- জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং মানবসৃষ্ট নানা কারণে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের বিশাল আবাদযোগ্য জমি লবণাক্ত হয়ে পড়ছে।
- এ সংকট উত্তরণে তাই সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি এনজিও’র সহায়তায় বিকল্প ফসল হিসেবে, সূর্যমুখী চাষ শুরু করেছেন উপকূলীয় কৃষকরা।
- বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত এ ফসলের মাত্র ১০ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। বাকি চাহিদা পূরণ করতে বিভিন্ন দেশ থেকে তেলবীজ আমদানি করা হয়।
- সরকারি হিসাবে, পতিত জমিতে তেলবীজ চাষ বাড়ালে সূর্যমুখী তেল উৎপাদন প্রায় ২৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভব।
ধান, গম, ভুট্টা, পাটসহ নানান শাকসবজি চাষ হওয়া বাংলাদেশ মূলত কৃষিনির্ভর একটি দেশ। উল্লিখিত ফসলগুলো দেশটির কৃষকদের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয়। এসব ফসল কেবল যে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, তা নয়। দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে এদের।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং মানবসৃষ্ট নানা কারণে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের বিশাল আবাদযোগ্য জমি লবণাক্ত হয়ে পড়ছে।
শুষ্ক মৌসুমে (নভেম্বর থেকে মে পর্যন্ত) এ অঞ্চলের জমি অনুর্বর অবস্থায় পড়ে থাকে। কারণ, প্রচলিত ফসলগুলো লবনাক্ত জমিতে ফলানো সম্ভব হয় না।
এ সংকট নিরসনে তাই সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি এনজিও’র সহায়তায় বিকল্প ফসল হিসেবে, সূর্যমুখী চাষ শুরু করেছেন উপকূলীয় কৃষকরা। সূর্যমুখী লবণাক্ততা সহনশীল ও দ্রুত বর্ধনশীল একটি ফসল হওয়ায়, এটির চাষ কৃষকদেরকে স্থিতিশীল আয়ের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।
গত শুষ্ক মৌসুমে উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালির কৃষক অসীম চন্দ্র শিখরী প্রায় ৩ একর জমিতে প্রথমবারের মতো সূর্যমুখী চাষ করেন।
তিনি জানান, “সূর্যমুখী চাষের আগে, শুষ্ক মৌসুমে আমি দীর্ঘদিন কিছুই ফলাতে পারিনি। এবার প্রায় ৭৫ মণ (১ মণ = ৩৭ দশমিক ৩ কেজি বা ৮২ দশমিক ২ পাউন্ড) সূর্যমুখী উৎপাদন করেছি। এতে আমার প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা আয় হয়েছে।”
সূর্যমুখী চাষে সাফল্যের মুখ দেখা অসীম তাই চলতি ২০২৩-২৪ মৌসুমে প্রায় ৯ একর জমিতে সূর্যমুখী চাষ করছেন। তার দেখাদেখি, আশপাশের ১৩০ জন কৃষকও প্রায় ১০০ একর জমিতে সূর্যমুখী চাষ শুরু করেছেন।
অসীম মঙ্গাবে-কে বলেন, লবাণক্ত জমিতে তিনি ধান রোপণের চেষ্টা করলেও তা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তরমুজ, মুগডাল বা অন্যান্য ডাল জাতীয় ফসল রোপণের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন তিনি।
স্থানীয় মানুষ শুষ্ক মৌসুমে এসব জমিকে ‘অগুন মাটি’ বলে ডাকত। কারণ সেখানে কিছুই জন্মাত না। অথচ সূর্যমুখী সহজেই মাটির লবণাক্ততার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে।
জমির লবণাক্ততা পাল্টে দিচ্ছে কৃষি পদ্ধতি
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৪৬ মিলিয়ন টন খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে প্রায় ৩৯ মিলিয়ন টন চাল, ১ মিলিয়ন টন গম ও প্রায় ৬০ মিলিয়ন টন ভুট্টা প্রতি বছর উৎপাদিত হচ্ছে দেশে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৮ দশমিক ৮ মিলিয়ন হেক্টর (২১ দশমিক ৭ মিলিয়ন একর) আবাদযোগ্য জমির মধ্যে প্রায় ৪ লাখ হেক্টর (৯ দশমিক ৮৮ লাখ একর) জমি, খরা ও লবণাক্ততার মতো অসংখ্য কারণে পতিত পড়ে থাকে।
Bangladesh Soil Research Development Institute (SRDI) জানায়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমশ বাড়ছে। এর ফলে, উপকূলীয় অঞ্চলের বড় একটি অংশ লবণাক্ততার শিকার হবে। এটি ফসল উৎপাদনে ভয়াবহ ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
