- ভারতের সুন্দরবন অঞ্চলে অনিয়মিত আবহাওয়া ও বিশ্বজুড়ে চিংড়ির বাড়তি চাহিদার কারণে ঐতিহ্যবাহী কৃষি থেকে সরে চিংড়ি চাষে জড়িয়ে পড়েছেন কৃষকদের বড় একটি অংশ।
- চিংড়ি চাষের এই উল্লম্ফন বিপর্যয় ডেকে এনেছে স্থানীয় জনজীবনে। অধিকাংশ কৃষকদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে তাদের ঐতিহ্যবাহী কৃষিভিত্তিক জীবিকা থেকে।
- বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও কারিগরি প্রশিক্ষণ ছাড়া চিংড়ি চাষ, দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ ও সমাজে বিরূপ প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা।
এক পাশে বিশাল চিংড়ি চাষের জলাভূমি আর অপর পাশে ঝুপড়ি ঘরের সারি । ভিন্ন ভিন্ন এই দুটি চিত্রকে আলাদা করেছে ছয় ফুট চওড়া সরু একটি পথ। পশ্চিমবঙ্গ সুন্দরবনের নগেন্দ্রপুর নামে এই গ্রামটি বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভভুক্ত (SBR) এলাকা। ঝুপড়ি ঘরগুলোর ঘরের একটিতে থাকেন রওশনআরা পিয়াদা, তার স্বামী সাইদুল্লা পিয়াদা, এবং তাদের তিন সন্তান।
মঙ্গাবে যখন রওশনআরার সঙ্গে কথা বলেন, তখন তিনি মাছের ঘেরের পাশে একটি মিঠা পানির পুকুরে বাসন মাজছিলেন। তার বয়স ৩১ বছর। তিনি বলেন, “প্রতিবার বৃষ্টি হলেই, মাছ চাষের ঘের থেকে লবণাক্ত পানি উপচে পড়ে আমাদের ঘরে ঢুকে যায়।”
“আগে আমরা এই জমিতেই কৃষি কাজ করতাম, তবে চিংড়ি চাষ শুরু হওয়ার পর থেকে জীবিকা চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে,” বলেন তার স্বামী সাইদুল্লা। দূরের চিংড়ি চাষের ঘেরগুলোর দিকে আঙুল নির্দেশ করে দেখান তিনি বলেন, “ঘেরের ওই প্রান্তেই প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ মিটার (১,৯৭০–২,৩০০ ফুট) দূরে সবুজ রেখার মতো গাছপালা দেখা যায়, ওগুলোই ম্যানগ্রোভ গাছ। এক সময় আরও কাছে ছিল এটি, তবে এই চিংড়ি চাষিরা প্রতি বছর সেগুলো ধ্বংস করে চলেছে।”
যে জমিতে এক সময় তারা কাজ করতেন, সেই জমিই আজ থেকে প্রায় দশ বছর আগে চিংড়ি ঘেরে রুপান্তর হয়। আর এই রুপান্তর এখন এই অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান এক প্রবণতা। জমির মালিকরা জমিগুলো মাছ চাষী উদ্যোক্তাদের কাছে লিজে দেন, আর সেখানে কাজ করেন তাদের নিজস্ব শ্রমিক। ফলে সাইদুল্লা, রওশনআরা ও তাদের প্রতিবেশীরা কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন।
“প্রতি মৌসুমের শুরুতে যখন ঘেরে আবার পানি তোলা হয়, তার আগে জমি চাষ বা পাড় বাঁধানোর কাজে আমাদের ডাকা হয়,” বলেন ৪৮ বছর বয়সী সাইদুল্লা। “মাছ চাষীরা এখন ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করায় সেই কাজও ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে,” বলেন রওশনআরা।
এই রাজ্যের নগেন্দ্রপুর গ্রামের মত সুন্দরবনের অন্যান্য এলাকার মানুষের অভিজ্ঞতার গল্প একই। সুন্দরবনের বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ (SBR), যা পশ্চিমবঙ্গ ও প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশে বিস্তৃত। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এটি, যা গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর মিলনস্থলে অবস্থিত এবং বঙ্গোপসাগরের কিনারে বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ গঠন করেছে।

