- জলাভূমি বিস্তৃত পশ্চিমবঙ্গ, অতিথি পাখিদের অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থল। একইসঙ্গে অনেক শিকারী এদের অবৈধভাবে আটক করে। মানুষের খাদ্য হিসেবেও এদের বিক্রি করা হয়।
- তবে পশ্চিমবঙ্গের জেলা মুর্শিদাবাদ, মালদা, বীরভূম ও পূর্ব বর্ধমানে অবাধে পাখি শিকার বন্ধে সম্প্রতি নেওয়া হয়েছে বেশকিছূ উদ্যোগ।
- ফাঁদে পড়া পাখিদের নিরাপদে উদ্ধার এবং পাখি শিকারে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্তে একসঙ্গে কাজ করছে, কিছু স্থানীয় অলাভজনক সংস্থা এবং রাজ্যের বন বিভাগ ।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার পাতান বিল, ১০০ হেক্টরের বেশি বিস্তৃত একটি জলাভূমি। চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি, পশ্চিমবঙ্গ বন বিভাগের কর্মকর্তারা সেখান থেকে এক মধ্যবয়সী সাইকেল আরোহীর পথ রোধ করেন। সেই ব্যক্তির কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়, অতিথি পাখিভর্তি তিনটি নাইলনের ব্যাগ। জানা যায়, ব্যাগবন্দি পাখিগুলোকে তিনি একজন ‘গ্রাহকের’ কাছে পৌঁছে দিচ্ছিলেন। এরপর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে আদালত তাকে সাত দিনের জুডিশিয়াল কাস্টডিতে পাঠান।
বিগত কয়েক বছর ধরে রাজ্যের মুর্শিদাবাদ, মালদা, বীরভূম এবং বর্ধমান জেলার জলাভূমি (বিল) এবং খোলা মাঠ থেকে শীতকালে অতিথি পাখিদের শিকার করা হচ্ছে। অতিথি পাখি ধরতে এই জলাভূমি এবং মাঠগুলো জাল দিয়ে ঢেকে ফাঁদে পরিণত করা হয়। এসব ফাঁদে আটকে পড়া পাখিগুলো অবৈধভাবে বাজারে সুস্বাদু খাবার হিসেবে বিক্রি করা হয়।
তবে গত শীত থেকে পাখি শিকার বন্ধে রাজ্যের বন বিভাগের কর্মকর্তাদের নজরদারি উল্লেখযোগ্যভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি, পাখি শিকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পরিবেশ নিয়ে কাজ করা অলাভজনক সংস্থাগুলো গোয়েন্দা তথ্য প্রদানের মাধ্যমে বন বিভাগকে সহায়তা করছে।
শিকারের কবল থেকে অতিথি পাখিদের উদ্ধার
২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৩ সালের এপ্রিলের মধ্যে, কলকাতার স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা Human & Environment Alliance League (HEAL) এর সদস্যরা মুর্শিদাবাদ ও মালদায় প্রশাসনকে মোট ৪৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ফাঁদ ধ্বংস করতে সাহায্য করে। এ সময় প্রায় ৩০ প্রজাতির ৯০০টিরও বেশি পাখি উদ্ধার করে ছেড়ে দেওয়া হয়। উদ্ধারকৃত পাখিদের বেশিরভাগই ছিল ছোট পায়ের (শর্ট-টোড) লার্ক। প্রজাতিটি মঙ্গোলিয়া, চীন এবং রাশিয়ার তীব্র শীত থেকে বাঁচতে ভারতে আসে।
এছাড়া ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের মার্চের মধ্যে কান্দি, মুর্শিদাবাদ, পূর্ব বর্ধমান, কুরুল, পাতান বিল, খরগ্রাম এবং ভরতপুর এলাকা থেকে পাখি শিকারের অভিযোগে অন্তত ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতদের বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইন, ১৯৭২-এর বিভিন্ন ধারায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়। অভিযুক্তরা সাত দিন বিচার বিভাগীয় হেফাজতে থাকার পর জামিনে মুক্তি লাভ করেন।

