- পরিবেশগত অবক্ষয় কমাতে, পোশাক খাতে নতুন তুলার ব্যবহার কমানোর ইউরোপীয় ইউনিয়নের লক্ষ্যের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। এর অংশ হিসেবে, তৈরি পোশাক খাতে রিসাইকেল উপকরণের ব্যবহার বৃদ্ধি করছে দেশটি।
- ২০১৯-২০ অর্থবছরে রপ্তানি আয়ের প্রধান অংশ এই খাত থেকেই এসেছিল। এর মূল্য ছিল, ২৭ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
- বাংলাদেশ বর্তমানে আমদানি করা টেক্সটাইল ফাইবারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ২০১৯ সালে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প (আরএমজি) বর্জ্যের প্রায় অর্ধেক ছিল কাঁচা তুলা।
- তবে পুনর্ব্যবহৃত তুলার চাহিদা ধীরে ধীরে বাড়ছে। এই বাড়তি চাহিদা মেটাতে, বেশ কিছু দেশীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্ব্যবহারযোগ্য বা রিসাইকেল প্ল্যান্ট পরিচালনা করছে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক (RMG) রপ্তানীকারক দেশ বাংলাদেশ। তৈরি পোশাকশিল্পে দেশটির উচ্চমানের উৎপাদন ক্ষমতা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। এ খাত সম্প্রসারণের উল্লেখযোগ্য সক্ষমতাও রয়েছে দেশটির। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮৩ শতাংশেরও বেশি আসে, তৈরি পোশাক খাত থেকে। ২০১৯ সালে শুধু পোশাক রপ্তানি থেকে বাংলাদেশের আয় হয়েছে ৩৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। বিশ্ব বাজারে সামগ্রিক পোশাক রপ্তানির ৬ শতাংশই বাংলাদেশের দখলে।
তবে বাংলাদেশের শক্তিশালী এ শিল্প কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে তুলা আমদানির হার অনেক বেশি। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ ১৭ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন টন কাঁচা তুলা আমদানি করেছে। একই সময়ে আমদানি করা হয়, ৯৬ হাজার ৭৭ টন পলিয়েস্টার ফাইবার এবং ৫৩ হাজার ২৮৯ টন ভিসকস ফাইবার ।
European Union’s target to implement Sustainable Development Goal 12 এর মূল বিষয় হলো, পোশাকের দায়িত্বশীল ব্যবহার ও উৎপাদন। এ লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে Bangladesh Garments Manufacturers and Exporters Association দেশের সবচেয়ে বড় ক্রেতা এইচএন্ডএম–এর সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে। এ চুক্তির লক্ষ্য, রিসাইকেল উপকরণ ব্যবহার করে ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ ৩০ শতাংশ কমিয়ে আনা।
বেক্সিমকো টেক্সটাইল ও পোশাক বিভাগের গ্রুপ ডিরেক্টর এবং সিইও সৈয়দ নাভেদ হোসেনের মতে, বাজার ধরে রাখতে এবং ক্রেতাদের সন্তুষ্ট করতে বাংলাদেশের এই লক্ষ্য অর্জন করা জরুরি।

তিনি মনে করেন, এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব। কারণ গত কয়েক দশকে টেকসই উৎপাদনে, বিশেষ করে পানি ও জ্বালানির ক্ষেত্রে প্রচুর কাজ হয়েছে। সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, দাতা সংস্থা এবং ব্যবসায়ীরা সবাই একসঙ্গে কাজ করছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার কারণে এই অগ্রগতি হয়েছে।
একটি উদাহরণ দিয়ে নাভেদ বলেন, ২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের শীর্ষ ১০টি সবুজ কারখানার মধ্যে ৬টি রয়েছে বাংলাদেশে । এছাড়া এখানে ৫০০টির মতো ভবন রয়েছে, যেগুলো U.S. Green Building Council Certification অনুসরণ করছে এবং ১২৫টি কারখানা LEED প্রত্যায়ন পত্র পেয়েছে।
বাংলাদেশে প্রায় ৪২ লাখ মানুষ তৈরি পোশাক শিল্পে এবং প্রায় ৫০ লাখ মানুষ টেক্সটাইল শিল্পে কাজ করে। পোশাক খাতকে সহায়তা করে বিধায় টেক্সটাইলকে ব্যাকওয়ার্ড-লিঙ্কিং শিল্প বলা হয়।
এ খাতে লাভের পরিমাণ অনেকটাই নির্ভর করে, উৎপাদনে কতো কম উপাদান নষ্ট হয় তার ওপর। কারণ খরচের বড় অংশই চলে যায় উপকরণ কেনায়। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদন চলাকালে যে বর্জ্য তৈরি হয়, তার পরিমাণ সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না।
Center for Policy Dialogue এর তথ্য মতে, দেশের প্রায় ৪ হাজার ৫০০ সক্রিয় পোশাক কারখানা তাদের দক্ষতা বাড়ালে এবং টেক্সটাইলের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করলে পোশাক তৈরি, সেলাই ও রঙ করার সময় বর্জ্যের পরিমাণ কমানো সম্ভব।


বাংলাদেশে রিসাইকেল
বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পে, পোশাক তৈরির সময় অবশিষ্ট থাকা তুলা রিসাইকেলের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এরইমধ্যে বেক্সিমকো লিমিটেড, সাইক্লো রিসাইকেলড ফাইবার এবং রিসাইকেল-আর এর মতো অনেক প্রতিষ্ঠান এ সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে।
BEXIMCO Ltd এর Chief Sustainability Officer মহিদুস সামাদ খান বলেন, “আমরা কারখানার কাপড়ের অবশিষ্টাংশ ব্যবহার করে রিসাইকেল সুতা উৎপাদনে কাজ করছি। বাংলাদেশে বৃত্তাকার অর্থনীতি গড়ে তুলতে আমরা ভূমিকা রাখছি এবং এটিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিচ্ছি।”
তিনি আরও বলেন, “যদিও কাপড় রিসাইকেল করা এবং এর ব্যবহার স্থানীয়ভাবে এখনও কম, এটি ধীরে ধীরে বাড়ছে। এখান থেকেই প্রমাণ হয় যে, বাংলাদেশ ইইউ–এর লক্ষ্য পূরণের পথে এগোচ্ছে।”
তবে এর জন্য ভোক্তা এবং অন্যান্য অংশীদারদের একসঙ্গে কাজ করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি। কারণ রিসাইকেল পণ্যের দাম সাধারন পণ্যের তুলনায় কিছুটা বেশি।
স্থানীয় বাজারে সস্তা পোশাক তৈরিতেও কিছু পরিমাণ ঝুট (বর্জ্য কাপড়) ব্যবহার হয়। এছাড়া এগুলো গদি, গাড়ির সিট ও আসবাবপত্রে ভরাট করার উপাদান হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। তবে এর ব্যবহার খুব সীমিত।

পরিবেশ রক্ষায় রিসাইকেল পণ্যের ভূমিকা
Friends of the Earth Europe এর তথ্য অনুযায়ী, ইইউ ভোক্তারা প্রতি বছর ৫ দশমিক ৮ মিলিয়ন টন টেক্সটাইল বর্জ্য ফেলে দেন। এর মাত্র এক-চতুর্থাংশ রিসাইকেল করা হয়। অবশিষ্ট ৪ দশমিক ৩ মিলিয়ন টন বর্জ্য পরিবেশ দূষণ করে।
এদিকে ১ কেজি তুলা উৎপাদনে প্রায় ১০ হাজার লিটার পানির প্রয়োজন হয়। প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী প্রায় ২৫০ বিলিয়ন টন তুলা উৎপাদিত হয়। এছাড়া, তুলা চাষের কারণে প্রতি বছর প্রায় ৪৩ মিলিয়ন টন কীটনাশক মিশ্রিত ধুলো বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে।
এ বিষয়ে CYCLO Recycled Fibers এর প্রতিষ্ঠাতা মুস্তাফাইন মুনির বলেন, “জমি ও পরিবেশ রক্ষা করা টেকসই উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে জরুরি। যারা রিসাইকেল সুতা দিয়ে তৈরিকৃত পোশাক পরেন ও কেনেন—ভোক্তা, খুচরা বিক্রেতা এবং উৎপাদক, তাদের সবারই এ দায়িত্ব নিতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “রিসাইকেল উপকরণে তৈরি পণ্য, পোশাক উৎপাদনের কারণে সৃষ্ট দূষণ কমায়। কারণ এতে পানি, রাসায়নিক ও রঙের ব্যবহার কম হয়।”
ব্যানার ছবি: বাংলাদেশে প্রায় ৪২ লাখ মানুষ তৈরি পোশাক শিল্পে কাজ করে। ছবি: মুহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান।
সাইটেশন
Akter, M. M. K., Haq, U. N., Islam, M. M. & Uddin, M. A. (2022). Textile-apparel manufacturing and material waste management in the circular economy: A conceptual model to achieve sustainable development goal (SDG) 12 for Bangladesh. Cleaner Environmental Systems Volume 4, March 2022, 100070. https://doi.org/10.1016/j.cesys.2022.100070
Alam, M. N. (2023). Recycling of pre consumers garment Waste: importance, opportunities, and Challenges for Bangladesh. Textile Focus. Retrieved from https://textilefocus.com/recycling-of-pre-consumers-garment-waste-importance-opportunities-and-challenges-for-bangladesh-2/
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে, মঙ্গাবে গ্লোবাল এ, ২০২৩ সালের ২৮ জুলাই।