- আসামের বিভিন্ন এলাকায় এখন বেশ জনপ্রিয় ভ্রাম্যমাণ মৌচাষ। ফুলের মৌসুমে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘরে মধুরস সংগ্রহ করেন ব্যবসায়ীরা।
- ভারতের অন্যান্য অংশে এই পদ্ধতি প্রচলিত হলেও, আসামে এটি তুলনামূলকভাবে নতুন; আবহাওয়ার পরিবর্তন ও ফুলের মৌসুম অনিয়মিত হওয়ার কারণে এই প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে।
- রাজ্যের বিস্তীর্ণ সরিষা চাষ ও মধুর বাণিজ্যিক উৎপাদনে প্রতিযোগিতা কম থাকায়, এই ব্যবসা ভ্রাম্যমাণ মৌচাষীদের আকর্ষণ করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষি ও মৌচাষের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে উঠলে এই শিল্পের সম্ভাবনা আরো বাড়বে।
আসামের নুমালীগড় এলাকার বরসাপরী গ্রাম।
দিগন্তের তটরেখা তখন সূর্যাস্তের লাল আভায় রঙিন, শত শত কাঠের বাক্স গুছিয়ে নেয়ার কাজে ব্যস্ত লীলা চরণ দত্ত ও তাঁর পাঁচ সহযোগী।
সূর্যের শেষ মৃদু আলো মিলিয়ে যেতেই জানুয়ারির সন্ধ্যায় হিমেল হাওয়া ছড়িয়ে পড়লো বিস্তৃত হলুদ সরিষা ক্ষেতে। তবু সময়ের একটুও অপচয় না করে ব্যস্ত মৌমাছির মতো বিরামহীন কাজ করে যাচ্ছিলেন মানুষগুলো। এরপর আস্তে আস্তে নেমে আসে নিস্তব্ধতা, আর সেই নীরবতার মাঝে শুধু শোনা যাচ্ছিল একটানা গুঞ্জন-যা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছিল গভীর শান্ত নৈশব্দে।
লীলা চরণ দত্ত একজন অভিজ্ঞ মৌচাষী। ভ্রাম্যমাণ মৌচাষের ব্যবসাও আছে তার। বরসাপরী গ্রামে এক মাসেরও বেশি সময় সরিষা ফুলের মধ্যে কাটানোর পর, সেই সন্ধ্যায় নতুন জায়গায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল তার দল। এ সময় তাদের সঙ্গে ছিলো প্রায় ২৫০টি কাঠের বাক্স, আর প্রতিটি বাক্সেই ছিলো গড়ে প্রায় ৬০,০০০ মৌমাছি।
মৌচাষ এখন লাভজনক ব্যবসা। তবে দেশী প্রজাতি এপিস সেরানা ইন্ডিকা (ভারতীয় মৌমাছি) ছাড়াও, অভিজ্ঞ মৌচাষীরা যেমন লীলা চরণ দত্ত, বেছে নিয়েছেন ইউরোপীয় প্রজাতি এপিস মেলিফেরা।
যদিও ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে এই ভিনদেশি জাতের মৌচাষ এখন বেশ প্রচলিত, তবে আসাম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এটি তুলনামূলক নতুন। ধীরে ধীরে আসাম এখন ভ্রাম্যমাণ মৌচাষীদের জন্য এক আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হচ্ছে, যেখানে প্রতি বছর ক্রমশ বাড়ছে বাইরের রাজ্যের মৌচাষীদের আনাগোনা।
আসামে এপিস মেলিফেরা প্রজাতির মৌচাষের পথিকৃৎ ধরা হয় লীলা চরণ দত্তকে। ২০০১ সাল থেকে এই প্রজাতি চাষ করে লাভজনক ব্যবসা গড়ে তুলেছেন তিনি। বলেন, “এই প্রজাতিটি আসামে প্রথম নিয়ে আসে আসাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (Assam Agricultural University)। এর সম্ভাবনা দেখে আমি পাঞ্জাব, বিহার আর পশ্চিমবঙ্গে গিয়েছিলাম এটি সংগ্রহ করতে।” আর ভারতে এই প্রজাতিটি আনা হয়েছিল ১৯৬২ থেকে ১৯৬৪ সালের মধ্যে পাঞ্জাব কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (Punjab Agricultural University) মাধ্যমে। উচ্চ মধু উৎপাদন ক্ষমতার জন্য এটি দ্রুত দেশী প্রজাতির তুলনায় বাণিজ্যিকভাবে বেশি জনপ্রিয়তা পায়। দত্তের কথায়, “এপিস সেরানা ইন্ডিকা (দেশীয় মৌমাছি) ভালো পরিবেশে সর্বোচ্চ ৮ থেকে ১০ কেজি মধু দেয়। তুলনায়, এপিস মেলিফেরা প্রতি মৌসুমে বা বছরে ২৫ থেকে ৩০ কেজি পর্যন্ত মধু উৎপাদন করতে পারে। তবে এর জন্য নিয়মিত স্থান পরিবর্তন বা পরিযান প্রয়োজন, যাতে পর্যাপ্ত ফুলের উৎস পাওয়া যায়।”
লীলা চরণের সহযোগী মৌচাষী মুরুলি বরাহ আরো একটু বিস্তারিতভাবে জানালেন মঙ্গাবেকে। “আমরা মূলত আসামের ভেতরেই পরিযান করি, তবে কখনো কখনো পাশের অরুণাচল প্রদেশের সীমান্ত পর্যন্তও যাই। আমাদের এই পরিযান বর্ষা মৌসুম শেষ হওয়ার পর থেকেই শুরু হয়।”
তিনি আরও বলেন “আমরা সাধারণত বাজালি জেলার পাঠশালা থেকে শুরু করি, যেখানে মৌমাছিরা প্রথমে বড়ই ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে, তারপর আসে সরিষা ফুলের মৌসুম। পাঠশালা থেকে সরিষার মধুরস সংগ্রহের পর আমরা প্রায় ৩৫৫ কিলোমিটার দূরে যখন নুমালীগড়ে যাই, তখন সেখানে শুরু হয় সরিষার মৌসুম। এরপর আমরা বোকাখাত অঞ্চলে যাই ধনেপাতা ও কুমড়ো ফুলের জন্য, তারপর সেই একই জায়গায় দরনশাক (Leucas linifolia) ফুলের মৌসুম পর্যন্ত থাকি। পরে কার্বি আংলং জেলায় যাই রাবার বাগানের জন্য-সেখানে মৌমাছিরা ফুল থেকে নয়, বরং মধু সংগ্রহ করে গাছের নতুন পাতার রস থেকে। এরপর শুরু হয় লিচুর মৌসুম, আমরা চলে যাই কামরূপ জেলার খেত্রিতে। কখনো কখনো রাজ্যের বাইরে পশ্চিমবঙ্গের মালদা বা বিহারেও যাই। লিচুর মৌসুম শেষ হতেই আবার এসে পড়ে বর্ষা। তখনই আমাদের এই পরিযান মৌসুমের ইতি টানি।”

মধু সংগ্রহের এই পরিযান কোনও নির্দিষ্ট পথে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ফুলের প্রাপ্যতার ওপর নির্ভর করে পথ ধরতে হয়। বর্ষাকালে যখন পরাগ (pollen) ও মধুরস (nectar) পাওয়া যায় না, তখন এপিস মেলিফেরা প্রজাতির মৌচাকগুলোকে শুষ্ক জায়গায় রেখে চিনি-গোলানো সিরাপ দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়। প্রতিটি বাক্সে প্রায় ছয় দিন পরপর এক কেজি চিনির সিরাপ দেওয়া হয়।
দত্ত জানান, “এছাড়াও আমরা এই সময়টায় মৌমাছিদের জন্য একটি ভিটামিন মিশ্রণ (substitute vitamin concoction) দিই। তবে এরপরও তারা কিছুটা প্রাকৃতিক মধুরসের প্রয়োজন বোধ করে। এজন্য আমরা ভুট্টার পরাগ দিই এবং নিজেদের হাতে মধুরস সংগ্রহ করে সেটা দিয়ে শিশু মৌমাছি ও রাণী মৌমাছিকে খাওয়াই। যদি যত্নে সামান্যও অবহেলা হয়, মারা যেতে পারে মৌমাছিরা। এরকম হলে পুরো বাক্স ফাঁকা হয়ে যাবার আশংকা থাকে। আর যারা বেঁচে থাকে, তাদেরও আবার শক্তি ফিরে পেতে এবং পরবর্তী মৌসুমে সক্রিয়ভাবে মধু সংগ্রহ শুরু করতে সময় লাগে, ফলে অনেক ধীর হয়ে যায় উৎপাদন ।”
