- বাংলাদেশে পাখি সংরক্ষণ আন্দোলনের পথিকৃৎ নাটোরের কৃষক যশোধন প্রামাণিক।
- তার ২৩ বছরের নিরলস প্রচেষ্টায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে এয়ারগানের ব্যবহার। প্রতিটি জেলায় পাখির অভয়ারণ্য তৈরি করা হয়েছে এবং পাখিদের জন্য তৈরি করা হয়েছে জলাশয়।
- যশোধন প্রামাণিকের একার উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘পক্ষীকূলের আশ্রয় ও খাদ্য নিশ্চিতকরণ প্রকল্প’, বাংলাদেশ সরকারকে পাখিদের সুরক্ষার পক্ষে ৩০টিরও বেশি সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করেছে।
জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের ‘বহুব্রীহি’ উপন্যাসের চরিত্র অবসরপ্রাপ্ত ধনী আইনজীবী সোবহান সাহেব। তিনি সমাজের জন্য কিছু করতে চেয়েছিলেন। ফিশ ফার্মিং এর কারণে দেশীয় মাছের বিলুপ্তি হতে পারে— এ আশঙ্কা থেকে ক্ষতিকর প্রজাতিগুলোর তালিকা নিয়ে তিনি গিয়েছিলেন সরকারি দপ্তরে। সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা উপহাস করে তার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছিলেন। হতাশ হয়ে তাই সোবহান সাহেব বলেছিলেন, “এই দেশের কিছুই হবে না!”
বহুব্রীহির সোবহান সাহেব আশা ছেড়ে দিলেও, বাস্তবে একজন মানুষ কিন্তু আশা ছাড়েননি। তিনি যশোধন প্রামাণিক। একবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে, উত্তরবঙ্গের নাটোর জেলার কৃষক যশোধন প্রামাণিক এক অনন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি শিকার, ধরা এবং খেয়ে ফেলার হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন পাখিদের।
দীর্ঘ ২৩ বছরের পরিশ্রমের শেষে, সরকারকে পাখি শিকারের জন্য এয়ারগানের ব্যবহার নিষিদ্ধে রাজি করাতে সফল হয়েছেন যশোধন প্রামাণিক। এটি ছিল দেশে পাখি সুরক্ষার এক বড় পদক্ষেপ। বছরের পর বছর লেগে থেকে তিনি পাখি রক্ষায় একাই সরকারকে ৭৫টিরও বেশি পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করেছেন। এছাড়া তিনি ‘পক্ষীকূলের আশ্রয় ও খাদ্য নিশ্চিতকরণ প্রকল্প’ নামক একটি কর্মসূচিও চালু করেছিলেন। এই প্রকল্প পাখির সুরক্ষায় ৩০টিরও বেশি পদক্ষেপ নিতে প্রভাবিত করে বাংলাদেশ সরকারকে।

৬৫ বছরের যশোধন মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিলেন একজন কিশোর। তিনি যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ দেখেছেন, আর দেখেছেন কীভাবে সেই ধ্বংসের ভেতর থেকে একটি দেশ নতুনভাবে উঠে দাঁড়িয়েছে।
যুদ্ধ শেষে যখন সবাই বেশ স্বস্তিতে ছিল তখন আমার বাবা মাখন চন্দ্র প্রামাণিক আমাকে বলেছিলেন, দেশ গড়ার জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে — নাটোরের বিখ্যাত রানী ভবানীর প্রাসাদের ভিতরে একটি বাগানে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন যশোধন প্রামাণিক।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দেবতা শিবকে উৎসর্গকৃত এই বাগানটির চারপাশে রয়েছে শিব ছাড়াও অন্যান্য দেব-দেবীর মূর্তি। তবে যশোধনের মতে, এই বাগানের প্রকৃত অভিভাবক পাখিরাই। পাখির বিষ্ঠা মন্দিরের সাইনবোর্ড ঢেকে দিয়েছে— যদিও দৃশ্যটা অদ্ভুত, তবুও এখানকার ডালে ডালে তাদের আশ্রয়ই বলে দেয়, এটি পাখিদের স্বর্গ।
নাটোর জেলার তিনটি পাখির অভয়ারণ্যের একটি এই জায়গা। যশোধনের অবিরাম প্রচেষ্টার ফলে এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে পাখি-নিরাপদ এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে।

