- বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জেলাগুলোতে জোয়ারের ঢেউ ক্রমশ বিপদজনক হয়ে উঠছে। যা ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুমে আরো তীব্র হয়, কখনও কখনও তা ১০ ফুট উচ্চতায় পৌঁছে।
- লোকালয় ও কৃষি জমিতে পানি প্রবেশ ঠেকাতে বাঁধ নির্মাণ করা হলেও ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতি এড়াতে এই বাঁধগুলো আর যথেষ্ট নয়। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ঘূর্ণিঝড়ের প্রবণতা বেড়েছে, ফলে বাঁধের ওপর পড়ছে বাড়তি চাপ। যা বাঁধ ভাঙার অন্যতম কারণ। এ কারণে জলোচ্ছ্বাসে বসতি হারানো এখন উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
- প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে, বাংলাদেশ সরকার এবং কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা বাঁধের পাশে বড় পরিসরে ম্যানগ্রোভ গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে, যা জোয়ারের ঢেউয়ের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
- বেসরকারি সংস্থাগুলো প্রাথমিকভাবে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে এবং স্থানীয়রা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে দেশী প্রজাতির ম্যানগ্রোভ রোপণের উদ্যোগে কাজ করছেন।
ময়না রানী মণ্ডল, বসবাস করছেন বাংলাদেশের সাতক্ষীরা উপকূলে। জোয়ারের উঁচু ঢেউয়ের কারণে গত তিন দশকে অন্তত ১০ বার তার বাড়িঘর তলিয়ে গেছে পানিতে।
বাংলাদেশ একটি বড় ব-দ্বীপ, যার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে ৩০০ ‘র বেশি নদ-নদী। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমি ধস ছাড়াও মাটির লবণাক্ততার মত নানারকম বিপর্যয় ও ঘনঘন প্রাকৃতিক বিপন্নতার কবলে পড়ছে সবসময়, এরকম দেশগুলোর ভেতর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণদের মধ্যে একটি বাংলাদেশ।
সমুদ্র এবং জোয়ারের ঢেউ থেকে বাঁচাতে, অধিকাংশ উপকূলীয় গ্রাম বাঁধ দিয়ে সুরক্ষিত রাখা হয়।
উপকূলের মানুষ সাধারণ জোয়ারের ঢেউয়ের সঙ্গে পরিচিত। এর উচ্চতার সীমা ও আছড়ে পড়ার ধরন সম্পর্কে তারা সচেতন। তবে ইদানিং ধরন বদলেছে মৌসুমী ঝড়গুলোর। ঘূর্ণিঝড়ের সময় যখন ঢেউ হয় অনেক উঁচু এবং শক্তিশালী, তখন সহজেই বাঁধ ভেঙে জলমগ্ন হয়ে পড়ে বসতিঅঞ্চল। প্রায় সব ঘূর্ণিঝড় উপকূলে আঘাত করার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামগুলো বন্যায় আক্রান্ত হয়। আর এই অবস্থায় স্থানীয়রা হয়ে পড়েন নিরুপায়। ঝড়ের তাণ্ডব থেকে রক্ষা পাওয়ার আর কোনো সুযোগ থাকেনা তাদের হাতে।

“বর্তমানে বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বাড়ছে, এবং আবহাওয়াও আর আগের মত থাকছেনা,” জানান ৫৫ বছর বয়সী বিধবা ময়না রানী। তিনি তার ছেলে, ছেলের স্ত্রী এবং নাতি-নাতনীদের সঙ্গে থাকেন। ময়না রাণী আরো জানান, অনেকদিন ধরেই জোয়ারের ঢেউয়ের উচ্চতার সঙ্গে বেড়ে চলেছে এর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ।
২০০৯ সালে এই এলাকায় ঘূর্ণিঝড় আইলা আঘাত করার সময়, ময়না রানি মণ্ডলের বাড়ি ভেসে যায়। সে সময় জোয়ারের ঢেউয়ের উচ্চতা ছিলো ১০ ফুটেরও বেশি।
এরপর ২০২১ সালের ২৬ মে উপকূলে আঘাত করে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস। প্রায় ১৩ লাখ মানুষ এই ঝড়ের কবলে পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ২৬ হাজার ঘরবাড়ি এবং কয়েক হাজার স্থাপনা। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেডক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তথ্য অনুসারে, এই ঝড়ে জোয়ারের ঢেউয়ের উচ্চতা ছিলো সাড়ে ছয় ফুটের বেশি।
ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেইঞ্জ (আইপিসিসি)-এর ”জলবায়ু পরিবর্তন ২০২১: দ্য ফিজিক্যাল সায়েন্স বেসিস” শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে আগামী দুই দশকে নানা ধরনের নেতিবাচক প্রভাবের মুখোমুখি হতে হবে বাংলাদেশকে, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো ঘূর্ণিঝড়গুলো আরো তীব্র ও বিধ্বংসী হবে।

প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বিকল্প নেই ম্যানগ্রোভের
ম্যানগ্রোভ হলো প্রাকৃতিক বাঁধ, যা উপকূলকে ঘূর্ণিঝড়ে বাতাসের চাপ এবং জোয়ারের ঢেউ থেকে রক্ষা করে। ম্যানগ্রোভের শ্বাসমূল মাটি ধরে রাখতে পারে বলে, এগুলো মাটির ক্ষয় প্রতিরোধেও সাহায্য করে।
জীবন ও জীবিকার ক্ষতি কমানো এবং টেকসই পতিবেশ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বাঁধের পাশ ঘেষে ম্যানগ্রোভ লাগাতে শুরু করেছেন বাংলাদেশের উপকূল এলাকার বাসিন্দারা। তারা এই গাছগুলোকে ঘূর্ণিঝড়ের সময় জোয়ারের ঢেউয়ের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক ঢাল বলে মনে করেন।
উপকূলের মানুষের পাশে দাঁড়াতে ন্যাশনাল অ্যাডাপ্টেশন প্রোগ্রাম অব অ্যাকশন (নাপা) বা জাতীয় অভিযোজন কর্মসূচি, ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন (এনডিসি) এবং বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেইঞ্জ স্ট্র্যাটিজি অ্যান্ড অ্যাকশন প্ল্যান (বিসিসিএসএপি) এর মতো বিভিন্ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এসব উদ্যোগে, উপকূলে ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছ লাগানোকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার জন্য অগ্রাধিকারমূলক উপায় হিসেবে সুপারিশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার অব ইনডিজেনাস নলেজ বা বারসিক, আইইউসিএন বাংলাদেশ ও ফ্রেন্ডশিপ এর মত বেশ কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা, ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছ লাগিয়ে বাঁধ শক্তিশালী করতে কাজ করছে। উপকূলের বিস্তীর্ন এলাকায় এরই মধ্যে ব্যাপক হারে রোপণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে তারা।


বারসিকের পরিচালক পাভেল পার্থ বলেন, “সমস্যার গুরুত্ব এবং ম্যানগ্রোভের সুবিধা বোঝার পর, আমরা স্থানীয় জনগণের সঙ্গে এক হয়ে তাদের প্রয়োজন ও চাহিদা অনুযায়ী কাজ করছি। আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে নিশ্চিত করছি ম্যানগ্রোভ কার্যক্রম ।”
“এভাবে নিজেদের কার্যক্রমের মাধ্যমেই গ্রাম আর জীবিকা রক্ষা করছে তারা। একই সঙ্গে রোপন করা গাছের মালিকানাও থাকছে তাদের হাতেই,” বলেন পার্থ।
এছাড়া আন্তর্জাতিক অনুদানকারীদের সহায়তায় বড় পরিসরে কাজ করছে ফ্রেন্ডশিপ । গত তিন বছরে তারা স্থানীয়দের অংশগ্রহণে ২০০ হেক্টর (প্রায় ৫০০ একর) এলাকায়, প্রায় ৫ লাখ গাছ রোপণ করেছে।
ফ্রেন্ডশিপের ক্লাইমেট অ্যাকশন সার্ভিসেসের জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ বদিউজ্জামান বলেন, “বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার অংশ হিসেবে আমরা নদীর তীরবর্তী এলাকায় অন্তত পাঁচ প্রজাতির ম্যানগ্রোভ গাছ রোপণ করে প্রাকৃতিব প্রতিরোধ ও পরিবেশের স্থায়িত্ব বাড়াচ্ছি। “নদী তীরবর্তী এলাকায়, যেখানে জোয়ারের পানি ওঠে সেসব জায়গায় এই কর্মসূচী বাস্তবায়ন হচ্ছে। ম্যানগ্রোভ গাছ রোপণের মাধ্যমে প্রতিবেশ ব্যবস্থার সহনশীলতা বাড়ানোর চেষ্টা করছি,” বলেন বদিউজ্জামান।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট জেলাতে নদী ও খালের সঙ্গে ম্যানগ্রোভ বন যুক্ত রয়েছে। এই অঞ্চল সুন্দরবনের কাছাকাছি হওয়ায় এবং লোনা পানির প্রাচুর্য থাকার কারণে সমুদ্রতট থেকে ১০০ কিলোমিটার ওপরের দিকেও ম্যানগ্রোভ গাছ জন্মায়। স্থানীয় প্রতিবেশ উপযোগী গাছগুলোর মধ্যে রয়েছে কেওড়া, বাইন, গেওয়া, খুলসি, কাঁকড়া, গোলপাতা ও গরান।
গাছ রোপন ও দীর্ঘমেয়াদে তা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ফ্রেন্ডশিপ স্থানীয় মানুষদের সম্পৃক্ত করেছে। তারা সুন্দরবনের আশপাশের জলাশয় থেকে ভেসে আসা ম্যানগ্রোভের বীজ সংগ্রহ, চারা তৈরি, বাঁধের পাশে রোপণের কাজগুলো করছে। একই সঙ্গে রোপণের পর এগুলো রক্ষণাবেক্ষনের দায়িত্বও রয়েছে তাদের ওপর।
“এই ভাবে তারা আমাদের সঙ্গে কাজ করে আর্থিকভাবেও উপকৃত হচ্ছেন,” বলেন মো. বদিউজ্জামান।

ব্যানার ছবি: সাতক্ষীরা জেলার ম্যানগ্রোভ রোপন কার্যক্রম। ছবি: আবু সিদ্দিক/মঙ্গাবে
সাইটেশন:
Islam, M. F., Bhattacharya, B., & Popescu, I. (2019). Flood risk assessment due to cyclone-induced dike breaching in coastal areas of Bangladesh. Natural Hazards and Earth System Sciences, 19(2), 353-368. European Geosciences Union. doi:10.5194/nhess-19-353-2019
Saenger, P., & Siddiqi, N. A. (1992). Land from the sea: The mangrove afforestation program of Bangladesh. Ocean & Coastal Management, 20(1), 23-39. doi:10.1016/0964-5691(93)90011-m
Phan, M. H., & Stive, M. J. F. (2022). Managing mangroves and coastal land cover in the Mekong Delta. Ocean and Coastal Management, 219, 106013. doi:10.1016/j.ocecoaman.2021.106013
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে গ্লোবাল-এ – এ, ২০২২ সালের ৩ জুন।