- ঢাকা শহরে ভুবন চিল (Black Kite) উড়ে বেড়ানোর দৃশ্য ক্রমশ বিরল হয়ে উঠছে। অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে সংকুচিত হয়ে আসছে পাখিদের আবাসস্থল।
- ২০২৪ সালের এপ্রিল-মে মাসে ঢাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে অন্তত ৩৫টি অসুস্থ ভুবন চিল উদ্ধার করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ প্রজাতির সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাওয়ায় উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরা।
- ডাম্পিং সাইট ও আশপাশের এলাকায় বড় গাছ না থাকা, ভুবন চিলের খাদ্য সংগ্রহে অন্যতম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাসা থেকে খাদ্যের উৎসস্থলের দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রমে বাড়তি শক্তি ব্যয় করতে হয় এ শিকারী পাখিকে।
- প্রতিকূল আবহাওয়া প্রায়শই ভুবন চিলের খাদ্য সংগ্রহের ক্ষমতাকে হ্রাস করে। ভারী বৃষ্টিপাত ও তাপদাহের মতো চরম আবহাওয়ায় তাদের খাদ্যের প্রাপ্যতা কমে যায়, প্রজননেও এর প্রভাব পড়ে।
ব্যস্ত নগরী ঢাকায় অবস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে প্রতি সন্ধ্যায় দুলে ওঠে গগন শিরিশ (Albizia richardiana), রাজ কড়ইয়ের মতো বড় গাছগুলোর শাখা-প্রশাখা। সমস্ত দিনের শেষে ডানার রোদের গন্ধ মুছে নিজেদের নীড়ে ফিরে আসে ভুবন চিলের ঝাঁক।
দিনের শেষে, নীড়ে ফেরার আগে শিকারী পাখিগুলো নিজেদের আবাসস্থলের ওপর বৃত্তাকারে ঘুরে আশপাশের এলাকার কর্তৃত্ব ঘোষণা করে।
তবে সময়ের পরিক্রমায়, অপরিকল্পিত নগরায়নের ভয়াবহ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে ৩০৬ বর্গকিলোমিটার (১১৮ বর্গমাইল) আয়তনের শহর ঢাকা। জলাশয় ভরাট ও পুরনো গাছ কেটে ফেলায় এ শহরে ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে শিরিশ গাছের ওপর ভুবন চিলের উড়ে চলার দৃশ্য।
বাংলাদেশে বন বিভাগের পরিদর্শকরা ২০২৪ সালের এপ্রিল-মে মাসে, ঢাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে অন্তত ৩৫টি অসুস্থ ভুবন চিল উদ্ধার করেছেন। উদ্ধারকৃত এসব পাখি উড়তে উড়তে ক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
উদ্ধারকারীদের মতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অল্প বয়সী চিলগুলো খাবার সংগ্রহ ও বাসা বাঁধার জন্য জায়গা খুঁজতে খুঁজতে অসুস্থ হয়ে পড়ে।
বন্যপ্রাণি পরিদর্শক অসীম মল্লিক মঙ্গাবেকে বলেন, সাধারনত পাখির ছানারা গাছের কাছাকাছি ডালগুলোতে উড়াউড়ি করে ওড়ার দক্ষতা বাড়ায়। কনক্রিটের জঙ্গলে বাচ্চা পাখিগুলোর যখন গাছ খুঁজে পেতে কষ্ট হয় এবং ওড়ার শক্তি কমে যায়, তখনই তারা নিচে পড়ে যায়।

হারিয়ে যাওয়া নীড়
ঢাকা শহরে ভুবন চিলের বাসা বাঁধার আচরণ বুঝতে গবেষকরা শহরের লক্ষণীয় সবুজ অঞ্চলগুলোতে একটি জরিপ পরিচালনা করেন। এজন্য তারা বেছে নেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গন, রমনা উদ্যান, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এবং ওসমানী উদ্যানকে।
জরিপিটিতে ৩৮টি বাসা বাঁধার স্থান রেকর্ড করা হয়। সর্বোচ্চ সংখ্যা নিয়ে এদিক থেকে এগিয়ে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গন। সেখানে পাওয়া যায় ১৯টি বাসা। এছাড়া গবেষকরা দেখতে পান, ৯২ শতাংশ বাসা বাঁধার স্থানই ছিল ফ্যাবেসিও (Fabaceae) প্রজাতির গাছে। বাকি ৮ শতাংশ ছিল মোবাইল নেটওয়ার্ক টাওয়ার ও উঁচু ভবনের মতো কাঠামোতে।
গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, বাসা বাঁধার স্থান যেটাই হোক না কেন, ভুবন চিল শব্দ দূষণ ও মানুষের ভিড় এড়িয়ে চলে।
উদ্ধারকারীরা যেসব এলাকায় অসুস্থ পাখি পেয়েছেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে আজিমপুর, মিরপুর, কাজীপাড়া, উত্তরা, টিকাটুলি, বনানী, মতিঝিল ও শ্যামলী। এসব এলাকা জনবহুল, কোলাহলপূর্ণ এবং ভুবন চিলের বাসা বাঁধার জন্য অনুপযুক্ত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ফিরোজ জামান বলেন, ভুবন চিলের খাদ্যাভ্যাস ও আবাসস্থলের ক্ষতি একটি আন্তঃসম্পর্কীয় ঘটনা।
প্রতি বছর ২ দশমিক ৭ থেকে ২ দশমিক ৯ মিলিয়ন টন বর্জ্য উৎপন্ন করে ঢাকা শহর। এর প্রায় ৭০ শতাংশই খাদ্য-সম্পর্কিত জৈব বর্জ্য। যেহেতু শহরে এত বর্জ্য উৎপাদন হয় সেহেতু ভুবন চিলের খাদ্যের অভাব হওয়ার কথা না। তবে আগে এলোমেলোভাবে বর্জ্য ফেলা হতো, এখন সেগুলো কয়েকটি নির্দিষ্ট সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন ও ল্যান্ডফিলে ফেলা হয়।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন অধ্যাপক জামান। তিনি বলেন, “দেখা গেছে, এসব ডাম্পিং সাইট ও আশপাশের এলাকায় কোনো বড় গাছ নেই। একারণে ভুবন চিলকে খাবারের সন্ধানে লম্বা সময় ধরে উড়তে হয়। এজন্য তাদের আরো বেশি শক্তির দরকার হয়।”
২০২১ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ঢাকা শহরের নগরায়ন ৮২ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায়, ৫৬ শতাংশ গাছপালা হারিয়ে গেছে।

প্রতিকূল আবহাওয়া
আবাসস্থলের ক্ষতি এবং খাদ্য ঘাটতির মুখোমুখি পাখিদের ক্লান্ত করে তুলতে অন্যতম উদ্বেগের বিষয় হলো, ভারী বৃষ্টিপাত ও তাপপ্রবাহের মতো চরম আবহাওয়া।
সাধারণত বৃষ্টিপাতকে পাখিদের খাদ্য সংগ্রহে বাধা হিসেবে দেখা হয়, আর তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে প্রায়শই ইতিবাচক মনে করা হয়। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিকূল আবহাওয়া প্রায়শই ভুবন চিলের খাদ্য সংগ্রহের ক্ষমতাকে হ্রাস করে। চরম আবহাওয়ায় তাদের খাদ্যের প্রাপ্যতা কমে যায় এবং প্রজননেও এর প্রভাব পড়ে।
২০২৪ সালের ২৭ মে, ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে ঢাকা শহরে ভারী বৃষ্টিপাত হয়। সে সময় শ্যামলীর একটি হাসপাতালের বাগানে পাওয়া যায় গাছ থেকে পড়ে যাওয়া একটি ভুবন চিল। হাসপাতালের কর্মী শফিকুল ইসলাম পাখিটিকে উদ্ধার করে বাড়ি নিয়ে যান। তিনি চেষ্টা করেন পাখিটির যত্ন নেয়ার।
