- বাংলাদেশ ও ভারত কমপক্ষে ৫৪টি নদী ভাগাভাগি করে, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র।
- বাংলাদেশের কৃষি, নৌচলাচল, অভ্যন্তরীণ মৎস্যচাষ এবং লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ রোধে উজান ও নিম্নাঞ্চলের পানির প্রবাহ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রয়োজনীয় পানি বণ্টন চুক্তির অভাবে তা ব্যাহত হচ্ছে।
- বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি সেচের জন্য কুশিয়ারা নদীর পানি বণ্টনের বিষয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে এতে মূল সমস্যার সমাধান হয়নি।
- ভারতের স্থানীয় রাজনীতির কারণে বাধাগ্রস্ত হওয়া গঙ্গা ও তিস্তার মতো প্রধান নদীগুলোর পানি বণ্টনের বিষয়ে, উভয় দেশের সরকারকে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি নিশ্চিতে জোর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি বণ্টন দীর্ঘমেয়াদী জটিল আলোচনার বিষয়। দুই দেশ অন্তত ৫৪টি নদী ভাগাভাগি করলেও এখন পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে শুধু গঙ্গার পানি বন্টন নিয়ে।
সম্প্রতি কুশিয়ারা নদীর পানি ভাগাভাগি নিয়ে ভারতের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। তবে পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা এ চুক্তিকে বলছেন, ‘অতল সমুদ্রের এক ফোঁটা জল’। তাদের মতে, এই ছোট নদীর চুক্তি মূল সমস্যার সমাধান নয়।
সম্প্রতি ভারত সফরে গিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর করেন। এতে ঠিক হয়, নভেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত অর্থাৎ শুষ্ক মৌসুমে কুশিয়ারা থেকে প্রতি সেকেন্ডে ৪ দশমিক ৩ ঘনমিটার (১৫৩ ঘনফুট) পানি দুই দেশই ব্যবহার করবে।
আন্তঃসীমান্ত নদী ও পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করা সংস্থা যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) সদস্য মালিক ফিদা এ. খান জানান, এই পানি দিয়ে বাংলাদেশে ৫ হাজার হেক্টর (১২ হাজার ৪০০ একর) জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হবে।

তবে বাংলাদেশের আন্তঃসীমান্ত পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নতুন চুক্তি ‘সমুদ্রের এক ফোঁটা জল’। এ চুক্তিতে হতাশা প্রকাশ করেছেন তারা। তাদের মতে, হিমালয় পর্বতমালা থেকে বঙ্গোপসাগরে প্রবাহিত প্রধান নদীগুলোর পানি বন্টনে ভাটির দেশ বাংলাদেশের স্বার্থকে যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছে না ভারত।
জেআরসির সাবেক টেকনিক্যাল সদস্য এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে কুশিয়ারার জন্য সমঝোতা স্মারককে বিশেষ কিছু মনে করি না।”
তিনি আরও বলেন, “দুই দেশ আগে থেকেই সেচের জন্য এই নদী থেকে পানি তুলছে— যা একটি আন্তর্জাতিক সীমান্ত। যদিও বিদ্যমান ঐকমত্যকে আনুষ্ঠানিক করা ভালো, তবুও আন্তঃসীমান্ত নদী নিয়ে আরও বেশ কিছু প্রধান সমস্যা রয়েছে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে সেগুলো উত্থাপন করে আসছে কিন্তু ভারত এতে গুরুত্ব দিচ্ছে না।”
হিমালয় থেকে প্রবাহিত নদীগুলির মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া পলি দ্বারা গঠিত বাংলাদেশ একটি সক্রিয় ব-দ্বীপ। জেআরসির তথ্যমতে, বাংলাদেশ ও ভারত কমপক্ষে ৫৪টি নদী ভাগাভাগি করে, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র। কৃষি, নৌযান, মৎস্য, এমনকি সমুদ্র থেকে লবণাক্ততা ঠেকাতেও এই নদীগুলোর পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধান নদীগুলোর চুক্তি
এখন পর্যন্ত ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একমাত্র দীর্ঘমেয়াদি পানি চুক্তি হলো, ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি। এই চুক্তি ২০২৫ সালে শেষ হবে। শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভারত সফরে উভয় সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ যে পানি পাচ্ছে তার সর্বোত্তম ব্যবহার হচ্ছে কিনা তা যাচাই করা হবে।
মালিক ফিদা বলেন, “আমরা এটিকে চুক্তি নবায়নের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছি।”
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন মালিক ফিদা। বর্তমানে Centre for Environmental and Geographic Information Services (CEGIS) এর নির্বাহী পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

তবে চুক্তিটি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা অধ্যাপক নিশাত বলেন, “চুক্তি অনুসারে, ১৯৯৬ সালে চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই এই মূল্যায়ন করা উচিত ছিল কিন্তু এটি কখনও হয়নি। দেখে ভালো লাগছে যে অবশেষে এটি মূল্যায়ন করা হচ্ছে।”
বাংলাদেশ বেশ কয়েক বছর ধরে আরেকটি প্রধান অভিন্ন নদী তিস্তার পানি বন্টনের জন্য একটি চুক্তি করতে চাইছে।
তবে ভারতের জাতীয় সরকার একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী হলেও, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধিতা করা হয়েছে। কারণ পশ্চিমবঙ্গ দিয়েই তিস্তা নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করে।
১৯৮৩ সালে একটি অস্থায়ী চুক্তি হয়েছিল দুই দেশের মধ্যে। চুক্তিতে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ ৩৬ শতাংশ ও ভারত ৩৯ শতাংশ পানি নেবে, আর ২৫ শতাংশ অব্যবহৃত থাকবে। ১৯৮৫ সালে শেষ হয়ে যাওয়া এ চুক্তি ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। তবে এরপর চুক্তিটির আর কোনো অগ্রগতি হয়নি।
২০১১ সালে, তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সফরের সময় উভয় সরকার একটি চুক্তি স্বাক্ষর করতে প্রস্তুত ছিল। তবে শেষ মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধিতা করায় তা ভেস্তে যায়।
এরপর থেকে তিস্তা নিয়ে কেবল ‘আলোচনা’ই চলছে।
অধ্যাপক নিশাত বলেন, “ভারতের রাজনৈতিক জটিলতার কারণে তিস্তা নিয়ে অচলাবস্থা কাটার সম্ভাবনা খুবই কম। পশ্চিমবঙ্গের সরকার পানি ভাগাভাগি করলে ভোট হারানোর ভয় পায়, আর কেন্দ্রীয় সরকারও পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের বিরোধিতা করতে চায় না। কারণ তারা ওই রাজ্যে রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতে চায়।”

যৌথ নদী কমিশনের ভূমিকা
বিশেষজ্ঞদের দাবি, যৌথ নদী কমিশন (জেআরসি) আসলে অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
এটি গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল, প্রতিবছর অন্তত একবার দুই দেশের মধ্যে বৈঠক করা। কিন্তু ২০১০ সালের মার্চে এক বৈঠকের পর, সর্বশেষ বৈঠক হয় ২০২২ সালের ২৫ আগস্ট। মাঝখানে সময় পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ ১২ বছর।
নদী সংরক্ষণ সংগঠন Riverine People এর সাধারণ সম্পাদক শেখ রোকন বলেন, “১২ বছরের ব্যবধানই দেখায়, জেআরসি কতটা অকার্যকর এবং সরকারের কাছে এটি কতটা অগ্রাধিকার পায়।”
তিনি আরও বলেন, “জেআরসি আসলে কেবল একটি সহায়তাকারী প্ল্যাটফর্ম, সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা এর নেই।”
অধ্যাপক নিশাত মনে করেন, যৌথভাবে পানি ব্যবস্থাপনার পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে বড় সংকট দেখা দেবে। কারণ দুই দেশেই পানির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।
তার মতে, বর্ষার পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে সমগ্র অববাহিকার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ নদী ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।
ব্যানার ছবি: পদ্মা নদীর তীরে নৌকা। নদীটি বাংলাদেশে প্রবাহিত গঙ্গার প্রধান শাখা। ছবি: Enamur Reza via Flickr (CC BY 2.0).
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে, মঙ্গাবে গ্লোবাল এ, ২০২২ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর।