- ১৯৭২ সালে পণ্য পরিবহনের জন্য জলপথ ব্যবহারের প্রোটোকল স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ ও ভারত। নির্ধারিত ১১টি রুটের মধ্যে বর্তমানে নিয়মিতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে মাত্র তিনটি রুট। কারণ বেশিরভাগ রুটেই বড় জাহাজ চলাচলের জন্য নেই পর্যাপ্ত গভীরতা।
- ২০১৬ সালের বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, রেলপথ এবং সড়কপথে পরিবহনের তুলনায় জলপথে পণ্য পরিবহনের খরচ কম। তবে বর্ষা মৌসুমে বাংলাদেশের মাত্র এক-চতুর্থাংশ নৌপথে যান্ত্রিক জলযান চলাচল করতে পারে। আর শুষ্ক মৌসুমে নাব্য সংকটের কারণে নদীপথ আরও কমে যায়।
- সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার চীনের একটি কোম্পানির সঙ্গে ৭১ মিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি করেছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এ প্রকল্পের এর মূল লক্ষ্য হলো, ড্রেজিং এর মাধ্যমে বাংলাদেশ হয়ে ভারত ও তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে পরিবহন রুট উন্নত করা এবং পণ্য পরিবহন আরও সহজ করা।
- তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাপক খনন কার্যক্রম গ্রহণের পাশাপাশি, নদীগুলোর যথাযথ ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। যেমন চ্যানেলগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং বাঁধ সুরক্ষা। অন্যথায় পুনরায় পলি জমে অল্প সময়ের মধ্যে চ্যানেলগুলো বন্ধ হয়ে যাবে।
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। দেশের জলপথগুলো শুধু অভ্যন্তরীণ যোগাযোগেই নয়, আঞ্চলিক বাণিজ্য ও ভূ-কৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরেই যৌথভাবে এই জলপথ ব্যবহার করছে বাংলাদেশ ও ভারত।
বাংলাদেশের জলপথ বাংলাদেশ ও ভারতের জন্য অর্থনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। তবে পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে এই রুটগুলোর বেশিরভাগই অকেজো হয়ে পড়েছে।
১৯৭২ সালে পণ্য পরিবহনের জন্য জলপথ ব্যবহারের প্রোটোকল স্বাক্ষর করে দেশ দুটি। নির্ধারিত ১১টি রুটের মধ্যে বর্তমানে নিয়মিতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে মাত্র তিনটি রুট। কারণ বেশিরভাগ রুটেই বড় জাহাজ চলাচলের জন্য নেই পর্যাপ্ত গভীরতা। কিছু রুট রয়েছে যেগুলো মাঝেমধ্যে ব্যবহৃত হয়। আবার কিছু রুট বছরে একবারও ব্যবহার করা হয় না।
অথচ এই রুটগুলো নিয়মিত ব্যবহার করা হলে বেশ কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা লাভের সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশের।
ভারতীয় জাহাজগুলো এসব রুটে চলাচল করলে, তাদের ভ্রমণের সময় নানা পরিষেবা দেওয়া সম্ভব হবে। এতে করে সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি এবং পণ্য সরবরাহ সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে রপ্তানি বাড়ানোরও চেষ্টা করছে। ১৯৭২ সালের প্রোটোকল সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হলে, বাংলাদেশের জন্য ভারতের কিছু কিছু অঞ্চলে পণ্য রপ্তানি বাড়ানো তুলনামূলক সহজ হবে।
পাশাপাশি, ভারতের কাছেও এই জলপথ ব্যবহারের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে।
ভৌগোলিকভাবে ভারতের মূল ভূখণ্ড বাংলাদেশ দ্বারা তার উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন এবং শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের একটি সংকীর্ণ করিডোরের মাধ্যমে সংযুক্ত। প্রোটোকলে ভারতের প্রাথমিক আগ্রহের জায়গাটি হলো, জলপথ ব্যবহার করে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে মূল ভূখণ্ডের সাথে সংযুক্ত করা।
তবে এ সব কিছুতেই বাধা হয়ে যেটি দাঁড়িয়ে আছে তা হলো, নদীর নাব্য সংকট।
বর্ষা মৌসুমে বাংলাদেশের নৌপথের মাত্র ৫ হাজার ৯৯৫ কিলোমিটার (৩ হাজার ৭২৫ মাইল) যান্ত্রিক জলযান চলাচলের উপযোগী থাকে। শুষ্ক মৌসুমে এই আয়তন কমে ৩ হাজার ৮৬৫ কিলোমিটার (২ হাজার ৪০০ মাইল) হয়ে যায়, যা দেশের ২৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথের অল্প কিছু অংশ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের নদী ব্যবস্থায় ২ হাজার ৩০০ কিলোমিটার (১ হাজার ৪২৯ মাইল) নৌপথ যুক্ত করতে ব্যাপক ড্রেজিং ও খনন কাজ পরিচালনা করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ।
বাংলাদেশ ও ভারত, উভয় দেশের জন্যই সবচেয়ে সাশ্রয়ী পরিবহন মাধ্যম নৌপথ।
২০১৬ সালের বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, জলপথে প্রতি কিলোমিটারে এক টন পণ্য পরিবহনের জন্য দশমিক ৯৯ টাকা (দশমিক ০১৩ ডলার) খরচ হয়। অন্যদিকে, রেলপথে পরিবহনের জন্য ২ দশমিক ৭৪ টাকা (দশমিক ০৩ ডলার) এবং সড়কপথে ৪ দশমিক ৫০ টাকা (দশমিক ০৬ ডলার) খরচ হয়।
প্রোটোকলে নির্ধারিত রুটসমূহ
