- বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম জুড়ে অবাধে গাছ কাটা ও ঝর্নার তলদেশ থেকে পাথর উত্তোলনের কারণে শুকিয়ে গেছে অনেক পাহাড়ি ঝিরি ও প্রাকৃতিক পানির উৎস। এতে হারিয়ে যাচ্ছে ওই অঞ্চলের পুটিটর মাহশির মাছ।
- জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে। যেসব ঝিরি ও ঝরায় আগে সারা বছর পানির প্রবাহ থাকতো, সেসবও শুকিয়ে যাচ্ছে তীব্র শুষ্ক মৌসুমে।
- পাহাড়ে এই বিপর্যয় ঠেকাতে ২০১৬ সাল থেকে, একটি প্রকল্পের মাধ্যমে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠিদের সঙ্গে কাজ করছে ইউএসএআইডি ও ইউএনডিপি। এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথমেই গাছ কাটা ও পাথর খননের মতো পরিবেশ বিরুদ্ধ কাজ বন্ধে জোর দেওয়া হয়।
- যেসব এলাকায় কিছুটা বন সংরক্ষণ করা গেছে, সেখানে ঝর্নার প্রবাহ স্থিতিশীল হয়ে আসছে। ফলে জলাশয়গুলোতে বাড়ছে পুটিটর মাহশীরসহ অন্যান্য মাছের বিচরণ।
লিকা চাকমা, বয়স ৩৭, এখনো মনে করতে পারেন খাগড়াছড়ির দিঘলছড়ি হাজাছড়া এলাকার শৈশবের সেই দিনগুলো, যখন ঝর্নাগুলো সারা বছর ধরে প্রবাহিত হতো। এই জলাধারগুলো শুধু ওই অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকাই নয়, টিকিয়ে রাখতো নানা ধরনের মাছ ও জলজ প্রাণী।
পুটিটর মাহশীর মাছের কথা উল্লেখ করে লিকা আরো বলেন, এক সময় গ্রামের ঝর্নাগুলোতে প্রচুর পরিমাণে এই মাছ পাওয়া যেত। বিপন্ন প্রজাতির এই মাছটির বিচরণ দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশেই। এমনকি পাকিস্তানে এটি জাতীয় মাছ হিসেবেও স্বীকৃত।
তবে যখন থেকে বন ধ্বংস এবং ঝর্নার তলদেশ থেকে পাথর তোলা শুরু করেন স্থানীয়রা, তখন থেকেই হারিয়ে যেতে থাকে পুটিটর মাহশীর। ঝর্নাগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় মাছটির জন্য উপযুক্ত আবাসস্থল প্রায় নেই বললেই চলে।
জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলছে। ২০১৬ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্ষাকালে স্বাভাবিকের চেয়ে মোট বৃষ্টিপাত বেড়েছে, কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে তা আরো কমে গেছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে ঝরনাগুলো প্রবাহিত থাকলেও, সারা বছর প্রবাহমান এসব জলাধার বছরের বাকি সময় শুকিয়ে যেতে থাকে।

“যখন আমরা বন থেকে গাছ কাটা এবং ঝরনা-ছড়া থেকে পাথর নেওয়া শুরু করলাম, তখন থেকেই ধীরে ধীরে ঝর্নাগুলো আর পর্যাপ্ত পানি দিতে পারছিলোনা,” জানান লিকা। “এক পর্যায়ে, শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রাকৃতিক উৎসগুলো শুকিয়ে যায়, ফলে বিলুপ্ত হয়ে যায় মাছের বেশ কিছু প্রজাতি।”
লিকাসহ স্থানীয়দের অনেকে প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। তারা ইউএসএআইডির অর্থায়নে ‘সিএইচটি ওয়াটারশেড কো-ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্টিভিটি’ প্রকল্পের অধীনে সংরক্ষণ স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছেন। এর মাধ্যমে তারা বিপন্ন মাছের প্রজাতি বিশেষ করে পুটিটর মাহশীরকে আবার এলাকার জলাধারগুলোতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।
তাদের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় বন উজাড় ও অতিরিক্ত বনসম্পদ আহরণ নিয়ন্ত্রণ করা গেছে। বেড়েছে বনের ঘনত্ব, পানিও পাওয়া যাচ্ছে ঝর্নাগুলোতে। ভাটির দিকে প্রজনন ও বিস্তার বাড়াতে, উজানে ঝর্নার উৎসেও নজর রাখেন স্বেচ্ছাসেবীরা। নজরদারির ফলে বাড়ছে মাছের পরিমাণও।
সিএইচটি ওয়াটারশেড কো-ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্টিভিটি বা সিএইচটিডব্লিউসিএ জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির ’পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন জোরদার প্রকল্প’-এর অংশ, যা পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল বিষয়ক মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করছে। সহায়তা করছে ইউএসএআইডি ও ইউএনডিপি। ২০১৬ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটি চলবে ১০ বছর, এবং এরই মধ্যেই কিছু সফলতা অর্জন করেছে এটি।
“তিন বছর আগে যখন আমরা সিএইচটিডব্লিউসিএ প্রকল্পের আওতায় আমাদের যৌথ বন সংরক্ষণ কাজ শুরু করলাম, তখন দিঘলছড়ি হাজাছড়া ঝর্না তার আগের রূপে ফিরে আসতে শুরু করে,” বলেন লিকা। “এখন স্থানীয়রা দিঘলছড়ি হাজাছড়া পাড়া ভিলেজ কমন ফরেস্ট (ভিসিএফ) রক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এবং ভিসিএফ ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমতি ছাড়া আমরা বনসম্পদ আহরণ করতে পারি না।”

