- সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে জনপ্রিয় সবজি বেগুনে সীসা, নিকেল ও ক্যাডমিয়ামের উপস্থিতির মাত্রা ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি করছে।
- গবেষকরা বলছেন, কৃষি জমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার এবং শিল্প দূষণই এই সংকটের মূল কারণ।
- বুড়িগঙ্গা নদীর মাছ এবং রাজধানী ঢাকায় যেসব গরুর দুধ বিক্রি হয় তাতেও একই ধরনের ভারী ধাতুর উপস্থিতি ধরা পড়েছে।
- বিষয়টি স্বীকার করে কৃষিতে রাসায়নিকের ব্যবহার কমানো ও শিল্প দূষণ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো।
সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, ভারী ধাতু দূষণের কারণে বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা গুরুতর ঝুঁকিতে পড়েছে। দেশের সবচেয়ে বেশি ভোগ্য সবজিগুলোর একটি বেগুনে সীসা, নিকেল ও ক্যাডমিয়ামের এমন মাত্রা শনাক্ত হয়েছে যা মারনঘাতী রোগ ক্যান্সার আক্রান্তের আশংকা তৈরি করে।
কৃষকদের অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের পাশাপাশি শিল্প দূষণের ফল বলে, এই পরিস্থিতিকে দেখছেন গবেষকরা। সমস্যাটি স্বীকার করে, সারাদেশে কৃষিকাজে রাসায়নিক সার ব্যবহারের হার কমানো ও শিল্প কল-কারখানার বর্জ্য নিষ্কাশন নিয়ন্ত্রণে কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো।
সায়েন্টিফিক রিপোর্ট জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাটিতে দেখা যায়, জামালপুর জেলার বেশ কিছু বেগুন ক্ষেতে সমীক্ষা চালান বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। এই অঞ্চলেই দেশের সবচেয়ে বেশি বেগুন চাষ হয় এবং বছর জুড়ে সরবরাহ করা হয় বাজারে। গবেষকরা বলছেন বেগুন উৎপাদনে প্রায় প্রতিদিন কীটনাশক ব্যবহারে ফসল ও মাটি উভয়েই বিষাক্ত ধাতু দ্বারা দূষিত হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, নমুনার ৭৫ ভাগ বেগুনে সীসা এবং ১০ ভাগ বেগুনে ক্যাডমিয়ামের মাত্রা নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি। তাদের মতে, এই মাত্রার ভারী ধাতুর উপস্থিতি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক।
গবেষকরা আরও জানিয়েছেন, বেগুন ক্ষেতের মাটি থেকে সরাসরি শোষণের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ক্যান্সারের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম হলেও, খাওয়ার মাধ্যমে এই ঝুঁকি কয়েকশ গুণ বেশি।
প্রতিবেদনটি বলছে “এমন উচ্চ মাত্রার ক্যান্সারের উপাদানের উপস্থিতি জামালপুরে উৎপাদিত বেগুন, ভোক্তাদের জন্য অনেক বড় স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করছে।”

একই ঝুঁকিতে ধানসহ অন্যান্য ফসলও
গবেষণাটিতে বাংলাদেশের দ্রুত শিল্পায়ন এবং এর ফলে সৃষ্ট শিল্পবর্জ্য, ফসল উৎপাদন বাড়াতে ব্যাপক হারে রাসায়নিকের ব্যবহার, এমনকি সেচের জন্যও বর্জ্য পানির ব্যবহারকে মাটিতে বিষাক্ত ধাতব দূষণের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর এসব দূষণ পরবর্তীতে ছড়িয়ে পড়ছে খাদ্যশস্যেও।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৬ মিলিয়ন মেট্রিক টন রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয়। আর বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, ৮.৬ মিলিয়ন হেক্টর (২১.৩ মিলিয়ন একর) জমিতে বছরে ৩৭,৪২২ মেট্রিক টন কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। এসব কৃষি রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসা ফসলের মধ্যে ধান, বেগুন এবং অন্যান্য শাকসবজি ও ফলমূল রয়েছে।
এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড পলিউশন রিসার্চ জার্নালে প্রকাশিত নতুন একটি গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা সম্পর্কিত চলমান পর্যালোচনায় দেখা গেছে- বিভিন্ন ধরনের খাদ্যশস্যে বিষাক্ত ধাতুর উপস্থিতি জাতীয় এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিরাপদ সীমার চেয়ে বেশি।
“বড় পরিসরের ওই গবেষণা পত্রটিতে দাবি করা হয় আর্সেনিক, জিঙ্ক, ক্যাডমিয়াম, কপার, ক্রোমিয়াম এবং সিসার উপস্থিতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত সর্বোচ্চ সহনীয় সীমার চেয়ে বেশি। শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, ধাতব সমৃদ্ধ সেচের পানি ব্যবহার, মুরগি ও মাছের খাবারে রাসায়নিক উপাদান মেশানোর ক্ষেত্রে অনিয়ম, এবং ভারী ধাতুসমৃদ্ধ কীটনাশক ও সারের অতিরিক্ত প্রয়োগকে ভারী ধাতু দূষণের জন্য দায়ী করা হয়েছে। এসব উপাদান উচ্চমাত্রার বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং খাদ্যশৃঙ্খলে এগুলো ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ করে দেয়।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. রেজাউল করিম স্বীকার করেন বাংলাদেশে ফসল উৎপাদন বাড়াতে রাসায়নিক সার এবং কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার হয়। সরকার কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে কীটনাশকের ব্যবহার ২০১১ সালে ৪৪,৪২৩ মেট্রিক টন থেকে ২০২২ সালে ৩৭,৪২২ মেট্রিক টনে নামিয়ে এনেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য নির্বিচারে সরাসরি নদীতে ফেলা, ভারী ধাতু দূষণের আরেকটি উৎস। পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মির্জা শওকত আলী মঙ্গাবে-কে বলেন, সরকার এ ধরনের দূষণ রোধে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, যার মধ্যে রয়েছে বর্জ্য নিষ্পত্তি কেন্দ্র স্থাপন এবং সচেতনতা কর্মসূচি। দূষণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে বুড়িগঙ্গা, যা রাজধানী ঢাকার প্রধান নদী এবং একই সঙ্গে দেশের সবচেয়ে দূষিত নদী।
২০১৬ সালে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বুড়িগঙ্গা নদীর মাছ যা শহরের বাসিন্দাদের জন্য একটি আমিষের উৎস, তাতেও একই ধরনের ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান পাওয়া গেছে। আমিষের আরেকটি উৎস দুধও রয়েছে ঝুঁকির তালিকায়। একই বছর অন্য আরেক গবেষণা বলছে, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের গরুর দুধেও ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান রয়েছে। যদিও এগুলোর মাত্রা ততটা ভয়াবহ নয় তবে দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের দুধ সেবন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে গবেষণাটিতে। এটি গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে বলেও সতর্ক করেন গবেষকরা।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক এবং কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার বিষয়ে আরও কঠোর নজরদারির আহ্বান জানিয়েছেন। খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে দুর্বল ধারণা, নিয়মকানুন সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে দূষণের জন্য দায়ী করছেন তিনি।
ব্যানার ছবি: খুলনায় ক্ষেত থেকে বেগুন সংগ্রহ করছেন কৃষকরা। ছবি: এম. ইউসুফ তুষার / ওয়ার্ল্ডফিশ Flickr (CC BY-NC-ND 2.0).
সাইটেশন:
Bushra, A., Zakir, H. M., Sharmin, S., Quadir, Q. F., Rashid, M. H., Rahman, M. S., & Mallick, S. (2022). Human health implications of trace metal contamination in topsoils and brinjal fruits harvested from a famous brinjal-producing area in Bangladesh. Scientific Reports, 12(1). doi:10.1038/s41598-022-17930-5
Sarker, A., Kim, J., Islam, A. R., Bilal, M., Rakib, M. R., Nandi, R., … Islam, T. (2021). Heavy metals contamination and associated health risks in food webs — A review focuses on food safety and environmental sustainability in Bangladesh. Environmental Science and Pollution Research, 29(3), 3230-3245. doi:10.1007/s11356-021-17153-7
Kawser Ahmed, M., Baki, M. A., Kundu, G. K., Saiful Islam, M., Monirul Islam, M., & Muzammel Hossain, M. (2016). Human health risks from heavy metals in fish of Buriganga river, Bangladesh. SpringerPlus, 5(1). doi:10.1186/s40064-016-3357-0
Muhib, M. I., Chowdhury, M. A., Easha, N. J., Rahman, M. M., Shammi, M., Fardous, Z., … Alam, M. K. (2016). Investigation of heavy metal contents in cow milk samples from area of Dhaka, Bangladesh. International Journal of Food Contamination, 3(1). doi:10.1186/s40550-016-0039-1
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে গ্লোবাল-এ – এ, ২০২২ সালের ২৯ নভেম্বর।