- ঘোড়াশাল (বাংলাদেশ) – ব্যান্ডেল (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত)
- মোংলা (বাংলাদেশ) – হলদিয়া (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত)
- মোংলা (বাংলাদেশ) – নারায়ণগঞ্জ হয়ে – করিমগঞ্জ (আসাম, ভারত)
- সিরাজগঞ্জ (বাংলাদেশ) – পাণ্ডু (আসাম, ভারত)
- আশুগঞ্জ (বাংলাদেশ) – শিলঘাট (আসাম, ভারত)
- চিলমারী (বাংলাদেশ) – ধুবড়ি (আসাম, ভারত)
- রাজশাহী (বাংলাদেশ) – ধুলিয়ান (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত)
- সুলতানগঞ্জ (বাংলাদেশ) – মাইয়া (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত)
- চিলমারী (বাংলাদেশ) – কোলাঘাট (আসাম, ভারত)
- দাউদকান্দি (বাংলাদেশ) – সোনামুড়া (ত্রিপুরা, ভারত)
- বাহাদুরাবাদ (বাংলাদেশ) – জোগিঘোপা (আসাম, ভারত)
নাব্য সংকট
প্রোটোকলে চিহ্নিত বেশিরভাগ রুটে উজান থেকে আসা প্রচুর পলি জমে। এই পলি জাহাজ চলাচল ব্যাহত করে। আবার এমন অনেক রুট রয়েছে, যেগুলো বড় জাহাজ চলাচলের উপযোগী নয়।
Center for Environmental and Geographic Information Services (CEGIS) এর নদী, ব-দ্বীপ ও পলিবিদ্যা বিষয়ক জেষ্ঠ্য উপদেষ্টা মমিনুল হক সরকার বলেন, “অপারেটররা এসব রুট ব্যবহারে আগ্রহী নয়। কারণ ছোট জাহাজ চালিয়ে লাভবান হওয়া সম্ভব নয়।”
বর্তমানে সর্বাধিক ব্যবহৃত রুটগুলো হলো মোংলা–হলদিয়া, চিলমারী–ধুবড়ি এবং নারায়ণগঞ্জ–করিমগঞ্জ।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা থেকে আসামের পাণ্ডু পর্যন্ত মোংলা–হলদিয়া রুটে মাত্র ১২টি কার্গো ট্রিপ হয়েছিল। পরের অর্থবছরে সেই সংখ্যা নেমে আসে তিনটিতে।
বাংলাদেশের চিলমারী থেকে আসামের ধুবড়ি পর্যন্ত ২০২০-২১ সালে ২৮টি ট্রিপ হয়েছিল। পরের বছর এই রুটে ট্রিপের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৯টিতে।
একইভাবে, নারায়ণগঞ্জ থেকে আসামের করিমগঞ্জ রুটে ২০২০-২১ সালে মাত্র একটি ট্রিপ হলেও পরের বছর তা বেড়ে হয় ১৫টি।
অন্যদিকে, রাজশাহী–ধুলিয়ান রুট শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহার করা যায় না। কারণ নদীতে যথেষ্ট পানি থাকে না। একারণে গত দুই অর্থবছরে রুটটি একবারও ব্যবহৃত হয়নি।
কলকাতা থেকে আসামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রুট গেছে বাংলাদেশের সুরমা–কুশিয়ারা নদীর মধ্য দিয়ে। তবে এই রুট বর্তমানে অকেজো।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও জলবিদ্যা বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত বলেন, “ভারত সরকারের সহযোগিতায় চ্যানেল সচল করার জন্য কাজ চলছে। কারণ তারা বিশ্বাস করে, এই রুট ব্যবহার করলে সময় ও খরচ দুটোই কমবে।”

ড্রেজিং কি একমাত্র সমাধান?
হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীর পলিতে গঠিত সক্রিয় একটি ব-দ্বীপ বাংলাদেশ। মোট ৫৪টি আন্তঃসীমন্ত নদী ব্যবহার করে বাংলাদেশ ও ভারত। দুই দেশেরই কৃষি, নৌচলাচল ও অভ্যন্তরীণ মৎস্য সম্পদ এসব নদীর ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি সমুদ্রের লবণাক্ততা ঠেকাতোও কাজ করে এগুলো।
প্রতিবছর এসব নদী ও জলাশয় প্রায় ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন টন পলি বহন করে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৭১ মিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি করেছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এ প্রকল্পের এর মূল লক্ষ্য হলো, ড্রেজিং এর মাধ্যমে বাংলাদেশ হয়ে ভারত ও তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে পরিবহন রুট উন্নত করা এবং পণ্য পরিবহন আরও সহজ করা।
এ চুক্তি স্বাক্ষরের সময় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের সদস্য মতিউর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, “এই রুটগুলোতে ড্রেজিং করলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ বাড়বে। এতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য ও মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে।”
তিনি আরও বলেন, “ঢাকা–চট্টগ্রাম–আশুগঞ্জ নদী রুটের ড্রেজিং শেষ হলে জাহাজগুলো সরাসরি ঢাকার পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার টার্মিনালে আসতে পারবে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি বৃদ্ধি পাবে।”
তবে এ বিষয়ে আইনুন নিশাত ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি চ্যানেল রক্ষণাবেক্ষণ ও বাঁধ সুরক্ষার মতো নদী ব্যবস্থাপনারও পরামর্শ দেন। কারণ তা না হলে অল্প সময়েই আবার পলি জমে চ্যানেল বন্ধ হয়ে যাবে।
ব্যানার ছবি: ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে বাংলাদেশে প্রবাহিত হওয়া উমঙ্গোট নদী। ছবি: Santanu Sen via Flickr (CC BY-NC-ND 2.0).
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে, মঙ্গাবে গ্লোবাল এ, ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর।