- পশ্চিমবঙ্গ বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে তারা যেসব ম্যানগ্রোভ বনায়ন করেছিল, তার অনেকগুলোই এরইমধ্যে ভাঙন ও জোয়ারে নষ্ট হয়ে গেছে।
- ২০২১ সালে প্রকাশিত এক বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভাঙনপ্রবণ এলাকায় ম্যানগ্রোভ টিকে থাকা কঠিন, কারণ উপকূলের উন্মুক্ত ও ভাঙনপ্রবণ অংশে ম্যানগ্রোভ অঙ্কুরিত হতে পারে না, ভাঙন রোধেও এটি কার্যকরী নয়।
- স্থানীয় বাসিন্দা ও বিজ্ঞানীদের মতে, এ ধরনের এলাকায় ম্যানগ্রোভের বেঁচে থাকার হার বাড়াতে বীজ বা চারা রোপণের আগে লবণ-সহনশীল ঘাস লাগানো, ঢেউ প্রতিরোধের জন্য সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি এবং নিয়মিত বেড়ার রক্ষণাবেক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।
ভারতের সুন্দরবনের পাখিরালয় ফেরিঘাটের পশ্চিমে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ মিটার এলাকা জুড়ে রয়েছে একটি ম্যানগ্রোভ বন। ২০২০ সালের বৃক্ষরোপণ প্রকল্পের অংশ ছিল এটি। চলতি বছরের মার্চে, গোমর নদীর জোয়ারে ভেসে গেছে বনটি। এর ঠিক পাশেই ছিল আরেকটি বন। প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ মিটার বিস্তৃত বনটি উত্তাল নদীর হাত থেকে রক্ষা পেলেও, গবাদি পশুর অবাধ বিচরণের প্রভাব থেকে রক্ষা পায়নি।
বনায়নকৃত এলাকাটি থেকে গবাদি পশুকে দূরে রাখতে কর্তৃপক্ষের নির্দেশে চারপাশে নাইলনের জাল বসানো হয়েছিল। তবে মঙ্গাবে-ইন্ডিয়া সরেজমিনে দেখতে পায়, সেইসব জালের কোনো চিহ্নই বর্তমানে অবশিষ্ট নেই। স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, ম্যানগ্রোভ গাছগুলো দুই-তিন ফুট লম্বা হয়ে উঠলেও, জায়গাটিতে গাছের ঘনত্ব বাড়েনি।

স্থানীয় বাসিন্দা যোগেশ মণ্ডল বলেন, “এখনও কিছু গাছ টিকে আছে। তবে গবাদি পশুর চারণ ভূমি হিসেবে এর ব্যবহার বন্ধ না করলে এবং নতুন বেড়া না দিলে কয়েক বছরের মধ্যেই এগুলোও হারিয়ে যাবে।”
ভারতের সুন্দরবন পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলাজুড়ে বিস্তৃত। এর মধ্যে দুটি প্রকল্পের প্রায় ১০ হেক্টর জমি গোসাবা দ্বীপের রাঙ্গাবেলিয়া পঞ্চায়েতে পড়েছে।

গোসাবা দ্বীপের কাছে ম্যানগ্রোভ বনভূমি। ২০০৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সুন্দরবনের ঘন ম্যানগ্রোভ আচ্ছাদন ১ হাজার ৩৮ বর্গ কিলোমিটার থেকে কমে ৯৯৪ বর্গকিলোমিটারে নেমে এসেছে। ছবি: শুভ্রাজিৎ সেন/মঙ্গাবে
২০২০ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এক বৃহৎ অভিযানে ২ হাজার ৫০০ হেক্টরের বেশি জমিতে ৫ কোটি ম্যানগ্রোভের বীজ রোপণ করেছিল। প্রতি হেক্টরে ২০ হাজার বীজ রোপণের লক্ষ্য থাকায়, এই ১০ হেক্টরে প্রায় ২ লাখ বীজ রোপিত হয়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা, এর মধ্যে বর্তমানে অস্ত্বিত্ব আছে মাত্র ৩০ হাজার গাছের।
ভারতের বন সম্পর্কিত প্রতিবেদন (২০২১) অনুযায়ী, দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার আয়তন ২ হাজার ৮০ দশমিক ৮২ বর্গ কিলোমিটার। এটি দেশের মোট ম্যানগ্রোভ এলাকার ৪১ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এখানেই বেঙ্গল টাইগারেরও বাসস্থান।
২০২০ সালে ঘূর্ণিঝড় আমফানের পর, ম্যানগ্রোভ বনের ক্ষতি ঠেকাতে Mahatma Gandhi National Rural Employment Guarantee Act (MGNREGA) এর অধীনে বিশাল বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুরু করেন, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
সরকারি তথ্যমতে, এ প্রকল্পের ফলে ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষের অস্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। এছাড়া, এই প্রকল্পে শ্রম দেওয়া মানুষদের ৬ কোটি ৫২ লাখ রুপিও প্রদান করা হয়।
প্রকল্পের আওতাধীন ৬০টি পঞ্চায়েতের প্রায় ২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমির ১ হাজার ৭২৫ হেক্টর ছিল অ-বনভূমি। যার মধ্যে রাঙ্গাবেলিয়াও ছিল।
রাঙ্গাবেলিয়া পঞ্চায়েতের উপ-প্রধান দেবপ্রসাদ সরকার বলেন, “নদী কিছু অংশ ভাসিয়ে নিয়ে গেলেও পার্শ্ববর্তী অংশে গাছের বৃদ্ধি সন্তোষজনক।”
এই ঘটনা প্রমাণ করে, ভাঙনপ্রবণ এলাকায় ম্যানগ্রোভ টিকিয়ে রাখা কঠিন। বেড়ার সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ না করলে গবাদি পশুও এর ক্ষতি করে। তবে নদীর ধারের মৃদু ঢাল ও প্রশস্ত জোয়ারের এলাকা বৃক্ষরোপণের জন্য আদর্শ।
গোসাবার বালি দ্বীপ, পাথরপ্রতিমার জি-প্লট এবং বাসন্তীর ঝারখালি এলাকায় গিয়েও একই পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করেছেন সংবাদদাতা ।

দ্রুত হারাচ্ছে ভারতের ম্যানগ্রোভ
The State of Forests in India এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৮৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনভূমির আয়তন ২ হাজার ৭৬ বর্গ কিলোমিটার থেকে ২ হাজার ১৫৫ বর্গ কিলোমিটারের মধ্যে ওঠানামা করেছে। তবে ২০০৭ <থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ঘন ম্যানগ্রোভ বন ১ হাজার ৩৮ বর্গকিলোমিটার থেকে কমে ৯৯৪ বর্গ কিলোমিটারে নেমে এসেছে। মাঝারি ঘন বন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরও বেশি। ৮৮১ বর্গ কিলোমিটার থেকে কমে ৬৯২ বর্গকিলোমিটার আয়তন হয়েছে এর। অন্যদিকে উন্মুক্ত বনভূমি ২৩৩ বর্গকিলোমিটার থেকে বেড়ে পৌঁছেছে ৪২৮ বর্গ কিলোমিটারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, বৃক্ষরোপণ উন্মুক্ত বন বৃদ্ধিতে বিশেষ অবদান রেখেছে। ২০২১ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সংরক্ষিত বনভূমি থেকে প্রায় ১১০ বর্গ কিলোমিটার ম্যানগ্রোভ বিলুপ্ত হয়েছে। অন্যদিকে জনবসতিপূর্ণ অংশে বন বেড়েছে ৮১ বর্গ কিলোমিটার।
সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড় প্রতিরোধে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে সরকারি কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোকে মাটির বাঁধে ম্যানগ্রোভ রোপণে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় উৎসাহিত হতে দেখা গেছে। প্রায়শই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের তহবিলে গড়ে উঠেছে এসব উদ্যোগ।
তবে তথ্যগুলো ভালোভাবে খতিয়ে দেখা যায়, ২০০৩ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের উন্মুক্ত ম্যানগ্রোভের আচ্ছাদন ৭১ বর্গ কিলোমিটার বৃদ্ধি পেলেও, ২০১৩ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে এর বৃদ্ধি ঘটেছে মাত্র ১৭ বর্গকিলোমিটার।

পরীক্ষামূলক বৃক্ষরোপণ ও ত্রুটি
২০০৪ সালের এশীয় সুনামির পর, উপকূলরেখাকে ঘূর্ণিঝড়, ঝড়ো হাওয়া এবং ভাঙন থেকে রক্ষার জন্য ম্যানগ্রোভ বৃক্ষরোপণ বিশ্বব্যাপী একটি জনপ্রিয় থিম হয়ে ওঠে। সুন্দরবন অঞ্চলে, বিশেষ করে ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলার পর এটি জনপ্রিয়তা লাভ করে। তখন থেকে বিশ্বব্যাপী উপযুক্ত উপকূলীয় অঞ্চলে লক্ষ লক্ষ ম্যানগ্রোভ বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে, যার মধ্যে সুন্দরবনও রয়েছে। কার্বন ধরে রাখার সম্ভাবনার জন্য এগুলো ব্যাপকভাবে স্বীকৃত।
২০১৪ সালে Wetlands International এবং The Nature Conservancy দ্বারা প্রকাশিত এক নথিতে, ভূমিক্ষয় রোধে বাতাস এবং ঢেউয়ের প্রভাব কমিয়ে ম্যানগ্রোভ বনায়নের ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশকিছু গবেষণায় দেখা যায়, ঘূর্ণিঝড় এবং ঝড়ো হাওয়ার প্রভাব কমাতে অবদান রাখলেও, ভাঙনরোধে অতটা কার্যকরি নয় ম্যানগ্রোভ। ২০১৯ সালের একটি গবেষণাপত্রে গুজরাটের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, ম্যানগ্রোভ রোপণ ভাঙন কমাতে ব্যর্থ হয়েছে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুনন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় মঙ্গাবে-ইন্ডিয়াকে বলেন, “মানুষের বসতি থাকা দ্বীপের তুলনায় ম্যানগ্রোভ দ্বীপ দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। এটি প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে।”

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুগত হাজরা বলেন, “সুরক্ষিত রাখতে না পারলে, ঢেউ বেশি থাকলে চারা টিকবে না। ঢেউ কম এমন এলাকায় ম্যানগ্রোভ ভালো বাড়ে, কিন্তু ভাঙন রোধ করতে চাইলে মাটির বাঁধের মতো সুরক্ষা প্রয়োজন। সেপ্টেম্বরের পর চারা রোপণ করলে সাফল্যের হারও বাড়তে পারে। কারণ এ সময়ে জোয়ারের ঢেউগুলো কম শক্তিশালী হয়। প্রকৃতিভেদে ভাঙনপ্রবণ এবং আবাদি এলাকার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতির প্রয়োজন পড়ে। “
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পরিবেশ বিভাগ কর্তৃক গঠিত একটি বিশেষজ্ঞ কমিটির জুলাই ২০২১ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপকূলের উন্মুক্ত ও ভেঙে যাওয়া অংশে ম্যানগ্রোভ অঙ্কুরিত হতে পারে না এবং মাটি ধরে রাখতে পারে না। এই এলাকাগুলোতে ম্যানগ্রোভ রোপণ ভাঙনকে প্রতিহত করতে পারবে না। এটি কেবল সুরক্ষিত, আবদ্ধ অংশে বা যেখানে সমুদ্রতীরবর্তী উপাদান কম সেখানে কাজ করবে।”
তবে ভাঙনরোধে কার্যকরি ভূমিকা না রাখলেও, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব কমাতে ম্যানগ্রোভের ভালো কাজ করার বিষয়ে একমত গবেষক দলটি।

মঙ্গাবে ইন্ডিয়ার পরিদর্শনে দেখা গেছে, বঙ্গোপসাগরের মুখোমুখি দ্বীপগুলোর মধ্যে একটি জি-প্লটে, দক্ষিণ-পূর্ব তীরে বৃক্ষরোপণ বেশিরভাগই ভাঙনের কারণে ভেসে গেছে। তবে, গ্রাম পঞ্চায়েতের সহযোগিতায় এনজিও উদ্যোগে বুড়োবুড়ির তাঁতে এক কিলোমিটার দীর্ঘ অভ্যন্তরে রোপিত গাছগুলো টিকে আছে।