ভিলেজ কমন ফরেস্ট (ভিসিএফ) হলো চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ বনাঞ্চলের অবশিষ্ট অংশ, যা ঐতিহ্যগতভাবে সংরক্ষণ করে আসছে ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠীরা। তারা ভালোভাবেই বুঝতেন যে ভারসাম্যপূর্ণ বন আর ঝর্নার মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। একটি বন পানি শোষকের মতো কাজ করে, অর্থাৎ বৃষ্টির পানি সরাসরি গড়িয়ে না পড়ে মাটিতে ধরে রাখতে সহযোগিতা করে। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির ভাণ্ডার আবার পূরণের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে ঝর্নার উৎসকে নিশ্চিত করে। এছাড়া শুষ্ক মৌসুমে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করতেও সহায়ক ভূমিকা রাখে এই বন।
ঝর্নার তলদেশ থেকে পাথর তোলা কমিয়ে আনাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ঝর্নার ভেতরের পাথরগুলো মাছের জন্য নিবিড় আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে। কিন্তু এগুলো সরিয়ে ফেলা আর বন উজাড় করার মাধ্যমে স্থানীয়রা শুধু পরিবেশরই ক্ষতি করেনি বরং নিজেদের এবং দেশী বন্যপ্রাণীকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
বন সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয়রা মাছ রক্ষার জন্যও কিছু নিয়ম করেছে। দেবরমাথার গ্রাম প্রধান বরুণ চাকমা জানান, যে সব ঝর্নায় মাছের সংখ্যা আবার বেড়েছে, সেগুলো থেকে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
বরুণ আরো জানান, ভিসিএফ ব্যবস্থাপনা কমিটিগুলো এলাকায় ঝর্না থেকে মাছ ধরলে ৫,০০০ টাকা জরিমানা দেয়ার কড়াকড়ি নিয়ম বাস্তবায়ন করছে। ২০২২ সালে পাশের এলাকার এক বাসিন্দা, দেবরমাথা গ্রামের ঝর্না থেকে চারটি পুটিটর ধরেছিলো, তাকে ২০,০০০ টাকা জরিমানা করা হয় বলে উল্লেখ করেন বরুণ।
লিকা বলেন, “প্রয়োজনে আমরা বাজার থেকে মাছ কিনে আমাদের আমিষের চাহিদা পূরণ করবো, তবু ঝর্না থেকে মাছ ধরবো না। সাধারণ বনাঞ্চল থেকে মাছ ধরার অনুমতি নেই। তবে গ্রামের ও বনাঞ্চলের বাইরে যে ছড়াগুলো রয়েছে, সেখান থেকে স্থানীয়রা মাছ ধরতে পারে।”
সাধারণ বনাঞ্চলের উজানে ঝরনার উৎস রক্ষা করা গেলে মাছের প্রজনন ও পরিমান বাড়তে থাকবে। এছাড়া ভাটির দিকে থাকা জনগোষ্ঠির জন্য মাছ ভোগ করা ও রক্ষার টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হয় এই বিধিনিষেধ থেকে।

ইউএনডিপির কমিউনিটি সংগঠক বিহিতা বিধান খিসা বলেন, অনেক ঝর্নার অবস্থা এখন স্থিতিশীল হয়েছে, এমনকি শুষ্ক মৌসুমেও পানি থাকছে। এর ফলে এসব ঝর্নায় মাছ আবার ফিরে আসছে, যা বন সংরক্ষণ কার্যক্রমের ফল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
“বাসস্থান ধ্বংসের কারণে এলাকার সব ঝর্নায় মাছ পাওয়া যায় না। যেখানে বন সংরক্ষণের প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে এরকম কিছু জলাধারে মিলছে মাছ।”
ওয়ার্ল্ডফিশের বাংলাদেশ কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী বিনয় কুমার বর্মন বলেন, এ অঞ্চলের জলাধারে পুটিটর মাহশীরের বিচরণ বাড়তে থাকা বিস্ময়কর ঘটনা, বাংলাদেশে এ প্রজাতিটি প্রায় বিলুপ্ত বলেই আশংকা করতেন বিজ্ঞানীরা।
তবে সংরক্ষণ কার্যক্রমের সাফল্যের পরও, বাংলাদেশে অতিরিক্ত মাছ ধরা, আবাসস্থল ধ্বংস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবসহ নানা কারণে এখনও মারাত্মক হুমকির মুখে রয়েছে এ প্রজাতিটি । দেশের বিপন্ন প্রজাতির রেড লিস্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাকৃতিক আবাসস্থলে পুটিটর মাহশীর খুঁজে পাওয়া বিরল ঘটনা।
বর্মন বলেন, “এই কারণেই পুটিটর এবং অন্যান্য প্রতিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষার জন্য সিএইচটিডব্লিউসিএ-র মতো জরুরি সংরক্ষণমূলক উদ্যোগ প্রয়োজন।”
ব্যানার ছবি: নতুন প্রাণ ফিরে পাওয়া দীঘলছড়ি হাজাছড়া ঝর্নার সামনে এক পাহাড়ী নারীর হাতে পুটিটর মাছ। ছবি: রফিকুল ইসলাম।
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে, মঙ্গাবে গ্লোবাল – এ, ২০২৪ সালের ১৯ জানুয়ারি।