেবে দেখেন।

বাঘের আক্রমণ থেকে বেঁচে যাওয়া মৌয়াল শ্যামল কর্মকার বলেন, এটি তার জীবনে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে কষ্টের ঘটনা। মধু সংগ্রহের সময় বাঘ তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সে সময় সঙ্গীরা লাঠি দিয়ে বাঘটিকে আঘাত করে তাকে বাঁচায়।
মঙ্গাবে-ইন্ডিয়ার কাছে তিনি বলেন, “বাঘের নখ আমার পায়ে ঢুকে যায়। আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। এরপর এক সপ্তাহ হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল। এখন আমি ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পে কিছু কাজ করি। যদিও মধু সংগ্রহের পাস থাকা সত্ত্বেও এখনও আমি পুরো ক্ষতিপূরণ পাইনি।”
ধারণা করা হয়, বনের সঙ্গে মানুষের মানসিক সংযোগ শতাব্দী ধরে গড়েে উঠেছে এবং সময়ের সাথে সাথে এটি এক ধরনের বন-ধর্মে রূপ নিয়েছে। এতে বনবিবি বনে বসবাসকারীদের রক্ষাকর্তা হিসেবে পূজিত হন।
বাঘ সংরক্ষণের সঙ্গে সমাজ-সংস্কৃতির সংযোগ
তবে অনেক আক্রান্ত পরিবার এখনও বনবিবির প্রতি বিশ্বাস রাখলেও মঙ্গাবে-ইন্ডিয়ার সঙ্গে আলাপে কিছু মানুষ জানান, তারা আর এতে ভরসা করতে পারেন না।
সূমিত্রা বলেন, “ঘূর্ণিঝড় আইলার পর ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আমরা কাঁকড়া ধরতে যাই। আমার স্বামী পূজা করতেন বনবিবির। আমিও করতাম। এখন আর করি না। মনে হয়, এত বছর প্রার্থনা করেও লাভ হয়নি, আর করে কী হবে!”
তিনি জানান, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বনে যেতে হয় বলে তিনি তার সন্তানদের কখনও বনে যেতে দেবেন না।
তিনি আরও বলেন, “আমরা যারা এই দ্বীপে বড় হয়েছি, বন আর মাঠই আমাদের জীবন। আমরা বাইরে যাইনি কখনও। বাইরে যাওয়ার চেয়ে বনে থাকতেই ভালো লাগত। এখন বাঘ আর কুমিরের আক্রমণের ভয়ে মানুষ বাইরে চলে যাচ্ছে।”
সুমিত্রা, গীতা ও সুভদ্রা বলেন, তারা বাঘ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা বোঝেন কিন্তু মানুষের জীবনের নিরাপত্তাকে বাদ দিয়ে নয়।
মানুষ-বাঘ সংঘাত এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্কের এই বাস্তবতাকে সংরক্ষণের পরিকল্পনার মধ্যে আনতে হবে বলে মনে করেন অরবিন্দ চৌধুরী।
তিনি বলেন, “স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণে এই অঞ্চলে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ-সাংস্কৃতিক প্রচার চালানো গেলে, এটি শুধু নারী ও পরিবেশ সম্পর্কিত সমস্যার সমাধানই নয়; বাঘ-বিধবাদের সামাজিক অপমানও কমাবে এবং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষার কাজকে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলবে।”
ব্যানার ছবি: বাঘের আক্রমণে স্বামী নিহত হওয়ার পর সুমিত্রা মিধা ভয়ে মাছ ধরা ছেড়ে দেন। বিকল্প জীবিকার অভাব তার মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়। কার্তিক চন্দ্রমৌলি/মঙ্গাবে
এই প্রতিবেদন ইন্টারনিউজ আর্থ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের বে অফ বেঙ্গল স্টোরি গ্রান্টসের অংশ। এতে সুন্দরবন সাফারির সঞ্জয় মণ্ডল ও তার দল মাঠপর্যায়ে সহায়তা করেছেন।
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে, মঙ্গাবে ইন্ডিয়া-তে ২০১৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর।