- বাংলাদেশে শকুনের জন্য নিরাপদ বলে বিবেচিত একটি এলাকায় ১৪টি শকুনের মরদেহ পাওয়া গেছে। শকুন রক্ষায় নানান পদক্ষেপ নেওয়া হলেও এই ঘটনা শকুন সংরক্ষণের উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
- ধারণা করা হচ্ছে, স্থানীয় কিছু মানুষ একটি মৃত ছাগলের শরীরে বিষ মাখিয়ে খোলা জায়গায় ফেলে রেখেছিল। সেটি খেয়েই শকুনগুলোর মৃত্যু হয়। যদিও তাদের শিকারের লক্ষ্য ছিল, প্রায়ই গ্রামের গবাদি পশু আক্রমণ করা বন্য কুকুর ও শিয়াল।
- ১৯৯০-এর দশকে দক্ষিণ এশিয়ায় শকুনের সংখ্যা ভয়াবহভাবে কমে যায়। এর প্রধান কারণ ছিল, গবাদি পশুর ব্যথানাশক ডাইক্লোফেনাক। যেসব পশুকে এই ওষুধ দেওয়া হতো, তাদের মৃতদেহ খেলে শকুন মারা যেত।
- এরপর থেকেই বাংলাদেশ সরকার শকুনের জন্য ক্ষতিকর বলে বিবেচিত হওয়ায়, গবাদি পশুর জন্য ব্যবহৃত ডাইক্লোফেনাক ও কিটোপ্রোফেন ওষুধ নিষিদ্ধ করে। সেইসঙ্গে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় শকুনের জন্য নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করে।
শকুন সংরক্ষণে বাংলাদেশ নানান উদ্যোগ নিলেও সাম্প্রতিক এক ঘটনায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে সকল প্রচেষ্টা। শকুনদের জন্য সংরক্ষিত একটি অঞ্চল থেকে ১৪টি শকুনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। কর্তৃপক্ষের তদন্তে উঠে এসেছে, অন্য বন্যপ্রাণীর জন্য রাখা বিষাক্ত টোপ গিলেই তাদের মৃত্যু হয়।
বাংলাদেশ বন বিভাগ ও আন্তর্জাতিক সংরক্ষণ সংস্থা IUCN এর প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়, স্থানীয় কিছু মানুষ একটি মৃত ছাগলের শরীরে বিষ মাখিয়ে খোলা জায়গায় ফেলে রেখেছিল। যদিও তাদের লক্ষ্য ছিল, প্রায়ই গ্রামের গবাদি পশু আক্রমণ করা বন্য কুকুর ও শিয়াল।
শকুনদের মরদেহ পাওয়ার এ ঘটনার সূত্রপাত হয় একটি বাংলা শকুনের (Gyps bengalensis) মাধ্যমে। ২০২২ সালে এই শকুনটির শরীরে একটি স্যাটেলাইট ট্যাগ লাগিয়েছিলেন IUCN গবেষকরা। চলতি বছরের ২২ মার্চ তারা লক্ষ্য করেন, শকুনটি ১৫ দিন ধরে একই জায়গা থেকে সিগন্যাল পাঠাচ্ছে। তারপর একটি উদ্ধারকারী দল সেই জায়াগায় গিয়ে দেখতে পায়, শকুনটির মরদেহ দুটি গাছের মধ্যে ঝুলে রয়েছে। পরবর্তী অনুসন্ধানে তারা একইভাবে ঝুলে থাকা আরও দুটি মৃত শকুন খুঁজে পান।
এরপর দলটি সিলেট বিভাগের কালার বাজার, রায়পুর, বুড়িগঙ্গা ও মৌলভীবাজার এলাকাতেও অনুসন্ধান চালায়। সেখান থেকে তারা মোট ১৪টি মৃত শকুন উদ্ধার করে। এর মধ্যে ১২টি বাংলা শকুন এবং ২টি হিমালয়ান গ্রিফন (Gyps himalayensis) ছিল।
ঘটনাটি বাংলাদেশে শকুন সংরক্ষণের ক্ষেত্রে একটি বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ ২০১৫ সালে যখন শকুন রক্ষায় জাতীয় কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়, তখন দেশে সাদা-খাঁজযুক্ত শকুন বা বাংলা শকুন ছিল মাত্র ২৬০টি।

মৃত শকুন পাওয়ার ঘটনায় IUCN Bangladesh এর প্রজেক্ট ম্যানেজার এ.বি.এম. সারোয়ার আলম জানিয়েছেন, সম্প্রতি স্থানীয়রা শিয়াল ও বন্য কুকুরের হামলায় কয়েকটি ছাগল খোয়া যাওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে, বিষাক্ত টোপ ব্যবহার করেছে। তবে এতে শুধু কুকুর-শিয়াল নয়, শকুনও মারা গেছে।
এ ঘটনার পর এ ধরনের কাজ ঠেকাতে উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। এমনকি শুক্রবার জুমার নামাজের সময় মসজিদে ঘোষণা দিয়েও মানুষকে সতর্ক করা হয়েছে।
বাংলাদেশে শকুন সংরক্ষণ
মোট ছয় প্রজাতির শকুন পাওয়া যায় বাংলাদেশে। এর মধ্যে বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী বাংলা শকুন এবং লম্বা ঠোঁটি শকুন (Gyps tenuirostris) অত্যন্ত বিপন্ন। অন্য চারটি প্রজাতি হলো, Himalayan griffon, cinereous (Aegypius monachus), griffon (Gyps fulvus) এবং Indian (Gyps indicus) শকুন। এ চার প্রজাতি মৌসুমি অতিথি হিসেবে বাংলাদেশে আসে।
বাংলাদেশে শকুনের প্রধান আবাসস্থল হলো, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট বিভাগ, উত্তরের ময়মনসিংহ বিভাগ এবং দক্ষিণের সুন্দরবনে।
১৯৯০-এর দশকে দক্ষিণ এশিয়ায় শকুনের সংখ্যা ভয়াবহভাবে কমে যায়। এর প্রধান কারণ ছিল গবাদি পশুর চিকিৎসায় ব্যথানাশক ডাইক্লোফেনাকের ব্যবহার। যেসব পশুকে এই ওষুধ দেওয়া হতো, তাদের মৃতদেহ খেলে শকুন মারা যেত। তাই ২০১১ সালে বাংলাদেশ সরকার গবাদি পশুর চিকিৎসায় ডাইক্লোফেনাকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। কিটোপ্রোফেন নামক আরেকটি ওষুধও শকুনের জন্য ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। ২০২১ সালে শকুনের নিরাপদ আবাসস্থল বলে বিবেচিত এলাকাগুলোতে এটিও নিষিদ্ধ করা হয়।

বন বিভাগের কর্মকর্তা আবু নাসের মোহসিন হোসেন জানান, ২০১৫ সালে সরকার ১০ বছরের একটি জাতীয় শকুন সংরক্ষণ কর্মপরিকল্পনা নেয়। এর লক্ষ্য ছিল, শকুনের সংখ্যা কমে যাওয়া ঠেকানো। কর্মপরিকল্পনায় বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়। তার মধ্যে অন্যতম ছিল, শকুন-নিরাপদ অঞ্চল গড়ে তোলা, যেখানে শকুনের জন্য ক্ষতিকারক পদার্থ ব্যবহার করা যাবে না; প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে একযোগে সংরক্ষণ কার্যক্রম চালানো ও শকুনের জন্য ক্ষতিকর গবাদি পশুর ওষুধ নিষিদ্ধ করা।
তিনি জানান, সরকার IUCN এর সহযোগিতায় এ পরিকল্পনার সব উদ্যোগ বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে।
সরকারি এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে, সিলেট ও খুলনা বিভাগে দুটি শকুন-নিরাপদ অঞ্চল তৈরি করা হয়েছে। এখানে বেশ কিছু বাংলা শকুনের বসবাস এবং দুটি বড় প্রজনন ক্ষেত্র রয়েছে। এই অঞ্চলগুলোর সর্বমোট আয়তন প্রায় ৪৭ হাজার ৩৮০ বর্গকিলোমিটার (১৮ হাজার ২৯৪ বর্গমাইল)।
এসব কার্যক্রমের তদারকিতে থাকা IUCN Bangladesh এর প্রতিনিধি সারোয়ার আলম বলেন, “প্রজনন এলাকার কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষদের নিয়ে শকুন সংরক্ষণ দল গঠন করা হয়েছে। এসব দল শকুনের বাসস্থান ও প্রজনন ক্ষেত্র রক্ষায় কাজ করছে।”
ব্যানার ছবি: হিমালয়ান গ্রিফন (Gyps himalayensis)। ছবি: Dash Huang via Flickr (CC BY-NC-SA 2.0).
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে, মঙ্গাবে গ্লোবাল এ, ২০২৩ সালের ২৮ এপ্রিল।