দেশের ‘মালিক’ হিসেবে দায়িত্বপালন
ছোটবেলা থেকেই যশোধন ছিলেন পরিবেশ সচেতন। তিনি কখনোই অন্য ছেলেদের সাথে মিশতে পারতেন না। অন্যরা গাছে উঠে পাখি ধরতো, আর তিনি গাছে উঠে কেবল পাখির বাসা দেখতেন। এর মাধ্যমে তিনি পাখিদের আচরণ বুঝতে শিখেছিলেন।
তিনি বলেন, “নাটোরে একসময় মানুষ ভাতের সাথে তরকারি হিসেবে পাখির মাংস খেতো। তখনো কেউ খেয়াল করেনি যে পাখির সংখ্যা কমছে।”
সে সময় যশোধন লক্ষ্য করেন, একটা পাখি সঙ্গী হারালে প্রায় এক বছর পর্যন্ত মিলন করে না। এটা দেখে তিনি পাখি রক্ষার গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন। তারপর থেকে তিনি মানুষকে সচেতন করা শুরু করেন। কিন্তু এ সময় এলাকায় ফসলের বাম্পার ফলনের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
যশোধন বলেন, “আমি বুঝেছিলাম, একজন নাগরিক হিসেবে আমার দায়িত্ব হলো এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।”
১৯৮০-র দশকের শেষ দিকে সবুজ বিপ্লবের কারণে মানুষ বেশি ফসল পেতে শুরু করে, কিন্তু এর জন্য প্রচুর সার আর কীটনাশকের ব্যবহার হচ্ছিল।

২০০৯ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, সাধারণ কীটনাশকে কার্বোফুরান, মনোক্রোটোফস, ফোরেট, ডায়াজিনন, ফেন্থিয়ন, ফসফামিডন, অ্যাজিনফস-মিথাইলের মতো অনেক বিষাক্ত উপাদান রয়েছে। এছাড়া ধান চাষে আরও নানারকম কীটনাশক ব্যবহৃত হয়, যা পাখিদের প্রজননে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, এমনকি তাদের মৃত্যুরও কারণ হয়।
অবশ্য এসব জানতে যশোধন প্রামাণিকের কোনো গবেষণার দরকার পড়েনি। কৃষক হিসেবে বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি তা বুঝেছিলেন। তাই তিনি এর বিরুদ্ধে আওয়াজ তুললেন। ২০০০ সালে তিনি চলে গেলেন ঢাকায়।
সেখানে স্থানীয় ও জাতীয় পরিবেশবিদদের সাথে আলোচনা করে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন — এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। তারপর সরাসরি বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তাদের সাথে দেখা করলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, “আপনি কে, এখানে কেন এসেছেন?”
উত্তরে যশোধন প্রামাণিক বলেছিলেন, “আমি মালিকপক্ষের একজন সদস্য।”
এ ঘটনার বিস্তারিত বর্ণণায় তিনি বলেন, “আমি খুব ভয় পাচ্ছিলাম। তবে প্রস্তুতও ছিলাম। আমার হাতে ছিল সংবিধানের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদ। আমি সেটা তাঁকে দিলাম এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে বললাম — আমি রাষ্ট্রের মালিক পক্ষের একজন সদস্য। সংবিধানে লেখা আছে, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতা জনগণের।”

আকাঙ্ক্ষা এবং অর্জন
যশোধনের ‘পক্ষীকূলের আশ্রয় ও খাদ্য নিশ্চিতকরণ প্রকল্প’ এখন দেশের ১০টি জেলায় ১০ হাজার একরের বেশি জমিতে বিস্তৃত। ২০১৯ সাল থেকে এই জায়গাগুলো পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে রয়েছে। এসব জমি সরকারি মালিকানাধীন। পাখি-বান্ধব জলাশয় তৈরি, বৃক্ষরোপণ—সব খরচই বহন করছে সরকার।
‘পক্ষীকূলের আশ্রয় ও খাদ্য নিশ্চিতকরণ প্রকল্প’ এর মূল ধারণা হলো,পাখিরা আমাদের পৃথিবীর একটি অপরিহার্য উপাদান এবং আমাদের সকলের উচিত পাখির সুরক্ষা নিশ্চিতে কাজ করা।
যশোধন প্রামাণিকের মতো স্বল্প শিক্ষিত একজন কৃষকের জন্য কাজটি সহজ ছিল না। তবুও তিনি কোনো ‘শর্টকাট’ রাস্তায় হাঁটেননি আবার হালও ছাড়েননি। তিনিই ২০০২ সালে প্রথমবারের মতো মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছিলেন,এয়ারগান নিষিদ্ধ করার জন্য। প্রায় ২০ বছরের চেষ্টা শেষে, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে এয়ারগান রাখা ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ সরকার।
পাখিদের উপকারে আসতে পারে এমন সব দাবিদাওয়া নিয়েই জীবন পার করেছেন তিনি। নিজেকে এই প্রকল্পের প্রতিষ্ঠাতা এবং সমন্বয়কারী বলে দাবি করেন যশোধন প্রামাণিক।
যশোধনের যোগাযোগ দক্ষতাও অসাধারন। তিনি স্কুলশিক্ষক ও ধর্মীয় নেতাদের সাহায্যে শিক্ষা ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সাথে মিলে মানুষকে সচেতন করেছেন পাখি রক্ষার ব্যাপারে।
তিনি ভূমি মন্ত্রণালয়কে প্রতিটি জেলায় পাখির জন্য জায়গা দিতে রাজি করান, জলসম্পদ মন্ত্রণালয়কে জলাশয় খনন করাতে রাজি করান, এমনকি কীটনাশকের প্যাকেটে সতর্কতা লেবেল লাগানো বাধ্যতামূলক করতেও সফল হন।


এক নিভৃতচারী পথপ্রদর্শক
যশোধন প্রামাণিকের বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সাহিনা খাতুন বলেন, “তিনি এক জীবন্ত কিংবদন্তি।”
নাটোরে জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই যশোধনের সাথে কাজ করছেন সাহিনা খাতুন। তাঁর নির্দেশনায় দিঘাপতিয়ািা ইউনিয়ন ও উত্তরা গণভবনে পাখিদের জন্য অভয়ারণ্য গড়ে ওঠে।
অন্যান্য উদ্যোগের পাশাপাশি যশোধন সবসময় এক জেলা থেকে আরেক জেলায় ঘুরে বেড়ান পাখিদের জন্য জমি রক্ষা করতে। কারণ বাংলাদেশে জমির অভাব ও দামের কারণে শক্তিশালী মহল মাঝে মাঝেই জমি দখল করতে চায়।
অসাধারন এই মানুষ ব্যক্তিগত জীবনে খুবই সাদামাটা। সাধারন জীবনযাপনেই অভ্যস্ত যশোধন প্রামাণিক। নিজের বীরোচিত কাজের জন্য বিশেষ কোনো সুযোগসুবিধা তিনি গ্রহণ করেন না। ডায়বেটিসের কারণে নিয়মিত বিরতিতে খাবার ও ওষুধ খেতে হয় তাকে। তাই তিনি সবসময় সঙ্গে রাখেন মৌসুমি ফল আর ঘরে তৈরি চাপাতি রুটি।
যশোধন প্রামাণিকের মতে, “দেশটা অসহায়। আমরা যদি সাহায্য না করি, তাহলে আর কে করবে?”
ব্যানার ছবি: যশোধন প্রামাণিক — একজন নিরলস সংগ্রামী, যিনি পাখি সংরক্ষণে এনেছেন এক অনন্য বিপ্লব। তাঁর ২৩ বছরের অক্লান্ত প্রয়াসে দেশে এয়ারগান নিষিদ্ধ হয়েছে এবং প্রতিটি অঞ্চলে গড়ে উঠেছে পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল। ছবি: মাকসুদা আজিজ।
সাইটেশন:
Parsons, Katharine & Mineau, Pierre. (2011). Effects of Pesticide Use in Rice Fields on Birds. Waterbirds. 33. (Special Publication 1): 193-218, 2010
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে, মঙ্গাবে গ্লোবাল এ, ২০২৩ সালের ৩০ মার্চ।