কৃষি থেকে মৎস্যচাষে রূপান্তর
এক সময় পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন অঞ্চলে জীবিকা হিসেবে কৃষিকাজ ও লবণাক্ত পানির মাছচাষ পাশাপাশিই চলতো। তবে অকাল বৃষ্টি, তাপমাত্রা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি আর বারবার ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে কৃষিকে। ফলে বিকল্প হিসেবে এখন লবণাক্ত পানির মাছ চাষই এই অঞ্চলের প্রধান জীবিকা হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।
চিংড়ির ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক চাহিদা এই পরিবর্তনকে আরও বেশি উৎসাহিত করেছে। বিশ্বের অন্যতম বড় চিংড়ি রপ্তানিকারক দেশ ভারত। যেখানে আন্ধ্রপ্রদেশ ভারতে সবচেয়ে বড় চিংড়ি উৎপাদনকারী রাজ্য, সেখানে পশ্চিমবঙ্গ, বিশেষ করে সুন্দরবন অঞ্চল, বাগদা চিংড়ি প্রজনন ও উৎপাদনে শীর্ষস্থান দখল করে আছে।
স্প্রিঙ্গার প্রকাশিত “Environment, Development, and Sustainability” জার্নালে ২০২১ সালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্র অনুযায়ী, সুন্দরবন অঞ্চলে চিংড়ি চাষের মোট জমির পরিমাণ ১৯৯৯ সালে ছিলো ৩১,৭৯৪ হেক্টর (৭৮,৫৬৪ একর বা সম্পূর্ণ SBR-এর ৩.৫৯%)। যা ২০১৯ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১,৫৮৭ হেক্টরে (১,২৭,৪৭৪ একর বা সম্পূর্ণ SBR-এর ৫.৮২%)। এই সময়ের মধ্যে কৃষিজমি থেকে মৎস্য চাষে ভূমি ব্যবহারের বড় ধরনের রূপান্তর ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হয় গবেষণাটিতে। অর্থাৎ ১৯৯৯ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে প্রায় ১০,৫৩৬ হেক্টর (SBR-এর কৃষিজমির ৩.৭১%) কৃষিজমি রূপান্তরিত হয় চিংড়ি ঘেরে, এবং ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে অতিরিক্ত আরও ১৩,৪৭১ হেক্টর (SBR-এর কৃষিজমির ৬.০২%) জমি কৃষি থেকে মাছ চাষের ঘেরে পরিবর্তিত হয়।
এর পাশাপাশি, ১৯৯৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে কাঁদামাটির চর (mudflat) ও কিছু ম্যানগ্রোভ অঞ্চল থেকে প্রায় ৩,৩২০ হেক্টর (৮,২০৩ একর) জমি চিংড়ি ঘেরে রূপান্তর হয়। অর্থাৎ এই স্থানগুলোও ধীরে ধীরে মাছ চাষের আওতায় চলে আসে।
স্প্রিঙ্গার প্রকাশিত জার্নালের সহকারি লেখক অভ্র চন্দ্র জানান, মিঠা পানির প্রবাহের ধরণে ধারাবাহিক পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়- এসব কারণে বদলে যাচ্ছে সুন্দরবনের সামাজিক ও পরিবেশগত প্রেক্ষাপট।” “মাটির গুণগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হওয়ায় ফসল উৎপাদন এবং চাষের ধরণও প্রভাবিত হয়েছে” মনে করেন অভ্র।
আন্তর্জাতিক জার্নাল অব বায়োরিসোর্স সায়েন্সে প্রকাশিত ২০২৩ সালের একটি প্রবন্ধ অনুযায়ী, ২০০৯ সালের আইলা ঘূর্ণিঝড়ের পর সুন্দরবনের কৃষি ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ২০২০ সালের অতি উচ্চ মাত্রার ঘূর্ণিঝড় আমফানও প্রায় ১৭,৮০০ হেক্টর কৃষিজমিকে কয়েক বছরের জন্য অনাবাদি করে ফেলে বলে ধারণা করা হয়।
