- বাংলাদেশে ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে বন্যা। এ সময় প্রায় এক কোটি মানুষের ঘরবাড়ি আর জীবিকা হুমকির মুখে পড়ে। যাদের অধিকাংশই বাস করে নদী চরে।
- সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভাঙন বেড়েছে চরাঞ্চলে। কারণ হিসেবে উজানে অতিবৃষ্টিকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে মৌসুমি বৃষ্টিতে বাড়ছে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর পানি, এতেই ডুবে যায় নিচু এলাকার চরগুলো।
- এই দুর্যোগে নিরাপত্তা দিতে সরকারি ও বেসরকারি কয়েকটি সংস্থা বর্ষার আগে চরবাসীদের বাড়িঘর উঁচু জায়গায় নির্মাণ করতে সহায়তা করছে।
৪৯ বছর বয়সী হামিদ আলী তার সারা জীবনে অন্তত আটবার ঘরবাড়ি বদলেছেন। প্রতিবার কারণ ছিল একই-কুড়িগ্রাম জেলার ব্রহ্মপুত্র নদীর চরে ভাঙন।
আশির দশকের শুরুতে অষ্টমীর চর পুরোপুরি ডুবে যায়। তখন হামিদ আলীসহ সেখানকার বাসিন্দারা চলে যান আরেক চর, নটাকান্দিতে। ১৯৯০ দশকের শেষ দিকে অষ্টমীর চর আবার জেগে ওঠে পানির ওপর। তখন তারা আবার ফিরে যান সেখানে। এরপর থেকে হামিদ আলী পরিবার নিয়ে অষ্টমীর চরেই বসবাস করছেন, তার চাষের জমির পরিমাণ আধা একরেরও কম।
ন্যাশনাল চর অ্যালায়েন্সের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় এক কোটি মানুষ নদী ও উপকূলের ১০৯টি চরে বসবাস করে, যেগুলো প্রতি বছরই থাকে বন্যার ঝুঁকিতে। বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৩২টিতে মোট জমির প্রায় ১০ শতাংশ জুড়ে বিস্তৃত এই চরগুলো।

চরবাসীদের মধ্যে বেশিরভাগই দরিদ্র। তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারগুলো বর্ষার আগেভাগেই ঘরবাড়ি উঁচু করে নিতে থাকে। কারণ বর্ষার সময় উজান থেকে নেমে আসা বিপুল পরিমাণ পানি বন্যার অন্যতম কারণ। এ সময় নদ-নদী দিয়ে এই পানি বঙ্গোপসাগরে পতিত হওয়ার সময় ভাসিয়ে দেয় আশাপাশের এসব চরগুলো।
নভেম্বর থেকে মার্চ, এই তিন মাস শুষ্ক মৌসুম। এ সময় পানির স্তর নিচে থাকায় চরবাসীরা অন্য জায়গা থেকে মাটি এনে ভিটা উঁচু করে নেয়। ভিটার সঙ্গে থাকে ঘাট, যা বর্ষার সময় উঁচু জায়গাটিতে ওঠা-নামায় সাহায্য করে। আবার এই ভিটার চারপাশে ঘাস আর জলজ সবজি লাগিয়ে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টাও থাকে স্থানীয়দের মধ্যে।
এখন চরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে ভিটা উঁচু করে বাড়ি বানানোর প্রবণতা। এমনকি যারা আগে সামর্থ্যের অভাবে করতে পারত না, তারাও এখন সরকার ও বিভিন্ন এনজিওর সহায়তায় এই ব্যবস্থার মধ্যে ঢুকছে। প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার একটি উপায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, এই পদ্ধতি।
বেসরকারিভাবে চরে বাড়ি নির্মাণে সহযোগিতা করছে চর লাইভলিহুডস প্রোগ্রাম আর পল্লী কর্ম–সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) কমিউনিটি ক্লাইমেট চেঞ্জ প্রজেক্ট (সিসিসিপি)। চরবাসীদের জীবন-জীবিকার ঝুঁকি কমানোই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
“যেসব এলাকা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, স্থানীয়দের অভিজ্ঞতা নিয়ে আমরা সেসব জায়গায় ক্লাস্টারভিত্তিক উঁচু ভিটা নির্মাণ করছি,” বলেন পিকেএসএফ–এর উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলে রাব্বি সাদেক আহমেদ।