শফিকুল জানান, বৃষ্টিতে সম্পূর্ণ ভিজে গিয়েছিল পাখিটি, হাঁটতে ও উড়তে পারছিল না। তার বাড়িতে পানি ও খাবার খাচ্ছিল না। পাখিটির অবস্থার অবনতি হওয়ায় তিনি বন বিভাগের সাহায্য চেয়েছিলেন। পরের দিন বন্যপ্রাণী পরিদর্শকরা অসুস্থ পাখিটিকে নিজেদের হেফাজতে নেন। তারা পাখিটিকে রোদে সম্পূর্ণ শুকিয়ে নিয়ে প্রয়োজনীয় তরল এবং খাবার খেতে দেন।
এর আগে, ৩০ এপ্রিল বন বিভাগের কর্মীরা বনানীর একটি আবাসিক এলাকা থেকে পানিশূণ্যতায় ভোগা একটি ভুবন চিল উদ্ধার করেন। এর আগের দিন, ঢাকার তাপমাত্রা ছিল ৪০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটি ছিল ৫৯ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেকর্ড।
প্রতিবেশী দেশ ভারতের দৈনিক সংবাদপত্র Hindustan Times ২২ মে,২০২৪ তারিখে এক প্রতিবেদনে জানায়, নয়াদিল্লীতে ভুবন চিলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। এদিকে প্রচণ্ড গরমে পাখিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ভুবন চিল। ভারতের একটি সংরক্ষণ সংস্থা Wildlife SOS জানায়, উঁচুতে উড়তে দেখা যায় এমন চিলগুলো প্রায়শই নামার সময় হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে পড়ে যায়।

বিষাক্ত খাবার
বাসস্থানের অবনতি ও চরম আবহাওয়ার পাশাপাশি খাদ্যের অভাব এবং বিষাক্ত খাবার গ্রহণও ঢাকার ভুবন চিলদের জন্য বড় ধরনের হুমকি হতে পারে।
এই মাংসাশী শিকারি পাখিদের খাদ্যাভ্যাস খুবই বিস্তৃত। বিচিত্র প্রজাতির প্রাণী খায় এসব পাখি। এদেরকে কীটপতঙ্গভোজী, মৎস্যভোজী এবং ময়লাখেকো হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কিছু বাংলাদেশী গবেষক ঢাকার ভুবন চিলদের খাদ্য গ্রহণ বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, তারা সাধারণত মুরগির নাড়িভুঁড়ি ও মৃতদেহের পাশাপাশি গরুর এবং মাছের পচা মাংস, মানুষের ফেলে দেয়া খাবার এবং ভাগাড়ের আবর্জনা খায়। অন্যান্য অঞ্চলে, তারা আবর্জনা ছাড়া পোকামাকড়, ইঁদুর, মাছ, অন্যান্য পাখির ছানা এবং কেঁচো শিকার করে খায়।
বন বিভাগের বন্যপ্রাণী পুনর্বাসন কেন্দ্র Sheikh Kamal Wildlife Center এর পক্ষীবিদ আল্লামা শিবলী সাদিকের ধারণা, বিষাক্ত খাবার খেয়েও অসুস্থ হতে পারে ভুবন চিল। তিনি বলেন, “প্রায়শই, কীটনাশকের প্রভাবে পোকামাকড় এবং ইঁদুর মারা যায়। এছাড়া ভাইরাল জ্বরে মুরগির ছানা মারা যায় এবং সমস্ত মৃত প্রাণীর জায়গা শেষমেষ ভাগাড়েই হয়।”
তবে আল্লামা শিবলী সাদিক মঙ্গাবেকে বলেন, “বিষাক্ত খাবার খাওয়ার পরিণতি বোঝার জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন।”
ভুবন চিলের সংখ্যা কমে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ
যদিও ঢাকায় ভুবন চিলের ওপর বিস্তৃত গবেষণা ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের অভাব রয়েছে, বিশেষজ্ঞরা লক্ষ্য করেছেন যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে ভুবন চিলের সংখ্যা।
২০১৫ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে করা একটি জরিপে, ঢাকায় প্রায় ১৩ হাজার ভুবন চিলের আনুমানিক সংখ্যা হিসাব করা হয়েছে। ২০১৭ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৮ সালের জানুয়ারির মধ্যে আরেকটি জরিপে একই শহরে ভুবন চিল পাওয়া গেছে প্রায় ৮২৫টি।
প্রাণিবিদ্যার অধ্যাপক জামান বলেন, “আমার ধারণা, ঢাকায় ভুবন চিলের বর্তমান সংখ্যা কয়েক দশক আগের তুলনায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। আবাসস্থল কমে যাওয়ায় এসব পাখিরা হয়তো অন্য কোথাও চলে গেছে। ”
IUCN এর ২০১৫ সালের Red List of Bangladesh অনুসারে, ভুবন চিল `Least Concern’ প্রজাতি হলেও অধ্যাপক জামান এ বিষয়েও সতর্ক করে বলেন, সংরক্ষণের প্রচেষ্টা না করা হলে ঢাকায় পাখিটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, ভুবন চিল কেন গুরুত্বপূর্ণ? উত্তরটি হলো, শহরের ময়লা পরিষ্কারে এ প্রজাতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা আবর্জনা পরিষ্কার করে এবং সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধে সহায়তা করে।
অধ্যাপক জামান বলেন, পর্যাপ্ত সংখ্যক ভুবন চিল শহরের ডাম্পিং সাইটের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জৈব বর্জ্য খেয়ে ফেলতে সক্ষম। এর ফলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চাপ অনেকটা কমে আসে।
এই অবদানের গুরুত্ব তুলে ধরে অধ্যাপক জামান ঢাকায় বিদ্যমান ভুবন চিলের আবাসস্থল, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও আশেপাশের পার্কগুলোর বড় গাছগুলো সংরক্ষণে পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানান।
ব্যানার ইমেজ: কনক্রিটের জঙ্গলে উপযুক্ত বাসা খুঁজে পেতে সংগ্রাম করতে করতে ক্লান্ত ভুবন চিলের ডানায় নেমে আসে অবসন্নতা।
সাইটেশন:
Hasan, A.M.M.K. Abedin, A.K.Sarker & H. Naner(2021). Roosting of black kites (Milvus migrans) in Dhaka Metropolis, Bangladesh. Taprobanica, The Journal of Asian Biodiversity, v10i1.252. doi:10.47605/tapro.v10i1.252
Haque, M. A., Ahammed, R., Monirujjaman., Islam, M. A., Khan, M. N. H., Rayan, S. A., Khan, M. M. H., & Kabir, M. M. (2021). Population status and feeding behavior of black kite (Milvus migrans) in Dhaka city, Bangladesh. Jahangirnagar University Journal of Biological Sciences, 9(1-2), 35–48. doi:10.3329/jujbs.v9i1-2.53705
Sergio, F. (2003). From individual behaviour to population pattern: Weather-dependent foraging and breeding performance in black kites. Animal Behaviour 66(6):1109-1117. doi:10.1006/anbe.2003.2303
Nawar, N., Sorker, R., Chowdhury, F. J. and Rahman, M. M. (2022). Present Status and Historical Changes of Urban Green Space in Dhaka City, Bangladesh: A Remote Sensing Driven Approach. Environmental Challenges Volume 6. Elsevier. doi:10.1016/j.envc.2021.100425
Hille, S and Thiollay, Jean-marc. (2001). Bird Conservation International, Volume 10, Issue 4, pp. 361 – 369. Cambridge University Press. doi:10.1017/S0959270900000319
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে গ্লোবাল– এ, ২০২৪ সালের ১০ জুন।