- সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ বাঘের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উৎস দেশ থেকে ভোগকারী দেশে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ভোক্তা বাজার এবং অবৈধ বাণিজ্যের জন্য একটি বৈশ্বিক ট্রানজিট হাবেও পরিণত হয়েছে দেশটি।
- এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে, দেশের অভ্যন্তরে ধনী অভিজাত শ্রেণির ক্রমবর্ধমান চাহিদা, বিশ্বব্যাপী সংযোগ, বাঘের পণ্যের প্রতি সাংস্কৃতিক আকর্ষণ । এছাড়া উন্নত পরিবহন নেটওয়ার্কের কারণে বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও স্থল সীমান্ত ক্রসিং দিয়ে বাঘের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দ্বিমুখী প্রবাহ সহজ হচ্ছে।
- গত দুই দশকের প্রচেষ্টার পর, বাঘ শিকার ও চোরাচালান কিছুটা কমেছে, একথা ঠিক। তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দুর্বলতার কারণে, বিশেষ করে সুন্দরবনে অবৈধ ব্যবসা অব্যাহত রয়েছে।
- বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্যপ্রাণী পাচার মোকাবেলায় সরকারি সংস্থা, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য দেশের মধ্যে সমন্বিত এবং বিস্তৃত সহযোগিতা অপরিহার্য।
বিগত ২০ বছরে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। দারিদ্র্য থেকে মুক্তি লাভ করেছে লাখ লাখ মানুষ। সেইসঙ্গে উত্থান ঘটেছে একটি ধনী অভিজাত শ্রেণির। এদের অনেকেরই আগ্রহ জন্মেছে বাঘের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রতি।
বিপন্ন বেঙ্গল টাইগারের (Panthera tigris) আবাসস্থল বাংলাদেশ। পূর্বে, মূলত বিদেশী চাহিদার কারণে বাঘ শিকার হয়ে আসছিল। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে এ ব্যবসা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এ গবেষণার মূল লেখক নাসির উদ্দিন মঙ্গাবে-কে বলেন, “বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে জীবিত বাঘ ও তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সরবরাহকারী দেশ ছিল। কিন্তু এখন আমরা দেখছি, দেশীয় ধনী ও বিদেশি প্রবাসীদের মধ্যে বাঘের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবহারের প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।”
গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ধনী শ্রেণিই এখন এসবের সবচেয়ে বড় ভোক্তা। ফলে দেশটি এখন শুধু বাঘের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রপ্তানি করছে না, বরং আমদানিও করছে। উল্টো বাংলাদেশের চাহিদা মেটাতে ভারত ও মিয়ানমারে বাঘ শিকার হচ্ছে।
নাসির উদ্দিন আরও বলেন, “বাঘ পাচারের ঝুঁকি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণেও এটি জটিল। বাংলাদেশের বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং প্রতিবেশী দেশের মানুষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এই অবৈধ ব্যবসাকে আরও ত্বরান্বিত করছে।”
আন্তর্জাতিক পরিবহন নেটওয়ার্ক দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়ায় এখন সহজেই বৈশ্বিক ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে যুক্ত হতে পারছে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। ফলে অবৈধ বাণিজ্য আরও বেড়েছে । পাশাপাশি, এটিকে দমন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ থেকে ১৫টি দেশে বাঘের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পাচার হয়। ভারত, চীন ও মালয়েশিয়া এ তালিকার শীর্ষে। এরপর তালিকায় রয়েছে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের মতো দেশের নাম। বাঘের চামড়া, হাড়, দাঁত ও শুকনো মাংসের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এগুলো বাংলাদেশ থেকে বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও স্থলসীমান্ত দিয়ে পাচার করা হয়।
Wildlife Justice Commission (WJC) এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, জীবিত বাঘ শাবকও পাচার হচ্ছে বিভিন্ন দেশে। প্রাপ্ত বয়স্ক বাঘের চেয়ে এদের দাম বেশি। প্রতিটি শাবক ৭ হাজার ৬৪৮ ডলার থেকে ১৭ হাজার ৫০০ ডলারে বিক্রি হয়। পরিবহন খরচ যোগ করলে, এ দাম আরও বৃদ্ধি পায়। এমনকি এক ঘটনায় দেখা গেছে, পাচারকারীরা অতিরিক্ত ১ হাজার ডলার খরচে থাইল্যান্ড থেকে বিমানের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি জীবিত শাবক আনার প্রস্তাব দিয়েছিল।
বন্যপ্রাণী পাচার এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দঁড়িয়েছে বলে জানান, বাংলাদেশ বন বিভাগের অধীনে বন্যপ্রাণী অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ইউনিটের (WCCU) প্রধান সানাউল্লাহ পাটোয়ারি।
তিনি বলেন, “পশুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে ঘিরে বাংলাদেশের বিভিন্ন গোষ্ঠীর নিজস্ব সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিশ্বাস রয়েছে। এগুলো অবৈধ বাণিজ্যের চাহিদা বাড়িয়ে তুলেছে। এর পাশাপাশি সীমিত সম্পদ ও দুর্বল নজরদারির কারণে, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের কাছে একটি আকর্ষণীয় ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে।”
সংরক্ষণ জটিলতা
বাঘের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পাচারের উৎস দেশ থেকে বাংলাদেশের ভোগকারী দেশে পরিণত হওয়ার ঘটনা খুবই সাম্প্রতিক। ২০২২ সালে TRAFFIC এর এক প্রতিবেদনে, গত দুই দশক ধরে বাংলাদেশকে বাঘ চোরাচালানের প্রধান হটস্পট বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০০০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে বাঘ আটকের ৩৬টি ঘটনা ঘটে। এ সময়ে ৫০টি বাঘ জব্দ করা হলেও, পাচারে জড়িত মাত্র ছয়জনকে কারাদণ্ড ও চারজনকে জরিমানা করা হয়।
বাংলাদেশ-ভারত ভূখণ্ডের সুন্দরবন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন। বেঙ্গল টাইগারের অন্যতম প্রধান একটি আবাসস্থলও এই সুন্দরবন। ২০১৭ সাল পর্যন্ত সেখানে বাঘ শিকারে আধিপত্য বিস্তার করত জলদস্যুরা । সরকারের জলদস্যু বিরোধী অভিযানে তারা নির্মূল হয়ে গেলে শূন্যস্থান দখল করে নেয়, নতুন বাঘ-শিকারী দল। আর এদের কারণেই সুন্দরবনের বাঘ এখনও ঝুঁকিতে রয়েছে।
এ বিষয়ে নাসির উদ্দিন বলেন, “জলদস্যুদের পতনের পর চাঁদাবাজি ও ডাকাতির ভয় কমে গেছে, কিন্তু নতুন শিকারী দলের কারণে বাঘ শিকারের সংখ্যা বেড়ে গেছে।”
তবে সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের দায়িত্বে থাকা বন কর্মকর্তা আবু নাসের মোহসিন হোসেন জানান, ২০১৭ সালের পর থেকে এ ধরনের শিকারপ্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। TRAFFIC এর রিপোর্টও বলছে, ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে পাচার ৭৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
বাঘ রক্ষায় জরুরি সমন্বিত উদ্যোগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছুটা অগ্রগতি হলেও বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। কার্যকরভাবে বাঘ পাচার ঠেকাতে রাষ্ট্রীয় সংস্থা, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য দেশের সহযোগিতা দরকার।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম.এ. আজিজ জানান, বাঘ রক্ষায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এখন অত্যন্ত জরুরি। স্থলসীমান্ত, সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দরে কর্মরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ, কর্মশালা এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানোর প্রস্তাবনাও দেন তিনি। পাশাপাশি, শুধু বাঘ-অধ্যুষিত দেশগুলোর সঙ্গেই নয়, বাঘের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের চাহিদা রয়েছে এমন দেশগুলোর সঙ্গেও আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের আরও সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো উচিত। এছাড়া বন বিভাগ, পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন, সীমান্তরক্ষী ও উপকূলরক্ষীসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে সক্রিয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।”
WCCU প্রধান পাটোয়ারিও এ বিষয়ে একমত। তিনিও মনে করেন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো দরকার। তবে তিনি অবশ্য বাজেট ঘাটতির কথাও উল্লেখ করেছেন। তিনি মনে করেন, মাঠপর্যায়ে আইন প্রয়োগের জন্য সরাসরি সরকারি তহবিল বরাদ্দ হওয়া উচিত।
সানাউল্লাহ পাটোয়ারি বলেন, “এ অপরাধচক্রের সদস্য সংখ্যা কম। সঠিক উদ্যোগ নিলে এটি দমন করা সম্ভব। তবে বড় সমস্যা হলো, WCCU ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বন বিভাগের সঙ্গে পুরোপুরি একীভূত হতে পারেনি।”
তিনি বলেন, সংস্থাটি সরাসরি সরকারি অর্থায়নও পায় না, বরং দাতা সংস্থার প্রকল্পভিত্তিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে। ফলে প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে সংস্থার কার্যক্ষমতা সীমিত।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বন্যপ্রাণী অপরাধের জটিল জাল ভেঙে ফেলতে এবং দেশের বেঙ্গল টাইগারকে চিরতরে বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
ব্যানার ছবি: জব্দ করা অবৈধ বন্যপ্রাণীর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। ছবি: Ryan Moehring / USFWS via Flickr (CC BY 2.0).
সাইটেশন
Uddin, N., Enoch, S., Harihar, A., Pickles, R. S. A., Hughes, A. C. (2023). Tigers at a crossroads: Shedding light on the role of Bangladesh in the illegal trade of this iconic big cat. Conservation Science and Practice, 5(7). doi:10.1111/csp2.12952
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে, মঙ্গাবে গ্লোবাল – এ, ২০২৪ সালের ৯ জানুয়ারি।