- বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ বৃহত্তম ধান উৎপাদনকারী দেশ। ১৭ কোটি মানুষের খাবারের যোগান দিতে প্রতি বছর প্রায় ৩৯ মিলিয়ন টন ধান উৎপাদন হয় এখানে। এদের মধ্যে ১৩০টি জাত গবেষণাগারে তৈরি।
- দেশে প্রায় ১ হাজার উন্নতমানের দেশীয় জাত রয়েছে, যেগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। তবুও বেশি ফলনের কারণে উচ্চফলনশীল জাতের ওপরই ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল কৃষকেরা।
- দেশীয় জাতের ধান চাষের মাধ্যমে কিছু কৃষক মনোকালচার প্রবণতার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। মনোকালচার চাষ হলো, এমন একটি কৃষিব্যবস্থা যেখানে একটি নির্দিষ্ট জমিতে প্রতিবার শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট ফসলের জাতের চাষ করা হয়।
- একই সঙ্গে কয়েকটি বেসরকারি সংরক্ষণ সংস্থা ও কিছু ব্যক্তি দেশীয় ধানের জাত রক্ষা ও সংরক্ষণে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করছেন। ২০০৫ সাল থেকে BARCIK দেশের বিভিন্ন জায়গার কৃষকদের কাছ থেকে ৬ শতাধিক দেশীয় ধানের জাত সংগ্রহ করেছে।
বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য ধান। তবে এটি যে কেবল প্রধান খাদ্য শস্য তাই নয়, কৃষকের সংস্কৃতি ও জীবিকারও প্রধান অবলম্বন। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের নানা প্রভাবে দেশে ধানচাষ ক্রমশ ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
জাতীয়ভাবে ধানের প্রধান উৎপাদনকারী হিসেবে পরিচিত, বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলীয় কয়েকটি জেলা। এসব জেলার কৃষিজমির একটি বড় অংশের ওপর সরাসরি লবণাক্ততার প্রভাব পড়েছে — সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বাণিজ্যিকভাবে চিংড়ি চাষ এবং উজানের আন্তঃসীমান্ত নদী থেকে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায়।
এ সংকট নিরসনে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চমাত্রার লবণাক্ততা সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন এবং কৃষকরা যাতে সেগুলো চাষে উৎসাহিত হয়, সেই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এতে কিছুটা সাফল্য পেলেও, মাঠ পর্যায়ে বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। কারণ বংশ পরম্পরায় ধান চাষ করা কৃষকরা, ধান উৎপাদনে সমস্যা হলে সাধারণত লবণসহনশীল বিকল্প ফসল বা বিকল্প পেশার দিকে ঝুঁকে পড়েন।
এসবের ব্যতিক্রম একজন মানুষ, যিনি অবিশ্বাস্যভাবে দেশের সবচেয়ে বেশি লবলাক্ত এলাকায় বসবাস করেও অনন্য ভূমিকা রাখছেন দেশীয় জাতের ধানচাষে।

আশপাশের চাষিরা যখন ধান বাদ দিয়ে অন্য ফসল চাষে মন দিচ্ছেন, সেখানে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মধ্যবয়সী কৃষক সিরাজুল ইসলাম দেশীয় লবণসহনশীল ধানের জাত সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করছেন। এখন পর্যন্ত তিনি ২১৮টি ভিন্ন জাতের ধানের বীজ সংগ্রহ করেছেন। শুধু তাই নয়, অন্যান্য কৃষকদেরও এসব প্রজাতির ধান চাষে উৎসাহিত করেন তিনি।
সিরাজুল বলেন, “একবার, আমাকে একটি বিশেষ জাতের বীজ আনতে ১০০ কিলোমিটার (৬০ মাইল) ভ্রমণ করতে হয়েছিল। শুনেছিলাম, এটি লবণাক্ততা ভালোভাবে সহ্য করতে পারে। তাই আমি এত কষ্ট সহ্য করেও সেটি সংগ্রহ করতে যাই।”
গত কয়েক দশকে, উচ্চফলনশীল ফসলের দিকে কৃষকদের ঝুঁকে পড়ার কারণে প্রায় হারিয়ে গেছে, অসংখ্য দেশীয় জাতের ধান। একারণেই সিরাজুলের বীজ ভাণ্ডার এখন অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
সাধারণত, তিনি কোনো নতুন বীজ সংগ্রহ করলে আগে ছোট জমিতে চাষ করেন। ফল ভালো হলে অন্য কৃষকদের সেই ধান চাষে উৎসাহিত করেন।
সিরাজুল ইসলাম জানান, কতটা লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে তা দেখার জন্য চিংড়ির ঘেরে কিছু ধান লাগিয়েছিলেন তিনি। তখন দেখা যায়, চিংড়ির ঘেরে সাধারণত লবণাক্ততা ২০ ডিএস/মিটার (প্রতি মিটারে ডেসি সিমেন্স) পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

দেশীয় ধানের চাষ দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে কৃষক সিরাজুল ইসলাম ‘সেবা সংগঠন’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে তুলেছেন। বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা ১৯৭ জন। এদের সবাই শ্যামনগরের হৈবতপুর ও নাকিপুর গ্রামের কৃষক।
সিরাজুল ইসলাম ও দেশের এমন আরও অনেক কৃষকের এ ধরনের উদ্যোগ এসেছে, Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge (BARCIK) এর কৃষক-নেতৃত্বাধীন ধান সংকরায়ন কর্মসূচির ফল হিসেবে। এ কর্মসূচি কৃষকদের বীজসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান নিজেদেরই করতে উৎসাহিত করছে। পাশাপাশি কৃষি বিজ্ঞানের ওপর বিজ্ঞানীদের একক নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দিয়ে কৃষকদেরও জ্ঞানের অংশীদার করছে।
২০২০ সালের এক হিসাব অনুযায়ী, ২০০৫ সাল থেকে BARCIK দেশের বিভিন্ন জায়গার কৃষকদের কাছ থেকে ৬৫৩টি দেশীয় ধানের জাত সংগ্রহ করেছে। এগুলোকে বিভিন্ন মৌসুমে চাষ করা হয়, যাতে বিলুপ্ত না হয়ে টিকে থাকতে পারে। একইসঙ্গে এগুলো কৃষক-নেতৃত্বাধীন সংকরায়নেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
কৃষকদের মাধ্যমে গৃহীত সংকরায়নের ফলে এখন পর্যন্ত নির্বাচিত হওয়ার পর্যায়ে আছে, ৮৮টি নতুন ধানের লাইন। এগুলো দেশের চারটি কৃষি–প্রতিবেশগত অঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হবে।
BARCIK-এর পরিচালক পাভেল পার্থ বলেন, “অনানুষ্ঠানিক হলেও, আমরা এই প্রক্রিয়াকে সমস্যার সমাধানকেন্দ্রিক গবেষণা হিসেবে দেখি। পুরোপুরিভাবে কৃষকেরা নিজেরাই এটির পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও পরিচালনা করেন। এর লক্ষ্য হলো, রাসায়নিকের ব্যবহার কমানো এবং কৃষিজমিতে ফসলের বৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখা। এজন্যই আমরা অবস্থাভেদে টিকে থাকতে পারে এমন দেশীয় জাত খুঁজে বের করছি।”


বাংলাদেশে ধান উৎপাদন ও মনোকালচার চাষের ঝোঁক
বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ বৃহত্তম ধান উৎপাদনকারী দেশ। ১৭ কোটি মানুষের খাদ্যের যোগান দিতে প্রতি বছর প্রায় ৩৯ মিলিয়ন টন ধান উৎপাদন হয় এখানে। তবে এদের বেশিরভাগই গবেষণাগারে উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল জাত।
দেশে প্রায় ১ হাজার উন্নতমানের দেশীয় জাত রয়েছে, যেগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। তবুও বেশি ফলনের কারণে দেশ উচ্চফলনশীল জাতের ওপরই ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
বাংলাদেশের ধানচাষ নিয়ে এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, কিছু কৃষক এখনো দেশীয় জাত ব্যবহার করেন। কারণ এগুলো উপকূলীয় অঞ্চল, অনাবাদি জমি বা গভীর জলের মতো কঠিন পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে। এসব জাতের শস্যের মান ভালো হয় এবং নানা প্রকার জৈবিক-অজৈবিক চাপ সহ্য করতে পারে।
Global Sustainable Development Report 2015 অনুযায়ী, গত ২০ বছরে বিশ্বের কৃষি ফসলের প্রায় ৭৫ শতাংশ বংশগতি বৈচিত্র্য হারিয়ে গেছে। এ হার স্বাভাবিকের তুলনায় ১০০ থেকে ১ হাজার গুণ বেশি। এর ফলে শুধু কৃষি নয়, প্রতিবেশে টেকসই খাদ্য উৎপাদনের সক্ষমতাও কমে গেছে।