বেসরকারি সংস্থা ফ্রেন্ডশিপ ভিটা প্রস্তুতের একটি নতুন নকশা চালু করেছে। ভিটার আকৃতি হবে ডিম্বাকৃতির, মাটি ফেলে অন্তত ৮–১২ ফুট উঁচু করা হয় এগুলো। ভিটাগুলো আকারে ছোটো এবং এমনভাবে বানানো হয় যাতে উত্তরের দিক থেকে আসা পানির প্রবাহে ঘরের ক্ষতি কম হয়। প্রতিটি ভিটায় ১৮ থেকে ৩০টি ঘর থাকে।
“এককেটি ভিটায় ১২০ থেকে ২০০ পরিবার এবং তাদের গবাদি পশুর থাকার ব্যবস্থা হয়,” বলেন ফ্রেন্ডশিপের প্রকল্প ব্যবস্থাপক মো. লাবিবুল ইসলাম। “ভিটার উচ্চতা নির্ধারণ করা হয় অতীতের বন্যার পানির রেকর্ড দেখে।”
৫০ বছর বয়সী মুসলেম উদ্দিন ফকির কুড়িগ্রামের নটাকান্দি চরেই থাকেন। ২০১৮ সালে তিনি উঁচু ভিটায় নতুন ঘর তোলেন।
“এখন বর্ষা এলেও আমাদের চিন্তা নেই, নিরাপদ লাগে, কারণ আমরা জানি ঘরবাড়ি আর গরু-ছাগল বাঁচবে,” বলেন তিনি।


বন্যা, ভাঙন আর নিরাপদ আশ্রয়
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান প্রভাব গুলোর মধ্যে নদী ভাঙন, হঠাৎ বন্যা, এবং দীর্ঘমেয়াদি বন্যা অন্যতম। বাংলাদেশ এবং ভারতের উজানে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বদলে যাওয়ার ফলে দেশটিতে বন্যার প্রকোপ বেড়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) বাংলাদেশের তিনটি বড় নদীর ভাঙন পর্যবেক্ষণ করেছে। নদীগুলো হলো গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা। ২০১৯ সালে ব্রহ্মপুত্রে ৭২৫ হেক্টর (১,৭৯২ একর) জমি আর গঙ্গায় ১,২৪০ হেক্টর (৩,০৬৪ একর) জমি নদীগর্ভে চলে যায়।
২০২০ সালে আরও বেশি জমি নদীতে বিলীন হয়: ব্রহ্মপুত্রে ১,১২০ হেক্টর (২,৭৬৮ একর) আর গঙ্গায় ১,২৬৫ হেক্টর (৩,১২৬ একর)। এসব জমিতে ছিল রাস্তা, কৃষিজমি, স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনা।
সিইজিআইএস আরও জানায়, ১৯৭৩ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে ব্রহ্মপুত্রের গড় প্রস্থ ৮.৫ কিলোমিটার থেকে বেড়ে ১২.২ কিলোমিটার হয়েছে।

প্রতিবছর প্রায় ১০ হাজার মানুষ নদীভাঙনে ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারায়, জানিয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড।
“যথাযথ নদী শাসন হলে ভাঙনের প্রভাব কমানো সম্ভব,” বলেন সিইজিআইএস–এর নদী, ব-দ্বীপ ও পলি বিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মমিনুল হক সরকার। তিনি আরও বলেন, “বৃষ্টিপাতের ধারা পরিবর্তন, নৌ চলাচল, আর উজানে বন উজাড়ে পানিতে বালির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার মত বেশ কিছু বিষয় আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে।”
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, চরবাসীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের জীবিকা কৃষির ওপর নির্ভরশীল। চরে দারিদ্র্যের হার ৩২ দশমিক ৪ শতাংশ—যা জাতীয় গড় ২৪ দশমিক ৩ শতাংশের চেয়ে অনেক বেশি।
“বন্যার সময় অনেক চরবাসী মৌসুমী শ্রমিক হিসেবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলে যায়, আবার কেউ কেউ স্থায়ীভাবেই এলাকা ছেড়ে দেন,” বলেন অর্থনীতিবিদ ও ন্যাশনাল চর অ্যালায়েন্সের প্রধান আতিউর রহমান।
চরবাসীদের জন্য ঘরবাড়ি ও জীবিকার সুযোগ বাড়াতে আরও অর্থ বরাদ্দ করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান রহমান। ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠিটি সরকারি সহযোগিতা পেলে বন্যার কারণে তাদের স্থানান্তর ঠেকানো অনেকাংশেই সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।

ব্যানার ছবি: চরে উঁচু ভিটার ওপর নির্মিত ঘরবাড়ি। ছবি : ফ্রেন্ডশিপ
সাইটেশন:
Ansari, M. S., Warner, J., Sukhwani, V., & Shaw, R. (2022). Implications of flood risk reduction interventions on community resilience: An assessment of community perception in Bangladesh. Climate, 10(2), 20. doi:10.3390/cli10020020
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে গ্লোবাল-এ – এ, ২০২২ সালের ২ আগস্ট।