- বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ প্ল্যানার্সের (বিআইপি) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০১০ সাল থেকে ৩৬ শতাংশ জলাশয় হারিয়েছে রাজধানী ঢাকা।
- শুষ্ক মৌসুমে ঢাকা শহরে পানির ঘাটতি দেখা দেয়। উন্মুক্ত জলাশয়ে পানির অভাবে এ সময় বড় ধরনের আগুন নিয়ন্ত্রণ করা দমকলকর্মীদের কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। আবার বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ধারণের উৎসের অভাবে শহরটিতে নিয়মিত জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।
- জলাশয়গুলো বিলীন হয়ে যাওয়ায় জলস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি, বায়ুবাহিত রোগ এবং মশাবাহিত রোগের মতো বহুমুখী সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।
- ২০০০ সালে, প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন পাস করে বাংলাদেশ সরকার। এতে প্রাকৃতিক জলাশয়গুলোকে অক্ষত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
২০২৩ সালের ৪ এপ্রিল, রাজধানী ঢাকার বঙ্গবাজার এলাকা— এই দিনে ঢাকার ব্যস্ততম এই কাপড়ের বাজারে ঘটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ছাই হয়ে যায় অসংখ্য দোকান। আগুন নেভাতে কাজ করা ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা সে সময় অভিযোগ করেন, আগুন নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল পানির অভাব।
বঙ্গবাজার দুর্ঘটনার প্রায় ১০ দিন পর, রাজধানীর আরেকটি জনাকীর্ন বাজারে আগুন লেগে যায়। এখানেও উদ্ধারকারী ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা একই অভিযোগ করেন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন মঙ্গাবে-কে জানান, ঢাকায় যেকোনো অগ্নিদুর্ঘটনা সামলাতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়, পানির সহজলভ্যতা। যদি সময়মতো পর্যাপ্ত পানি পাওয়া না যায়, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, “রাজধানীতে রাস্তায় কোথাও অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র নেই। আগুন নেভাতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পানির কিন্তু প্রায় প্রতিটি ঘটনায় আমরা এই সমস্যার মুখোমুখি হই। আমাদের সাথে থাকা পানি দিয়ে আগুন নেভানো সম্ভব হয় না। তাই যেকোনো মূল্যে শহরের হ্রদ, পুকুর, খালসহ জলাশয়গুলো সংরক্ষণ করতে হবে। তা নাহলে সামনের দিনগুলোতে আগুন লাগার ঘটনা বাড়তে থাকলে, আমাদের কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠবে।”
এদিকে, ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে দেশে ১২ হাজার ১৮২টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল। ২০২২ সালে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৪ হাজার ১০২-এ। অর্থাৎ গত এক দশকে অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
শুধু উল্লিখিত দুটি ঘটনাই নয়, গত কয়েক বছরে ঢাকার জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরে অগ্নিকাণ্ড এখন প্রায় নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দমকল বাহিনীর সদস্য ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পানিই মূল উপাদান। পানির অভাবের কারণে আগুন প্রায়শই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

ঢাকার স্থায়ী সমস্যা জলাবদ্ধতা
অগ্নিনির্বাপণে পানির সংকটের পাশাপাশি, জলাবদ্ধতাও ঢাকার মানুষের নিত্যদিনের দুর্ভোগ। এক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতেই শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা প্রায় অচল হয়ে পড়ে। ফলে রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ঐতিহাসিকভাবে ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা প্রাকৃতিক জলাশয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল। শহরের অতিরিক্ত পানি বাইরে সরিয়ে দিত খাল, নদী ও হ্রদ । এগুলো প্রাকৃতিক প্লাবনভূমি হিসেবে কাজ করতো ও বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ধরে রাখতো। এতে বন্যা নিয়ন্ত্রণে থাকতো এবং পানি সহজেই মাটিতে মিশে যেতো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার চারপাশের হ্রদ, পুকুর, খাল ও নদী সংরক্ষণ করাই জলাবদ্ধতা দূর করার একমাত্র সমাধান।
বিশ্বব্যাংকের ২০১৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তন না হলেও ২০১৪ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে ঢাকার জলাবদ্ধতায় সম্ভাব্য ক্ষতি হবে প্রায় ১১০ বিলিয়ন টাকা (১ বিলিয়ন ডলার)। আর যদি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তীব্র বর্ষণ হয়, তাহলে একই সময়ে ক্ষতি বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ১ দশমিক ৩৯ ট্রিলিয়ন টাকা (১৩ বিলিয়ন ডলার)।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার জনসংখ্যা বিবেচনায় শহরের ১২-১৫ শতাংশ জলাশয় থাকা উচিত। কিন্তু বর্তমানে ঢাকার মধ্যাঞ্চলে জলাশয় রয়েছে মাত্র ৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ প্ল্যানার্স (বিআইপি) এর ২০১৯ সালের এক গবেষণা অনুসারে, ২০১০ সালে ঢাকার বিশদ এলাকা পরিকল্পনা প্রকাশের পর থেকে গত ৯ বছরে , রাজধানীর ৩৬ শতাংশ জলাশয় মাটি ভরাটের কারণে হারিয়ে গেছে।


বিআইপির সাবেক সাধারন সম্পাদক আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, শুধু ব্যক্তি বা ব্যবসায়ীরাই নয়, সরকারি সংস্থাগুলোও ঢাকার জলাশয় ভরাট করছে।
সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার গাবতলী এলাকায়, ৫৩ একর জলাধারের মধ্যে ১১ একর ভরাট করেছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)। সেখানে একটি টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরির জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে চারতলা ভবন।
আদিল বলেন, “এ সমস্যা বহুমুখী। জলাশয় ভরাট কেবল অগ্নিনির্বাপনে সমস্যা বা জলাবদ্ধতা তৈরি করছে তা নয়, রাজধানীর জীববৈচিত্র্যও ধ্বংস করছে। এতে করে শহরের প্রতিবেশ প্রায় ভেঙে পড়েছে।”
তিনি জানান, ঢাকায় তাপমাত্রা বাড়ছে। আর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো, পানির প্রাচুর্য নিশ্চিত করা।
২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় জলসম্পদ প্রকৌশল সম্মেলনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮৮ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ঢাকার প্রায় অর্ধেক জলাভূমি ভরাট হয়ে গেছে।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, ১৯৮৮ সালে ঢাকার ৪৩ দশমিক ০৮ শতাংশ এলাকা ছিল জলাভূমি। ২০০২ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২৬ দশমিক ৯৭ শতাংশে। আর ২০১৬ সালে তা আরও কমে ১২ দশমিক ১৩ শতাংশে নেমে আসে। অর্থাৎ এই ২৮ বছরে জলাভূমি কমেছে প্রায় ৭১ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
গবেষণায় আরও বলা হয়, জলাভূমি কমে যাওয়ার কারণে ঢাকার ভেতরেই এলাকাভেদে তাপমাত্রার তারতম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই heat island তৈরি হচ্ছে এবং উদ্ভিদ ও প্রাণীর বৈচিত্র্য রক্ষায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

বহুমুখী সমস্যা
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের যুগ্ম সম্পাদক ইকবাল হাবিব জানান, যেকোনো শহরে জলাশয় থাকার চারটি বড় সুবিধা থাকে। জলাশয় জলাধার হিসেবে কাজ করে, জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পূরণ করে।
তিনি আরও বলেন, “এটি জনস্বাস্থ্যকে বড় রকমের ঝুঁকির মুখে ফেলে। জলাশয় ভরাটের কারণে মশাবাহিত রোগসহ জলবাহিত ও বায়ুবাহিত রোগের প্রকোপ বেড়ে যাচ্ছে।”
হাবিব বলেন, “একসময় জলপথের বহুল ব্যবহারের কারণে ঢাকা ‘বাংলাদেশের ভেনিস’ নামে পরিচিত ছিল। সময়ের পরিক্রমায় এসব জলপথ হারিয়ে গেছে।”
তিনি অভিযোগ করেন, এ সংক্রান্ত পর্যাপ্ত আইন থাকলেও এর সঠিক বাস্তবায়ন নেই বা খুবই কম ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ করা হয়।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বিশদ এলাকা পরিকল্পনা-২০২২ অনুযায়ী, তাদের আওতাধীন ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকায় মোট ৩ হাজার ৪৬৪টি পুকুর শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২০৫টি পুকুর ঢাকার ভেতরে রয়েছে।
রাজউক চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান মিয়া বলেন, ২০০০ সালের প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইনে স্পষ্ট বলা আছে—ব্যক্তিগত মালিকানাধীন পুকুরও ভরাট করা যাবে না। এ কারণে রাজউক জলাশয় রক্ষায় উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি জানান, বিভিন্ন সংস্থাকে তাদের পুকুর ও জলাশয় রক্ষা করতে অনুরোধ জানানো হবে।
আনিসুর আরও বলেন, “রাজউক এরইমধ্যে কয়েকটি নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এতে হ্রদ ও জলাশয় সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।”
ব্যানার ছবি: ২০২১ সালে মাঝারি বৃষ্টিপাতে পানিতে তলিয়ে যায় ঢাকার প্রধান সড়ক। এ সময় ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। ছবি: প্রবীর দাস।
সাইটেশন:
- Climate and disaster resilience of greater Dhaka area: A micro level analysis. (2015). Retrieved from The World Bank website: https://documents1.worldbank.org/curated/en/481741467990959868/pdf/101066-NWP-PUBLIC-disclose-on-11-23-15-Box393257B.pdf
- Ferdous, J & Rahman. T. U. (2018). Estimation of the changes in wetlands of Dhaka city from Landsat images. Proceedings of the 1st National Conference on Water Resources Engineering (NCWRE). CUET, Chittagong, Bangladesh. Retrieved from https://www.researchgate.net/publication/330506127_ESTIMATION_OF_THE_CHANGES_IN_WETLANDS_OF_DHAKA_CITY_FROM_LANDSAT_IMAGES
- Dewan. A., Kiselev. G., Botje, D., Mahmud, G.I., Bhuian. M. H., and Hasan, Q. K. (2021). Surface urban heat island intensity in five major cities of Bangladesh: Patterns, drivers and trends. Sustainable Cities and Society. V.71. Elsevier. doi:10.1016/j.scs.2021.102926
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে, মঙ্গাবে গ্লোবাল এ, ২০২৩ সালের ১০ মে।