ভ্রাম্যমাণ মৌচাষ বা মাইগ্রেটরি বিকিপিং, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশে বহুদিনের প্রচলিত প্রথা, ভারতে তুলনামূলক নতুন হলেও এটি মধু উৎপাদনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে। এই পদ্ধতিতে মৌচাষীরা যেসব এলাকায় ফুলের মধুরস ফুরিয়ে যায়, সেখান থেকে মৌচাকের বাক্সগুলো সরিয়ে নিয়ে যান মধু সমৃদ্ধ নতুন এলাকায়। বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যজুড়ে ভ্রাম্যমাণ মৌচাষ সাধারণ ব্যবসা। দক্ষিণ ভারতে মৌচাষীরা প্রায়ই তাদের মৌ-কলোনি নিয়ে যান সূর্যমুখী, কুসুম (safflower), তুলা, তিল এবং অন্যান্য ফসলের ক্ষেতে। অন্যদিকে শীত আসার আগমুহূর্তে কাশ্মীর উপত্যকার মৌচাষীরা তাদের মৌমাছি নিয়ে চলে যায় রাজস্থান, গুজরাট ও অন্যান্য উষ্ণ অঞ্চলে। ভ্রাম্যমাণ মৌচাষকে উদ্বুদ্ধ করতে ২০১৮-১৯ সালে শুরু হয় “ন্যাশনাল বিকিপিং অ্যান্ড হানি মিশন (National Beekeeping & Honey Mission)।” এই প্রকল্পের অধীনে মৌচাক পরিবহন, সঠিক সময় নির্বাচন, পরিযানের আগে মৌচাক প্রস্তুতসহ মৌচাষীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
রাতের আকাশের নিচেই বদলে ফেলতে হয় অবস্থান
পরিযান প্রক্রিয়ায় প্রথম ধাপ হলো উপযুক্ত ফুল ও থাকার জায়গাসহ সম্ভাব্য নতুন স্থান খোঁজা। যখন কোনো জায়গা সম্ভাবনাময় বলে মনে হয়, তখন মৌচাষীরা সেখানে গিয়ে পরিদর্শন করেন এবং স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জেনে নেন- ওই এলাকায় ফুলের পরিমাণ কেমন, এবং মৌমাছির কলোনি রাখার জন্য জায়গা পাওয়া কতটা বাস্তবসম্মত। সবকিছু ভালোভাবে যাচাই-বাছাই ও নিশ্চিত হওয়ার পরেই তারা সেই নির্বাচিত জায়গায় মৌচাক স্থানান্তর করেন। যেহেতু মৌমাছিরা দিনের বেলায় মধুরস (nectar) সংগ্রহে বের হয়, তাই পরিবহনের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো রাত। সন্ধ্যা নামলে, যখন সব মৌমাছি তাদের চাক বা বাক্সে ফিরে আসে, তখন বাক্সগুলোর মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর সেগুলো তোলা হয় গাড়িতে এবং পরবর্তী গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া হয়। নতুন স্থানে পৌঁছে বাক্সগুলো নামিয়ে রাখা হয় এবং এমনভাবে প্রস্তুত করা হয় যাতে পরদিন সকালে মৌমাছিরা আবার মধু সংগ্রহে বের হতে পারে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি এক রাতের মধ্যেই সম্পন্ন করা জরুরি, যাতে মৌমাছিদের স্বাভাবিক কাজকর্মে কোনো বিঘ্ন না ঘটে।
বিহারের মৌচাষী মদন মণ্ডল ব্যাখ্যা করলেন, “যেসব ক্ষেত্রে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ৬০০ কিলোমিটারের বেশি দূরে থাকে, সেক্ষেত্রে আমাদের সকালবেলায় থামতেই হয়। সকাল ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে আমরা বাক্সগুলো নামিয়ে রাখি, যাতে মৌমাছিরা কিছুক্ষণ ওড়াউড়ি করতে পারে। এরপর সন্ধ্যা হলে আবার সেই বাক্সগুলো গুছিয়ে তুলি, পরবর্তী যাত্রাপথের জন্য প্রস্তুত হতে।”

এপিস মেলিফেরা প্রজাতির মৌচাষ সঠিকভাবে পরিচালনা করতে কমপক্ষে চার থেকে পাঁচজনের একটি দল প্রয়োজন। স্থান অনুসন্ধান, শিবির স্থাপন এবং মধু উৎপাদন- এই পুরো প্রক্রিয়াটি নির্বিঘ্নে পরিচালনার কাজ করেন তারা। অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হতে হলে একজন মৌচাষীর কমপক্ষে ২০০টি মৌচাকের বাক্স থাকতে হবে। যাদের এর চেয়ে কম বাক্স, তারা সাধারণত তিন থেকে চারজনের দল নিয়ে একসঙ্গে কাজ করে।
