- অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের কারণে গুণগত মান হারাচ্ছে বাংলাদেশের কৃষি জমি। এর ফলে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ছে দেশটি।
- ফসলের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কৃষি জমির অতিরিক্ত ব্যবহারে বাড়ছে মাটির ক্ষয় এবং অম্লতা ও লবণ জমছে মাটিতে। এছাড়া উচ্চ ফলনশীল জাত ও হাইব্রিড বীজ ব্যবহার, বন ধংস ও জৈব সার বিমুখতা বাংলাদেশের মাটির অবনতির প্রধান কারণ।
- বাংলাদেশে রাসায়নিক সার মূলত আমদানি নির্ভর। বিশ্ববাজারে এর দাম ওঠা-নামার কারণে খাদ্যের দামেও তা প্রভাব ফেলছে।
- এ অবস্থায় চাষের জমির মান উন্নত করার জন্য জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহী অনেক কৃষক।
বাংলাদেশে খাদ্য শস্যের বাৎসরিক চাহিদা প্রায় ৩৮ মিলিয়ন টন। ১৭ কোটির বিশাল জনগোষ্ঠির এই খাদ্য সরবরাহের জন্য অল্প জমিতে বেশি উৎপাদন করতে দেশটির কৃষকরা ব্যাপক হারে রাসায়নিক সার ব্যবহার করেন।
ক্রমশ গতি পাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। তবে বিশাল এই জনগোষ্ঠির জন্য খাদ্য সরবরাহ সহজ কাজ নয়, ফলে কৃষকদের দারস্থ হতে হয় কম সময়ে অতিরিক্ত ফসল উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর। উৎপাদন বাড়াতে ব্যাপক হারে রাসায়নিক সার ব্যবহার করছেন তারা। ফলে দেশটিতে উল্লেখযোগ্য হারে ক্ষয়ে যাচ্ছে মাটি।
কিছু কৃষক তাদের কৃষি জমির গুনগত মান উন্নয়নে আবার নির্ভর করতে শুরু করেছেন জৈব সারের ওপর। এদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে রাসায়নিক সারও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে, যা প্রভাব ফেলেছে স্থানীয় বাজারেও। মাটির দূষন কমানো ও সারের বাড়তি দাম বিবেচনায় রেখেই মূলত কৃষকরা জৈব সারের ব্যবহারের দিকে ঝুঁকেছেন।
কম খরচে পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য উৎপাদনে বেগ পেতে হচ্ছে কৃষকদের। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশ এই বছর ৩৫.৬৫ মিলিয়ন টন ধান সংগ্রহ করেছে, যা মূল লক্ষমাত্রার তুলনায় কিছুটা কম।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ভারতসহ অন্যান্য শস্য রপ্তানিকারক দেশগুলোর রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কারণে বাড়ছে খাদ্যশষ্যের দাম। ২০২২ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস এ ২০২০ থেকে ২০২২ সময়কালে ৫০ টিরও বেশি দেশকে খাদ্য ঝুঁকির তালিকায় রেখেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে ওপরে।

মাটির মান অবনমনের কারণ
১৯৮০-৮১ থেকে ২০১৫-১৬ পর্যন্ত মাটিতে নাইট্রোজেন, পটাশিয়াম এবং ফসফরাসসহ সব ধরনের রাসায়নিক উপাদানের ব্যবহার বহুগুণ বেড়ে যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৯৮০-৮১ সালে বাংলাদেশে ইউরিয়া সার (নাইট্রোজেন) ব্যবহার হয় ৩,৬৫,৮৮১ টন, যা ২০১৫-১৬ সালে বেড়ে ১১,৮৩,০২৪ টনে পৌঁছায়।
ফলে কমতে থাকে মাটির ভালো অনুজীবগুলোর পরিমাণ। এতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাচ্ছে না উদ্ভিদ, এমনকি অতিরিক্ত সার ব্যবহারের পরেও বেড়ে উঠছেনা তারা।
অতিরিক্ত ফসল উৎপাদন, হাইব্রিড বীজের ব্যবহার, মাটির ক্ষয়, লবণাক্ততা, অম্লতা, বন ধংস এবং রাসায়নিক সার প্রয়োগকে মাটির মান নষ্ট হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে বিভিন্ন গবেষণা চিহ্নিত করেছে।
মাটির পুষ্টি ভারসাম্য
বাংলাদেশ সয়েল রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট ইন্সস্টিটিউট (এসআরডিআই) অনুযায়ী ভালো মাটিতে ন্যূনতম ২.৫ ভাগ জৈব পদার্থ থাকা উচিত, যেখানে দেশটির অধিকাংশ এলাকার মাটিতে রয়েছে ১.৫ ভাগের কম জৈব পদার্থ ।
এসআরডিআই জানিয়েছে, দেশের চাষযোগ্য মাটিতে পুষ্টি ঘাটতি মারাত্মক। বাংলাদেশে মাটির মোট নাইট্রোজেনের ভারসাম্য নেতিবাচক, ফসফরাস প্রায় শূন্য, পটাশিয়ামের ভারসাম্য অত্যন্ত নেতিবাচক। একই অবস্থা গন্ধক, জিঙ্ক, বরন এবং অন্যান্য জৈব পদার্থ ও অম্ল স্তরের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে।
২০২২–২৩ সালে বাংলাদেশে ইউরিয়ার চাহিদা ছিলো ৩.৪ মিলিয়ন টন। একই ভাবে ডায়ামোনিয়াম ফসফেটের (ডিএপি) ২.৪ মিলিয়ন টন, ট্রিপল সুপার ফসফটের (টিএসপি) ১ মিলিয়ন টন এবং মিউরিয়েট অফ পটাশের (এমওপি) ১.৪ মিলিয়ন টন চাহিদা ছিলো।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার এসোসিয়েশনের তথ্য মতে, দেশটি স্থানীয়ভাবে প্রায় ১ মিলিয়ন টন ইউরিয়া সার উৎপাদন করে, বাকি অংশ আসে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কাতার থেকে। এছাড়া টিএসপির জন্য মরক্কো ও তিউনিসিয়ার ওপর নির্ভরশীল, যেখানে স্থানীয় উৎপাদকরা প্রায় ১ লাখ টন সরবরাহ করে। ডিএপির ক্ষেত্রে চীন ও জর্ডানের ওপর নির্ভরশীল, এবং এমওপির পুরো চাহিদা বেলারুশ, রাশিয়া ও কানাডা থেকে আমদানি করে পূরণ হয়।

জৈব বিকল্প
এসআরডিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে জৈব সার ব্যবহার হয় প্রায় ৩০,০০০ টন। যা বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে উৎপাদিত হয়।
যদিও পরিমাণ কম তবে চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, যা বছরে প্রায় ৩০ ভাগ। এসিআই অ্যাগ্রোবিজনেসের পরিচালক ও সিইওি জানান, স্থানীয় উদ্যোক্তারা মূলত গরু ও মুরগির মল ব্যবহার করে জৈব সার তৈরি করছেন।
কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় সার ভার্মিকম্পোস্ট। প্রধানত কেঁচো, শাকসবজি, কলার খোসা, কোকো পিট, গাছের পাতা, আখের ছোবরা, ফল-সবজির খোসা এবং অন্যান্য ভেজানো জৈব উপাদান মিশিয়ে তৈরি হয় এই সার।
বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এক কৃষক আব্দুল হামিদ মঙ্গাবে-কে বলেন, ভার্মিকম্পোস্ট মাটির উর্বরতা বাড়ায় এবং উদ্ভিদকে কীটপতঙ্গের আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। এছাড়া মাটিতে জৈব উপাদান যোগ করা এবং দীর্ঘ সময় ধরে মাটিকে উর্বর রাখতে পারার কাজও করে এটি।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদের ২০১৮ সালের ফার্টিলাইজার রেকোমেন্ডেশন গাইড অনুযায়ী মাটির উৎপাদনশীলতা ধরে রাখতে জৈব উপাদান ব্যবহার করা উচিত, যার মধ্যে রয়েছে পশুর মল-মূত্র, খাবার, ফসলের অবশিষ্টাংশ, পোলট্রি মল, চালের খোসা, খৈল-ভুসি, আগাছা, মৃত প্রাণী, সবুজ সার ইত্যাদি।
জৈব সার মাটির কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয় এবং রাসায়নিক সারের তুলনায় মাটির জীববৈচিত্র্য প্রায় ৩০ ভাগ বাড়াতে পারে বলে জানান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক হামিদুর রহমান।
টেকসই কৃষি নিশ্চিত করতে রাসায়নিক এবং জৈব সার সমন্বয় করে ব্যবহারের মাধ্যমে মাটির স্বাস্থ্য ভালো রাখা এবং উৎপাদন বাড়ানো দুটিই জরুরি বলে জানান তিনি।
ব্যানার ছবি: রাজবাড়ী জেলার কৃষক চুমকি মণ্ডল, তাঁর ক্ষেতে গম বোনার জন্য সিডার ফার্টিলাইজার ড্রিল ব্যবহার করা হচ্ছে। ছবি: রনক মার্টিন CGIAR via Flickr (CC BY-NC-SA 2.0).
সাইটেশন:
Global Network against Food Crises. (2022). 2022 Global Report on Food Crises. Retrieved from https://www.wfp.org/publications/global-report-food-crises-2022
Ul Haque, A.T., Khan, N. A., and Barman, S. K. (2018). Vermi-compost in agricultural production in Bangladesh. International Journal of Natural and Social Sciences, 2018, 5(2): 61-68. Retrieved from https://www.researchgate.net/publication/324950109_Vermi-compost_in_agricultural_production_in_Bangladesh.
Bangladesh Agricultural Research Council. (2018). Fertilizer Recommendation Guide-2018. Retrieved from https://bit.ly/3GnbDwy.
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে গ্লোবাল-এ – এ, ২০২২ সালের ৩০ ডিসেম্বর।