- বাংলাদেশের অধিকাংশ জেলেদের দাবি, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাছ ইলিশ ধরার ওপর তিন সপ্তাহের নিষেধাজ্ঞার সময়কালে, সরকার কর্তৃক প্রতিশ্রুত ক্ষতিপূরণ তারা এখনও পাননি।
- চলতি নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২৮ অক্টোবর। নিষেধাজ্ঞার শুরুতে জেলেদের ৪০ কেজি (৮৮ পাউন্ড) চালের প্যাকেজ বিতরণ করার কথা ছিল সরকারের। তবে স্থানীয় প্রভাবশালীদের ওপর সরকারি সহায়তা প্যাকেজ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
- সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৫ লাখ জেলে সরাসরি ইলিশ আহরণের সঙ্গে যুক্ত। এছাড়া আরও ২০ লাখ জেলে পরোক্ষভাবে এর ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদশের মোট মৎস্য সম্পদের আট ভাগের এক ভাগই ইলিশ (Tenualosa ilisha)। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে ১ শতাংশেরও বেশি অবদান রাখে এটি।
- মাছের বংশবৃদ্ধি ও জাটকা ইলিশ বাঁচাতে, বছরে দুই বার ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করে সরকার।
দেখতে সাধারন রুপোলি রঙের মাছ মনে হলেও, বাংলাদশের মোট মৎস্য সম্পদের আটভাগের এক ভাগই ইলিশ (Tenualosa ilisha)। মোট দেশজ উৎপাদনে ১ শতাংশেরও বেশি অবদান রাখে এটি। বাংলাদেশে এর গুরুত্ব এতই বেশি যে মাছের বংশবৃদ্ধি ও জাটকা ইলিশ বাঁচাতে, বছরে দুই বার প্রায় তিন সপ্তাহের জন্য ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করে সরকার।
সে হিসেবে চলমান নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে ২৮ অক্টোবর। যদিও এই সময়ে জেলেদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা থাকলেও অনেকেই জানিয়েছেন, তারা এখনও সেই সহায়তা পাননি।
এ বিষয়ে ভোলা, পটুয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও বরিশালসহ উপকূলীয় জেলাগুলোর বেশকিছু জেলেদের সঙ্গে কথা বলে মঙ্গাবে। তাদের মধ্যে একজন আবদুল জলিল। তিনি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ইলিশ উৎপাদন কেন্দ্র ভোলার একজন জেলে।
আবদুল জলিল জানান, জেলা প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার সময়, মাছ না ধরার বিনিময়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে প্রতিটি জেলের ৪০ কেজি (৮৮ পাউন্ড) চাল পাওয়ার কথা ছিল। তবে তারা কোনো সহায়তা পাননি।

তিনি মনে করেন, জেলেদের প্রতি সরকারের মনোভাব অন্যায্য।
স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা ভাঙার জন্য অনেক জেলেকে জরিমানা বা এমনকি জেলেও পাঠানো হয়েছে।
এ ব্যাপারে আবদুল জলিল বলেন, “যদি সরকার চায় আমরা এই সময়ে মাছ না ধরি, তবে আমাদের সময়মতো ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। না হলে জীবিকা চালাতে আমরা মাছ ধরতেই বাধ্য হব। জরিমানা বা জেলের ভয় দেখিয়ে আমাদের থামানো যাবে না।”
ক্ষতিপূরণ প্রদান প্রক্রিয়া সহজ করতে ‘মৎস্যজীবী কার্ড’ বিতরণের ব্যবস্থা করেছে সরকার। এই কার্ড দেখিয়ে নিষেধাজ্ঞার সময়ে ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ দাবি করতে পারেন জেলেরা। তবে ভোলার জেলে রেজাউল করিম অভিযোগ করেন, প্রকৃত জেলেদের অনেকেই কার্ড পাননি। বরং প্রভাবশালী স্থানীয় ব্যক্তিরা বা তাদের পরিবারের সদস্যরা এগুলো পেয়েছেন।
বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান Center for Natural Resources Study (CNRS) এর নির্বাহী পরিচালক এম. মুখলেছুর রহমান বলেন, “দিন এনে দিন খাওয়া দরিদ্র জেলেদের একদিনের আয় বন্ধ হলেও তা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। সে তুলনায় সরকার যে সহায়তা দিচ্ছে তা খুবই নগণ্য।”
সরকারি ইলিশ সংরক্ষণ কর্মসূচির প্রধান জিয়া হায়দার চৌধুরী স্বীকার করেন, নিষেধাজ্ঞার সময় শেষ হলেও অনেক জেলে এখনো প্রতিশ্রুত সহায়তা পাননি। তিনি বলেন, “আমরা চেষ্টা করছি ক্ষতিপূরণ সময়মতো পৌঁছে দিতে। এরকমটা খুব কম হয়, তবে উপকূলীয় এলাকার দুর্গমতার কারণে কখনও কখনও সময়মতো সহায়তা পৌঁছে দেয়া সম্ভব হয় না।”
তবে সরকার ধীরে ধীরে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বাড়াচ্ছে বলেও জানান তিনি।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৫ লাখ জেলে সরাসরি ইলিশ আহরণের সঙ্গে যুক্ত। এছাড়া আরও ২০ লাখ জেলে পরোক্ষভাবে এর ওপর নির্ভরশীল।
মূলত ইলিশের ডিম রক্ষায় ২০০০ সালের শুরুর দিক থেকে সরকার ইলিশ ধরায় নিয়মিত বিরতিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আসছে। এবার নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে ২৮ অক্টোবর। ২০০৭ সাল থেকে প্রতি অক্টোবরে এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আনিসুর রহমান বলেন, “সর্বোত্তম ফল পেতে হলে, নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের সঠিকভাবে ক্ষতিপূরণ প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, যেহেতু এটি তাদের জীবিকার প্রশ্ন, তাই নিষেধাজ্ঞার সময়ে বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি।”
তিনি জানান, সরকার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইলিশ সংরক্ষণ ট্রাস্ট তহবিলের মাধ্যমে জেলেদের বিকল্প জীবিকা তৈরি করছে। তিনি বিশ্বাস করেন, ট্রাস্ট তহবিল নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের জন্য কার্যকর আয়ের পথ খুলে দেবে।

জাতীয় সম্পদ ইলিশ
মৎস্য পরিসংখ্যান বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী, ২০২১ সালের জুনে শেষ হওয়া অর্থবছরে, ১২ মাসে বাংলাদেশ ৫ লাখ ৬৫ হাজার ১৮৩ মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদন করেছে। এর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসে সমুদ্র থেকে এবং বাকিগুলো আসে নদী থেকে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশই ইলিশ।
দেশে ও বিদেশে ইলিশের চাহিদা খুব বেশি হওয়ায় সেই চাহিদা মেটাতে অতিরিক্ত ইলিশ আহরণ, টেকসই মৎস্য চাষকে হুমকির মুখে ফেলেছে। তাই সরকার ধাপে ধাপে অতিরিক্ত ইলিশ আহরণ বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে।
বাংলাদেশের ইলিশ অভয়ারণ্য
- ষাটনল ও চর আলেকজান্ডারের মধ্যে মেঘনা নদীর ১০০ কিলোমিটার (৬০ মাইল) অংশ
- ভোলা জেলার মেঘনা নদীর মোহনায় শাহবাজপুর চ্যানেলের ৯০ কিলোমিটার (৫৬ মাইল) অংশ
- ভোলা জেলার তেঁতুলিয়া নদীর ১০০ কিলোমিটার অংশ
- পটুয়াখালী জেলার আন্ধারমানিক নদীর ৪০ কিলোমিটার (২৫ মাইল) অংশ
- শরীয়তপুর জেলার পদ্মা নদীর (পদ্মার মোহনা) ২০ কিলোমিটার (১২ মাইল) অংশ
- বরিশাল জেলার হিজলা এবং মেহেন্দিগঞ্জের মধ্যে মেঘনা নদীর ৮৩ কিলোমিটার (৫২ মাইল) অংশ
ব্যানার ছবি: ইলিশ ধরার জাল তৈরি করছেন জেলেরা। ছবি: Mohammad Mahabubur Rahman/WorldFish via Flickr (CC BY-NC-ND 2.0).
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে, মঙ্গাবে গ্লোবাল এ, ২০২২ সালের ২৮ অক্টোবর।