- ক্রমবর্ধমান রপ্তানি চাহিদা মেটাতে কাঁকড়ার চাষ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে বাংলাদেশে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, যে হারে মা কাঁকড়ার মজুদ কমছে, তাতে রপ্তানির এ ধারা টেকসই না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
- গবেষকদের মতে, বিপুল সংখ্যক কাঁকড়ার নিয়ন্ত্রণহীন আহরণ, সুন্দরবনের প্রতিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে।
- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং সিঙ্গাপুরের মতো বাজারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রায় ৩৫ মিলিয়ন ডলারের কাঁকড়া রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ।
- সুন্দরবনের কাঁকড়ার ওপর চাপ কমাতে, ফার্মে কাঁকড়া উৎপাদনের প্রচেষ্টা আরও বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে বিকল্প এই ব্যবস্থা বাণিজ্যিকভাবে এখনও কার্যকর হয়নি।
আব্দুস সবুর একজন ক্ষুদ্র জেলে। তার কাছে সাফল্যের পথ একটাই— সবধরনের কাঁকড়া ধরা এবং স্থানীয় মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে সেগুলো বিক্রি করা।
সবুরের মাছ ধরার এলাকা সুন্দরবন। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এ ম্যানগ্রোভ বনে সারা বছরই কাঁকড়া ধরেন তিনি। প্রতিদিন প্রায় ৪০-৫০ কিলোগ্রাম কাঁকড়া ধরেন আব্দুস সবুর।
তার ধরা কাঁকড়াগুলোর ক্রেতাদের একজন কৃষ্ণপদ সাহা। সাহার মতো মধ্যস্বত্বভোগীরা, প্রতিদিন প্রায় ৩ থেকে ৪ মেট্রিক টন কাঁকড়া ঢাকার রপ্তানিকারকদের কাছে পাঠান। এ কাঁকড়ার বেশিরভাগই তারা কিনে নেন, সুন্দরবনের জেলেদের কাছ থেকে। রপ্তানিকৃত কাঁকড়ার মাত্র ৫ শতাংশ আসে পুকুর বা ঘেরের কাঁকড়া চাষীদের কাছ থেকে।
সুন্দরবন ও চাষের কাঁকড়া আহরণের বিশাল এ পার্থক্য, চিন্তিত করে তুলেছে বিশেষজ্ঞে ও সংরক্ষণবীদদের। তারা বলছেন, সুন্দরবনের বন্য কাঁকড়ার ভাণ্ডার দ্রুত ফুরিয়ে আসছে বাংলাদেশে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, “কাঁকড়া আহরণের হার বর্তমান হারে অব্যাহত থাকলে এটি বিপন্ন হয়ে পড়বে। তাই বন্য কাঁকড়া ধরার পরিবর্তে তাদের জন্য কৃত্রিম প্রজনন কৌশল চালু করা উচিত। তা নাহলে, কাঁকড়ার প্রাকৃতিক মজুদ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়বে।”

২০২০ সালের এক গবেষণাতেও এই সংকটের কথা উল্লিখিত হয়। সেখানে দেখা যায়, সুন্দরবন থেকে অত্যাধিক হারে ধরা হচ্ছে কাঁকড়া (Scylla spp.)। এর ফলে কাঁকড়ার পরিমান যেমন কমছে, তেমনি তাদের প্রজাতিগুলোর জিনগত বৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়, বন্য কাঁকড়ার সংখ্যা কমতে থাকলে গোটা প্রতিবেশেরই ভারসাম্য নষ্ট হবে। এর ফলে পানির মান খারাপ হওয়া, মাটির ক্ষতি, ম্যানগ্রোভ প্রজাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং জীববৈচিত্র্য কমে যাওয়ার মতো সংকটময় পরিস্থিতির আবির্ভাব ঘটবে।
এই সংকট আমলে নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বিস্তৃত ম্যানগ্রোভ বন রক্ষায় বাংলাদেশ সরকার, প্রতিবছর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে কাঁকড়া ধরা নিষিদ্ধ করেছে। কারণ, এ সময়েই কাঁকড়া ডিম দেয় ও বংশবিস্তার করে। আবার জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত, তিন মাস পুরো সুন্দরবনেই সব ধরনের সম্পদ আহরণ বন্ধ রাখা হয়। তবে এই নিয়ম বাস্তবে খুব একটা মানা হয় না। সবুরের মতো জেলেরা সারা বছরই কাঁকড়া ধরেন।
বাংলাদেশ বন বিভাগের বিভাগীয় বন সংরক্ষক মিহির কুমার বলেন, “আমরা সবসময় সতর্ক থাকি। যদি কোনো জেলে বা মৌয়াল (যারা বনে মধু সংগ্রহ করেন) নিয়ম ভেঙে কাঁকড়া ধরেন, আমরা তাদের গ্রেপ্তার করি। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করি ও শাস্তি দেই। অবৈধ কার্যক্রম বন্ধে আমরা এলাকায় নিয়মিত অভিযান চালাই।”
তবে কুমার এও বলেন যে অবৈধভাবে কাঁকড়া সংগ্রহ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা বেশ কঠিন কাজ।

কাঁকড়া ব্যবসা স্থানীয়ভাবে এবং জাতীয় অর্থনীতির জন্য খুব লাভজনক। বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, শুধু ২০১৯–২০২০ অর্থবছরেই প্রায় ৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাঁকড়া রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। এই রপ্তানির মধ্যে শক্ত ও নরম, দুই ধরনের খোলসের কাঁকড়াই রয়েছে।
শক্ত খোলসের কাঁকড়া মূলত জীবিত অবস্থায় রপ্তানি করা হয়। এর প্রধান বাজার চীন। অন্যদিকে, নরম খোলসের কাঁকড়ার প্রধান বাজার হলো যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সিঙ্গাপুর। এদের মধ্যে নরম খোলসের কাঁকড়ার রপ্তানি দিন দিন বাড়ছে।
বন্য প্রতিবেশের কাঁকড়া ধরা বাদ দিতে বিকল্প ব্যবস্থা হতে পারে, ফার্মে কাঁকড়া চাষ করা। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, যে সাতক্ষীরা জেলায় সবুরের মতো জেলেরা থাকেন, সেখানে প্রায় ৩ হাজার মানুষ কাঁকড়া চাষে জড়িত। জেলায় মোট ৩২১ হেক্টর (অর্থাৎ প্রায় ৭৯৩ একর) জমি জুড়ে কাঁকড়ার ঘের আছে। শুধু এই জেলা থেকেই প্রতিবছর প্রায় ২ হাজার মেট্রিক টন কাঁকড়া উৎপাদিত হয়।
মৎস খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি, সমস্যা সমাধানে কাঁকড়া চাষকে আরও গুরুত্ব দেয়া হলে রপ্তানি আয় আরও বাড়ানো সম্ভব।
সমস্যা হলো, কাঁকড়া চাষ করেও এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ নয়। কারণ বর্তমান পদ্ধতি অনুযায়ী, বনে গিয়ে অল্প বয়সী কাঁকড়া ধরে আনা হয়। তারপর সেগুলো ঘেরে এনে লালন-পালন করা হয় এবং মোটা-তাজা হলে বিক্রি করা হয়। অর্থাৎ ফার্মগুলোও প্রকৃতপক্ষে বনের কাঁকড়ার ওপরেই নির্ভরশীল।
বন্য কাঁকড়া প্রকৃতিতে টিকিয়ে রাখার টেকসই বিকল্প হতে পারে, ফার্মে ডিম থেকে কাঁকড়া ফোটানো। এটি করা গেলে বন্য কাঁকড়ার ওপর নির্ভরশীলতা অনেকটাই কমে আসবে। এ লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা কাজও করছে।
তবে সাতক্ষীরার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আনিছুর রহমান বলেন, “এসব প্রচেষ্টা থাকলেও এখনও কোনো উদ্যোগ বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর হয়নি। তাই আপাতত দেশের কাঁকড়া শিল্প পুরোপুরিই প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে টিকে আছে।”
ব্যানার ছবি: সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরছেন জেলেরা। ছবি: মহসিন উল হাকিম।
সাইটেশন
Rahman, M. M., Haque, S. M., Galib, S. M., Islam, M. A., Parvez, M. T., Hoque, M. N., … Brown, C. (2020). Mud crab fishery in climate vulnerable coastal Bangladesh: An analysis towards sustainable development. Aquaculture International, 28(3), 1243-1268. doi:10.1007/s10499-020-00523-2
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে, মঙ্গাবে গ্লোবাল এ, ২০২৩ সালের ১৬ আগস্ট।