- বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় পাখিপ্রেমীদের উদ্যোগ এবং প্রশাসন ও বেসরকারি সহায়তায় গড়ে উঠেছে প্রায় ১০০টি কমিউনিটি-ভিত্তিক অভয়ারণ্য।
- এখন পর্যন্ত স্তন্যপায়ী, সরীসৃপ, উভচর ও পাখিসহ নানা ধরনের বন্যপ্রাণীর জন্য ২৪টি বনকে অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে বন বিভাগ।
- ৭১৪ প্রজাতির পাখি পাওয়া যায় বাংলাদেশে, যার অর্ধেকের বেশি দেশী এবং বাকিগুলো পরিযায়ী।
- তবে গত ৩০ বছরে দেশী প্রজাতির পাখির সংখ্যা ব্যাপক হারে কমেছে- ১৯৯৪ সালে পাখির সংখ্যা ছিলো আনুমানিক ৮ লাখ, যা ২০১৭ সালে নেমে আসে ২ লাখ ৩৩ হাজারে, আর ২০১৮ সালে দাঁড়ায় মাত্র ১ লাখ ৬৩ হাজারে।
খারিয়াকান্দি গ্রাম একটি সাধারণ কৃষিভিত্তিক এলাকা। এর সবুজ-শ্যামল পরিবেশ একে নানান প্রজাতির পাখির জন্য উপযুক্ত আবাসস্থলে পরিণত করেছে। ফলে অন্যান্য বন্যপ্রাণীসমৃদ্ধ এলাকার মতো এখানেও বহুদিন ধরে শিকারীরা ভিড় জমাতো, যে কারণে পাখির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমতে থাকে।
তবে এই এলাকার কিছু বাসিন্দা এগিয়ে আসেন পাখিদের রক্ষায়। শিকার বন্ধ করতে শিকারীদের প্রতিরোধ এবং গ্রামবাসীর মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর কাজ শুরু করেন তারা । এই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কারণে মাত্র ৮০০ মানুষের এই গ্রামেই বর্তমানে বসবাস করছে হাজারো পাখি।
“বাঁশঝাড় বেশি থাকায় আমাদের গ্রাম সবসময়ই বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কাছে আকর্ষনীয় ছিল, কারণ তারা সহজেই বাসা বানাতে পারত এসব ঝাড়ে। তবে একসময় শিকারের কারণে পাখির সংখ্যা কমে যায়,” বলেন গ্রামটির পাখি সংরক্ষণ কমিটির সদস্য আয়নাল হক।
“তখন আমরা গ্রাম থেকে শিকারীদের প্রতিহত করতে শুরু করি এবং গ্রামবাসীর মধ্যে সচেতনতা তৈরি করি, যাতে তারা নিজ আগ্রহেই শিকারীদের প্রবেশ ঠেকায়,” জানান আয়নাল।
২০১৭ সালে স্থানীয় এই উদ্যোগ, বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ বা বারসিকের সহায়তায় কাঠামোগত রূপ পায়। পরে স্থানীয় সরকার গ্রামটিকে পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করে। তখন থেকেই খারিয়াকান্দি গ্রামটি পাখির বাড়ি হিসেবেও পরিচিতি পেতে থাকে।


“কমিউনিটি প্রতিনিধি এবং গ্রামের একজন সদস্য হিসেবে আমি সবসময় স্থানীয় উদ্যোগের সঙ্গে আছি,” বলেন স্থানীয় সরকারের চেয়ারম্যান মো. শহিদুল ইসলাম। “বিষয়টির সঙ্গে সরকার যেনো আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ করতে পারে, সেজন্য আমি ২০১২ সালে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনের আওতায় গ্রামটিকে পাখির বাড়ি ঘোষণা করার ব্যবস্থা করি।” উল্লেখ করেন শহীদুল।
বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় পাখিপ্রেমীদের উদ্যোগে তৈরি প্রায় ১০০টি কমিউনিটি-ভিত্তিক পাখির অভয়ারণ্যের একটি, খারিয়াকান্দি । অভয়ারণ্যের এর এক-তৃতীয়াংশ উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর ও পঞ্চগড়ে অবস্থিত, আর বাকিগুলো দেশের বিভিন্ন জলাভূমিতে ছড়িয়ে রয়েছে।
গত কয়েক দশক ধরে খাদ্য উৎপাদনের জন্য জমির চাহিদা বাড়ায়, বনভূমি দ্রুত কমছে বাংলাদেশে। এর ফলে বন্যপ্রাণী, বিশেষ করে পাখিদের জন্য কমে গেছে আবাসস্থল।
ঢাকার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যার অধ্যাপক এম. মনিরুল এইচ. খান বলেন, খারিয়াকান্দির মত গ্রামগুলোর এ ধরনের উদ্যোগ, আবাসস্থল কমে যাওয়ার বিরুদ্ধে পরিস্থিতি বদলে দেওয়ার চমৎকার পদক্ষেপ। একই সঙ্গে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধির বিষয়টিও সামনে আসছে ধীরে ধীরে।
“ এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে, দেশটির তরুণ ও সাধারণ মানুষের বিভিন্ন কমিউনিটি-ভিত্তিক পাখি ক্লাব, এবং সরকার-এনজিওগুলোর নানা উদ্যোগের মাধ্যমে,” বলেন বাংলাদেশ বন বিভাগের সংরক্ষক ইমরান আহমেদ।
স্তন্যপায়ী থেকে শুরু করে সরীসৃপ, উভচর ও পাখিসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর জন্য বন বিভাগ এখন পর্যন্ত ২৪টি বন অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে।


বাংলাদেশে পাখির বৈচিত্র্য
আইইউসিএন-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৭১৪ প্রজাতির পাখি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩২০ প্রজাতি পরিযায়ী, যারা মূলত শীতকালে উত্তর গোলার্ধের মঙ্গোলিয়া, চীন, তিব্বত ও রাশিয়া থেকে বাংলাদেশে আসে। প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ৩ লাখ পরিযায়ী আসার তথ্য পাওয়া যায়। যাদের অধিকাংশ জলচর। তারা ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন পথ ব্যবহার করে বাংলাদেশে প্রবেশ করে বলে জানিয়েছে বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনাল।
যদিও দেশী প্রজাতির পাখির সঠিক সংখ্যা ধারণা নির্ভর এবং স্পষ্ট নয়, তবে আইইউসিএন-এর অনুমান অনুযায়ী ১৯৯৪ সালে পাখির মোট সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ, যা ২০১৭ সালে ২ লাখ ৩৩ হাজারে নেমে আসে, আর ২০১৮ সালে দাঁড়ায় ১ লাখ ৬৩ হাজারে।
ব্যানার ছবি: গাছে বসে আছে একটি বক, বাংলাদেশ। ছবি: ইসতিয়াক আহমেদ বর্ষণ।
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে গ্লোবাল-এ – এ, ২০২৩ সালের ১৩ জানুয়ারি।