আসামে ফুলের প্রাপ্যতা টানছে মৌচাষীদের
মদন মণ্ডল দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে মৌচাষের সঙ্গে যুক্ত। ২০১৩ সাল থেকে তিনি নিজ রাজ্য বিহার থেকে আসামের বরপেটা জেলায় আসছেন, সঙ্গে থাকে ২০০টি মৌচাকের বাক্স। তাদের আকর্ষণ সেই সরিষার ফুলে ভরা মধুরসে সমৃদ্ধ বিস্তীর্ণ ক্ষেত। তিনি একা নন, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের আরো বহু মৌচাষী দল প্রতি বছর শীতকালে আসামের বরপেটা, বাজালি ও মরিগাঁও জেলায় এসে জড়ো হন। এভাবে প্রতিবছরই মৌচাষীদের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে।
মদন মণ্ডল বললেন, “যথেষ্ট পরিমাণে মধু উৎপাদন নিশ্চিত করতে হলে, এপিস মেলিফেরা প্রজাতির ২০০টি মৌ-কলোনির জন্য প্রায় ২৫০ একর জমির ফসলে একচ্ছত্র প্রবেশাধিকার প্রয়োজন। তবে বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডে মৌচাষীর সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় একই জমিতে অতিরিক্ত মৌমাছির সমাগমে কমে যাচ্ছে উৎপাদন। এই বিড়ম্বনা এড়াতে আমরা আসামে পরিযান শুরু করি, কারণ এখানে বিস্তীর্ণ এলাকায় সরিষা চাষ হয়, মৌচাষীও তুলনামূলক কম। ফলে আমাদের মধু উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়ে গেছে।”
তবে গত এক দশকে আসামে মৌচাষীদের এই পরিযানের সংখ্যাও অনেক বেড়েছে। এখন মাত্র দুই কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যেই বিভিন্ন দলের দুই হাজারেরও বেশি মৌচাকের বাক্স দেখা যায়।
মণ্ডল ও তাঁর সহকর্মী মৌচাষীরা জানান, ফসলের ধরনে পরিবর্তন আসায় মধু উৎপাদনে প্রভাব পড়েছে। তারা বলছেন, “আগে আসামে সরিষা ফসলের পর ধনে পাতা চাষ হতো। এছাড়া আমরা বিহারের বিশাল সূর্যমুখী ক্ষেত থেকে মধুরস সংগ্রহ করতে পারতাম। ধীরে ধীরে কৃষকরা এখন ভুট্টা ও অন্যান্য হাইব্রিড ফসলের দিকে ঝুঁকছেন, ফলে মৌমাছির জন্য ফুলের মধুরসের উৎস কমে গেছে অনেকাংশে। গত তিন বছরে বিহারে ভুট্টা উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কারণ, কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদিত ৪৭টি নতুন ইথানল প্ল্যান্ট স্থাপন। এর ভিত্তিতেই রাজ্য সরকার ইথানল উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। মণ্ডল আরো বলেন, “এখন আমাদের প্রধান উপার্জনের উৎস হলো সরিষা। সরিষার ফুল না পেলে আমাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।”
আসামে প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য ও মধু ব্যবসার প্রতিযোগিতা কম হওয়ায় পরিযান সীমিত রেখেও, প্রচুর মধু উৎপাদন করতে পারেন চাষীরা। তবে পর্যাপ্ত উৎপাদন ও লাভ বজায় রাখতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাইরের রাজ্যগুলোর মৌচাষীদের বছর জুড়ে একাধিক রাজ্যে পরিযান করতে হয়।