সুন্দরবনের নারীদের নিয়ে গঠিত দল – সৃজানী এবং সবুজ সাথী, ২০১৭-২০১৮ সালে এক কিলোমিটার অভ্যন্তরে অবস্থিত জি-প্লট গ্রাম পঞ্চায়েতের গোবর্ধনপুর এবং বুড়োবুড়ির তাঁত মৌজার সীমান্তবর্তী খালের পাশে একটি মাটির সমতলভূমিতে প্রায় ৪০ হাজার চারা রোপণ করেছিল। সমন্বয়কারীদের একজন বুলুরানি দাসের মতে, সেখানে এখনো ২০ হাজারের বেশি চারা বেঁচে আছে।
জি-প্লট গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য বিমল দাস বলেন, “এই জমিতে বৃক্ষরোপণ সফল হয়েছে কারণ এটি কাদামাটির এলাকা এবং ঘেরা জায়গা। তবে গোবিন্দপুরের দক্ষিণ-পূর্বে ক্ষতিগ্রস্ত ছাতা এলাকায় ম্যানগ্রোভ গাছ লাগানোর প্রতিটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে।”

বালি দ্বীপের দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব অংশে একই রকম প্রবণতা দেখা গেছে। পাশাপাশি দক্ষিণ পশ্চিম শ্রীপতিনগর, পশ্চিম শ্রীধরনগর এবং দক্ষিণ কে-প্লটেও একই চিত্র দেখা যায়।
বালি দ্বীপের বাসিন্দা, Wildlife Protection Society of India (WPSI) এর প্রধান ফিল্ড অফিসার অনিল মিস্ত্রির মতে, ম্যানগ্রোভ চারার বেঁচে থাকার হার বৃদ্ধির জন্য সঠিক সময় এবং স্থান চিহ্নিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, “চন্দ্রচক্রের সপ্তম এবং দশম দিনের মধ্যে নিম্ন বসন্ত জোয়ার (যখন চাঁদ পূর্ণ এবং নতুন থাকে) নিম্ন নিপ জোয়ারের তুলনায় বেশি পিছিয়ে যায়, যার ফলে নদীর তীরে আরও কাদামাটির সৃষ্টি হয়।”
তবে নিম্ন বসন্ত জোয়ারের ফলে যে অতিরিক্ত স্থান পাওয়া যায় তা চারা রোপণের জন্য অনুপযুক্ত।
অনিল মিস্ত্রি মঙ্গাবে-ইন্ডিয়াকে বলেন, “নিম্ন বসন্ত জোয়ারের সময় রোপণ সংস্থাগুলো প্রায়শই সম্পূর্ণ উপলব্ধ অংশ ব্যবহার করে। তারা এটা বিবেচনা করে না যে এর কিছু অংশ প্রতি চন্দ্রচক্রের জন্য বেশ কয়েক দিন ধরে ক্রমাগত জলের নিচে থাকবে এবং এতে চারা মারা যাবে।”
২০২০ সালে ঘূর্ণিঝড় আমফানের পর বন্যায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা সুন্দরবনের উত্তর-পূর্ব প্রান্তের মাধবকাটি গ্রাম। সেই এলাকার বাসিন্দা, বাঙালি লোকশিল্পী ও আর্কাইভিস্ট সৌরভ মনি তখন নিজের গ্রাম ও আশপাশের এলাকায় বৃক্ষরোপণ অভিযানের নেতৃত্ব দেন। তার অভিজ্ঞতায়, এ অভিযানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, গাছ লাগানোর পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, “ঢেউ বারবার বেড়া ভেঙে ফেলে। তাই চারা টিকিয়ে রাখার হার বাড়াতে প্রতিরক্ষামূলক ব্যারিকেডগুলো দুই থেকে তিন বছর ধরে বারবার মেরামত বা পুনঃস্থাপন করতে হবে। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রায়শই মূল বাগানের তুলনায় বেশি আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হয়।”
মৌসুনি দ্বীপের ইন্টারনেট ক্যাফের মালিক মির্জা সাহেব বেগ। তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে বাগানের আদর্শ স্থান পরিবর্তন হচ্ছে, কিছু জায়গায় পলি এবং কাদামাটির পরিবর্তে বালি এবং কিছু জায়গায় বালির পরিবর্তে পলি জমছে।
এদিকে বঙ্গোপসাগরের সাথে আরেকটি নদী চিনাইয়ের মোহনার কাছে, পাঁচ থেকে দশ বছর আগে পরিচালিত বৃক্ষরোপণ অভিযান দৃশ্যত ভালো ফলাফল দিয়েছে। তবে, সেই অংশের পাশে, গত বছরের বাগানগুলো জমাট বাঁধা বালির নিচে চাপা পড়ে ছিল।

ঝারখালিতে স্বেচ্ছাসেবী টুম্পা ডাকুয়া বলেন, “জোয়ারের মধ্যে প্রশস্ত ও মৃদু ঢাল থাকলে গাছ বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেশি।”
প্রজাঘেরি গ্রামের আরেকজন স্বেচ্ছাসেবী জানান, গড়ে মাত্র ৩০ শতাংশ চারা টিকে থাকে।
পরিদর্শনকারী সংবাদদাতার অনুসন্ধান অনুসারে, বেশিরভাগ স্থানে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা নেই। তবে কিছু এনজিও নজরদারি রাখার জন্য এক বা দুইজন লোককে নিযুক্ত করে। প্রতি তিন থেকে ছয় মাসে কেবল একবার সাইট পরিদর্শন করা হয়। পূর্বে উল্লিখিত Wetlands International এবং The Nature Conservancy এর ২০১৪ সালের প্রতিবেদনে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৃথক চারা রক্ষা করার কথা বলা হয়েছিল। এসব সাইটে এমন কোনও অনুশীলন ছিল না।
ম্যানগ্রোভ রক্ষায় ঘাস
ওয়েস্টবেঙ্গল স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক কৃষ্ণা রায়ের মতে, ক্ষয়প্রাপ্ত জমিতে ম্যানগ্রোভ লাগানোর আগে লবণ সহনশীল ঘাস লাগানো উচিত। ২০১৪-২০১৮ সালে পাথরপ্রতিমায় তার নেতৃত্বে চালানো এক প্রকল্পে দেখা গেছে, ঘাস মাটি স্থিতিশীল রাখতে এবং বীজ আটকে রাখতে সাহায্য করে।
কেন্দ্রীয় সরকারের জৈবপ্রযুক্তি বিভাগের অনুদানে ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে পাথরপ্রতিমা ব্লকের রামগঙ্গা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় তিন হেক্টর জমিতে একটি পাইলট প্রকল্পের নেতৃত্ব দেন কৃষ্ণা রায়।
তিনি বলেন, “যেসব এলাকায় ঘাস লাগানো হয়েছিল, সেখানে গাছের সংখ্যা ও প্রজাতি উভয়ই বেশি ছিল। এই সাফল্যে ঘাসের অবদান রয়েছে, এটি বীজ আটকে রেখেছে “
তার মতে, চারটি স্থানীয় ঘাস — Porteresia coarctata, Myriostachya wightiana, Paspalum vaginatum এবং Sporobolus virginicus এক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে ঘাস লাগানো ও ছড়ানোর কাজ কয়েক বছর ধরে করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, “২০১৪ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে কিন্তু পরে বন প্রাকৃতিকভাবেই বৃদ্ধি পেতে শুরু করে।”
অবশ্য সরকার এই পদ্ধতি গ্রহণ করবে কিনা তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এ বছরের মে মাসে বন বিভাগ ঘোষণা করেছে, ২০২১-২২ সালে জেলায় আরও সাড়ে ১২ কোটি কোটি ম্যানগ্রোভ ও অন্যান্য প্রজাতির বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে।
ব্যানার ছবি: পশ্চিমবঙ্গের ভারতীয় সুন্দরবন। মৌসুনি দ্বীপে মৃত গাছের পাশে এই বছর রোপণ করা নতুন ম্যানগ্রোভ চারা। ছবি: শুভ্রাজিৎ সেন/মঙ্গাবে
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে, মঙ্গাবে ইন্ডিয়া-তে, ২০২২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর।