- রিমোট সেন্সিং তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৩৮টি সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে মোট ১,৬১৮ কিলোমিটার সড়ক তৈরি হয়েছে। এসব সড়কের অনেকগুলোই চলে গেছে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় উদ্যান ও বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের মধ্য দিয়ে।
- প্রতিবেশী দেশ ভারতে এ ধরনের এলাকায় অবকাঠোমো নির্মাণ প্রকল্প বিষয়ক যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে, মতামত চাওয়া হয় পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কাছে। তবে বাংলাদেশে এমন কোনো বিধান নেই। ফলে নির্বিচারে সড়ক, রেললাইন ও বিদ্যুতের লাইন তৈরি হচ্ছে এসব এলাকায়।
- প্রাণী হত্যার পাশাপাশি এসব অবকাঠামোর ব্যবহার গাছ কাটা, খনন, শিকার ও পাচার, বহিরাগত প্রজাতি প্রবেশ, দূষণ এবং অবৈধ বসতি গড়ার প্রবণতাও বাড়াচ্ছে।
- বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবকাঠামোগত যেকোনো পরিকল্পনায় বন্যপ্রাণীর ভালো-মন্দ বিবেচনা, সাধারণ প্রবণতা হওয়া উচিত। সম্প্রতি কিছু প্রকল্পে প্রাণী চলাচলের সুবিধার্থে ক্যানপি ব্রিজ, ওভারপাস ও আন্ডারপাস যুক্ত করা শুরু হয়েছে।
সতর্কীকরণ: এই প্রতিবেদনে মৃত বন্যপ্রাণীর ছবি আছে, যা অনেক পাঠকের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।
সিনেমার দৃশ্য বনাম বাস্তবতা
দুটি এশীয় হাতি রেললাইনের ওপর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ট্রেনের জানালা থেকে ফিলিয়াস ফগ তাকিয়ে দেখছেন। ট্রেনের গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গতি বাড়ায় হাতিরাও। বন পেরিয়ে যাচ্ছে ট্রেন, মনে হয় যেনো প্রায় ছুঁয়ে দিলো হাতিদের, আর ফগ হাসেন।
এভাবেই পরিচালক মাইকেল অ্যান্ডারসন ১৯৫৬ সালে অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র– অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটটি ডেইজ– এ দক্ষিণ এশিয়ার এক উষ্ণমণ্ডলীয় বনের দৃশ্য ধারণ করেন। এই দৃশ্যের শুটিং হয়েছিল লাউয়াছড়া বনে, যা তখনকার পূর্ব পাকিস্তান আর এখনকার বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত। সিনেমায় বন দেখতে ছিলো চিরসবুজ, তবে বাস্তবের লাউয়াছড়া বনের আর সেই রুপ নেই। বন্যপ্রাণীর দেখা পাওয়াও এখন বিরল ঘটনা। জীববিজ্ঞানীদের মতে, সত্তরের দশকের পর থেকে এখানে কোনো এশীয় হাতি দেখা যায়নি।
নতুন নতুন সড়ক, রেললাইন ও বিদ্যুতের লাইন নির্মাণের মাধ্যমে বেড়েছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আবার সেই প্রবৃদ্ধিই এসব নির্মাণকে করেছে আরও ত্বরান্বিত। এখন লাউয়াছড়া বনের মধ্যে রেললাইনের পাশাপাশি উন্নয়নের অংশ হিসেবে আছে বিদ্যুতের লাইন ও মহাসড়ক। এসব সড়ক ও বিদ্যুতের তার পার হতে গিয়ে প্রতি বছর অসংখ্য প্রাণী মারা যায়। শুধু চাপা পড়া বা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঝুঁকি নয়—এসব অবকাঠামো প্রাকৃতিক আবাসস্থলকে বিভাজিত করে দেয়, ফলে বাধাগ্রস্ত হয় বন্যপ্রাণীর খাবার সংগ্রহ, সঙ্গী খোঁজা এবং অভিবাসন।
অপরিকল্পিত নির্মাণ, সচেতনতার অভাব, আইনগত সুরক্ষার ঘাটতি এবং অবকাঠামো নির্মাণের উপযুক্ত নীতিমালা না থাকায়, বাংলাদেশে বনভূমি ক্রমশ খণ্ডিত হচ্ছে, আর তীব্র হচ্ছে বন্যপ্রাণীর জন্য হুমকি।

বনে সড়ক, রেল ও বিদ্যুতের লাইন
আরণ্যক ফাউন্ডেশনের তথ্য ব্যবহার করে মঙ্গাবে ৩৮টি সংরক্ষিত বনে ১,৬১৮ কিমি (১,০০৫ মাইল) সড়ক শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে কিছু সড়ক ১৫ মিটার (৪৯ ফুট) পর্যন্ত প্রশস্ত।
ভাওয়াল, হিমছড়ি, মধুপুর, কাপ্তাই ও ফাসিয়াখালী জাতীয় উদ্যান; পাবলাখালী, টেকনাফ, চুনতি ও সাতছড়ি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এবং বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কসহ অনেক স্পর্শকাতর এলাকার মধ্য দিয়ে চলে গেছে এসব সড়ক।
আরণ্যক ফাউন্ডেশনের তথ্যে আরও দেখা গেছে, ছয়টি সংরক্ষিত এলাকায় (লাউয়াছড়া, ভাওয়াল, হিমছড়ি ও মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যান; ফাসিয়াখালী ও চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য) মোট ৪০ কিলোমিটার (২৫ মাইল) রেললাইন আছে।

প্রাণহানি নিয়ে গবেষণা
অবকাঠামোর কারণে লাউয়াছড়া বন কতটা হুমকিতে রয়েছে, বন্যপ্রাণীর মৃত্যুর পরিসংখ্যানই তা প্রমাণ করে। ২০১৯ সালের এক গবেষণায় জীববিজ্ঞানী দম্পতি মারজান মারিয়া ও হাসান আল রাজি স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর বিশ্লেষণ করে দেখাচ্ছেন, ২০১৫ থেকে ২০১৭ সালে, শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ মহাসড়ক ও ঢাকা-সিলেট রেললাইন (যা লাউয়াছড়া বনের ভেতর দিয়ে গেছে) পার হওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে ১৫টি বানর জাতীয় প্রাণী মারা যায়। এই মহাসড়কের পাশে একটি বিদ্যুতের লাইনও আছে।
তারা সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে ১৪টি প্রাণীর মৃত্যুর ঘটনাও নথিভুক্ত করেন, যেখানে ঢাকা-সিলেট সড়ক ও বিদ্যুতের লাইন বনটিকে ভাগ করেছে।
“আমরা সংবাদপত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি,” বলেন আল রাজি, “কিন্তু প্রকৃত সংখ্যাটা হয়তো আরও বেশি।”
২০১৩ সালে জীববিজ্ঞানী শাহরিয়ার রহমান ও তার সহকর্মীরা, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে যাওয়া ৭ কিলোমিটার (৪ মাইল) রাস্তার ওপর গবেষণা চালিয়ে দেখেন, ২০১১ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় ৫০৩টি সাপ।

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে ধ্বংস হচ্ছে বন
২০১৫ সালের এক গবেষণায় বলা হয়, পৃথিবীর ভূমি ও সাগর অঞ্চল যত খণ্ডিত হচ্ছে, বাস্তুতন্ত্রের কার্যকারিতা ও জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য তত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির প্রটেকটেড প্লানেট রিপোর্ট ২০১৮ বলছে, আবাসস্থল খণ্ডিত হওয়ায় কমছে বন্যপ্রাণীর চলাচলের জায়গা। এছাড়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে নদীর প্রবাহ, সংরক্ষিত এলাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে মূল অংশ থেকে, আর পরাগায়নের মতো জীবন বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াগুলো পড়ছে হুমকিতে।
২০২০ সালে ইউএসএআইডি লিনিয়ার ইনফ্রাস্ট্রাকচার সেফগার্ডস ইন এশিয়া (LISA) প্রকল্প শুরু করে। এতে সাতটি দেশের গবেষকরা দেখান, এসব অবকাঠামো কেবল প্রাণী হত্যাই নয় আরো নানাভাবে বিপর্যস্ত করছে প্রকৃতিকে। এর মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে প্রভাব ফেলা, বনের মাটি খনন, শিকার ও পাচার বৃদ্ধি, বহিরাগত প্রজাতির আগমন, গাড়ি-ট্রেনের কারণে শব্দ-আলো-দূষণ, এবং অবৈধ বসতির মতো নতুন ভূমি ব্যবহারের কারণও হয়ে উঠছে অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ।
বাংলাদেশের সাবেক বন কর্মকর্তা ফরিদ উদ্দিন, যিনি LISA প্রকল্পে যুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন, “ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণের মানে হলো, সেটিকে ধ্বংস করার পথ তৈরি করা। ইতিহাস দেখলেই বোঝা যায়, রাস্তা তৈরি হলে কীভাবে আশেপাশের বন ধ্বংস হয়েছে।”

