- এ বছরের ১৩ মার্চ দুটি লোনা পানির কুমিরের গায়ে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার স্থাপন করে, সুন্দরবনে অবমুক্ত করে বনবিভাগ।
- এ পর্যন্ত চারটি কুমিরের গায়ে ট্রান্সমিটার লাগানো হয়েছে। এদের মধ্যে তিনটি ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে এবং একটি বন থেকে আনা হয়। আরও কয়েকটির গায়ে ট্রান্সমিটার লাগানোর প্রস্তুতি চলছে।
- সুন্দরবনের প্রতিবেশে কুমিরের জীবনাচরণ, বাসস্থান, পরিবেশ, এবং মৃত্যুহার শনাক্ত করতেই, বন বিভাগ এই স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার স্থাপনের কাজ করছে।
- বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্যাটেলাইটের তথ্য বাংলাদেশে মারাত্মকভাবে বিপন্ন লোনা পাানির কুমির সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশে লোনা পানির কুমির সংরক্ষণের নতুন উদ্যোগ হিসেবে, এদের গায়ে স্যাটেলাইট স্থাপন শুরু করেছে বনবিভাগ। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ প্রতিবেশে এই প্রজাতির চলাচল, অভ্যাস এবং জীবনকাল পর্যবেক্ষণের জন্য এই ব্যবস্থা। ম্যানগ্রোভ বনটিই এই কুমিরের একমাত্র আবাসস্থল
২০২৪ সালের ১৩ মার্চ, বাংলাদেশ বন বিভাগ এশিয়ার মধ্যে প্রথমবারের মতো দুটি লোনা পানির কুমিরের (Crocodylus porosus) গায়ে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার সংযুক্ত করে সুন্দরবনে অবমুক্ত করে। এর কয়েক দিন পর, একই প্রক্রিয়ায় আরো দুটির ওপরও এই নজরদারি ব্যবস্থা করে বনবিভাগ।
অস্ট্রেলিয়ার কমনওয়েলথ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ অর্গানাইজেশনের (CSIRO) গবেষক ও মারডক বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডজাংক্ট লেকচারার রুচিরা সোমাওয়েরা এবং কুইন্সল্যান্ড পার্কস অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ সার্ভিসের প্রধান রেঞ্জার পল বেরি কুমিরগুলোর ওপর স্যাটলোইট ট্রান্সমিটার সংযোগ করতে সাহায্য করেছেন। এছাড়া বন বিভাগের কর্মকর্তাদের এই সংযুক্ত প্রক্রিয়া ও পর্যবেক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন এই দুই অস্টেলিয়ান।
বন বিভাগ এবং আইইউসিএন বাংলাদেশ, যৌথভাবে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। এতে সহযোগিতা করেছে কয়েকটি দাতা সংস্থা।

খুলনা সার্কেলের বন কর্মকর্তা মিহির কুমার দো জানান, বর্তমানে সুন্দরবনে লোনা পানির কুমিরের সংখ্যা যথেষ্ট। ২০১৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সুন্দরবনের করমজল কুমির প্রজনন কেন্দ্র থেকে প্রায় ২০০টি কুমির অবমুক্ত করেছে বন বিভাগ।
“তবে আমরা অবমুক্ত কুমিরের বেঁচে থাকার হার জানি না এবং এই বাসস্থান তাদের জন্য কতটা উপযুক্ত, তাও নিশ্চিত নই,” যোগ করেন দো।
তিনি জানান, স্যাটেলাইট ট্যাগ ব্যবহার করে কুমিরের আবাসস্থল, বিচরণ এলাকা এবং জীবনচক্র সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করছেন তারা। এই তথ্যগুলো ভবিষ্যতেও কুমির সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনায় সাহায্য করবে বলে মনে করেন তিনি।
গবেষকরা ও বন বিভাগের কর্মকর্তাদের লক্ষ্য চারটি স্যাটেলাইট ট্যাগযুক্ত কুমিরের (একটি বন্য ও বিভিন্ন চিড়িয়াখানা থেকে উদ্ধার তিনটি) তথ্য থেকে এই প্রজাতির আচরণ, ডিম পাড়ার স্থান, পরিবেশ, মৃত্যু হার ও আবাসস্থল এলাকা সম্পর্কে জানা। পাশাপাশি, তারা মানুষ-কুমির সংঘাত সম্পর্কিত তথ্যও সংগ্রহ করছেন।
আইইউসিএন বাংলাদেশের প্রকল্প ব্যবস্থাপক এবিএম সারোয়ার আলম মঙ্গাবে-কে জানান, খুব শিগগিরই আরও একটি বন্য কুমিরকে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার দিয়ে ট্যাগ করা হবে।
সোমাওয়েরা বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে কুমিরে স্যাটেলাইট ট্যাগ ব্যবহার করছে এবং বিশ্বের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার পর দ্বিতীয় দেশ এটি।
আলম জানান, তারা অ্যামেরিকার তৈরি স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার ব্যবহার করছেন, যা লবণাক্ত পরিবেশের কথা বিবেচনা করে বিশেষভাবে বানানো হয়েছে এবং এটি প্রতি ঘণ্টায় নির্ভুল তথ্য দেয়।
“ট্রান্সমিটারযুক্ত চারটি কুমির পুরোপুরি স্বাভাবিক আছে। এর মধ্যে তিনটি স্বাচ্ছন্দে সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খালে ঘুরছে, তবে একটি কুমির ম্যানগ্রোভ বন থেকে বেরিয়ে বরিশালে চলে গেছে। স্যাটেলাইট তথ্য দেখাচ্ছে, এটি প্রথম ১০ দিনে ১৫০ কিলোমিটার (৯৩ মাইল) ভ্রমণের পর এখন সুন্দরবনের দিকে ফিরে আসছে,” যোগ করেন তিনি।
বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের কাছে কুমির সংরক্ষণের সঠিক কোনো পরিকল্পনা নেই, তাই স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া তথ্য, এই প্রজাতি সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটারের তথ্য বিশ্লেষণের এক বছরের মধ্যে, লোনা পানির কুমিরের আবাসস্থল নির্ধারণ করা সম্ভব হবে বলে জানান আলম।
“একবার কুমিরের আবাসস্থল এবং সংখ্যা শনাক্ত হলে বন বিভাগ লোনা পানির কুমির সংরক্ষণের জন্য সঠিক পরিকল্পনা করতে পারবে,” আলম আরও যোগ করেন।

সুন্দরবনে লোনা পানির কুমিরের ঝুঁকি
ক্রমশ কমছে সুন্দরবনের কুমিরের সংখ্যা। বনের ভেতরে পর্যটন, অতিরিক্ত জলযান চলাচল এর মূল কারণ।
সত্তরের দশক পর্যন্ত কুমিরের চামড়ার বাণিজ্যিক ব্যবহার, বাংলাদেশে এ প্রজাতির সংখ্যা কমিয়েছে। বন্যপ্রাণী (সুরক্ষা ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ এর সুবাদে লোনা পানির কুমির এখন দেশে সুরক্ষিত প্রজাতি। তবে বনআশ্রিত কুমিরগুলো এখনো বিভিন্নভাবে মানবসৃষ্ট হুমকির সম্মুখীন। ২০১৮ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, এসব কুমিরের প্রধান শত্রু চোরাশিকারী। কারণ তারা সবসময় সক্রিয়।
প্রতি বছর মাছ, কাঁকড়া, মধু, জ্বালানি কাঠ ও বনজাত পণ্য সংগ্রহ করতে, সুন্দরবনে প্রবেশ করে ত্রিশ লাখের বেশি স্থানীয় মানুষ। বনের ভেতর বিভিন্ন চ্যানেল দিয়ে বনজীবি এবং মালবাহী জাহাজের আনাগোনায় রোদ পোহানোর মত কুমিরের স্বাভাবিক চাহিদা নষ্ট হয় এভাবে।
২০১৫ সালের আইইউসিএন রেড লিস্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে মহাবিপন্ন এই প্রজাতিটি মূলত সুন্দরবনে বাস করে। যেখানে তাদের পূর্ণবয়স্কের সংখ্যা ১০০ থেকে ১৫০টি।
ব্যানার ইমেজ: করমজল কুমির প্রজনন কেন্দ্রে একটি কুমির পুকুর পাড়ে রোদ পোহাচ্ছে। ছবি: মো. মফিজুর রহমান চৌধুরী।
সাইটেশন:
Aziz, M. A., & Islam, M, A. (2018). Population Status and Spatial Distribution of Saltwater Crocodile, Crocodylus Porosus in the Sundarbans of Bangladesh. ScienceDirect, 24, e01206. doi:10.3329/bjz.v46i1.37624
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে গ্লোবাল-এ – এ, ২০২৪ সালের ২২ এপ্রিল।