- কেবলমাত্র প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ওপর ভিত্তি করে ব্রহ্মপুত্রের বন্যার ঝুঁকি নির্ণয় করা হলে, প্রকৃত ঝুঁকির তুলনায় তা ২৪ থেকে ৩৮ শতাংশ কম দেখায় বলে সম্প্রতি সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা। অর্থাৎ প্রচলিত ধারণার চেয়ে অনেক কম সময়ের ব্যবধানে একের পর এক বন্যা হওয়ার সম্ভাবনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
- আন্তঃসীমান্ত এই নদীতে চীন ও ভারতের বৃহৎ পরিসরে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের পরিকল্পনা চলাকালীন এই উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
- চীন, ভারত, বাংলাদেশ, ভুটান এবং নেপালের মধ্যে ব্রহ্মপুত্রের পানি নিষ্কাশনের বিষয়ে তথ্য আদান-প্রদানের বিষয়টিকে আরও উন্নত করার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
শুধু ভারত কিংবা বাংলাদেশ নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়াতেই গুরুত্বপূর্ণ নদী ব্রহ্মপুত্র। এদিকে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে আসা তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বলছেন, গুরুত্বপূর্ণ এই নদীর বন্যার ঝুঁকি সম্পর্কে সঠিক ধারণা তৈরি করা সম্ভব হয়নি। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, ঝুঁকি নির্ণয়ে যে তথ্যগুলো ব্যবহার করা হয় সেগুলো মূলত শুষ্ক মৌসুমের তথ্য।
ব্রহ্মপুত্র নদীর গত ৭০০ বছরের জলপ্রবাহের ধরন ও গাছের বার্ষিক বৃদ্ধি চক্রের তথ্য অনুযায়ী, আন্তঃসীমান্ত এই নদীর প্রকৃত বন্যার ঝুঁকি আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি।
আসন্ন ঝুঁকি মোকাবিলায় চীন, ভারত, বাংলাদেশ, ভুটান এবং নেপালের মধ্যে নদীর জলপ্রবাহের তথ্য আদান-প্রদান আরও উন্নত করার আহ্বান জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
চীন এবং ভারতের ব্রহ্মপুত্র নদীতে বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের পরিকল্পনা চলাকালীন এই গবেষণাটি করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু উষ্ণ হলে মৌসুমী বর্ষা আরও তীব্র হবে। এদিকে নদীর প্রাকৃতিক পরিবর্তনের হিসাব করা হচ্ছে মূলত ১৯৫০ এর দশকের ডিসচার্জ-গেজ রেকর্ডের ওপর ভিত্তি করে। ব্রহ্মপুত্র নদীর অববাহিকায় তিব্বত, মায়ানমার, নেপাল এবং ভুটানের ২৮টি ভিন্ন স্থানে প্রাচীন বৃক্ষের বার্ষিক বৃদ্ধি চক্র বিশ্লেষণ করে জানা যায়, গত ৭০০ বছরের মধ্যে ১৯৫৬ থেকে ১৯৮৬ সাল ছিল অন্যতম শুষ্ক সময়।
গবেষণাটির প্রধান গবেষক মুকুন্দ পালাত রাও (Tree Ring Laboratory, Lamont-Doherty Earth Observatory, Columbia University) মঙ্গাবে-ইন্ডিয়াকে বলেন, “এটা আমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয় হওয়া উচিত। কারণ, বর্তমান সময়ে উচ্চ জলস্রোতের বছরগুলোই সাধারণত বন্যার সাথে সম্পর্কিত। অথচ আমরা শুষ্ক মৌসুমের তথ্য দিয়ে ঝুঁকির হিসাব করি, যেকারণে প্রকৃত ঝুঁকি নিরুপণ করা যায় না।”
ভবিষ্যতে ব্রহ্মপুত্রে বন্যার ঝুঁকি নির্ণয়ে কেবলমাত্র জলপ্রবাহের বর্তমান রেকর্ড (যেমন গত কয়েক দশকের) দেখা হলে যে পূর্ভাবাস দাাঁড়াবে, সেটি প্রকৃত ঝুঁকির তুলনায় ২৪ শতাংশ থেকে ৩৮ শতাংশ কম হবে। এর সঙ্গে প্রাকৃতিক পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট উষ্ণায়নের প্রভাব যোগ হলে, ধারণার চেয়ে অনেক বেশি ও স্বল্প বিরতিতে বন্যা হতে পারে।
পালাত রাও বলেন, “যদি বলা হয় শতাব্দীর শেষে প্রতি সাড়ে চার বছরে একবার বন্যা আসবে, বাস্তবে তা প্রতি তিন বছরে একবার হতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “গাছের বার্ষিক বৃদ্ধি চক্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অতীতে আর্দ্র সময়ের পরিমাণ অনেক বেশি ছিল। এটি মূলত কয়েক দশক বা শতাব্দীজুড়ে প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ফল। ১৭৮৭ সালের একটি বড় বন্যার উল্লেখ পাওয়া যায় বিভিন্ন গবেষণায়। সে সময় তিস্তা নদী তার গতিপথ পরিবর্তন করে পূর্ব দিকে গঙ্গায় প্রবাহিত হওয়ার পরিবর্তে ব্রহ্মপুত্রর দিকে প্রবাহিত হয়েছিল। এটি ভূমিকম্প নাকি অতিবৃষ্টির কারণে ঘটেছিল, তা নিশ্চিত নয়। তবে সেই বছর অত্যন্ত আর্দ্র ছিল বলেই ইঙ্গিত মেলে।”
গবেষণায় কেবল বন্যার ঝুঁকি নিয়ে কথা বলা হয়েছে, যা অভিযোজনের দিক থেকে বন্যার ঝুঁকির তিনটি উপাদানের মধ্যে একটি। Vulnerability এবং exposure হলো অন্য দুটি উপাদান।
পালাত রাও বলেন, “নীতি নির্ধারণে ভুল-ত্রুটি কমিয়ে ও অবকাঠামো উন্নত করে আমরা বন্যার ঝুঁকি কমাতে পারি। তাই বাঁধ ও পোল্ডারের মতো কাঠামোর নিয়মিত পর্যালোচনা, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং বন্যা মোকাবিলা পরিকল্পনা জরুরি।”

এই গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল, নদীর প্রাকৃতিক পরিবর্তন ও জলপ্রবাহের দীর্ঘ চক্র বোঝা। বিজ্ঞানীরা ডেনড্রোক্রোনোলজি বা গাছের বার্ষিক বৃদ্ধি চক্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে অতীতের জলবায়ু সম্পর্কে ধারণা পান।
এ অঞ্চলের গাছ বর্ষায় বেশি বৃদ্ধি পায় ও বার্ষিক চক্র প্রশস্ত হয়। অন্যদিকে, শুষ্ক মৌসুমে এই চক্র সরু হয়। আবার দীর্ঘজীবী গাছের চক্র বিশ্লেষণ করে শতাব্দীপ্রাচীন জলবায়ু সম্পর্কে জানা যায়।
গবেষক পালাত রাও আরও বলেন, “টিকে থাকা প্রাচীন বৃক্ষ থেকে একটি পাতলা ‘ট্রি-কোর’ নিয়ে মাইক্রোস্কোপের নিচে রেখে এদের বার্ষিক বৃদ্ধি চক্র পরিমাপ করলে, গত কয়েক শতাব্দীর জলবায়ু পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা সম্ভব।”
IIT-Guwahati এর অধ্যাপক চন্দন মহন্ত বলেন, “বন্যার ঝুঁকি বোঝার জন্য শুধু সাম্প্রতিক তথ্য যথেষ্ট নয়। পাশাপাশি, অতীতের তথ্যের অভাব থাকলে বিকল্প তথ্য তৈরি করা প্রয়োজন। তবে এক্ষেত্রে গাছের বার্ষিক বৃদ্ধি চক্রের তথ্য এককভাবে যথেষ্ট নয়, এটিকে অন্যান্য তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে ব্যবহার করতে হবে।”
Bangladesh University of Engineering and Technology (BUET) এর আওতাধীন Institute of Water and Flood Management (IWFM) এর পরিচালক, অধ্যাপক শাহজাহান মণ্ডল এক্ষেত্রে অববাহিকা রাজ্যগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের গুরুত্বের ওপর জোর দেন।
মঙ্গাবে ইন্ডিয়াকে তিনি বলেন, “এটি কেবল বন্যা এবং ভাঙন ব্যবস্থাপনা নয়, শুষ্ক মৌসুমে পানি ব্যবস্থাপনায়ও সহায়তা করবে।”
তিব্বত, উত্তর-পূর্ব ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মাইল বিস্তৃত বিভিন্ন নাম এবং বাঁকযুক্ত পথে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র নদীকে প্রায়শই ‘প্রবাহমান সমুদ্র’ হিসাবে বর্ণনা করা হয়। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদী ব্যবস্থার আনুমানিক ৪০ হাজার বর্গমিটার/সেকেন্ড বার্ষিক গড় প্রবাহে প্রায় অর্ধেক অবদান রাখে এই নদী।
এটি আমাজন ও কঙ্গোর পর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম নদী ব্যবস্থা। বাংলাদেশের যমুনা নামে পরিচিত এই নদীতে প্রতি বছর প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। জলাশয়ের বেশিরভাগ অংশে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের হার ৩ হাজার মিলিমিটারের বেশি।
