- লোকশিল্পী নরেন হাঁসদা পশ্চিমবঙ্গের একজন সঙ্গীতশিল্পী। এক দশক ধরে পুরুলিয়া জেলার বনভূমি পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে যাওয়া এ শিল্পীর পরিবেশের প্রতি রয়েছে গভীর অনুরাগ।
- এই পথশিল্পী সাঁওতাল ও বাংলা ভাষায় প্রতিবেশ সম্পর্কিত কমপক্ষে ১২০টি গান রচনা করেছেন।
- এ বছর তার দল পুরুলিয়া জেলায় ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নিয়েছে।
প্রথম দেখায় নরেন হাঁসদাকে সাধারন একজন রকস্টারের মতোই দেখায়—চোখে স্পষ্ট অভিব্যক্তি, ঢিলেঢালা করে বাঁধা লম্বা চুল, কাঁধে ঝোলানো একটি তারের বাদ্যযন্ত্র। আরেকটু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, শরীর খুব সুঠাম না হলেও আঁটসাঁট শার্ট, হাতাকাটা জ্যাকেট আর জিন্স পরিহিত ব্যক্তিটি ভীষণ আত্মবিশ্বাসী। গান গাইতে শুরু করলেই তার রকস্টার সত্তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গানের সুরে সুরে যখন তিনি উচ্চারণ করেন ‘জঙ্গল, পাহাড়, ফুল, নদী’ তখন যারা তার ভাষা বোঝে না, তারাও বুঝতে পারে স্বরচিত ‘জঙ্গল মহল’ গানের মাধ্যমে তিনি প্রকৃতি বন্দনাই করছেন।
পরের গানটা শুরু করলেই যেন মনে হয়, প্রকৃতির আশীর্বাদপুষ্ট ভিন্ন কোনো জগতে হারিয়ে গেছেন তিনি। নরেন এরপর বাস্তবে ফিরে আসেন দর্শকের হাততালিতে।
“আমাকে প্রকৃতির সৌন্দর্যে ভরা পৃথিবী কল্পনা করতে হয় না। আমি এমন জায়গায়ই থেকেছি এবং এখনও থাকি। আমার গানও সেখান থেকেই অনুপ্রাণিত।”
ঝাড়খণ্ডের জামশেদপুরে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য আয়োজিত ‘সংবাদ ২০২১’ অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার শেষে এ কথা বলেছিলেন, চল্লিশের চৌকাঠ পেরিয়ে আসা নরেন হাঁসদা। তার গান সাঁওতালি ভাষায় লেখা। এটি পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর সাঁওতাল নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষা।
ইতিহাস বলে, প্রকৃতির সঙ্গে রয়েছে ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতের দীর্ঘ যোগাযোগ। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বহু রাগ প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত। এদের মধ্যে অন্যতম, রাগ মালহার (বৃষ্টি নিয়ে) আর বসন্ত বাহার (বসন্ত নিয়ে)। সেইসঙ্গে আদিবাসী সমাজেরও রয়েছে, আলাদা ভাষা ও উপভাষা। তবে এর বিশেষত্ব হলো, প্রায়ই গানের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে তাদের প্রতিবেশেগত ধারণা।
প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে দেওয়া অযোধ্যা পাহাড়
বছর দশেকেরও আগে, সঙ্গীতের টানেই সাঁওতাল নৃগোষ্ঠীর এই মানুষটি পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার নিজগ্রাম জাহাজপুর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। সাঁওতালি ও বাংলায় গান গাইতে গাইতে তিনি বিভিন্ন গ্রাম ও শহরে ঘুরে বেড়াতেন। তার বেশিরভাগ গানের বিষয়বস্তু ছিল, নানান সামাজিক অসঙ্গতি। ঘুরতে ঘুরতে একসময় তিনি অযোধ্যা পাহাড়ের পাদদেশে জনবসতিহীন ভালিডুংরি গ্রাম খুঁজে পান। সেখানকার শান্ত পরিবেশ তাকে মুগ্ধ করে, গান লেখার জন্য তিনি খুঁজে পান উৎকৃষ্ট এক স্থান।
নরেন বলেন, “ওই দুই বছর আমি প্রকৃতির খুব কাছাকাছি ছিলাম। খোলা আকাশের নিচে ঘুমাতাম, বনে ঘুরতাম আর প্রকৃতির স্তুতি গেয়ে সময় কাটাতাম। বৃষ্টি এলে কয়েক কিলোমিটার হেঁটে স্কুলে গিয়ে আশ্রয় নিতাম। দীর্ঘ সময় ধরে প্রকৃতির কোলে বসবাস করার কারণে প্রকৃতির প্রতি অন্তহীন ভালোবাসা তৈরি হয় আমার। নিজের অজান্তেই আমি সংরক্ষণবাদী হয়ে উঠতে শুরু করি।”
১৯৮৫ সালের পশ্চিমবঙ্গ জেলা গেজেট অনুযায়ী, পুরুলিয়ার ভূ-প্রকৃতি, মধ্য ভারতের পাহাড় ও ছোটনাগপুর মালভূমি থেকে বাংলার দামোদর সমভূমিতে নেমে এসেছে। এখানেই অবস্থিত অযোধ্যা পাহাড়। একসময় এই অঞ্চলকে বলা হতো, জঙ্গলমহল বা অরণ্যের জমি। পরে ব্রিটিশরা এটিকে মানভূম জেলার আওতায় নিয়ে আসে এবং ১৯৫৬ সালে বিহার ও বাংলার মধ্যে ভাগ করে দেয়। এই এলাকায় আগে প্রচুর আর্দ্র গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বন ছিল। কিন্তু উনিশ শতকের শুরুতে বৃটিশরা কাঠকে ‘সম্পদ’ হিসেবে বিবেচনা শুরু করে এবং ব্যাপক হারে শুরু করে বৃক্ষনিধন।
১৮৯৪ সালে ওই এলাকার দুটি ছোট বনকে সরকারি সংরক্ষিত বন ঘোষণা করা হয় এবং ১৮৬৫ সালের ভারতীয় বন আইন প্রয়োগের জন্য জরিপ এবং ম্যাপিং করা হয়। তবে এ সময় পুরুলিয়ার ব্যক্তিমালিকানাধীন বন রক্ষায় কোনো কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

গেজেটে উল্লেখ করা হয়, বিশ শতকের প্রথমার্ধে সংঘটিত দুই বিশ্বযুদ্ধ কাঠের চাহিদা বাড়িয়ে দেয়। ফলে বন আরও নষ্ট হয়। পাশাপাশি নষ্ট হয় পরিবেশের ভারসাম্য, ক্ষতিগ্রস্ত হয় বন্যপ্রাণী ও আদিবাসীদের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক। সেইসঙ্গে প্রায় হারিয়ে যায়, ভালো মানের কাঠ। কারণ তুমুল উৎসাহে বৃক্ষনিধন চললেও, বৃক্ষরোপণের প্রচেষ্টা ছিল খুবই সীমিত। অবশ্য ষাটের দশকের শেষের দিকে, মাটি সংরক্ষণ প্রকল্পের মাধ্যমে বনায়ন কার্যক্রম ‘সঠিকভাবে’ শুরু হয়েছিল; তবে একই জাতের বৃক্ষরোপণের কারণে সে সময় উদ্ভিদ এবং প্রাণীজগতে নেতিবাচক প্রভাবও পড়েছিল।
ভারতীয় বন প্রতিবেদন ২০২১ অনুযায়ী, পুরুলিয়ায় বনভূমি ৩ দশমিক ৩৬ বর্গ কিলোমিটার বেড়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালে পুরুলিয়ায় ৩৭ দশমিক ৩৮ বর্গ কিলোমিটার অতি ঘন বন, ৩০৭ দশমিক ৩৬ বর্গ কিলোমিটার মাঝারি ঘন বন এবং ৫৭৪ দশমিক ৫০ বর্গ কিলোমিটার উন্মুক্ত বন রয়েছে। ২০১৯ সালে এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৩৭ দশমিক ৩৬, ৩০৬ দশমিক ৯৪ এবং ৫৭১ দশমিক ৫৮ বর্গকিলোমিটার।
২০১৭ সালের এক গবেষণায় বলা হয়- বনজ সম্পদের অতিরিক্ত ব্যবহার, চাষাবাদের ধরন পরিবর্তন, অতিরিক্ত গবাদি পশু চরানো, বনের আগুন ও খনির খোঁড়াখুঁড়ি পুরুলিয়ার বন অবক্ষয়ের মূল কারণ।
সঙ্গীত থেকে পরিবেশ রক্ষার যাত্রা
প্রকৃতির স্বর্গরাজ্য অযোধ্যায় আনন্দঘন দিনগুলো যাপনের সময়, ধীরে ধীরে নরেন হাঁসদার চোখে পড়ে বনভূমির অবক্ষয়। শৈশব থেকেই তিনি দেখেছেন, মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে বা ব্যবসার জন্য গাছ কাটছে। তবে প্রকৃতির প্রতি তার টান সহজাত হলেও, সংঘর্ষ এড়িয়ে চলে বিনয়ের সাথে মানুষকে গাছ না কাটার জন্য অনুরোধ করতেন তিনি। যদিও তার কথায় গা করেনি কেউই।
নরেন বলেন, “তারা সবসময় বলতো, উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বা কোনো প্রয়োজনে গাছ কাটছে। এসব আমার কাছে জটিল মনে হতো। আমার নীবতা তাদেরকে যেন আরও সুযোগ করে দিচ্ছিল। স্লোগান দিয়ে লাভ নেই বুঝতে পেরে ভাবলাম, আমার গানকেই সচেতনতা তৈরির কাজে লাগাই।”
অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা হাঁসদা এ পর্যন্ত কমপক্ষে ১২০টি গান লিখেছেন।
তিনি গ্রামে গ্রামে গিয়ে তারের বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে গান করেন সহজ ভাষায়, তৈরি করেন জনসচেতনতা— ‘গাছ বাঁচাও, গাছ বাঁচলে পরিবেশ বাঁচবে, পরিবেশ বাঁচলে মানুষ বাঁচবে।’
তার অনন্য সঙ্গীত মানুষকে আকর্ষণ করে। এভাবেই তিনি শিল্পী থেকে কর্মী, আর তারপর হয়ে ওঠেন, স্বঘোষিত সংরক্ষণবাদী।
তিনি শুধু গানই গাইতেন না, গাছ কাটার বিরুদ্ধেও দাঁড়াতেন। কেউ না শুনলে তিনি চুপচাপ ফিরে যেতেন। পরদিন যেখান থেকে গাছ উপড়ে ফেলা হতো, সেই জায়গায় একটি চারা লাগাতেন। তার কৌশল ছিল সহজ, ‘প্রতিরোধ ব্যর্থ হলে নিজেই কাজে লেগে যাও’।
এ কাজে ৫ থেকে ১০ বছর বয়সী এতিম শিশুরা তাকে সাহায্য করতো। সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল বলে গ্রামবাসী তাকে স্কুল খোলার উৎসাহ দেয়। বর্তমানে তিনি পুরুলিয়ায় তিনটি ‘আশ্রম স্কুল’ চালান। এগুলোর মধ্যে একটি এতিম শিশুদের জন্য করা আবাসিক স্কুল। এই বাচ্চারাই তার শক্তি হয়ে ওঠে একসময়। গাছ কাটতে দেখলে সবাই মিলে বাধা দেয়।
নরেন বলেন, “প্রথমে কেউ আমাদের কথা শুনত না। বাধা দেওয়ার পরও একবার এক ব্যক্তি একটি গাছ কেটে ফেলেছিলেন। এরপর আমি শিশুদের আর কিছু গ্রামবাসীকে নিয়ে তার বাড়ি যাই। মারধর বা জরিমানা করিনি কিন্তু তাকে ঘিরে রেখেছিলাম, যতক্ষণ না তিনি তার ভুল বুঝতে পারলেন। এত লোক দেখে তিনি ভয়ে প্রতিশ্রুতি দিলেন, আর কখনও গাছ কাটবেন না। তখন বুঝতে পারলাম, আমার পাশে যদিও সব ছোট ছোট শিশুরা রয়েছে, তাদের শক্তিকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।”
নরেন এবং এই শিশুরা স্থানীয় এনজিওর দেওয়া চারাও লাগিয়ে গেছে। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অযোধ্যার বনের কয়েক একর জমি আবার সবুজ হয়েছে। তারা সেইসব অসংখ্য আদিবাসীদের দলে নাম লিখিয়েছে, যারা কোনো সরকারি সাহায্য ছাড়াই বন রক্ষা করছে।
নতুন বছরের পরিকল্পনা
নরেন হাঁসদার পরিবেশ রক্ষার যাত্রা শুরু হয়েছিল হঠাৎ করেই। তবে এখন তার পরিকল্পনা স্পষ্ট। এ বছর তিনি পুরুলিয়ার অনুর্বর জমিতে ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার চারা লাগাতে চান। পাশাপাশি চলবে গানও। এরইমধ্যে তিনি কয়েকটি এনজিওর সঙ্গে চারা সংগ্রহের ব্যাপারে কথা বলেছেন। জুন-জুলাই নাগাদ বৃক্ষরোপণ শুরু করবেন তিনি। অবশ্য বনভূমি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে কাজ করলেও, বৃহৎ পরিসরে কাজ চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে এখনও নিশ্চিত নন তিনি।
তিনি বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের কথা শুনেছি, যদিও এর অর্থটা ঠিক জানি না। আমাদের সংস্কৃতিতে শেখানো হয়, প্রকৃতির ক্ষতি করা পাপ। আমি যদি তা বুঝে কাজ করতে পারি, তবে শিক্ষিত মানুষরা কেন প্রতিবেশ নষ্ট করে যাচ্ছে সেটাই আমার বোধগম্য না।”
ব্যানার ছবি: সাঁওতাল ও বাংলা ভাষায় কমপক্ষে ১২০টি গান রচনা করেছেন নরেন হাঁসদা। ছবি: তাজীন কুরেশী
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে, মঙ্গাবে-ইন্ডিয়াতে , ২০২২ সালের ২৪ জানুয়ারি।