নদিয়া-মুর্শিদাবাদের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (DFO) হিসেবে কর্মরত ভারতীয় বন পরিষেবা (IFS) কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার বাউরি বলেন, “আমরা পাখিদের দুটি শ্রেণিতে ভাগ করি- বহিরাগত (exotic) এবং বন্য (wild)। খাঁচায় প্রজনন করানো পাখিগুলোই মূলত বহিরাগত হয়। ২০২২ সালে বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইনে কিছু পরিবর্তন আসার পর থেকে, মানুষ পাখি পালনের লাইসেন্স নিয়ে বহিরাগত পাখি বিক্রি করতে পারে। তবে আইন অনুযায়ী বন্য পাখি ধরা, বিক্রি করা, ক্রয় বা হত্যা করা অপরাধ। আর অতিথি পাখি শর্ট-টোড লার্ক বন্য শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।”
বাউরি জানান, সোর্সের কাছ থেকে তথ্য পেলে তারা অভিযান পরিচালনা করেন। স্থানীয় থানার সহযোগীতায় অভিযানগুলো পরিচালনা করা হয়।
নয়াদিল্লি-ভিত্তিক Wildlife Trust of India (WTI)-এর সঙ্গে কাজ করা সংস্থা HEAL, মুর্শিদাবাদে বেশিরভাগ অভিযানে বন বিভাগকে গোপন সংবাদ প্রদান করে সাহায্য করেছে। অন্য একটি অলাভজনক সংস্থা Burdwan Society for Animal Welfare এর কাছ থেকে অবৈধ পাখি শিকারের তথ্য পেয়েছে পূর্ব বর্ধমানের প্রশাসন।
পশ্চিমবঙ্গের অতিথি পাখি এবং তাদের আবাসস্থল
২০২০ সালে, Asian Waterbird Census (AWC) ভারতের ১৯টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ১৪২টি জলাভূমিতে জরিপ পরিচালনা করে। সেই জরিপে পশ্চিমবঙ্গের ২৪টি জলাভূমিতে সর্বোচ্চ সংখ্যক জলজ পাখি (৩০ হাজার ২৩৫টি) নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বীরভূম জেলার বল্লভপুর বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে নথিভুক্ত হয়েছে সর্বোচ্চ সংখ্যক (৩ হাজার ৭১৫টি) পাখি।
যেসব জলাভূমি এবং হ্রদ সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে স্বীকৃত, সেগুলো পাখিদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ আশ্রয়। তবে অসংখ্য অরক্ষিত জলাভূমি এবং কৃষিক্ষেত্র রয়েছে, যেগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খুব একটা নিরাপদ নয়। শর্ট-টোড লার্ক এর মতো কিছু অতিথি পাখি শুকনো খোলা মাঠে আশ্রয় নেয়। এই আশ্রয় নিতে গিয়েই তারা জালে আটকা পড়ে। পাখিরা যেন জালের দিকে আকৃষ্ট হয়, সেজন্যে শিকারের সময় চোখ ধাঁধানো আলোর ব্যবস্থাও রাখা হয়।
HEAL-এর সদস্যরা জানান, অতিথি পাখিদের মৌসুমী ব্যবসার একটি ‘সুপ্রতিষ্ঠিত কেন্দ্র’ হিসেবে গড়ে উঠেছে দক্ষিণ-মধ্য পশ্চিমবঙ্গ। বাংলায় ‘বগারি’ বা ‘মাঠ চড়ুই’ নামে পরিচিত লার্ক পাখিগুলো জীবিত বিক্রি করা হয়। বাজারভেদে এদের দাম ভিন্ন হয়।
HEAL-এর সেক্রেটারি শুভ্রজ্যোতি চ্যাটার্জি বলেন, “এই পাখিগুলো কয়েক বছর আগেও প্রকাশ্য বাজারে বিক্রি হতো। গত কয়েক বছরের প্রচারণার কারণে এখন গোপনে বেচাকেনা করা হয়। ক্রেতা এবং রেস্তোরাঁ মালিকদের সঙ্গে শিকারিদের যোগাযোগ থাকে। বেচাকেনার জন্য তারা নিজেদের সুবিধাজনক জায়গায় একত্রিত হয়।”

পাখিদের হটস্পট মুর্শিদাবাদ
চ্যাটার্জি জানান, তারা মুর্শিদাবাদে দুটি এবং মালদায় একটি টহল দল মোতায়েন করেছেন। এছাড়া মুর্শিদাবাদ, মালদা এবং বীরভূম জেলার ১১টি ব্লকের ২৫টি জলাভূমি এবং অন্যান্য আবাসস্থল পর্যবেক্ষণ করেছেন তারা।
মুর্শিদাবাদ এই কার্যক্রমের অন্যতম উপকেন্দ্র, কারণ এখানে বিস্তৃত জলাভূমির সংখ্যা বেশি। ‘Monitoring of Migratory Birds at Selected Water Bodies of Murshidabad District’ শিরোনামে ২০২০ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজ্যের ১০০ হেক্টরের বেশি বিস্তৃত ২৩টি বড় মিঠাপানির জলাভূমির মধ্যে ১৩টি এই জেলায় অবস্থিত। পাতান বিল তার মধ্যে অন্যতম।
West Bengal Biodiversity Board (WBBB) এর সহায়তায়, ২০১৯ সালের নভেম্বর থেকে ২০২০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এই ১৩টি বন্য জলাভূমিতে করা সমীক্ষায় ৫৩টি প্রজাতি চিহ্নিত করা হয়েছে। এদের মধ্যে ১৭টি অতিথি পাখি, ৭টি স্থানীয়ভাবে অভিবাসিত পাখি এবং ২৯টি আবাসিক পাখির প্রজাতি ছিল। এছাড়া ferruginous duck, black-headed ibis, hen harrier এবং Asian woollyneck এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। এগুলো nternational Union for Conservation of Nature (IUCN) এর রেড লিস্টে প্রায়-বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে বিবেচিত।
অতিথি পাখির মোট ১৯টি প্রজাতির দেখা পাওয়া পাতান বিলেই পাওয়া গেছে black-headed ibis এবং Asian woollyneck এর উপস্থিতি। এই গবেষণায় পাখি শিকারকে অতিথি পাখির সংখ্যা হ্রাসের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে স্থানীয় বিদ্যালয়গুলোতে পাখি শিকারের প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য প্রচারণা চালানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
HEAL-এর স্বেচ্ছাসেবকদের মতে, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে শুধুমাত্র পাতান বিল থেকেই ২৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ফাঁদ সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। তবে তারা যে ফাঁদে পড়া পাখিগুলো উদ্ধার করেছিলেন, তার মধ্যে কোনো বিপন্ন বা ঝুঁকিপূর্ণ প্রজাতি ছিল না। উদ্ধারকৃত পাখিদের মধ্যে বেশিরভাগ ‘মঙ্গোলিয়ান short-toed larks অথবা Skyes’s short-toed larks হলেও অন্যান্য অতিথি পাখি যেমন oriental skylark, olive-backed pipit, rosy pipit, red-throated pipit, common snipe এবং cotton pygmy-goose’- ও ছিল। এই পাখিগুলো আইইউসিএন এর তালিকায় ‘কম বিপন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তারপরও এগুলোকে ফাঁদে ফেলা বা হত্যা করা অবৈধ।
HEAL জানিয়েছে, common snipe ও cotton pygmy-goose মূল্যবান শিকার হিসেবে বিবেচিত হয় এবং বাজারে উচ্চ মূল্যে বিক্রি হয়। বিপরীতে, spotted owlets ও বাদুড়ের মতো পাখিগুলো জালে ধরা পরলে, বিক্রি না করে তাদের মৃত্যুর জন্য সেখানেই ফেলে রাখা হয়। কারণ বাজারে এদের কোনো চাহিদা নেই।
পশ্চিমবঙ্গে পাখিদের জন্য সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যয়
পাতান বিলের কাছে বসবাসকারী HEAL-এর একজন স্বেচ্ছাসেবক আদিত্য প্রধান বলেন, “এরকম পাখি শিকারের শাস্তিস্বরূপ লোকজনের জেলে যাওয়ার খবর আশেপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে এবং এর কিছু প্রভাব দেখা যাচ্ছে। তবে, পাখি শিকারের এই কার্যক্রম অনেক বছর ধরে চলছে। তাই জনসচেতনতা তৈরি করতে এবং অবৈধ শিকারের প্রবণতা দূর করতে আরও কয়েক বছর এই ধরনের পর্যবেক্ষণ এবং অভিযান চালিয়ে যেতে হবে।”

মুর্শিদাবাদের ভরতপুর থানা এলাকার পল্লীশ্রী গ্রামের কৃষক কঙ্কণ বর্মণ মঙ্গাবে-ইন্ডিয়াকে জানান- ভরতপুরের কারুল বিল, কন্দির পাতান বিল ও বেলুন বিল এবং বারুয়া থানাধীন কল্যাণপুর মাঠ থেকে জালগুলো সরানো এবং ধ্বংস করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “এই কার্যক্রম বন্ধ করা সহজ নয়। কিছু ক্ষেত্রে আমরা শিকারিদের প্রতিরোধের মুখে পড়েছি। খরগ্রাম থানাধীন এলোয়ারি মোড় এলাকায় এরকম ঘটনা ঘটেছে। সেখানে বিশাল কৃষি জমিতে শর্ট-টোড লার্ককে ফাঁদ ফেলে ধরা হয়েছিল।”
তিনি জানান, ফাঁদের খবর পাওয়া গেলে প্রাথমিকভাবে শিকার-বিরোধী স্থানীয় প্রচারকারীরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং জড়িত ব্যক্তিদের পাখিগুলো ছেড়ে দিতে এবং জাল সরিয়ে নিতে বলেন। তাদের কথা না মানলে বন বিভাগকে খবর দেওয়া হয়।
HEAL-এর হিসাব অনুযায়ী, কারুল বিলে (যা সাহাপুর বিল নামেও পরিচিত) শীতকালে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার অতিথি হাঁস এবং পশ্চিমবঙ্গে শীতকালীন গার্গেনি পাখির সবচেয়ে বড় ঝাঁকের সমাগম ঘটে।
২০০০ সালে, Central Inland Capture Fisheries Research Institute বেলুন বিলকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করার একটি প্রস্তাব করেছিল- একটি সেচ জলাধার এবং মাছ ধরার জন্য, অন্যটি মাছ চাষের পুকুর হিসেবে এবং আরেকটি পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে।
এই প্রস্তাবনার আলোকে মাছ চাষে বেশ উন্নয়ন হয়েছে। জেলা প্রশাসনের লিজ দেওয়ার জন্য নির্ধারিত সরকারি মৎস্য খামারের তালিকায় বেলুন বিলের ৮২৯ একরেরও বেশি জমি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই লিজের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ১০ হাজার ২৪৩ টাকা। তবে প্রস্তাব অনুযায়ী, এখানে পাখির অভয়ারণ্য ঘোষিত হয়নি।
ব্যানার ছবি: পশ্চিমবঙ্গের সাঁতরাগাছি ঝিলে অতিথি পাখির ঝাঁক। ছবি: বিশ্বরূপ গাঙ্গুলী/উইকিমিডিয়া কমন্স।
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে মঙ্গাবে ইন্ডিয়া-তে, ২০২৩ সালের ২ নভেস্বর।