SRDI এর তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের মোট আয়তন ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার (৫৬ হাজার ৯৭৭ বর্গমাইল)। এর মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চল প্রায় ২০ শতাংশ, যার আবার ৩০ শতাংশেরও বেশি জমি আবাদযোগ্য। অথচ উপকূলীয় এলাকার প্রায় ৫৩ শতাংশ জমি প্রতক্ষ্যভাবে লবণাক্ততায় আক্রান্ত। শুষ্ক মৌসুমে এসব জমি অনুর্বর হয়ে থাকে। যেকারণে কৃষকদের জীবিকা অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে যায়।
তথ্য অনুযায়ী, সব আবাদযোগ্য জমির মধ্যে মাত্র ৮ লাখ হেক্টর (প্রায় ২০ লাখ একর) জমিতে সূর্যমুখীসহ বিভিন্ন তেলবীজ চাষ হয়। এখান থেকে বছরে প্রায় ১ দশমিক ২ মিলিয়ন টন ফসল উৎপাদন করা হয়। অবশ্য দেশের মোট ভোজ্যতেলের চাহিদার মাত্র ১০ শতাংশই এটি পূরণ করতে পারে।
২০০৭ সালের সুপার সাইক্লোন সিডর ও ২০০৯ সালের আইলার পর জলোচ্ছ্বাসের কারণে উপকূলীয় অনেক জমি লবণাক্ত হয়ে পড়ে। তখন কিছু এনজিও কৃষকদের বিনামূল্যে সূর্যমুখী বীজ, সার ও প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে ব্র্যাক । তারা জানায়, সূর্যমুখী বীজে ৪০-৪৫ শতাংশ তেল থাকে, যা অন্যান্য ভোজ্য তেলের তুলনায় বেশি স্বাস্থ্যকর।
বর্তমানে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ২ হাজার ১৭০ একর পতিত জমিতে উন্নতমানের সূর্যমুখী বীজ, সার, প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে ব্র্যাক। আশা করা হচ্ছে, এখান থেকে প্রায় ১ হাজার ৬৮০ টন সূর্যমুখী বীজ উৎপাদিত হবে।
BRAC এর জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচির প্রকল্প ব্যবস্থাপক বশির আহমেদ বলেন, “সূর্যমুখী উদ্যোগ উপকূলীয় কৃষকদের জন্য আশার আলো হয়ে উঠেছে। আগে যেখানে জমি পতিত থাকত, এখন সেটি সোনালী সূর্যমুখীর সমুদ্র হয়ে উঠেছে। এমনকি, অনেক কৃষক নিজেদের সূর্যমুখী তেলের ব্যবসা গড়ে তোলার স্বপ্নও দেখছেন।”
দেশীয় তেলবীজের উৎপাদন ও সম্ভাবনা
বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত তেলবীজ হলো সরিষা, সূর্যমুখী, চিনাবাদাম, তিল ও সয়াবিন। এর মধ্যে ভোজ্যতেল উৎপাদনে ব্যবহার হয় মূলত সরিষা।
শুষ্ক মৌসুমে সাধারণত ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে এ ফসল রোপণ করা হয়। ফসল উত্তোলন করা হয়, ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের ২০২২-২৩ সালের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশে তেলবীজ উৎপাদন হয়েছে ১ দশমিক ৬ মিলিয়ন টন। তবে এর মধ্যে সূর্যমুখীর অবদান মাত্র শূণ্য দশমিক ২৭৮ মিলিয়ন টন।

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সরিষা দেশে উৎপাদিত প্রধান তেলবীজ হলেও, দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদার মাত্র ১০ শতাংশ পূরণ করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণে সূর্যমুখীর অবদানও ক্রমশ বাড়ছে।
সরকারি হিসাবে, পতিত জমিতে তেলবীজ চাষ বাড়ালে সূর্যমুখী তেল উৎপাদন প্রায় ২৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভব, বিশেষ করে উপকূলীয় লবণাক্ত জমিতে।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অধীনে চলমান, ভোজ্য তেল ফসল প্রকল্পের পরিচালক জসিম উদ্দিন বলেন, “যদি আমরা সূর্যমুখী থেকে ভালো মানের তেলবীজ উৎপাদন করতে পারি, তাহলে ভোজ্য তেলের আমদানি কমিয়ে আনতে পারব। বর্তমানে মোট চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ দেশেই উৎপাদিত হয়। আমরা যদি আরও ১৬ শতাংশ যোগ করতে পারি, তবে স্থানীয় চাহিদার ২৬ শতাংশ পর্যন্ত পূরণ করা সম্ভব হবে।”
তিনি আরও জানান, সরকার লবণাক্ততা-সহনশীল নতুন সূর্যমুখী জাত উদ্ভাবন ও পরীক্ষার উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে। অংশগ্রহণকারী কৃষকরাও পতিত জমি ব্যবহার করে আয় করতে পারায় খুশি। তাদের সাফল্য দেখে আশেপাশের আরও কৃষক এ উদ্যোগে যোগ দিতে আগ্রহী হয়েছেন।
ব্যানার ছবি: উপকূলীয় কৃষকরা এখন সূর্যমুখী চাষ করছেন এবং এ বিকল্প ফসল থেকে লাভবান হচ্ছেন। ছবি: ব্র্যাক।
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে, মঙ্গাবে গ্লোবাল – এ, ২০২৪ সালের ৩১ জানুয়ারি।