মণ্ডল জানান, “ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে আমরা আসামে থাকি। এরপর ফেব্রুয়ারিতে লিচুর ফুল ফোটা শুরু হলে আমরা চলে যাই, বিহারের ভাগলপুরে। সেখান থেকে ঝাড়খণ্ডের রাঁচি, উদ্দেশ্য বন্য করঞ্জা (Millettia pinnata) ফুলের মৌসুম ধরা।” এভাবে ঘনঘন স্থানান্তরের ফলে পরিবহন খরচ বেড়ে যায়, সঙ্গে যোগ হয় বিভিন্ন জায়গায় কৃষি জমি ভাড়া নেওয়ার ব্যয়, উল্লেখ করেন তিনি।
যদিও এ বিষয়ে সরকারি কোনো নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই, তবে অন্য রাজ্য থেকে আসা মৌচাষীদের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। স্থানীয়দের মতে, বর্তমানে বরপেটা জেলায় প্রায় ৫০টি ভ্রাম্যমাণ মৌচাষী দল কাজ করছে।
আসামে ক্রমশ বাড়ছে মধু উৎপাদনের সম্ভাবনা
সিএসআইআর- নর্থ ইস্ট ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (NEIST)-এর তথ্য অনুযায়ী, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বছরে প্রায় পাঁচ লাখ কিলোগ্রাম মধু উৎপাদন হয়, যার ২৫ ভাগই আসে আসাম থেকে। এই মধুর উৎস বন ও চাষের মৌচাক।
লীলা চরণ দত্ত বলেন, “আসামে মূলত এপিস সেরানা ইন্ডিকা প্রজাতির মৌমাছি চাষ হয়। তবে যদি আমরা এপিস মেলিফেরা প্রজাতিতে যেতে পারি, তাহলে বাজারের চাহিদা আরও ভালোভাবে পূরণ করা সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন শুষ্ক আবহাওয়া। কারণ অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত মধু উৎপাদনের পক্ষে অনুকূল নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এখন আমরা দেখছি, বৃষ্টি মৌসুমের দৈর্ঘ্য কমে আসছে, যা আসলে মৌচাষের জন্য কিছুটা সুবিধাজনক, কারণ এতে পরাগ (pollen) দীর্ঘসময় ধরে টিকে থাকে এবং পানিতে ধুয়ে যায় না। আবার যদি সময় মতো বৃষ্টি না হয় এবং সে কারণে ফুল ফোটার সময় বিঘ্নিত হয়, সেটিও মধু উৎপাদনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।”
দত্ত উল্লেখ করেন যে, ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় উত্তর-পূর্ব ভারতে মধু খাওয়ার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। ফলে এখানে চাহিদা সব সময় সরবরাহের চেয়ে বেশি থাকে। যে কারণে এই অঞ্চলে মধুর দাম রপ্তানি মূল্যের তুলনায় বেশি। অন্যান্য রাজ্যের মৌচাষীরা যেখানে মূলত রপ্তানি বাজারের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে উত্তর-পূর্ব ভারতের মৌচাষীদের জন্য এটি একটি বাড়তি সুবিধা। কারণ স্থানীয় বাজারেই তারা ভালো দামে মধু বিক্রি করতে পারেন।
মৌচাষী মদন মণ্ডল জানান, ভালো সরিষার মৌসুমে তিনি প্রায় ৩,০০০ কেজি মধু উৎপাদন করেন। প্রতি কেজি বিক্রি করেন প্রায় ১৫০ রুপি। তবে রপ্তানি বাজারে প্রায়ই অস্থিতিশীল থাকে, মধুর দাম। সরিষা ফুলের মধুর মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে স্ফটিক আকার ধারণ করার প্রবণতা রয়েছে, যার ফলে অনেকেই ভুল ভেবে ধরে নেন যে এতে চিনি মেশানো হয়েছে। এই ভ্রান্ত ধারণার কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে মধুর দাম কমে যায়, এতে কম দামে রপ্তানি বাজারে মধু বিক্রি করতে বাধ্য হন মৌচাষী।

