- তৃতীয় একটি জলাভূমিকে রামসার সাইট হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ। তবে দেশটির পুরোনো দুটি রামসার সাইটের বর্তমান অবস্থা বলছে শুধুমাত্র এই স্ট্যাটাস, সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিতে পারবে না।
- বন উজাড়, বন্যপ্রাণী ও মাছ শিকার, প্রাকৃতিক সম্পদের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং পানিদূষণের কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন এবং মিঠাপানির জলাভূমি টাঙ্গুয়ার হাওর গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
- দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় জলাভূমি হাকালুকি হাওর। টাঙ্গুয়ার হাওর ও সুন্দরবনের মতো এটির জন্যও রামসার স্ট্যাটাস পেতে কাজ করছে সরকার। যদিও এরই মধ্যে একই ধরনের হুমকির সম্মুখীন এই হাওরটি।
- “সমস্যা হলো, রামসার স্বীকৃতি পাওয়ার পর আর কিছুই করে না সরকার। কারণ এসব সমস্যার মূলে যারা থাকে, তারা কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতাসীনদের কাছের লোক। ফলে প্রভাবশালী গোষ্ঠিটির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয় তারা,” বলেন পরিবেশ আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
দেশের সবচেয়ে বড় মিঠাপানির জলাভূমি হাকালুকি হাওরকে রামসার সাইট হিসেবে ঘোষণার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। অথচ এরই মধ্যে ঘোষিত দেশের অন্য দুটি আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি, সুন্দরবন ও টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রতিবেশগত বিপর্যয় বেড়েই চলছে।
রামসার কনভেনশন, জলাভূমি সংরক্ষণ ও এর টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করার আহ্বান জানায় এবং আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমিকে রামসার সাইট হিসেবে ঘোষণা করে। বাংলাদেশ ১৯৯২ সালে এই কনভেনশনে যোগ দেয় এবং একই বছরে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনকে রামসার সাইট ঘোষণা করা হয়। এরপর ২০০০ সালে মিঠাপানির জলাভূমি টাঙ্গুয়ার হাওর রামসার সাইটের মর্যাদা পায়।
গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সরকার দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় জলাভূমি হাকালুকি হাওরকে রামসার স্ট্যাটাসের জন্য মনোনীত করে। বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও, সুন্দরবন ও টাঙ্গুয়ার হাওরের বর্তমান অবস্থা দেখে সতর্ক করেছেন এই বলে যে, শুধুমাত্র এই স্ট্যাটাস জলাভূমির সুরক্ষা দিতে পারবে না।
“সমস্যা হলো, রামসার স্বীকৃতি পাওয়ার পর আর কিছুই করে না সরকার,” বলেন বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। “কারণ এসব সমস্যার মূলে যারা থাকে, তারা কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতাসীনদের কাছের লোক। ফলে প্রভাবশালী গোষ্ঠিটির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয় তারা।”
তবে তিনি আরও বলেন, হাকালুকি হাওর তার প্রতিবেশগত অনন্য ভূমিকার জন্য রামসার সাইট হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার যোগ্য।
“তবুও আমরা সরকারের এই পদক্ষেপকে সমর্থন করি, কারণ যখন কোনো জায়গাকে রামসার স্ট্যাটাস দেওয়া হয়, তখন সেখানে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো আন্তর্জাতিকভাবে মনোযোগ পায়,” আরো জানান তিনি।


ডুবে যাচ্ছে সুন্দরবন
বঙ্গোপসাগরের মোহনায় অবস্থিত সুন্দরবন, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের কারণে ক্রমাগত প্রতিবেশগত হুমকির মধ্যে রয়েছে। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) এবং অভিবাসী প্রজাতির সংরক্ষণ বিষয়ক কনভেনশন সিএমএসের যৌথভাবে প্রকাশিত ২০২০ সালের এক তথ্যপত্রে এমনটাই বলা হয়েছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, ভয়াবহ বন্যা এবং ছোট ছোট দ্বীপ বিলীন হয়ে যাওয়া, সুন্দরবনের প্রধান হুমকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অথচ ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবেও সুন্দরবন নাম লিখিয়েছে বেশ আগে।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে গড় উচ্চতা ১ মিটারেরও কম হওয়ায় পানির সামান্য বৃদ্ধি পুরো অঞ্চলকে বিপদের মুখে ফেলতে পারে। তথ্যপত্রে বলা হয়েছে, “সমুদ্রপৃষ্ঠের সামান্য উচ্চতা বৃদ্ধিও এ অঞ্চলকে নাটকীয়ভাবে প্রভাবিত করবে।”
উপকূল ধস, ঘনঘন বন্যা ও দ্বীপগুলোর বিলুপ্তি সুন্দরবনের বহুমুখী জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ২০০০ সালের তুলনায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যদি ২৮ সেন্টিমিটার বেড়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশে বাঘের আবাসস্থল ৯৬ ভাগ কমে আসবে।
“এই হুমকিগুলো বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ বর্তমানে সমুদ্রপৃষ্ঠ প্রতি বছর ৩.২ মিলিমিটার হারে বাড়ছে,” তথ্যপত্রের হিসাব।

সমুদ্রপৃষ্ঠ ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে এ অঞ্চলে বেড়েছে ঘূর্ণিঝড়ের প্রবণতা। এর ফলে মানবজীবন ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলের জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে এই দুর্যোগ। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বাঘ। কারণ ঘনঘন ঝড়, তাদের শিকারের সময়কে কমিয়ে দিচ্ছে। একইভাবে, স্থানীয় ও পরিযায়ী জলচর পাখিরাও হারিয়ে ফেলছে জোয়ার-ভাটা নির্ভর কাদামাটির চর।
তার ওপর আছে মানবসৃষ্ট হুমকি। নির্বিচার বন ধংস, বন্যপ্রাণী পাচার ও মাছ ধরতে ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার এগুলোর মধ্যে অন্যতম। এছাড়া এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে শিল্পায়ন ও নগরায়ন।
গত ডিসেম্বরে বাগেরহাট জেলায় সুন্দরবনের কাছে ১,৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট উদ্বোধন করে সরকার। এই প্রকল্প ভয়াবহভাবে সামাজিক ও পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে বলে সতর্ক করে আসছেন বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদরা। বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠী বাস্তুহারা হওয়ার আশংকা রয়েছে এই প্রকল্পে।
তবে সুন্দরবনের পশ্চিম রেঞ্জের বন কর্মকর্তা আবু নাসের মোহসিন হোসেন জানান, “অবৈধ বন নিধন, বন্যপ্রাণী শিকার ও হরিণ পাচার বন্ধ হয়েছে। সরকারের নেওয়া সংরক্ষণমূলক পদক্ষেপে সমৃদ্ধ হয়েছে জীববৈচিত্রও।”
তিনি আরও বলেন, কিছু জেলে এখনও বিষ ব্যবহার করছে মাছ ধরতে, তবে বন বিভাগের এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা রয়েছে।
হুমকিতে টাঙ্গুয়ার হাওর
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত টাঙ্গুয়ার হাওর একটি বিশাল নিচু এলাকা, যা বর্ষাকালে বৃষ্টির পানিতে ভরে যায়। এখানে রয়েছে ১৪০টিরও বেশি মাছের প্রজাতি এবং প্রায় ৬০,০০০ পরিযায়ী জলচরের আবাস। এছাড়াও এখানে দেশের শেষ সোয়াম্প ফরেস্ট বা জলাবনের কিছু অংশ অবশিষ্ট আছে এবং এটিকে পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ সরকার।
প্রায় ১০,০০০ হেক্টর (২৫,০০০ একর) বিস্তৃত এই হাওর, সুরমা নদীর প্লাবনভূমি ও এর অবস্থান ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে। প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার, আবাসস্থল ধ্বংস, মাটি ক্ষয়, পানি দূষণ, বন উজাড় এবং বন্যপ্রাণী শিকারের কারণে দক্ষিণের সুন্দরবনের মতো এখানেও, উদ্ভিদ ও প্রাণিজ বৈচিত্র্য ভয়াবহভাবে হুমকিতে পড়েছে।
আইইউসিএন–এর ২০১২ সালের এক প্রকাশনায় বলা হয়েছে, এক সময় টাঙ্গুয়ার হাওরে স্বাদুপানির বনের অস্তিত্ব খুব সাধারণ ছিল। তবে গাছ কাটা ও জমি পরিষ্কার করার মত নানারকম মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের কারণে এখন তা বিরল। নলখাগড়ার ক্ষেত থেকে অব্যাহতভাবে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ ও এসব জমি কৃষিজমিতে রূপান্তরের ফলে এই বন কমে গেছে। এর ফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে মৎস্যসম্পদের ওপরও। কারণ স্বাদুপানির বন ও নলখাগড়া মাছের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয় ও খাদ্যের উৎস।
আইইউসিএনের গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, “অতীতে যেসব জলজ প্রজাতির ঘনঘন দেখা মিলতো এখানে, এখন সেগুলো খুবই বিরল বা দ্রুত বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।” গবেষকরা এরই মধ্যে মাছের উৎপাদন, বন্যপ্রাণীর বৈচিত্র্য এবং জলচরের সংখ্যা কমে যাওয়া লক্ষ্য করেছেন।

এছাড়া জেলে ও ক্রমাগত পর্যটকদের নৌকা থেকে তেল দূষণ এবং স্থানীয় কয়লা সংগ্রাহকদের কর্মকাণ্ডও এলাকার জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি তৈরি করছে। এছাড়াও খাবারের জন্য জলচর প্রাণীর শিকার প্রবণতাও বিপন্ন করছে হাওরের প্রতিবেশকে।
স্থানীয় নৌকা চালক আখতার হোসেন বলেন, “টাঙ্গুয়ার হাওর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জনপ্রিয় পর্যটন এলাকায় পরিণত হয়েছে। অনেক পর্যটক স্থানীয়দের সহায়তায় খাবারের জন্য শিকার করছে বিভিন্ন পাখি-হাঁস।”
তিনি আরও বলেন, “হাওরের ব্যবস্থাপনা খুবই দুর্বল। জেলেরা ক্ষতিকর গিলনেট ব্যবহার করে, শিকারীরা অবাধে ঘুরে বেড়ায়, আর পর্যটকেরা প্লাস্টিক পণ্য ফেলে বাড়ায় দূষণ।”
পরিবেশ অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক মোহাম্মদ আমরান হোসেন বলেন, কিছু মানুষ এখনও অবৈধভাবে পাখি, বন্যপ্রাণী ও মাছ শিকার করছে, তবে পরিস্থিতি আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে।
“আমরা পুরোপুরি বন্ধ করতে পারবো না, তবে এমন ক্ষতিকর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। এজন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন,” বলেন আমরান।

ঝুঁকিতে হাকালুকি হাওরও
দুটি রামসার সাইট স্থায়ী হুমকির মুখে থাকা অবস্থায় পরিবেশ অধিদপ্তর তৃতীয় সাইট হিসেবে হাকালুকি হাওরের নাম প্রস্তাব করেছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক সৈয়দা মাসুমা খানম বলেন, “ডিসেম্বরে আমরা হাকালুকি হাওরকে রামসার সাইট ঘোষণার প্রস্তাব দিয়েছি, বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে।”
তবে এখানেও একই ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে হাওরটি। গবেষণায় দেখা গেছে, হাকালুকি হাওরে স্বাদুপানির বন ধ্বংস হওয়ার কারণে পরিযায়ী পাখি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী তাদের আবাস হারাচ্ছে। গত কয়েক দশকে এ অঞ্চলে কৃষি কার্যক্রমও দ্রুত বেড়েছে, যা জলাভূমির প্রতিবেশকে প্রভাবিত করছে মারাত্মকভাবে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, গত কয়েক দশকে হাকালুকি হাওরের জীববৈচিত্র্য ও জৈব উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। পলি জমা, প্রাকৃতিক সম্পদের অতিরিক্ত ব্যবহার, কৃষিতে রাসায়নিকের অপব্যবহার এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণে এটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে নষ্ট হচ্ছে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং প্রতিবেশের পাশাপাশি এখানে স্থানীয় মানুষের খাদ্য, জ্বালানি, পশুখাদ্য ও জীবিকার ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
ব্যানার ছবি: একটি ব্রোঞ্জ-ডানা জাকানা। ছবি: তারেক উদ্দিন আহমেদ / via Flickr (CC BY 2.0)
সাইটেশন:
Uddin, M. J., Mohluddin, A. S. M., Hossain, S. T., & Hakim, A. (2013). Eco-environmental changes of wetland resources of Hakaluki haor in Bangladesh using GIS technology. Journal of Biodiversity & Endangered Species, 1(1). doi:10.4172/2332-2543.1000103
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে গ্লোবাল-এ – এ, ২০২৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি।