উচ্চফলনশীল জাতের উন্নয়ন ও নিবিড় কৃষি পদ্ধতির কারণে আধুনিক কৃষির আবির্ভাব ঘটলেও, এতে শুধুমাত্র কয়েকটি উন্নত জাত ছাড়া অসংখ্য ঐতিহ্যবাহী ফসলের জাত হারিয়ে গেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বৈজ্ঞানিকভাবে উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ও কীটনাশক-প্রতিরোধী জাত, বিশ্ব খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। তবে এর ফলে ‘জেনেটিক ক্ষয়’ বা ঐতিহ্যবাহী জাত হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে ভবিষ্যতে নতুন জাত উদ্ভাবনও কঠিন হয়ে পড়বে।

গবেষণায় আরও বলা হয়, মনোকালচার পদ্ধতির চাষে সীমিত সংখ্যক জাতের ওপর নির্ভরশীলতা উত্তোরত্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় কীটপতঙ্গের আক্রমণ বেড়েছে। পাশাপাশি দুর্বল হয়ে পড়েছে কৃষি-প্রতিবেশ।
কৃষক ও গবেষকরা মনে করেন, বিনিয়োগের নিরাপদ রিটার্ন নিশ্চিত করতে না পারায় কৃষকেরা একফসলি চাষের দিকে ঝুঁকেছেন। উৎপাদন খরচ বেশি আর ন্যায্য দাম না পাওয়ায় তারা প্রচলিত ও নির্ভরযোগ্য জাতই বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ আহসান উদ্দিন আহমেদ একফসলি চাষ বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে সরকারি নীতিকে দায়ী করেছেন। একইসঙ্গে কৃষকদের স্বপ্ন পূরণেও এ নীতি ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, “কৃষকরা যদি উৎপাদিত ধানের ন্যায্য দাম না পান, তবে তারা অবশ্যই সেই জাত বেছে নেবেন যা তাদের বেশি ফলন দেবে। এ সমস্যার সমাধান কেবল তখনই সম্ভব, যখন কৃষকদের কাছে লাভজনক বিকল্প থাকবে।”
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (BRRI) সাবেক মহাপরিচালক জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, “সরকারের উচিত এমন ব্যবস্থা করা যাতে কৃষকরা ন্যায্য দাম পান। নইলে তারা সবসময় এমন জাত বেছে নেবেন, যা তাদের বেশি লাভ দেবে।”
উদাহরণ হিসেবে তিনি আরও বলেন, “গত ৩০ বছরে কৃষকেরা গবেষণাগারে তৈরি ১৩০টি জাতের মধ্যে ব্রি-২৮ এবং ব্রি-২৯ই সবচেয়ে বেশি চাষ করেছেন। কারণ, শুধু এই দুটি জাতই তাদের তুলনামূলক ভালো লাভ দিয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর মনোকালচার পদ্ধতিতে চাষের প্রবণতা বেড়েছে।
ব্যানার ছবি: ধান মাড়াই এর কাজ করছেন কৃষকরা। ছবি: United Nations/M. Yousuf Tushar via Flickr (CC BY-NC-ND 2.0).
সাইটেশন:
Shelley, Israt J., Takahashi-Nosaka, M., Kano-Nakata, M., Haque, M. S., and Inukai, Y. (2016). Rice Cultivation in Bangladesh: Present Scenario, Problems, and Prospects. Journal of International Cooperation for Agricultural Development. Retrieved from https://icrea.agr.nagoya-u.ac.jp/jpn/journal/Vol14_20-29-Review-Shelley.pdf
F.S.R.K. Dewi, G. A., & Gonzaléz, V. A. (n.d.). Conserving Traditional Seed Crops Diversity. Retrieved from United Nations Division for Sustainable Development website: https://sustainabledevelopment.un.org/content/documents/5739Conserving%20traditional%20seed%20crops%20diversity.pdf
Zhu, Y., Wang, Y., Chen, H., and Lu, Bao-Rong. (2003). Conserving Traditional Rice Varieties through Management for Crop Diversity. BioScience, Volume 53, Issue 2, February 2003, Pages 158–162, doi:10.1641/0006-3568(2003)053[0158:CTRVTM]2.0.CO;2
Shahabuddin, Q., Rahman, A. (2017). Agricultural and Food Policy Framework in Bangladesh: An Assessment. The Bangladesh Development Studies, March-June 2017, Vol. 40A, No. 1 & 2, Agricultural Transformation, Structural Change and Policy Reforms (March-June 2017), pp. 27-51. Bangladesh Institute of Development Studies. Retrieved from https://www.jstor.org/stable/10.2307/26572743
নিবন্ধটি ২০২৪ সালে ডেভেলপিং এশিয়া জার্নালিজম পুরস্কারপ্রাপ্ত। নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে, মঙ্গাবে গ্লোবাল এ, ২০২৩ সালের ৩ এপ্রিল।