আসামে সরিষা ফুলের মধু কেজি প্রতি ২০০ থেকে ৩০০ রুপিতে বিক্রি হয়। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যে ধনিয়া, লিচু ও দোঁরশাক (Leucas linifolia) ফুলের মধুর দাম তুলনামূলক বাড়তি- গড়ে প্রতি কেজি ৪০০ রুপি বা তারও বেশি। মধুর পাশাপাশি মৌচাষীরা মৌচাকও বিক্রি করেন, যা প্রসাধনী শিল্পে ব্যবহার হয়। এর দাম প্রতি কেজি প্রায় ১,০০০ রুপি।
সিএসআইআর-এনইআইএসটি (CSIR–NEIST) পর্যবেক্ষণ বলছে, এই অঞ্চলে মৌচাষ ও কৃষিকাজের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে, ফলে মধু উৎপাদন সম্ভাবনার চেয়ে কম। দত্তের মতে, আসামে বড় পরিসরে এক জাত ফসল যেমন ধনিয়া, সূর্যমুখী ও তিলের চাষ শুরু করা উচিত, যাতে মৌচাষের প্রকৃত সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যায়। এই পরিবর্তনটি অপরিহার্য, কারণ এর মাধ্যমেই ইউরোপীয় প্রজাতির মৌমাছি (Apis mellifera) চাষ অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হয়ে উঠবে।
দত্ত আরও উল্লেখ করেন, আসামে কৃষিকাজ এখনো খণ্ডিত আকারে পরিচালিত হয়। সেখানে প্রত্যেক কৃষক অল্প পরিসরে নিজ নিজ জমিতে ভিন্ন ভিন্ন ফসল চাষ করেন। এটি বিহার বা সুন্দরবনের মতো অঞ্চলের উল্টো ঘটনা। কারণ এই দুুই জায়গায় বড় পরিসরে একজাত ফসলের চাষ হয়। বিহারে ব্যাপকভাবে করঞ্জা/করচ (Millettia pinnata) গাছের চাষ হয়, আর সুন্দরবন বিখ্যাত খলিসা (Aegiceras corniculatum), গরান (Ceriops decandra) ও কেওড়া (Sonneratia apetala) গাছের ফুলের মত আরো নানা প্রজাতির ফুলের জন্য।
এই সমস্যাগুলোর সমাধানে দত্তের পরামর্শ- সরকার যেন একটি সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থা (integrated agricultural system) গড়ে তোলে। বিশেষ করে তেলবীজ খাতে চাষাবাদ থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উৎপাদন পর্যন্ত এক সঙ্গে পরিচালনার ব্যবস্থা দরকার বলে মনে করেন তিনি। এই সমন্বিত পদ্ধতি সহযোগিতামূলক কৃষিকাজকে উৎসাহিত করবে, যা কৃষি ও মৌচাষ উভয় ক্ষেত্রের জন্যই একটি টেকসই ব্যবসা।
আসাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিএআর–এআইসিআরপি অন হানি বীজ অ্যান্ড পলিনেটর্স (ICAR–AICRP on Honey Bees and Pollinators)-এর প্রধান বিজ্ঞানী মুকুল কুমার ডেকা জানান, এপিস মেলিফেরা (Apis mellifera) প্রজাতির মৌমাছি পালনের একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হলো বর্ষাকালে আসামে বাগান বা অরচার্ডের অভাব। সম্প্রতি মরিঙ্গা (সজনে), ক্যারামবোলা (কামরাঙ্গা) এবং নতুন ফসল যেমন ড্রাগন ফল চাষের উদ্যোগ বাড়ায় মৌমাছিদের মধু রসের প্রাপ্যতা বেড়েছে, যা বেশ ইতিবাচক। তবে মুকুল মনে করেন, পরিকল্পিত চাষাবাদ আরও জোরদার করা প্রয়োজন, যা আসামে মধু উৎপাদনের সর্বোচ্চ সম্ভাবনাকে বাস্তবায়নের পথ দেখাবে।
ব্যানার ছবি: আসামের বরপেটায় বিহারের ভ্রাম্যমাণ মৌচাষীরা। ছবি: সুরজিত শর্মা / মঙ্গাবে।
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে ইন্ডিয়া-তে, ২০২৪ সালের ৬ মে।