আইনি দুর্বলতা ও ঘাটতি
বাংলাদেশে বন রক্ষার দুটি আইন আছে, এর মধ্যে একটি ১৯২৭ সালে প্রনয়ণ করা হয় এবং এটিই সংশোধিত রুপ পায় ২০১৯-এ। যেখানে সংরক্ষিত বনের ভেতর অবকাঠামো নির্মাণ বিষয়ে ছোট্ট করে লেখা আছে। এতে বলা হয়েছে, বনের ভেতর কোনো পরিবর্তন আনা নিষিদ্ধ এবং আইন লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা ৫০,০০০ টাকা জরিমানা হতে পারে।
কিন্তু এই আইন, সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে একাধিক লেনের রাস্তা নির্মাণ থামাতে পারেনি। অন্যদিকে ভারতে পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় মহাসড়ক কর্তৃপক্ষ ২০১৬ সালে ইকো ফ্রেন্ডলি মেজার টু মিটিগেট দ্য ইমপ্যাক্ট অব লিনিয়ার ইনফ্রাস্ট্রাকচার নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এতে প্রাণীকে সড়ক দুর্ঘটনা ও শব্দদূষণ থেকে রক্ষার নির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং পরিবেশ ছাড়পত্র পেতে এ নীতিমালা মানা বাধ্যতামূলক।
সিলেট বন বিভাগের কর্মকর্তা এমডি রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, “আলাদা নীতিমালা না থাকলেও বিষয়টি সাধারণ জ্ঞানেই ঠিক করা যায়। অবকাঠামো বানানোর আগে বিভিন্ন সংস্থা ও অংশীজনরা একত্রে বসে আলোচনা করলেই, বনের ভেতর বন্যপ্রাণীর চাহিদা বিবেচনায় নেওয়া সম্ভব।”


বন্যপ্রাণী রক্ষায় অগ্রগতি
বন বিভাগের কারিগরি সহায়তা ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার অর্থায়নে জীববিজ্ঞানী মারজান মারিয়া ও হাসান আল-রাজি সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে ছয়টি ও লাউয়াছড়ায় পাঁচটি ক্যানপি ব্রিজ বসিয়েছেন। ক্যামেরা ট্র্যাপে প্রায় ১,০০০টি প্রাণীর এসব ব্রিজ ব্যবহার করার ছবি ধরা পড়ে।
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, সাত প্রজাতির বানর জাতীয় প্রাণীর আবাসস্থল। এর মধ্যে উল্লুক (Hoolock hoolock), বেঙ্গল স্লো লোরিস (Nycticebus bengalensis), ক্যাপড লেঙ্গুর (Trachypithecus pileatus), চশমা পরা হনুমান (Trachypithecus phayrei), রেসাস বানর (Macaca mulatta), নর্দার্ন পিগ-টেইলড বানর (Macaca leonina) এবং আসাম বানর (Macaca assamensis) অন্যতম। এর মধ্যে ছয়টি বিশ্বব্যাপী হুমকির মুখে।
বড় পরিসরের কাজ বলতে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পে চুনতি, মেধাকচ্ছপিয়া ও ফাসিয়াখালী বনের ভেতর যেসব অংশ দিয়ে সড়ক নির্মাণ হয়েছে, সেসব জায়গায় হাতির জন্য ওভারপাস ও আন্ডারপাস তৈরি করা হচ্ছে।
সাবেক বন কর্মকর্তা ফরিদ উদ্দিন বলেন, “বাংলাদেশ এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত হচ্ছে, তাই নতুন রাস্তা নির্মাণ ও পুরনো রাস্তার সম্প্রসারণ চলতে থাকবে। যদি আমরা জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তি ঠেকিয়ে কাজ করতে পারি, তবে এই উন্নয়নগুলো হবে অর্থবহ।”
ব্যানার ছবি: ক্যানপি ব্রিজ পার হচ্ছে এক ক্যাপড লেঙ্গুর। ছবি: হাসান আল রাজি
সাইটেশন:
Al-Razi, H., Maria, M., & Bin Muzaffar, S. (2019). Mortality of primates due to roads and power lines in two forest patches in Bangladesh. Zoologia, 36, 1-6. doi:10.3897/zoologia.36.e33540
Rahman, S. C., Rashid, S. M. A., Das, K., Jenkins, C., & Luiselli, L. (2013). Monsoon does matter: annual activity patterns in a snake assemblage from Bangladesh. The Herpetological Journal, 23(4), 203-208. Retrieved from: https://www.thebhs.org/publications/the-herpetological-journal/volume-23-number-4-october-2013/720-04-monsoon-does-matter-annual-activity-patterns-in-a-snake-assemblage-from-bangladesh/file
Haddad, N. M., Brudvig, L. A., Clobert, J., Davies, K. F., Gonzalez, A., Holt, R. D., … Townshend, J. R. (2015). Habitat fragmentation and its lasting impact on earth’s ecosystems. Science Advances, 1(2). doi:10.1126/sciadv.1500052
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে গ্লোবাল-এ – এ, ২০২২ সালের ২১ ডিসেম্বর।