- বিশ্বের একমাত্র প্রাকৃতিক জিন ব্যাংক হিসেবে পরিচিত হালদা নদী থেকে বেশ কয়েক বছর আগে প্রায় উধাও হয়ে যায় মাছের ডিম। তবে সম্প্রতি এই নদীতে আবারও ডিম পাড়া শুরু করেছে মাছেরা।
- ঐতিহাসিক রেকর্ড অনুসারে, ১৯৪১ সালে এই নদীতে প্রায় ৪ হাজার কিলোগ্রাম (৮ হাজার ৮১৮ পাউন্ড) মাছের ডিম পাওয়া যেত। পরবর্তীতে অতিরিক্ত আহরণ এবং শিল্প দূষণের কারণে ২০১৬ সালে এই পরিমাণ প্রায় শূন্যে পৌঁছে যায়।
- ২০১৮ সাল থেকে নদীটিকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা এবং মাছের ঐতিহ্যবাহী স্থান ঘোষণা করাসহ জোরালো সংরক্ষণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার।
- ২০২০ সালে হালদা নদী থেকে প্রায় ৪২৪ কেজি (৯৩৫ পাউন্ড) মাছের ডিম সংগ্রহ করা হয়েছিল। তবে ঘূর্ণিঝড় আমফানের কারণে তৈরি হওয়া লবণাক্ততা এবং বর্ষাকালে কম বৃষ্টিপাতের ফলে পরবর্তী সময়ে উৎপাদন হার কমে যায়।
হালদা নদীকে বলা হয়, বিশ্বের একমাত্র প্রাকৃতিক জিন ব্যাংক। এখানে রুই (Labeo rohita), কাতলা (Labeo catla), মৃগেল (Cirrhinus cirrhosus) এবং কালিবাউশের (Labeo calbasu) মতো ভারতীয় কার্প মাছ ডিম পাড়ে। ২০১৬ সালে প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে গেলেও সম্প্রতি এই নদীতে আবারও ডিম পাড়া শুরু করেছে মাছেরা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের হালদা নদী গবেষণাগারের তথ্য অনুযায়ী, নদীটির স্বর্ণযুগে অর্থাৎ ১৯৪১ সালে, এখান থেকে প্রায় ৪ হাজার কেজি (৮ হাজার ৮১৮ পাউন্ড) মাছের ডিম সংগ্রহ করা হতো। International Union for Conservation of Nature (IUCN) এর বিলুপ্ত ঘোষিত প্রায় ১৪৭টি গাঙ্গেয় ডলফিনেরও আবাসস্থল হালদা।
২০২০ সালে হালদা থেকে ৪২৪ কেজি (৯৩৫ পাউন্ড) মাছের ডিম সংগ্রহ করা হয়। তবে ঘূর্ণিঝড় আমফানের কারণে লবণাক্ত পানির প্রভাবে গত দুই বছরে ডিম উৎপাদনের হার কমে গেছে।
২০১৮ সাল থেকে সরকার ও স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে অতিরিক্ত মাছ ধরা, শিল্পবর্জ্য দূষণ, নদী অববাহিকায় তামাক চাষসহ মাছের জন্য ক্ষতিকর কাজগুলো নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। যেকারণে হালদার জলে আবার বংশবৃদ্ধি করতে পারছে মাছ ।

হালদাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা বা Ecologically Critical Area (ECA) ঘোষণা করার প্রক্রিয়াও চলছে। চট্টগ্রাম শহরের প্রায় ৭০ লাখ মানুষের জন্য দৈনিক প্রায় ১৮ কোটি লিটার (৪৭ দশমিক ৫ মিলিয়ন) সুপেয় পানি সরবরাহ করে নদীটি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ECA হিসেবে ঘোষণা করা হলে সুপেয় পানির উৎস নদীটি আরও সুরক্ষিত হবে। ২০২০ সালে নদীটিকে ‘মৎস্য ঐতিহ্যবাহী স্থান’ হিসেবেও ঘোষণা করা হয়।
এছাড়া ২০১৮ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর নদীতে জলজ প্রাণীর মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে একটি জরিপ করে। সেই জরিপে দেখা যায়, বিপুল পরিমাণ শিল্পবর্জ্যই নদী দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ। প্রতিবেদনে বলা হয়, যদি নদীটিকে ECA হিসেবে ঘোষণা করা যায়, তবে দূষণ অনেকটা কমে যাবে।
উল্লেখ্য, হালদার তীরে ট্যানারি, রঙ কারখানা, কাগজ কল এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রসহ প্রায় ২০–২৫টি ভারী কল-কারখানা রয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এবং হালদা গবেষণাগারের প্রধান মো. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, “সংরক্ষণ উদ্যোগের অংশ হিসেবে গত তিন বছরে দুটি বড় দূষণকারী প্রতিষ্ঠান—এশিয়ান পেপার মিলস ও ১০০ মেগাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে দূষণ অর্ধেকে নেমে এসেছে।”
এছাড়া মাছের প্রজনন ক্ষেত্র বলে বিবেচিত সর্তার খাল থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত, নদীর ২০ কিলোমিটার অংশে অবাধ মৎস আহরণ বন্ধ করতে রক্ষী মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি, নদীর তীরবর্তী এলাকায় তামাক চাষ ও ট্যানারি কার্যক্রমও এক বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে।
প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা
ECA হলো এমন একটি অঞ্চল, যা জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে অনন্য কিন্তু মানুষের বিভিন্ন কার্যকলাপের কারণে এখন হুমকির মুখে। একারণেই এটিকে সুরক্ষিত রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৯ সালে ECA বিধিমালা প্রণয়ন করে। বর্তমানে সারা দেশে ১৩টি ECA রয়েছে।

হালদা সংরক্ষণের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর ৩১ মার্চ, ২০১৮ সালে একটি খসড়া গেজেট প্রকাশ করে এবং সংশ্লিষ্টদের মতামত চায়।
পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এম. রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা ২০১৮ সাল থেকে হালদাকে ECA ঘোষণা করার চেষ্টা করছি। তবে নদীর সীমানা চূড়ান্ত করতেই সময় লেগে যাচ্ছে।”
পরিকল্পনা অনুযায়ী, খাগড়াছড়ি জেলার রামগড় উপজেলা থেকে চট্টগ্রাম জেলার কর্ণফুলী নদীর সংযোগস্থল পর্যন্ত, প্রায় ১০৭ কিলোমিটার দীর্ঘ হালদা নদীর দুই তীরকেই প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হবে।
Center for Environmental and Geographic Information Services (CEGIS), নদীর উভয় তীর থেকে ৫০০ মিটার এলাকা ডিজিটাল পদ্ধতিতে চিহ্নিত করেছে। এর মাধ্যমে নদীর মোট এলাকা নির্ধারণ সহজ হয়েছে।
রফিকুল ইসলাম জানান, “CEGIS থেকে প্রাপ্ত বিস্তারিত তথ্যের ভিত্তিতে আমরা সম্প্রতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে আবেদন পাঠিয়েছি। সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি এখন মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভর করছে।”
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “নদীটিকে ECA ঘোষণা করা জরুরি। এতে অন্তত দূষণ বন্ধ করার আইনগত বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে।”
তবে সমালোচকরা মনে করেন, সরকার এখনও বিদ্যমান ECA-গুলো যথাযথভাবে রক্ষা করতে পারেনি।এর মধ্যে সেন্টমার্টিন দ্বীপ, হাকালুকি হাওর, কক্সবাজার ও সোনাদিয়া দ্বীপে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু সুরক্ষা কার্যক্রম চলছে।
ECA ঘোষণার চলমান প্রক্রিয়ার পাশাপাশি নদী ও তার জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের গুরত্ব অনুধাবন করে, সরকার ২০২০ সালে বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য আইন ২০১৭ এর অধীনে হালদাকে ‘মৎস্য ঐতিহ্যবাহী স্থান’ ঘোষণা করেছে।
বাংলাদেশের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকাসমূহ
- সুন্দরবন – পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এবং একটি রামসার সাইট।
- কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত – ১৫২ কিলোমিটার দীর্ঘ, বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত।
- সেন্ট মার্টিন দ্বীপ – বিরল প্রবাল প্রাচীরের আবাসস্থল।
- সোনাদিয়া দ্বীপ – সামুদ্রিক কচ্ছপের প্রজনন ক্ষেত্র।
- টাঙ্গুয়ার হাওর – গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি, মা মাছের প্রজনন ক্ষেত্র এবং একটি রামসার সাইট।
- হাকালুকি হাওর – জলাভূমি, মা মাছের প্রজনন ও স্বাদু পানির বন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।
- বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষা নদী – রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে থাকা চারটি প্রধান নদী।
- গুলশান-বারিধারা হ্রদ – ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত।
- মারজাত বাওর –জলাভূমি ও মা মাছের প্রজনন ক্ষেত্র।
- জাফলং-এর পিয়াইন নদী – প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ এলাকা।
ব্যানার ছবি: হালদা নদী থেকে সংগৃহীত মাছের ডিম। ছবি: হালদা নদী গবেষণাগার
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে, মঙ্গাবে গ্লোবাল এ, ২০২২ সালের ২ নভেম্বর।