- ভারতে বিভিন্ন নদীতে ব্যারাজ ও বাঁধ নির্মাণের কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পরিযায়ী মাছ ইলিশের চলাচল।
- “ক্লিন গঙ্গা মিশন”-এর আওতায় ইলিশ সংরক্ষণ ও পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য নেয়া হয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ। এর মধ্যে রয়েছে গঙ্গা নদীর উজানে ছোট ইলিশ (পোনা) ও ডিম ছাড়ার পরীক্ষা-নিরীক্ষা। পাশাপাশি, যারা/যেসব প্রতিষ্ঠান ইলিশে ট্যাগ লাগিয়ে সেগুলোর ওপর নজরদারি করে অবস্থান সম্পর্কিত তথ্য দেয়, তাদের প্রণোদনাও দেওয়া হচ্ছে।
- বিশ্বের মোট ইলিশের ৮০ ভাগ উৎপাদন করে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারত। তবে বাংলাদেশের তুলনায় ভারতের পরিমাণ মাত্র ১০ শতাংশ। ফলে সরবরাহের জন্য প্রতিবেশী বাংলাদেশের ওপর নির্ভর করতে হয় দেশটিকে।
প্রসঞ্জিত মণ্ডল, বয়স ৩০, বসবাস করেন পশ্চিমবঙ্গের ফারাক্কায়। তার পৈতৃক পেশা মাছ ধরা। তবে এখন আর শুধু মাছ ধরে চলেনা সংসার, তাই অটোরিকশাও চালান মাঝে মাঝে।
মাঝে মাঝে সময় পেলে বন্ধুদের সঙ্গে গঙ্গা নদীতে যান মাছ ধরতে। কয়েকটা ইলিশ ধরাই তাদের লক্ষ্য। পশ্চিমবঙ্গে ইলিশ ভীষণ জনপ্রিয় মাছ। আর এই মাছ ধরতে পারলে ভালো দাম পাওয়া যায় তাই অন্যান্য মাছ ধরাতে তেমন আগ্রহ নেই তাদের।
কোনো এক বৃষ্টি বিকেলে মঙ্গাবে টিম প্রসেঞ্জিতের সঙ্গে দেখা করে। ঠিক আগের দিনই বন্ধুদের সঙ্গে মাছ ধরতে গিয়েছেলেন তিনি। আর ভাগ্যও ভালো ছিলো, জুটে যায় দুটি ইলিশ। বিক্রিও করেন ভালো দামে, ২৫০০ রুপি। যা ভাগাভাগি করে নেন তারা। তবে এই মাছ পাওয়া এখন শুধুই ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে, বলেন প্রসেঞ্জিত।
কেন ইলিশ ধরা লাভজনক, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ফারাক্কা-ভিত্তিক ইলিশ সংরক্ষণকর্মী ফারুক শেখ বলেন, “এক কেজি ওজনের বড় একটি ইলিশ মাছ বিক্রি হয় প্রায় ২,৭০০ থেকে ২,৮০০ রুপিতে। আর ছোট ইলিশ, যেগুলোর ওজন ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম, সেগুলো বিক্রি হয় ৭০০ থেকে ৮০০ তে। তাই একটা বড় ইলিশ ধরা মানে আসলেই বড় বিষয়।”
চাহিদা ও যোগানের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ হয় ইলিশের দাম। দাম যতই বেশি হোক না কেন, স্বাদ ও স্বাস্থ্যগতগুণের কারণে ইলিশ কিনতে ভীড় করেন ক্রেতারা। ফারাক্কার বাসিন্দা মৃণাল এস.কে. বলেন “প্রতিটি বাঙালি পরিবারেরই প্রিয় মাছ ইলিশ।”

কমছে ইলিশের পরিমাণ
এ. কে. সাহু, কলকাতার ব্যারাকপুরে অবস্থিত সেন্ট্রাল ইনল্যান্ড ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট (CIFRI)-এর জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী মঙ্গাবে ইন্ডিয়াকে বলেন, “ইলিশ একটি দ্রুত গতির অভিবাসী মাছ। আগে এই মাছ উত্তর প্রদেশের প্রয়াগরাজ (অধুনা অ্যালাহবাদ) পর্যন্ত চলে যেত। তবে ১৯৭৫ সালে গঙ্গার ওপর ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণের পর, উজানে আসতে পারছে না ইলিশ। ফলে যখন তারা আর আগের মতো মাইগ্রেট করতে পারলো না, তখনই ভারতে কমতে থাকলো এদের পরিমাণ।”
বিশ্বব্যাপী এখনও এই পরিযায়ী মাছটির গতিবিধি কেবলমাত্র বাংলাদেশ–ভারত–মিয়ানমারের অঞ্চল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ।
সেন্ট্রাল ইনল্যান্ড ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট (CIFRI)-এর পরিচালক বি.কে দাস মঙ্গাবে ইন্ডিয়াকে বলেন, ‘ন্যাশনাল মিশন ফর ক্লিন গঙ্গা’- এর আওতায় ইলিশের পরিমাণ বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে ভারত সরকার, এবং এই প্রক্রিয়ায় মৎস্যজীবীরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।”
সিআইএফআরআই/CIFRI-এর কর্মকর্তারা আরো জানান, গঙ্গা নদীতে মোট ১৯০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। ফারাক্কা থেকে ফ্রেজারগঞ্জ পর্যন্ত গঙ্গার নিম্ন অববাহিকায় বসবাসকারী মৎস্যজীবীদের ওপর করা একটি আর্থ-সামজিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, তাদের মোট আয়ের প্রায় ৩৮ দশমিক ৮৪ ভাগে অবদান রাখে ইলিশ মাছ। তবে ফারাক্কা থেকে প্রয়াগরাজ-কানপুর পর্যন্ত গঙ্গার উজানে বসবাসকারী মৎস্যজীবীরা ইলিশ মাছ থেকে বঞ্চিত। এমনও সময় ছিলো যখন দিল্লি ও আগ্রাতেও পাওয়া যেত ইলিশ।
গঙ্গা নদীর ফারাক্কা ব্যারাজকেই ইলিশ মাছের চলাচল বা অভিবাসনের প্রধান বাধা বলেও মনে করে সিআইএফআরআই/CIFRI। তাই অভিবাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো, ইলিশগুলোকে ব্যারাজের নিম্নপ্রবাহে (ডাউনস্ট্রিমে) ধরা এবং পরে তাদেরকে উজানে (আপস্ট্রিমে) ছেড়ে দেওয়া।
CIFRI এখন পর্যন্ত ফারাক্কা ব্যারাজের দিক থেকে গঙ্গার উজানে মোট ৭৪,৯৬২টি ছোট ইলিশ/জাটকা ছেড়েছে। রাজমহল, ভাগলপুর এবং বালিয়ার জেলেরা জানান, এখন এই অঞ্চলের নদীপথে ইলিশের দেখা মিলছে। এর পাশাপাশি, গঙ্গায় আরও প্রায় ১১ লাখ নিষিক্ত ডিম ছাড়া হয়েছে, এবং ফারাক্কার উজানে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে একটি হ্যাচারি।

তবে এই পরীক্ষা-নীরিক্ষার বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করে এক বিশেষজ্ঞ মঙ্গাবে-ইন্ডিয়াকে বলেন, “এভাবে ইলিশের ডিমের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা দুই শতাংশেরও কম। ইলিশে লাগানো ট্যাগ উদ্ধারের হারও অপ্রতুল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পানির শিকারী প্রাণীরা ডিমগুলো খেয়ে ফেলে। তাছাড়া, ইলিশের টিকে থাকা নির্ভর করে তাপমাত্রা, পানির প্রবাহ ও গতিবেগের মত অনেক পরিবেশগত ও ভৌগোলিক উপাদানের ওপর।”
ইলিশের প্রজনন উপযোগী পরিবেশ
স্বাদু পানির নদীতে যখন গড় তাপমাত্রা প্রায় ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে, তখন ইলিশের ডিম ২৩ থেকে ২৬ ঘণ্টার মধ্যে ফুটে যায়। পানির এই তাপমাত্রা তাদের বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই এই অঞ্চলের শীতকালকে ইলিশের প্রজনন ও চলাচলের জন্য সবচেয়ে উপযোগী সময় হিসেবে ধরা হয়।
এক বছরের মধ্যে ইলিশ মাছের গড় ওজন হয় প্রায় ২৫০ গ্রাম, আর এক কেজি ওজন হতে সময় লাগে তিন থেকে চার বছর। ইলিশ সংরক্ষণের জন্য প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রাখা, মশারির জাল ব্যবহার নিষিদ্ধ করা এবং নদীতে বিষ দিয়ে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপসহ এসব বিষয়ে সচেতনা বাড়ানোর মতো কর্মসূচী রয়েছে সরকারের। সিআইএফআরআই- এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ফরাক্কা থেকে প্রয়াগরাজ পর্যন্ত নদীপথে মোট ৪৪০টি সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালিত হয়েছে। এসব কর্মসূচীতে অংশ নিয়েছেন মোট ১৮,৩২৬ জন জেলে।
সরকারি উদ্যোগ
পশ্চিমবঙ্গ সরকারও ইলিশ মাছ সংরক্ষণের জন্য নানাভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে কয়েকটি নদী পথকে ইলিশ অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করে তারা।
তবে রাজ্যের প্রধান জেলেদের সংগঠন ‘দক্ষিণবঙ্গ মৎস্যজীবী ফোরাম’ এইটুকুতে সন্তুষ্ট নয়। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মিলন দাস বলেন, “পশ্চিমবঙ্গ সরকার ইলিশ সংরক্ষণের ব্যাপারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। জেলেদেরই মাছের শত্রু বানানো হয়েছে তাদের পুরো প্রক্রিয়ায়। রাজ্য সরকার আইইউসিএন-এর তহবিল দিয়ে পাঁচটি ইলিশ অভয়ারণ্য তৈরি করেছে ঠিকই তবে সংরক্ষিত এলাকায় জেলেরা ঢুকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শুধু জেলেরাই।”
নদী দূষণের কবলে ইলিশ
সিআইএফআরআই (CIFRI)- এর মতে, নদীর দূষণ কিছুটা হলেও ইলিশের সংখ্যা বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা বলেন, “দূষণ মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর মধ্যে মানসিক ও শারীরিক চাপ সৃষ্টি করে। যদিও ‘দূষণ’ শব্দটি খুবই বিস্তৃত- এতে শিল্প ও কৃষি উভয় ধরনের দূষণই অন্তর্ভুক্ত। সব ধরনের দূষণের সম্মিলিত প্রভাব মাছের প্রজননের ওপর কতটা, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে দূষণজনিত চাপ ইলিশের প্রজনন প্রক্রিয়ায় নিঃসন্দেহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।”
বাংলাদেশের মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রশাসন ও অর্থ বিভাগের পরিচালক এবং ইলিশ বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আনিসুর রহমান, মঙ্গাবে ইন্ডিয়াকে বলেন, “বাংলাদেশে ইলিশের অবস্থা তুলনামূলক ভালো হলেও উৎপাদন কমে যাচ্ছে। এর পেছনে কয়েকটি কারণ হিসেবে তিনি বলেন, নদীতে পলি জমে যাওয়া, পানি দূষণ, অতিরিক্ত মাছ ধরা, এবং ছোট ইলিশ ধরার প্রবণতা। জলবায়ু পরিবর্তনও ইলিশের পরিমাণ কমে যাওয়ার একটি বড় কারণ।”
রহমান আরও বলেন, বিপজ্জনক ও অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরার সরঞ্জাম ব্যবহারের কারণে শুধু ইলিশ নয়, আরও অনেক প্রজাতির মাছও ধীরে ধীরে কমছে। সিআইএফআরআই(CIFRI)-এর পর্যবেক্ষণেও ইলিশের জন্য পাঁচটি প্রধান হুমকি চিহ্নিত: অতিরিক্ত মাছ ধরা, বাঁধ ও ব্যারাজের কারণে নদীর গতিপথে বাধা সৃষ্টি, নদীতে পলি জমে যাওয়া, পানি দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন।
ফারাক্কা ব্যারাজের কারণেই কমেছে ইলিশ
২০০৭ সালে প্রকাশিত “ইমপ্যাক্ট অব ফারাক্কা ব্যারাজ অন হিলসা ফিশারিজ: অ্যান ওভারভিউ” শীর্ষক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হওয়ার পর গঙ্গা নদীর মধ্যবর্তী অংশে (ফারাক্কা থেকে প্রয়াগরাজ পর্যন্ত) ইলিশ ধরা ৮৩ দশমিক ১ ভাগ থেকে ৯৮ দশমিক ৬ ভাগ পর্যন্ত কমে যায়। অপরদিকে ব্যারাজের ভাটিতে ইলিশ কিছুটা বাড়তে থাকে। প্রয়াগরাজে (উত্তরপ্রদেশ) ১৯৬১ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে প্রতি হেক্টরে গড়ে ৪ দশমিক ৮৬ কিলোগ্রাম ইলিশ পাওয়া যেত। কিন্তু ব্যারাজ নির্মাণের পর ১৯৮০’র দশকে এই উৎপাদন কমে দাঁড়ায় প্রতি হেক্টরে মাত্র দশমিক ২৩ কিলোগ্রাম । একইভাবে, ভাগলপুরে (বিহার) উৎপাদন ১ দশমিক ৬৩ কিলোগ্রাম থেকে নেমে আসে দশমিক ৪৮ কিলোগ্রামে। এর ফলে উত্তরপ্রদেশ ও বিহারে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাজারো জেলেদের জীবিকা।
মঙ্গাবে ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, শুরু থেকেই ফারাক্কা ব্যারাজের দুটি গেটকে মাছ চলাচলের পথ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। গেট নম্বর ২৫ এবং ২৫এ, ১৯৭৫ সাল থেকেই “ফিশ লক” বা মাছ চলাচলে জন্য ঠিক করা আছে। ইলিশ সংরক্ষণের উপায়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে এ বিষয়ে সরকারকে বহুবার চিঠি পাঠানো হয়েছে, বলেও জানা যায়।

রাইট টু ইনফরমেশন আইনের আওতায় এক সাংবাদিকের করা আবেদনের প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় পানি কমিশন জানায়, “ফারাক্কা ব্যারাজে কোনো ফিশ ল্যাডার নেই। দুটি ফিশ লক গেট আছে, যা বর্তমানে বন্ধ।” কমিশন তাদের উত্তরে আরো জানিয়েছে, “অফিসে থাকা রেকর্ড অনুযায়ী, এই গেট ১৯৯৮ সাল থেকে কার্যকর। বর্তমানে গেটটি একটি নতুন গেট দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে।” ইলিশ মাছের চলাচল ফিশ লক গেটের কারণে প্রভাবিত হচ্ছে কি না, সে প্রশ্নের জবাবে কমিশন বলছে, “আমাদের অফিসে কোনো রেকর্ড নেই যা প্রমাণ করে ফিশ লক গেট ইলিশের চলাচল প্রভাবিত করেছে।”
