- বঙ্গোপসাগর ঘেঁষে সুন্দরবন— এটি বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনভূমি। এই বন মূলত শত শত প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর উপস্থিতিতে সমৃদ্ধ এক স্বতন্ত্র প্রতিবেশ। বন সংলগ্ন জনপদের জীবিকার জন্যে এটি নানা প্রাকৃতিক সম্পদেও পরিপূর্ণ। তবে প্রাচুর্যময় বাস্ততন্ত্রটি নানান কারণে এখন হুমকির মুখে।
- বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে বাংলাদেশ সরকার প্রথমবারের মতো একটি অনন্য পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারিভাবে জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিন মাসের জন্য সুন্দরবনে সব ধরনের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই সময়টি সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীদের প্রজনন মৌসুম বিধায় এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।
- তবে সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল স্থানীয় জনগোষ্ঠী, যারা খাদ্য ও সম্পদের জন্য এই বনের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল তারা জনান, এই নিষেধাজ্ঞা তাদের জীবন-জীবিকাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করবে এবং তাদেরকে দুর্দশার মধ্যে ফেলবে।
- পরিবেশ সংরক্ষণবিদরাও এই নিষেধাজ্ঞাকে ‘অসঙ্গতিপূর্ণ’ বলে উল্লেখ করেছেন। নিষেধাজ্ঞার সময় নিয়ে তাঁরা সংশয় প্রকাশ করেছেন। কারণ সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর প্রজনন সময়ও আলাদা। তাঁরা আরো বলেন, স্থানীয় জনগোষ্ঠী নয়, বরং বনে ঘুরতে আসা পর্যটকেরা এর বাস্তুতন্ত্রের সাম্যাবস্থার ব্যাঘাত ও দূষণের জন্য মূলত দায়ী। তাই বনে স্থানীয়দের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা এক্ষেত্রে তেমন কার্যকরী নয়।
আগামী জুন মাস থেকে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনে তিন মাসের জন্য সব ধরনের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে যাচ্ছে,বাংলাদেশ সরকার। এই নিষেধাজ্ঞা শুধু পর্যটকদের জন্যই নয়, বনের আশেপাশে বসবাসকারী স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্যও প্রযোজ্য হবে।
প্রতি বছরের জুন,জুলাই ও আগস্ট — এই তিন মাসব্যাপী বাংলাদেশ সরকার যে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার পরিকল্পনা করেছে, তার উদ্দেশ্য হলো প্রজনন মৌসুমে বন্যপ্রাণীদের জন্য একটি নিরবচ্ছিন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা।
সুন্দরবন ৪৫০টিরও বেশি প্রজাতি সমৃদ্ধ একটি অনন্য বন্যপ্রাণী আবাসস্থল। এখানে রয়েছে বেঙ্গল টাইগার (Panthera tigris tigris), গাঙ্গেয় শুশুক (Platanista gangetica), অজগর (Python molurus), নোনা জলের কুমির (Crocodylus porosus), বিভিন্ন প্রজাতির বানর, কয়েক ডজন মাছ এবং শত শত পাখি। বাংলাদেশের তিনটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য — সুন্দরবন পূর্ব, সুন্দরবন পশ্চিম এবং সুন্দরবন দক্ষিণ ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত। ৩৩০টিরও বেশি প্রজাতির গাছ, গুল্ম এবং পরজীবী উদ্ভিদ এই ম্যানগ্রোভ বনের প্রাকৃতিক সবুজ শোভাকে করেছে অনন্য।

ম্যানগ্রোভ বনটি বাংলাদেশ ও ভারত জুড়ে ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটার (৩ হাজার ৯০০ বর্গ মাইল) এরও বেশি এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এটি বাংলাদেশের মোট ভূমির ৪ শতাংশ বা ৬ হাজার ১৭ বর্গ কিলোমিটার (২ হাজার ৩২৩ বর্গ মাইল) এবং দেশের বনভূমির ৪০ শতাংশ জুড়ে রয়েছে।
সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ বনভূমির ভারত অংশকে আইইউসিএন-এর ইকোসিস্টেম ফ্রেমওয়ার্কের রেড লিস্টে ‘বিপন্ন’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ অংশে বনের প্রতিবেশের অবস্থাও প্রাকৃতিক এবং মানবসৃষ্ট উভয় কারণে হুমকির সম্মুখীন।
বাংলাদেশ সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবু নাসের মোহসিন হোসেন জানান, সরকার ২০২০ সালের ২৮ জুলাই বনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং এটি এই বছর থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে। তিনি বলেন, “বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের স্বার্থে আমরা কঠোরভাবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবো।”
তবে স্থানীয় জনগোষ্ঠী যারা তাদের দৈনন্দিন জীবিকার জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ম্যানগ্রোভের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত তাদের জীবিকায় বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ৬ লাখ মানুষ তাদের জীবিকার জন্যে সুন্দরবন থেকে আহরিত নানান সম্পদ যেমন মাছ, কাঁকড়া, মধু এবং নিপা পাম বা গোলপাতার (Nypa fruticans) ওপর বিভিন্নভাবে নির্ভরশীল। এদের মধ্যে প্রায় ১২ হাজার মানুষের বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেটের (BLC) অধীনে সারা বছর বনে নিয়মিত প্রবেশের অনুমতি রয়েছে।
বাকিরা সব সময়ই কোনো সরকারি অনুমতি ছাড়াই বনে প্রবেশ করে বিভিন্ন ধরনের বনজ সম্পদ সংগ্রহ করে থাকে। এর জন্য তারা সুন্দরবনের ১৬টি ফরেস্ট স্টেশনের যেকোনো একটি থেকে অনুমতি নেয়। এই স্টেশনগুলো প্রতিবছর প্রায় ৫ লাখ ইউএস ডলার রাজস্ব আয় করে।


সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের দাতিনাখালী গ্রামের বাসিন্দা ৫০ বছর বয়সী সাবেদ আলী বলেন, “গত ৩০ বছর ধরে আমি প্রায় প্রতিদিনই মাছ ও কাঁকড়া ধরা অথবা গোলপাতা বা মধু সংগ্রহের জন্য বনে যাই। আমার পরিবারের খরচের যোগান এই বন থেকেই আসে।”
তিনি আরও বলেন, “আমার মতো এখানে বসবাসকারী শত শত পরিবার এই বনের ওপর নির্ভরশীল। এই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত পরিবারগুলোকে কষ্টের দিকে ঠেলে দেবে।”
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পরিস্থিতি সামাল দিতে নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন প্রত্যেক পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ দেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে, ক্ষতিপূরণ প্রদানের সিদ্ধান্ত এখনও অনুমোদিত হয়নি।
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা হোসেন বলেন, “আমরা বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট থাকা প্রতিটি পরিবারের জন্য নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন সময়ে ১ বস্তা চাল (প্রায় ৪০ কিলোগ্রাম বা ৮৮ পাউন্ড) মূল্যের ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ বরাদ্দের প্রস্তাব পাঠিয়েছি। যদিও প্রয়োজনের তুলনায় এই পরিমাণ খুবই কম, তবুও এটি দিয়ে শুরু করা হবে। তবে দুর্ভাগ্যবশত, আমরা অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এখনও কোনো সাড়া পাইনি।”

এই নিষেধাজ্ঞা কি প্রয়োজনীয়?
সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিদদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। যদিও তারা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন, তবে ‘মঙ্গাবে’-র সঙ্গে আলোচনায় তারা নিষেধাজ্ঞার সময় এবং বন-নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল এইচ. খান বলেন, “যদিও উদ্যোগটি ভালো, এটির সময়টি সঠিক নয়।”
তিনি জানান, সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের উপর প্রাথমিক চাপের কারণ পর্যটন, সম্পদ সংগ্রহকারীরা এর জন্য দায়ী নন। কারণ পর্যটকরাই বেশি পরিবেশ দূষণ করে এবং বন্যপ্রাণীদের বিরক্ত করে। তিনি বলেন, “নিষেধাজ্ঞাটি আমার কাছে অনুপযুক্ত মনে হচ্ছে।”
তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার পর্যটক এই ম্যানগ্রোভ বন দেখতে আসেন।
খান বলেন, “তবে তাদের বেশিরভাগই নভেম্বর থেকে মার্চ মাসের মধ্যে শুষ্ক মৌসুমে আসেন। নিষেধাজ্ঞার সময়ে অর্থাৎ জুন থেকে আগস্ট মাসে বর্ষার কারণে পর্যটকদের সংখ্যা কম থাকে।”


বনে প্রবেশ নিষেধাজ্ঞার কারণ হিসেবে সরকার বন্যপ্রাণীর প্রজনন মৌসুমের কথা বললেও, গত ২০ বছর ধরে ম্যানগ্রোভের বন্যপ্রাণী নিয়ে বিশদ গবেষণা করা অধ্যাপক খান বলেন , “সব প্রজাতি একই সময়ে প্রজনন করে না। জুন, জুলাই এবং আগস্ট — এই তিন মাস সুন্দরবনে কেবল পাখিদেরই প্রজনন মৌসুম।”
বাংলাদেশ বন বিভাগের সাবেক প্রধান বন সংরক্ষক ইশতিয়াক উদ্দিন আহমেদও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি ’মঙ্গাবে’-কে বলেন, “যদিও অনিয়ন্ত্রিত সম্পদ আহরণ নিয়ন্ত্রণে আনা প্রয়োজন, তবে নিষেধাজ্ঞার জন্য নির্বাচিত সময়কাল উপযুক্ত হয়নি। সরকারের এটি পুনর্বিবেচনা করা উচিত।”
বন-নির্ভরশীল মানুষের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে সরকারের এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা উচিত নয়, কারণ এতে উল্টো ফল হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, “গরীব মানুষ তাদের জীবিকার জন্য নিষেধাজ্ঞা অমান্য করবে। তখন বন বিভাগ এবং বনজীবীদের মধ্যে সংঘাত দেখা দেবে, যা শেষ পর্যন্ত সংরক্ষণ প্রক্রিয়াকেই বাধাগ্রস্ত করবে।”
ব্যানার ছবি: খুলনায় একজন জেলে চিংড়ি সংগ্রহ করছেন। ছবি: কে এম আসাদ/ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল via Flickr (CC BY-NC-ND 2.0)
সাইটেশন:
Rahman, L. M., & Ahmed, F. U. (2016). Forest dependent people in Bangladesh. Souvenir: National Tree Fair Campaign and Tree Fair, 57-60. Retrieved from: https://www.researchgate.net/publication/305800243_FOREST_DEPENDENT_PEOPLE
Haque, M. Z., Reza, M. I. H., Alam, M. M., Ahmed, Z. U., & Islam, M. W. (2016). Discovery of a potential site for community-based sustainable ecotourism in the Sundarbans Reserve Forests, Bangladesh. International Journal of Conservation Science, 7(2), 553-566. Retrieved from: http://www.ijcs.uaic.ro/public/IJCS-16-30_Haque.pdf
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে গ্লোবাল-এ – এ, ২০২২ সালের ৩০ মে।