- বাংলাদেশের নির্মাণ শিল্পে বালুর চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন।
- পরিবেশবাদীদের মতে, দেশের নদীগুলো থেকে উত্তোলিত বালুর প্রায় ৬০-৭০ ভাগই অবৈধভাবে তোলা। এ হারে বালু উত্তোলন নদীর প্রতিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, বাড়াচ্ছে নদী পাড়ের ক্ষয়। এছাড়া নদীর জীববৈচিত্র্যের জন্যও হুমকি এই অবৈধ কার্যক্রম।
- বাংলাদেশের নির্মাণ শিল্পে বাড়তে থাকা বালুর চাহিদা, অবৈধভাবে নদী খননের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে মনে করেন পরিবেশবাদীরা। পরিবেশ বা জলবায়ু সংক্রান্ত ঝুঁকির কথা বিবেচনা ছাড়াই নদী থেকে বালু সংগ্রহ করা হচ্ছে।
- খনন নিয়ন্ত্রণে ২০১০ সালে একটি আইন করা হয়, কিন্তু তা কার্যকর না হওয়ায় অবৈধ বালু উত্তোলন বাড়তে থাকে। আইন প্রয়োগের দুর্বলতা ও শাস্তির উদাহরণ না থাকায় প্রভাবশালীরা যুক্ত হচ্ছেন এই ব্যবসায়।
বাংলাদেশের নির্মাণ শিল্পে বালুর চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অবৈধ খননের মাত্রাও বেড়েছে, যা ছাপিয়ে যাচ্ছে বৈধ খননের পরিমাণকেও। শহর ও নগর সম্প্রসারণের কারণে বাড়ছে নির্মাণ কাজ। নির্মাণ শিল্পের চাহিদা মেটাতে নদী থেকে অবাধে চলছে বালু উত্তোলন। ভারত ও মায়ানমার থেকে আসা ৫৭ টি আন্ত-সীমান্ত নদীর মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশের নদীতে জমা হচ্ছে বালু-কাদাসহ পলি। এর পরিমাণ বছরে প্রায় ২.৪ বিলিয়ন টন ।
নদী থেকে উত্তোলিত বালুর বড় একটি অংশ জমি ভরাটে ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশ যেহেতু নদীমাতৃক দেশ এবং অনেক এলাকা বদ্বীপের অংশ, তাই নতুন জমি তৈরি করতে খাল-নালা বা ড্রেন ভরাট করা হয়। এতে বর্ষাকালে পানি স্থলভাগ থেকে নেমে যাওয়ার স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে যায়, সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা ও বাড়ে বন্যার ঝুঁকি।
সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, খনন প্রক্রিয়ার ফলে নদীর পাড়, বাড়ি, কৃষিজমি, স্কুল, সেতু এবং নদীর বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি ধ্বংস হচ্ছে নদী-সংলগ্ন ভূ-গর্ভস্থ জলাধার।
মূলত গঙ্গা এবং মেঘনা নদী অববাহিকাকে অবৈধ বালু উত্তোলনের প্রধান এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
সমস্যাটিকে আমলে নিয়ে বাংলাদেশ সরকার ২০১০ সালে পাথর ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন প্রনয়ণ করে। তবে সমালোচকরা বলছেন, এই আইনটি অবৈধ কার্যযক্রমকে যেমন নির্মূল করতে পারছেনা, তেমনি প্রয়োগ করার ক্ষেত্রেও রয়েছে প্রশাসনের উদাসীনতা ।

অনিয়মতান্ত্রিক উত্তোলনে বিপর্যস্ত নদী প্রতিবেশ
কোনো নিয়ম-কানুন তোয়াক্কা না করে যেভাবে বালু তোলা হচ্ছে, তাতে নদীর আশপাশের সমতল ভূমি, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যা বন্যাপ্রবণ অংশ ধীরে ধীরে নিচে দেবে যাচ্ছে। এর ফলে বাড়ছে বড় ধরনের বন্যা এবং অন্যান্য ক্ষতির আশঙ্কা। এছাড়া বালু উত্তোলনে পাল্টে যাচ্ছে নদীর তলদেশ আর উপকূলের স্বাভাবিক গঠন; যা বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা আর পশুপাখির জন্য ক্ষতিকর।
সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস)– এর নদী, বদ্বীপ এবং পলি বিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মমিনুল হক সরকার জানান, প্রাকৃতিক কারণ ছাড়াও অপরিকল্পিত বালু তোলা বাংলাদেশের নদীভাঙনের অন্যতম বড় কারণ।
“মাত্রাতিরিক্ত বালু উত্তোলন নদী ও এর চ্যানেলগুলোর অবনতি ঘটাচ্ছে। খনন প্রক্রিয়ায় নদীর তলদেশে সৃষ্টি হচ্ছে গর্ত যা নদীর পাড় ক্ষয়ের অন্যতম কারণ,” আরও জানান সরকার।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের তিনটি প্রধান নদীর (গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা) ভাঙন পর্যবেক্ষণ করেছে সিইজিআইএস। ২০১৯ সালে ব্রহ্মপুত্র নদীর ভাঙনে ৭২৫ হেক্টর (১,৭৯২ একর) জমি এবং গঙ্গা নদীর ভাঙনে ১,২৪০ হেক্টর (৩,০৬৪ একর) জমি বিলীন হয়ে গেছে।
এসব নদীর ভাঙনে ২০২০ সালে আরও জমি হারিয়েছে নদী সংলগ্ন এলাকাগুলো। ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে ১,১২০ হেক্টর (২,৭৬৮ একর) এবং গঙ্গার ভাঙনে ১,২৬৫ হেক্টর (৩,১২৬ একর) জমি নদীতে হারিয়ে যায়। এসব এলাকায় এক সময় রাস্তা, কৃষিজমি, স্কুল, হাসপাতাল-ক্লিনিক, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব ছিলো।