ভারতে এই নদীর অববাহিকা ছয়টি রাজ্য জুড়ে বিস্তৃত। এগুলো হলো- অরুণাচল প্রদেশ, আসাম, নাগাল্যান্ড, মেঘালয়, সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ। আসাম রাজ্যের উঁচু অঞ্চলে ব্রহ্মপুত্র নদীর বুকে অবস্থিত মাজুলি দ্বীপ, বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ও জনবসতিপূর্ণ নদী দ্বীপ। বন্যার কারণে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা প্রতি বছরই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
তবে বন্যার একটি ভালো দিকও রয়েছে। ব্রহ্মপুত্রও বন্যার সময় পুষ্টি-সমৃদ্ধ পলি বয়ে আনে। এই পলি কৃষিজমি উর্বর করে তোলে ও ধানচাষে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
তাই চীন, ভারত, বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের মধ্যে তথ্য বিনিময় গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, বিশেষত যখন উজানের দেশগুলো থেকে নদীর জলব্যবস্থাপনা বেশি নিয়ন্ত্রিত হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালের নভেম্বরে উত্তর-পশ্চিম চীনের শুষ্ক অঞ্চলগুলোতে সেচের জন্য নদী থেকে জল সরিয়ে নেওয়ার আশঙ্কার মধ্যে ইয়ারলুং সাংপো (ভারতে ব্রহ্মপুত্র) নদীর নিম্নাঞ্চলে ৬০ গিগাওয়াট জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের ঘোষণা দেয় চীন। অন্যদিকে, ১ ডিসেম্বর, ২০২০ তারিখে সিয়াং (অরুণাচল প্রদেশের ব্রহ্মপুত্রের অংশ) নদীর ওপর ১০ গিগাওয়াট জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের ঘোষণা দেয় ভারত।
এ বিষয়ে পালাত রাও বলেন, প্রকল্পটি বর্ষা মৌসুমের প্রবাহের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারবে না। কারণ বেশিরভাগ বৃষ্টিপাত হিমালয়ের দক্ষিণে হয়। তবে জলপ্রবাহের যেকোনো পরিবর্তন শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করবে।”
তিনি আরও বলেন, “শুষ্ক মৌসুমে বাঁধের মাধ্যমে পানি প্রবাহ হ্রাস করলে পানি নিরাপত্তা এবং সুন্দরবনের নিম্নাঞ্চলীয় বদ্বীপে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হবে।”
তবে পালাত রাও জানান, এটি কেবল শুষ্ক মৌসুমে উদ্বেগের কারণ হবে, যখন জলপ্রবাহের মাত্রা কম থাকে।
তবে বাঁধের কারণে পলির ক্ষয়ক্ষতির সঙ্গে আরও একটি উদ্বেগের বিষয় জড়িত। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পলি বহন করা নদীগুলোর মধ্যে একটি। এই পলি প্লাবনভূমির উর্বরতা এবং বৃহৎ নদীতীর টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
রাও বলেন, “বাঁধগুলো অনিবার্যভাবে পলি আটকে রাখে। দীর্ঘমেয়াদে এটি চরগুলোর অখণ্ডতার জন্য হুমকি হতে পারে। এদের মধ্যে আবার অনেকগুলো চর বর্তমানে জনবসতিপূর্ণ। ভারতের আসামে এটি আঞ্চলিক রাজনীতির সাথেও মিথস্ক্রিয়া করতে পারে। কারণ আসামে চরগুলোতে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী অনেক বৈষম্যের সম্মুখীন।”

অঞ্চলটি টেকটোনিকভাবে সক্রিয় (ভূমিকম্প)। এছাড়া ব্রহ্মপুত্র অত্যন্ত বাঁকযুক্ত নদী, যা প্রায়শই তার গতিপথ পরিবর্তন করে। বন্যার উদ্বেগ ছাড়াও এই দুটিই অন্যান্য বড় ঝুঁকির কারণ।
পালাত রাও এ বিষয়ে মঙ্গাবে-ইন্ডিয়াকে বলেন, “উপত্যকায় এখন পর্যন্ত গৃহীত বন্যা ও নদী ব্যবস্থাপনাগুলো এলাকা-নির্দিষ্ট এবং বেশিরভাগই স্বল্পমেয়াদী কাঠামোগত ব্যবস্থা। এর মধ্যে রয়েছে, বাঁধ নির্মাণ, প্রবেশযোগ্য এবং অভেদ্য স্পার, রিভেটমেন্ট ইত্যাদি। তবে বন্যা ব্যবস্থাপনা কাঠামোর দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ মানুষের জন্য অপ্রত্যাশিত দুর্দশার কারণ হয়।”
তিনি আরও বলেন, নদীর আচরণ বৈজ্ঞানিকভাবে বোঝার পর কাঠামোগত ও অ-কাঠামোগত ব্যবস্থা মিলিয়ে নদীব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা উচিত।
ব্যানার ছবি: উঁচু থেকে ধারণকৃত বাঁকযুক্ত ব্রহ্মপুত্র নদীর দৃশ্য। ছবি: Ashwin Kumar/Wikimedia Commons.
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে, মঙ্গাবে ইন্ডিয়া-তে, ২০২১ সালের ১৪ জানুয়ারি।