- বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৪০০ টন সাগর শৈবাল উৎপাদন হয়। যার বাজার মূল্য ৫৫ মিলিয়ন টাকা (প্রায় ৫ লাখ মার্কিন ডলার)। এক গবেষণায় বলা হয়েছে ২০৫০ সালের মধ্যে বছরে অন্তত ৫ কোটি টন সাগর শৈবাল উৎপাদন করার সক্ষমতা আছে দেশটির।
- রপ্তানির মাধ্যমে আরো বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও, পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব এবং যথাযথ নীতি ও বিধিমালা না থাকায় এই খাত নানা সমস্যার মুখোমুখি।
- জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য মতে, এই শৈবালের চাষ বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে দ্রুত বাড়তে থাকা জলজ খাতগুলির একটি, যেখানে বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ৩৩ বিলিয়ন টন, যার বাজার মূল্য ১১.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
সি-উইড বা সাগর শৈবাল, যা নদী ও সাগরের তলদেশে জন্মানো এক ধরনের জলজ উদ্ভিদ। সাধারণত স্থানীয় আদিবাসীদের খাদ্যাভ্যাসে এটি সাংস্কৃতিকভাবেই যুক্ত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু শহুরে রেস্তোঁরাতেও সালাদ, রান্না করা সবজি, মাছের তরকারি এবং মাংসের পদে ব্যবহার হচ্ছে এই শৈবাল।
এছাড়াও, বিশ্বব্যাপী বহুল ব্যবহৃত এই জলজ সম্পদ পূর্ব এশিয়ার দেশ যেমন চীন, জাপান ও কোরিয়ায় খাদ্য-শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হয়।
দেশ-বিদেশে সাগর শৈবালের ক্রমাগত চাহিদা বিবেচনা করে, বাংলাদেশ সম্প্রতি তার সমুদ্র অর্থনীতি (ব্লু ইকোনোমি) সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে এই জলজ উদ্ভিদের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামুদ্রিক সম্পদ বিষয়ক ইউনিট এমএইউ এবং নেদারল্যান্ডসের একটি জরিপে বঙ্গোপসাগরে কয়েকশ প্রজাতির সাগর শৈবালের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
এই শৈবাল বায়োকেমিক্যাল, ফার্মাসিউটিক্যাল এবং প্রসাধনী শিল্পের কাঁচামাল তৈরিতে সাহায্য করে। তাই বাংলাদেশে এর একটি ভালো বাজারও আছে। আনুমানিকভাবে যার মূল্য প্রায় ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে সঠিক নীতি ও বিধিমালা না থাকায় দেশে সাগর শৈবাল চাষ ও ব্যবসা তেমন পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠেনি এখনো।

বাংলাদেশ ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী খায়রুল আলম বলেন, “বাংলাদেশে সাগর শৈবাল চাষ নতুন হলেও সময়োপযোগী, আর এর চাষ পদ্ধতি তুলনামূলকভাবে সহজ। আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো, বিশেষ করে সেইন্ট মার্টিন দ্বীপ এবং কক্সবাজার জেলার সমুদ্রতীরের মাটি ও পানি, সাগর শৈবাল চাষের জন্য খুবই উপযুক্ত।”
“উপকূলে বসবাসরত স্থানীয়রা সাগর শৈবাল চাষ করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে পারে। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ আছে এই খাতে। এছাড়া সাগর শৈবাল ওষুধ হিসেবেও ব্যবহার করা যায়, কারণ এটি অনেক রোগ নিরাময় করতে সক্ষম,” জানান খায়রুল।
সাগর শৈবাল হলো এক ধরনের আলোক-সংশ্লেষণকারী ফুলহীন উদ্ভিদ, যা সাধারণত নদী বা সমুদ্রের তলদেশে জন্মায় এবং এর কোনো মূল, কাণ্ড ও পাতা নেই। এটি সাধারণত উপকূলীয় এলাকায় পাথর, বালি, কাদা, শামুকের খোলস বা অন্য কোনো শক্ত কাঠামোর সঙ্গে লেগে থাকে।
তিন ধরনের শৈবালের মধ্যে, সবুজ শৈবাল সাধারণত খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়। লাল শৈবাল ব্যবহার হয় শিল্পে হাইড্রোকলয়েড উৎপাদনে, আর বাদামী শৈবাল খাদ্য ও হাইড্রোকলয়েড উৎপাদন উভয় ক্ষেত্রেই কাজে লাগে।
বাংলাদেশের সাগর শৈবাল নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে বেড়ে ওঠে। ম্যানগ্রোভ বনের শ্বাসমূলও সবুজ, লাল এবং বাদামী শৈবাল বেড়ে ওঠার জন্য উপযুক্ত জায়গা।
বাংলাদেশের বালু ও কাদাময় সৈকত, নদীর মোহনা এবং ম্যানগ্রোভ জলাভূমি যা বিভিন্ন ধরনের সাগর শৈবালের বৃদ্ধি ও আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশে সমুদ্র তটরেখা প্রায় ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ, এবং এর উপকূলীয় অঞ্চলের পরিধি ৪৭,২০১ বর্গকিলোমিটার।
দেশটির ১৯টি উপকূলীয় জেলায় প্রায় ৩ কোটি মানুষ বাস করে, যাদের অধিকাংশের জীবিকা সমুদ্র সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। উপকূলের বাসিন্দাদের সাগর শৈবাল উৎপাদনের কৌশল শেখানো হলে, তাদের জীবনমান পরিবর্তিত হতে পারে বলে মনে করেন খায়রুল আলম।


বাংলাদেশের সাগর শৈবালের বৈচিত্র্য ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা অনুসারে, সাগর শৈবাল চাষ বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল জলজ খাতগুলির একটি, যার বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ৩৩ বিলিয়ন টন এবং বাজার মূল্য ১১.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটি ২০২৪ সালের মধ্যে দ্বিগুণ হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। বর্তমানে ৪০টির বেশি দেশ শৈবাল উৎপাদন করছে, যার মধ্যে চীন ও ইন্দোনেশিয়া মিলেই সরবরাহ করে ৮৭ ভাগ।
বাংলাদেশ বর্তমানে প্রায় ৪০০ টন শৈবাল উৎপাদন করে, যার মূল্য ৫৫ মিলিয়ন টাকা (প্রায় ৫ লাখ মার্কিন ডলার)।তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে এই উৎপাদন ৫ কোটি টনে বাড়ানো সম্ভব।
জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২২০ প্রজাতির সাগর শৈবাল আছে। শৈবালের এই উপস্থিতি দেশে বিশাল বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে, যা দেশের চাহিদায় আমদানি নির্ভরতা কমাতে পারে এবং রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে সাহায্য করবে এই খাত।
মাছের খাবার, পশুখাদ্য, খাদ্য উপাদান, স্বল্পমূল্য এবং উচ্চমূল্যের প্রসাধনীর উপাদানসহ বেশ কিছু শিল্পে কিছু কিছু সাগর শৈবাল ব্যবহার হতে পারে। এছাড়া সাগর শৈবাল সার, বায়োফুয়েল এবং পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধী পণ্য তৈরিতেও ব্যবহারের সুযোগ আছে। খাদ্য হিসেবে সাগর শৈবালের ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সম্ভব।
জরিপে প্রস্তাবে বলা হয়, এই জলজ খাদ্যের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো গেলে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, পটুয়াখালী এবং সাতক্ষীরার মতো উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য লক্ষ লক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

সাগর শৈবাল চাষে সমস্যা
উৎপাদকরা বলছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব এবং যথাযথ নীতি ও বিধিমালার অভাবই সাগর শৈবাল চাষের মূল সমস্যা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্স অ্যান্ড ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, “ফার্মগুলো সাধারণত ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তার ওপর বিনিয়োগের অভাব। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এই খাতে বিনিয়োগ নিয়ে এখনো স্বাচ্ছন্দবোধ করছেনা। কয়েকটি আগ্রহ দেখালেও তারা লাভ নিয়ে নিশ্চিত নয়। তবে এটি একটি উদীয়মান খাত; শিগগিরই একটি প্রতিযোগিতামূলক খাতে পরিণত হবে সাগর শৈবাল।”
এক গবেষণা বলছে, শৈবাল ফার্মে দূষণ একটি বড় সমস্যা। বঙ্গোপসাগরের ঘোলা পানি কমিয়ে দিয়েছে ফার্মের উৎপাদন। অনেক সময় প্রবল ঢেউ শৈবাল ফার্ম ভাসিয়ে নিয়ে গেছে, যার ফলে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষক।
এছাড়া কৃষকরা, কম সময়ে উৎপাদন কৌশল আয়ত্ব করা এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাবকে শৈবাল উৎপাদনে অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। যেমন উৎপাদন স্থল নির্বাচনে জ্ঞানের অভাবে অনেক সময় অনুপযুক্ত স্থানে চাষ শুরু করেন ব্যবসায়ীরা।
আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, শৈবাল তোলার পর পরবর্তী প্রক্রিয়াকরণে প্রযুক্তির অভাব বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। এছাড়া চাষ মৌসুমে মানসম্মত বীজের চাহিদা মেটাতে ‘বীজ ব্যাংক’ অপরিহার্য, যা নেই বললেই চলে।
বাংলাদেশে সাগর শৈবাল ব্যবসা বড় হওয়ার পথে আরও কিছু বাধা রয়েছে, এর মধ্যে উৎপাদনকারীরা ন্যায্য মূল্য না পাওয়া, শৈবাল থেকে নতুন পণ্য তৈরি করতে না পারা অন্যতম। ফলে বাড়তি মুনাফার সুযোগ তৈরি হচ্ছেনা এই খাতে। সরবরাহ ব্যবস্থা বা সাপ্লাই চেইন দুর্বল হওয়ায় উৎপাদিত শৈবাল ঠিকভাবে বাজারে পৌঁছায়ও না। এর পাশাপাশি পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা বা ঋণ পাওয়া যায়না এই খাতের ব্যবসা এবং গবেষণার জন্য। সব মিলিয়ে শৈবাল ব্যবসার উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে এসব প্রতিবন্ধকতা।
ব্যানার ছবি: স্থানীয় জেলেরা সাগর শৈবাল সংগ্রহ করছে। ছবি: খায়রুল আলম।
সাইটেশন
Bangladesh Rising: The Success Stories of Bangladesh. (2022). Retrieved from Public Diplomacy Wing, Bangladesh Ministry of Foreign Affairs website: https://mofa.portal.gov.bd/sites/default/files/files/mofa.portal.gov.bd/page/37199c6d_96b8_4715_bf54_d999c9b02ff9/Bangladesh Rising February 2022 .pdf
Abijith, D., Saravanan, S., Jennifer, J. J., S. Parthasarathy, K. S., Singh, L., & Sankriti, R. (2021). Chapter 25 – Assessing the impact of damage and government response toward the cyclone Gaja in Tamil Nadu, India. Disaster Resilience and Sustainability. Retrieved from https://www.sciencedirect.com/science/article/pii/B9780323851954000160?via=ihub
Ahmed, Z. U., Hasan O., Rahman, M. M, Akter, M. A., Rahman, M. S., and Subrata, S. (2022). Seaweeds for the sustainable blue economy development: A study from the southeast coast of Bangladesh. Heliyon. Volume 8, Issue 3. https://doi.org/10.1016/j.heliyon.2022.e09079
Ahmed, N. and Taparhudee, W. (2005). Seaweed Cultivation in Bangladesh: Problems and Potentials. Kasetsart University Fisheries Research Bulletin No. 28. Retrieved from https://www.researchgate.net/publication/261595838_Seaweed_Cultivation_in_Bangladesh_Problems_and_Potentials
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে গ্লোবাল-এ – এ, ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর।