- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, বিশ্বের ৮৮ শতাংশ দেশে ভেষজ ওষুধের ব্যবহার রয়েছে। এছাড়া, ৪০ শতাংশেরও বেশি আধুনিক ওষুধ এসেছে প্রাকৃতিক উৎস থেকে।
- বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মতে, বাংলাদেশে ৭২২ প্রজাতির ঔষধি গাছ রয়েছে ।
- বাংলাদেশের নাটোর জেলার খোলাবাড়িয়া ইউনিয়নের স্থানীয়রা যেখানে আগে ভেষজ গাছ কেটে ফেলত, তাদেরই পরবর্তী প্রজন্ম আজ সেটি রোপণ ও চাষ করছে। বড় বড় ওষুধ কোম্পানি এবং আয়ুর্বেদিক ও ইউনানি ঔষধ প্রস্তুতকারকরা, এ গ্রাম থেকেই কাঁচামাল সংগ্রহ করছে ।
নব্বই এর দশকে যখন ইন্টারনেট, স্মার্টফোন কিংবা স্যাটেলাইট টেলিভিশনের বাড়-বাড়ন্ত ছিল না, তখন বাংলাদেশের মানুষের দৃশ্যমান বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম ছিল সরকার পরিচালিত বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)।
তখনকার দিনে বিটিভিতে সরকারিভাবে প্রচারিত হতো গাছ না কাটা, ডায়রিয়ার চিকিৎসায় ওরস্যালাইন খাওয়ানো বা ইলিশের জাটকা সংরক্ষণ করার মতো নানান সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন। এগুলোর কোনো কোনোটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে নব্বই এর দশকে বেড়ে ওঠা মানুষের স্মৃতিতে তা এখনো প্রখর।
বিটিভিতে প্রচারিত সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপনগুলোর একটি ছিল, ওষুধের উৎস হিসেবে গাছের গুরুত্ব নিয়ে নির্মিত। এতে কিংবদন্তি অভিনেতা আবুল খায়ের (৪ এপ্রিল ১৯২৯ – ২ ফেব্রুয়ারি ২০০১) অভিনয় করেছিলেন একজন কবিরাজের চরিত্রে।
কবিরাজ বলতে মূলত গ্রামাঞ্চলের ভেষজ চিকিৎসকদের বোঝানো হয়। গাছপালা, শরীরের গঠন আর রোগ সম্পর্কে প্রাচীন জ্ঞান ব্যবহার করে ওষুধ তৈরি করেন তারা। আবুল খায়ের অভিনীত সেই প্রচারণায় কবিরাজ চরিত্রকে দুঃখ করে বলতে শোনা যায়, যেসব গাছ দিয়ে তিনি ওষুধ বানাতেন, সেগুলো নির্বিচারে কেটে ফেলার কারণে আর নেই।
আশ্চর্য হওয়ার মতো ঘটনা হলো চিকিৎসা, প্রযুক্তি ও অর্থনীতির অভাবনীয় উন্নতির যুগেও গ্রাম বাংলায় আজও টিকে আছেন কবিরাজরা। দেশের চিকিৎসা শিল্পের বড় বড় দিকপালের আগ্রহের কারণে নতুন করে আবারও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ভেষজ গাছের সংস্কৃতি।

একসময় অবহেলিত এসব গাছ এখন আবার ফিরে আসছে। মধ্যে ব্যবধান কেবল দুই বা তিন প্রজন্মের। স্থানীয়রা যেখানে আগে ভেষজ গাছ কেটে ফেলত, তাদেরই পরবর্তী প্রজন্ম আজ ভেষজ গাছ রোপণ ও চাষ করছে। তাদের জন্য এটি নতুন আয়ের উৎস, আর গাছের জন্য টিকে থাকার নতুন সুযোগ।
উদাহরণ হিসেবে এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়, উত্তরাঞ্চলের নাটোর জেলার খোলাবাড়িয়া ইউনিয়নের কথা। এখানকার বহু মানুষ বর্তমানে জীবিকা নির্বাহের জন্য বাণিজ্যিকভাবে ভেষজ গাছ চাষ করছেন।
এর কৃতিত্ব স্থানীয় কবিরাজ আফাজ উদ্দিন পাগলার। তিনি যেন নব্বই এর দশকের সেই টিভি বিজ্ঞাপনে আবুল খায়ের অভিনীত কবিরাজ চরিত্রের বাস্তব রূপ। খোলাবাড়িয়া ইউনিয়নে ১৫টি গ্রাম রয়েছে। এখানে বহু বছর ধরে ভেষজ গাছ চাষ করছেন কৃষকেরা। একারণেই এলাকাটি পরিচিত পেয়েছে ‘ভেষজ গ্রাম’ নামে।
ভেষজ গাছ রোপণে খোলাবাড়িয়া ইউনিয়নের যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৫ সালে। আফাজ উদ্দিন পাগলা তখন নিজের গ্রামে ভেষজ চিকিৎসা শুরু করেন। জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকায় তার বাড়ির সামনে রোগীদের লাইন স্বাভাবিকভাবেই দীর্ঘ হতে থাকে। তখন তাকে দূর-দুরান্ত থেকে ভেষজ গাছ সংগ্রহ করতে হতো।
একটা সময় পরে তাই তিনি নিজের জমিতেই নানান ভেষজ গাছের চাষ করতে থাকেন। ধীরে ধীরে বাড়তি চারা তৈরি হলে তিনি সেগুলো আশপাশের ভেষজ চিকিৎসকদের কাছে বিক্রি শুরু করেন।
গ্রামের কৃষক হাসান আলী ভূঁইয়া মঙ্গাবে-কে বলেন, “এটি ছিল যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ভেষজ গাছের চাষ সহজ, আর সবজির তুলনায় অনেক বেশি লাভজনক।”
এ কৃষকের কাছ থেকে আরও জানা যায়, শুরুতে মানুষ খুব একটা গুরুত্ব না দিলেও ধীরে ধীরে এই চর্চা পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে। এখন পুরো ইউনিয়নেই ভেষজ গাছের চাষ হয়।

এলাকার বিভিন্ন স্থানের তালিকা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এখন রাস্তার ধারে, বাড়ির উঠোনে এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে পুকুরের ধারেও সব ধরনের ঔষধি গাছ দেখা যায়।”
নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) জানায়, প্রায় ১৪০ হেক্টর (৩৪৬ একর) জমিতে ১৪০ প্রজাতির ভেষজ গাছ চাষ হচ্ছে এলাকাটিতে। ডিএই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুধু কৃষকরাই নয়, অন্যান্য পেশার মানুষের মধ্যেও ভেষজ গাছ চাষে আগ্রহ বাড়ছে।
নাটোরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, “প্রতি ইঞ্চি অব্যবহৃত জমিকে কোনও না কোনও ধরনের চাষের আওতায় আনার সরকারি নির্দেশনার পর, এখানকার লোকেরা তাদের বাড়ির উঠোনে এবং অব্যবহৃত জমিতে ঔষধি গাছ চাষ করছে। বিষয়টি বেশ চমকপ্রদ। পাশপাশি, মানুষ এখন ঔষধি গাছের বাণিজ্যিক মূল্যের ব্যাপারেও বেশ সচেতন।”
তিনি জানান, গত দুই দশক ধরে গ্রামগুলোতে ১ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি কৃষক ঔষধি গাছের চাষ করছেন। জনপ্রিয় জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে অ্যালোভেরা, শিমুল (red silk-cotton), অশ্বগন্ধা (Indian ginseng), কালমেঘ (Andrographis paniculate), তুলসী (holy basil), শতমূল (asparagus) এবং বাসক (Malabar nut)।
নাটোরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রত্যাশা, চলতি অর্থবছরে প্রতি হেক্টরে ১০৩ দশমিক ৭৫ কিলোগ্রাম (২২৯ পাউন্ড) হারে ভেষজ গাছের চাষ হবে। এতে করে মোট উৎপাদন দাঁড়াবে প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ টনে।
স্থানীয় কৃষকেরা শুধু চাষই করছেন না, বরং নার্সারিও গড়ে তুলেছেন। এসব নার্সারি থেকে বাণিজ্যিকভাবে চারা বিক্রি হচ্ছে।
২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হালিমা ভেষজ নার্সারি প্রায় ৬০০ প্রজাতির ভেষজ গাছের চারা উৎপাদন করে। প্রতিদিন দেশের নানান জায়গা থেকে এখানে মানুষ চারা কিনতে আসে।
আবদুল ওয়াদুদ বলেন, প্রথাগত বা বিকল্প চিকিৎসা সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ ক্রমবর্ধমান। সেই কারণেই এখন শহরাঞ্চলেও মানুষ বাড়ির টবে ঔষধি গাছ লাগাচ্ছেন।কারণ, যদি কারও কাশি হয়, তাহলে তারা তুলসী পাতা দিয়ে চিকিৎসা করতে চাইতে পারেন। যদি কোষ্ঠকাঠিন্য হয়, তাহলে তারা ত্রিফলা খেয়ে নিরাময়ের আশা করতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, একটি নার্সারি করতে বড় জমি লাগে না, তবে দরকার যত্ন, নিষ্ঠা আর পরিশ্রম। গাছের নাম, বৈশিষ্ট্য আর কোন অংশ কাজে লাগে তা জানলে গাছগুলো মূল্যবান হয়ে ওঠে। এক একর জমির নার্সারি থেকেও মাসে প্রায় ৮০ হাজার টাকা (প্রায় ৭৩৭ ডলার) আয় হয়।


ভেষজ গাছের চাষ আর নার্সারি গড়ে ওঠার কারণে খোলাবাড়িয়া বাজার এখন দেশের বড় ভেষজ কাঁচামালের কেন্দ্র। প্রতি বছর এখানকার ১৫টি গ্রাম থেকে ২৫-৩০ কোটি টাকার (প্রায় ২ হাজার ৩০০–২ হাজার ৮০০ ডলার মূল্যের) ভেষজ গাছ বিক্রি হয়।
আমিরগঞ্জ এবং লক্ষ্মীপুর বাজারে প্রায় ১৭টি দোকানে ঔষধি গাছ বিক্রি হয়। দোকানগুলো থেকে ঔষধি গাছ কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। তবে দেশে কাঁচা অ্যালোভেরার চাহিদা এত বেশি যে এগুলো সরবরাহ করতে হয় ট্রাক বোঝাই করে।
স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, একমি , তাইওয়ান ফুড প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এবং হামদর্দের মতো বড় বড় ওষুধ কোম্পানি এবং আয়ুর্বেদিক ও ইউনানি ঔষধ প্রস্তুতকারকরা এই বাজার থেকে তাদের কাঁচামাল সংগ্রহ করে। স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস বেশিরভাগ সময়েই অশ্বগন্ধা কিনে থাকে। আর তাইওয়ান ফুড বেশিরভাগ সময় কেনে অ্যালোভেরা।
Kholabaria Medicinal Village Development Cooperative Society Ltd এর সভাপতি দেলোয়ার হোসেন জানান, ছোট ব্যবসায়ীরাও এই বাজার থেকে ঔষধি গাছ কিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করেন।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ঋগ্বেদে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দে ঔষধি গাছের ব্যবহারে কথা উল্লেখ করেছে ইন্দো-আর্যরা। এতে বলা হয়েছে, ভারতীয় উপমহাদেশের একটি দেশ হিসেবে বাংলাদেশও উদ্ভিদের বিশাল বৈচিত্র্য ধারণ করে।
গবেষণা অনুসারে, “ভারতীয় উপমহাদেশে প্রায় ২ হাজার ঔষধি গাছ রয়েছে। এর মধ্যে তালিকাভুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের ৪৪৯টি গাছ। ব্যবহৃত উদ্ভিদের সঠিক সংখ্যা অজানা হলেও কিছু সাধারণ ঔষধি গাছ রয়েছে, যা কবিরাজরা দীর্ঘদিন ধরে ভেষজ ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন।”

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মতে, বাংলাদেশে ৭২২ প্রজাতির ঔষধি গাছ রয়েছে । এর মধ্যে ২৫৫টি আয়ুর্বেদিক ও ইউনানিতে ব্যবহৃত হয়। আর ভারতে রয়েছে ৪ হাজার প্রজাতির ঔষধি গাছ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানায়, বিশ্বের ৮৮ শতাংশ দেশে ভেষজ ওষুধের ব্যবহার রয়েছে। বহু শতাব্দী ধরে এটি মানুষের স্বাস্থ্যসেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজও যেখানে আধুনিক চিকিৎসা পৌঁছায়নি, সেখানে এটি ভরসার প্রধান মাধ্যম। এছাড়া, ভেষজ উপাদান এখন বিশ্বজুড়ে ট্রিলিয়ন ডলারের স্বাস্থ্য, সৌন্দর্য ও ঔষধশিল্পের অংশ। ৪০ শতাংশেরও বেশি আধুনিক ওষুধ এসেছে প্রাকৃতিক উৎস থেকে। অ্যাসপিরিন ও আর্টেমিসিনিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ ভেষজ উপাদান থেকেই তৈরি হয়েছে।
ব্যানার ছবি: শিমুল তুলার বাগান। ছবি: বুলবুল আহমেদ।
সাইটেশন
Bardhan, S., Ashrafi, S., & Saha, T. (2018). Commonly Used Medicinal Plants in Bangladesh to treat Different Infections. Journal of Immunology and Microbiology. Retrieved from https://www.imedpub.com/articles/commonly-used-medicinal-plants-in-bangladesh-to-treat-different-infections.php?aid=22458
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে, মঙ্গাবে গ্লোবাল এ, ২০২৩ সালের ২১ জুলাই।