আইন প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে দুর্বলতা
পাথর এবং মাটি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক আইনকে ভীষণ দুর্বল বলে মনে করেন পরিবেশবাদী ও আইনজীবীরা। আইনটির সমালোচনা করে তারা বলেন, এই আইনে অনেক দুর্বলতা রয়েছে যে কারণে অপরাধ ও অপরাধীকে আইনি কাঠামোতে আনা কঠিন।
আইন অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার একটি এলাকাকে বালু খনি/মহাল হিসেবে ঘোষণা করতে পারে, কিন্তু সেটি চিহ্নিত করার কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড আইনে উল্লেখ নেই। এমনকি বালু মহাল ঘোষণার আগে এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমন্টে (EIA) বা পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করাও বাধ্যতামূলক করেনি আইনটি।
এদিকে, প্রতিবেশী দেশ ভারত দীর্ঘদিন হলো বালু উত্তোলনের জন্য EIA বাধ্যতামূলক করেছে এবং ২০১৬ সালে ৫ হেক্টরের চেয়েও ছোট প্রকল্পের জন্যও এই নিয়ম প্রযোজ্য করে দেশটি।
“আমাদের আইনি কাঠামো খুব দুর্বল এবং সেটিও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয় না,” বলেন পরিবেশ আইনজীবী ও অধিকার কর্মী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি আরো বলেন, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী স্থানীয় ব্যক্তিরা বালু ব্যবসার বড় অংশীদার।
“দুর্বল আইন সবসময় অভিযুক্তদের পালানোর পথ করে দেয়। কখনও কখনও স্থানীয় প্রশাসনের কাছে নিজেদের প্রভাব প্রয়োগ করে খনন চালিয়ে যায় তারা,” বলেন রিজওয়ানা।
সৈয়দা রিজওয়ানা যিনি বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল লইয়ারস এসোসিয়েশন (বেলা)-এর প্রধান নির্বাহীও, তিনি জানান বাংলাদেশে বালু উত্তোলনের পরিসংখ্যানও নেই। তবে ধারণা করা যায়, বাজারের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ ভাগ বালু অবৈধভাবে উত্তোলিত।
অবৈধ বালু উত্তোলন বিষয়ে বেলা সম্প্রতি কমপক্ষে ৩০০টি মামলা করেছে। “যে ধরনের শাস্তি প্রয়োগ হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা উদাহরণ তৈরি করেনা, কারণ এই আইনে অল্প জরিমানা দিয়ে মুক্তি পাওয়ার সুযোগ আছে,” বলেন রিজওয়ানা।

নিয়ন্ত্রণের বাইরে পরিস্থিতি
দুর্বল আইন ও অতিরিক্ত লাভের কারণে, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ক্রমশ বালু উত্তোলনে যুক্ত হচ্ছেন। ক্ষমতাবান এসব ব্যক্তির কারণে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলা কঠিন ও বিপজ্জনক বলে মনে করেন পরিবেশ কর্মীরা।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা এবং এক সাংবাদিক অবৈধ এই ধরনের কার্যক্রম খতিয়ে দেখার সময় শারীরিক হামলার শিকার হয়েছেন।
এছাড়া, ২০১২ সালে একটি বালু উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান মিথ্যা মামলা দিয়ে তিনজনকে আটক করার মত ঘটনার কথাও উঠে এসেছে এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশনের একটি প্রতিবেদনে।
ব্যানার ইমেজ: অবৈধভাবে বালু উত্তোলন তদারক করছে দুই ব্যক্তি। ছবি: ওয়াটারকিপারস বাংলাদেশ।
সাইটেশন:
Rentier, E. S., & Cammeraat, L. H. (2022). The environmental impacts of river sand mining. Science of The Total Environment, 838(1), 155877. doi:10.1016/j.scitotenv.2022.155877
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে গ্লোবাল-এ – এ, ২০২২ সালের ১৬ আগস্ট।