মুম্বাই ভিত্তিক ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন ট্রাস্টের রিভারাইন ইকোসিস্টেম এবং লাইভলিহুড প্রোগ্রামের প্রধান, নচিকেত কেলকর মঙ্গাবে ইন্ডিয়াকে এক ইমেইল সাক্ষাৎকারে বলেন, “ইলিশ মাছের উপরের দিকে অভিবাসনের একমাত্র উপায় হলো ড্যাম ও ব্যারাজগুলো নতুন করে পরিচালনা করা। যেখানে ইলিশ পাওয়া যায়, সেসব এলাকায় এরই মধ্যেই অতিরিক্ত শিকার হয়েছে। তাই মনে হয় না, ইলিশের মাধ্যমে মৎস্যজীবীদের আয় বাড়ানো সম্ভব। ইলিশ সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ। কারণ, ইলিশের ঐতিহাসিক বিস্তৃতি এখন আর আগের মত নেই এবং যেখানে আছে সেখানেও এর পরিমাণ কমছে।”
ইলিশের জোগান ও বাংলাদেশের ওপর নির্ভরতা
ইলিশ ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক মাছ। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বে মোট ইলিশ উৎপাদনের ৯৬ ভাগের বেশি হয় বাংলাদেশ, ভারত এবং মিয়ানমারের তটভূমিতে। যার একটি বড় অংশ উৎপাদন হয় বাংলাদেশ থেকে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে, ৮৬ দশমিক ৭ ভাগ ইলিশ উৎপাদন হয় বাংলাদেশে, ৮ ভাগ ভারতে, এবং ৪ ভাগ মিয়ানমারে।
তাহলে কি এই দেশগুলোকে ইলিশ সংরক্ষণের জন্য যৌথ প্রচেষ্টা করা উচিত? “নিশ্চয়ই,” বলেন রহমান। “এটি একটি আন্তঃমহাদেশীয় সমস্যা, এবং ভারত-বাংলাদেশ-মিয়ানমারের যৌথ প্রচেষ্টা অপরিহার্য, কারণ ইলিশের অস্তিত্বের জন্য স্বাদু পানি, লবণাক্ত পানি এবং সামুদ্রিক পানি-এই তিনটিই প্রয়োজন।”
ভারতে ইলিশের চাহিদা অনেক বেশি এবং পর্যাপ্ত সরবরাহের জন্য দেশটি বাংলাদেশের ওপর নির্ভরশীল। যেহেতু দুই দেশের মধ্যেই সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক, তাই বাংলাদেশ একচেটিয়াভাবে ভারতের কাছে ইলিশ সরবরাহ করে। তবে এরও একটি সীমা আছে। মঙ্গাবে ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশ সরকার ভারতের জন্য ২,৪৫০ মেট্রিক টন ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দিয়েছিল। রহমান বলেন, “সাধারণত, বর্তমানে অন্য কোনো দেশে ইলিশ রপ্তানি হচ্ছে না। আশা করা যায়, শিগগিরই এটি সম্ভব হবে।”
ইলিশ সংরক্ষণে কী করছে বাংলাদেশ
রহমান জানান, বাংলাদেশের ইলিশ সংরক্ষণের জন্য চারটি কৌশলগত পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হলো- পোনা ইলিশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অভয়ারণ্য স্থাপন; প্রজনন মৌসুমে প্রজনন বা ডিম পাড়ার স্থানগুলোর চারপাশের প্রতিবেশ ঠিক রাখা এবং সংরক্ষণ করা; প্রতি বছর ৬৫ দিনের জন্য সমুদ্রে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা (২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত); এবং ইলিশের প্রজনন ও বেড়ে ওঠার সময় দরিদ্র মৎস্যজীবীদের ভর্তুকি প্রদান।
২০০৮-০৯ সালে বাংলাদেশে ২.৯৮ লাখ মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল। ২০১৯-২০ সালে এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৫.৬৫ লাখ মেট্রিক টনে পৌঁছায়।
ব্যানার ছবি: ফারাক্কার ইলিশ প্রজনন কেন্দ্র। ছবি: রাহুল সিং।
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে ইন্ডিয়া-তে, ২০২৩ সালের ১৭ জানুয়ারি।