বিশ্বব্যাপী উচ্চ চাহিদার কারণে ভারতের বহু প্রতিষ্ঠান এখন চিংড়ির পোনা, খাবার ও ওষুধ বিক্রি করছে, ফলে দ্রুত লাভের আশায় স্থানীয়রা নিয়ন্ত্রণহীন মাছ চাষে জড়িয়ে পড়ছে বলে দাবি করছেন বিশেষজ্ঞরা।

চিংড়ি ও অন্যান্য মাছের (ফিনফিশ) মিশ্র চাষ বা আধা লবণাক্ত পানির পলি কালচার হলো সুন্দরবন জীববৈচিত্র সংরক্ষণ এলাকার (SBR) সবচেয়ে বেশি প্রচলিত মাছ চাষ পদ্ধতি। তবে প্রাকৃতিক কারণগুলো থাকা সত্ত্বেও, সুন্দরবনের স্থানীয় মানুষের জন্য এই আধা লবণাক্ত পানির মাছ চাষের রূপান্তরটি সম্পূর্ণ স্বতঃস্স্ফুর্ত ছিল না।
চিংড়ি চাষের অন্ধকার দিক
রওশনআরা, তার স্বামী এবং তাদের প্রতিবেশীরা যে জমিতে এক সময় চাষ করতেন, সেটি সরকারের মালিকানাধীন যা স্থানীয়দের লিজ দেওয়া হয়। “স্থানীয় শাসক দলের নেতাদের আশীর্বাদে ওই জমির তথাকথিত মালিক সেখানে চাষের অনুমতি পায়,” বলেন স্থানীয় পরিবেশকর্মী অপূর্ব দাস।
দাশ আরো বলেন “২০১১ সালে সরকার পরিবর্তনের পর এবং ঘের করে মাছ চাষের (aquaculture) প্রবণতা বাড়তে থাকায়, শাসক দলের স্থানীয় নেতারা এই জমিটিকে চিংড়ি চাষের জন্য জলাভূমিতে পরিণত করেন।”
“রওশনআরা ও তার স্বামীর মতো কৃষি শ্রমিকরা যেহেতু ঘেরের চাষে দক্ষ ছিলেন না, তাই চিংড়ি চাষীরা এলাকার বাইরে থেকে শ্রমিক জোগার করে কাজ করাতে শুরু করেন।”
একই রকম গল্প গোটা সুন্দরবন জুড়েই শোনা যায়, যেখানে অনেকেই অভিযোগ করেন, তারা তাদের ঐতিহ্যবাহী জীবিকার উৎসের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন এবং তাদের জমি চিংড়ি চাষের জন্য কেড়ে নেওয়া হয়।
সম্প্রতি ভূমি দখলের সঙ্গে জড়িত স্থানীয় শাসক দলের এক নেতার দুই সহযোগীর গ্রেপ্তার, সুন্দরবন জীববৈচিত্র সংরক্ষণ অঞ্চলের (SBR) পরিস্থিতিকে স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে আসে। সেখানে প্রভাবশালী ভূমি মাফিয়ারা বেআইনিভাবে চিংড়ি চাষ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে- যা এই অঞ্চলের অর্থনীতি ও রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
মঙ্গাবের সঙ্গে বহু কৃষক কথা বলেছেন, যারা দাবি করেন স্থানীয় ভূমি মাফিয়ারা তাদের জমি দখল করে নিয়েছে। এদের মধ্যে ভূমিহারা কৃষক জগন্নাথ সিংহ, তার বয়স ৫৬, বয়ারমারি গ্রামের বাসিন্দা তিনি। তার ছিল দশমিক ২ হেক্টর (অর্থাৎ প্রায় আধা একর) জমি, যেখানে তিনি ধান চাষ করতেন। জগন্নাথ এবং তার প্রতিবেশীরা তাদের ছোট ছোট জমির টুকরোগুলো একত্র করে মোট দশমিক ৯ হেক্টর (প্রায় ২.২ একর) জমি লিজ দেন একজন বিনিয়োগকারীকে, যিনি চিংড়ি চাষ শুরু করতে চেয়েছিলেন। প্রথম দুই বছরের জন্য তারা প্রতি হেক্টরে ৭৫,১৮৭ রুপি হারে লিজের টাকা পান। “তবে দুই বছর পর বিনিয়োগকারী আমাদের জানালেন, ওই দশমিক ৯ হেক্টর জমির মালিকানা বদলে গেছে,” বলেন জগন্নাথ সিংহ।
“এবং তিনি ঠিকই বলেছিলেন, কারণ সরকারি দপ্তরের নথিতে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, আমাদের জমির মালিক স্থানীয় শাসক দলের এক নেতা। বহুবার আবেদন করার পরও এখনো আমি আমার জমিতে ফিরতে পারিনি, আর গত দুই বছরের ভাড়াটাও পাইনি,” জানান ক্ষুব্ধ এই কৃষক।
চিংড়ি চাষে কেনো জড়াননি এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “চিংড়ি চাষের জন্য প্রচুর বিনিয়োগ দরকার। আমি ছোট কৃষক, আমার কাছে এত মূলধন ছিল না।” সিংহের প্রতিবেশী অমর সিংহেরও পরিণতি একই। অমর একজন বর্গাচাষি, অর্থাৎ ভূমি সংস্কারের কারণে তিনি এমন এক জমিতে বংশানুক্রমিক অধিকার পেয়েছিলেন যার মালিক ছিলেন অন্য কেউ। সেই অধিকার অনুযায়ী তিনি জমিতে কাজ করে উৎপাদনের একটি অংশ পাওয়ার কথা ছিল। তবে এখন তিনি কিছুই পান না। একদিন হঠাৎই জানতে পারেন, জমিটির মালিকানা বদলে গেছে।
কিছু কৃষক, যারা মুনাফার সম্ভাবনা দেখে এবং স্থানীয় ডিলারদের আশ্বাসে চিংড়ি চাষে নেমেছিলেন, এখন তারা তাদের সিদ্ধান্তের জন্য অনুশোচনা করছেন।
আর একটি কৃষি পরিবার- কল্পনা মালো এবং তাঁর স্বামী ননি গোপাল মালোর প্রায় ২ হেক্টর (৪.৯ একর) জমি রয়েছে। “আমরা পাঁচ বছরের এক চুক্তির অধীনে পুরো জমির মধ্যে ১ দশমিক ৪৬ হেক্টর (৩.৬ একর) জমি চিংড়ি চাষের জন্য রূপান্তর করি,” বলেন ৩৬ বছর বয়সী কল্পনা মালো।
“আমরা চিংড়ির লার্ভা, খাবার এবং ওষুধ বিক্রি করে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় ডিলারের সঙ্গে চুক্তি করেছিলাম। তিনি আমাদের জমির পাশে আরও কয়েকটি জমি জোগাড় করে বিশাল এক মাছের খামার শুরু করেন। ডিলার নিজস্ব কর্মচারী ও যন্ত্রপাতি নিয়ে আসে। তিনি আমাদের হেক্টর প্রতি ১ দশমিক ১ লাখ টাকা করে দেন। চুক্তিটি ছিলো পাঁচ বছরের। এবং প্রতিষ্ঠানটির ডিলার আমাদের আশ্বাস দিয়েছিল যে পরে জমিটি আবার কৃষিকাজের উপযোগী করে দেবে।”
মালো দম্পতি এবং তাঁদের জমির মালিক ও প্রতিবেশীদের কাছে, দ্রুত বেশি পরিমাণে অর্থ উপার্জনের একটি সহজ উপায় বলে মনে হয়েছিল এটি- যতক্ষণ না তৃতীয় বছরে এক ভাইরাস আঘাত হানে, যা সব মাছের ঘেরে আক্রমণ করে উৎপাদন ধ্বংস করে দেয়। “তারা আমাদের টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেয় এবং ২০২২ সালে জমি পুনরুদ্ধার না করেই তা ফেলে চলে যায়,” বলেন কল্পনা। “পরে আমরা জানতে পারি, তারা ঠিকঠাক বৈজ্ঞানিক নির্দেশিকা মেনে চাষ করেনি। তারা চলে যাওয়ার পর আমরা আবার ধান চাষের চেষ্টা করি, তবে ফলন খুবই খারাপ ছিল।”

ডিলারের খোঁজখবর নিতে গেলে স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েত স্বীকার করেন, কয়েক বছর আগেও এলাকায় চিংড়ি চাষের জালিয়াতির ব্যবসা ছিলো রমরমা। “এখন গ্রামবাসীদের কাছ থেকে আর কোনো অভিযোগ পাইনি। দুঃখের বিষয় হলো, যারা অর্থ হারিয়েছেন তারা এখনো সেই ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারেননি,” অভিযোগ করেন গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান অলোকেশ পুরকায়েত।
জাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ ওশানোগ্রাফিক স্টাডিজের অধ্যাপক ও পরিচালক তুহিন দাস সুন্দরবনের মাছ চাষ পদ্ধতির একটি বড় ত্রুটির দিকে আলোকপাত করেন- তা হলো কারিগরি জ্ঞান ও সঠিক বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণের অভাব।
দাস ব্যাখ্যা করে বলেন, “মাটি ও পানির গুণমান কিংবা রাসায়নিক ব্যবহারের বিষয়ে কারিগরি জ্ঞানের অভাব রয়েছে চাষীদের। তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ঐতিহ্যগত জ্ঞানের ওপর নির্ভর করেন, তবে প্রায়ই কোনো পরিমাপক যন্ত্র ব্যবহার করেন না। কখনও কখনও ভাইরাস সংক্রমণের কারণে তারা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হন, যা দীর্ঘমেয়াদে মাটি ও ঘেরে চাষকে অযোগ্য করে তোলে।”
দাস আরও উল্লেখ করেন, বিশ্বব্যাপী উচ্চ চাহিদার ফলে ভারতের অনেক প্রতিষ্ঠান চিংড়ির লার্ভা, খাদ্য ও ওষুধ বিক্রির ব্যবসায় নাম লিখিয়েছে। এই চাপের সঙ্গে স্থানীযদের দ্রুত মুনাফা অর্জনের আকাংখা মিলিত হয়ে এক ধরনের নিয়ন্ত্রণহীন ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞানবিহীন মাছ চাষে রূপ নিয়েছে এই প্রবণতা।

লবণাক্ততার বাইরেও, ঘেরে চিংড়ি চাষ বাড়ার অন্যতম কারণ মূলত অর্থনৈতিক। ২০২২ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, সুইডেন ও যুক্তরাজ্যের গবেষকদের একটি যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, চিংড়ি চাষের দ্রুত বৃদ্ধির মূল উদ্দেশ্য অর্থনৈতিক লাভ, যা প্রতি হেক্টরে বছরে আনুমানিক ২,০২৩ থেকে ৬,৫৪০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। গবেষণাটি আরও জানায়, নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চিংড়ি চাষের জন্য ভূমি ব্যবহারের ফলে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs)-এর অগ্রগতিতে গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষত SDG ১৫ দশমিক ৩ এবং ১৫ দশমিক ১, যা মরুকরণ রোধ এবং ভূমি ও জলজ প্রতিবেশ সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেয়।
দাস সতর্ক করে বলেন, সুন্দরবনে এই অবৈজ্ঞানিক চিংড়ি চাষের পরিণতি দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বলেন, “চাষের পুকুর থেকে পাশের জমিতে নোনা পানি প্রবেশের ফলে মাটির উর্বরতা কমে যাবে, যা আশপাশের প্রতিবেশের জন্য ক্ষতির কারণও হয়ে উঠবে। এতে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা বিপর্যস্ত হতে পরে।” তিনি আরও বলেন, “এ ধরনের অনিয়মতান্ত্রিক চাষ স্থানীয় প্রতিবেশ ছাড়াও গোটা অঞ্চলের পরিবেশকেই বদলে দেবে এবং যার প্রভাব হবে দীর্ঘস্থায়ী।”
চিংড়ির বিপুল বৈশ্বিক চাহিদা এবং সুন্দরবনের বিশাল চাষযোগ্য সম্ভাবনার কারণে, অবৈজ্ঞানিক ও শোষণমূলক কার্যক্রম আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশংকা রয়েছে। কল্পনা মালো ও জগন্নাথ সিংহের মতো যাদের নিজস্ব জমি আছে, তারা আবার কৃষিকাজে ফিরে যেতে চান। অন্যদিকে রওশনআরা ও তার স্বামী সাইদুল্লা আশা করেন, নোনা পানির পুকুরে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারবেন তারা।
সাইটেশন:
Goodbred, S. L., Paolo, P. M., Ullah, M. S., Pate, R. D., Khan, S. R., Kuehl, S. A., … Rahaman, W. (2014). Piecing together the Ganges-Brahmaputra-Meghna river delta: Use of sediment provenance to reconstruct the history and interaction of multiple fluvial systems during Holocene delta evolution. Geological Society of America Bulletin, 126(11-12), 1495-1510. doi:10.1130/b30965.1
Mitra, A., Zaman, S., & Pramanick, P. (2023). Traditional livelihoods in Sundarban delta. Climate Resilient Innovative Livelihoods in Indian Sundarban Delta, 49-117. doi:10.1007/978-3-031-42633-9_2
Giri, S., Samanta, S., Mondal, P. P., Basu, O., Khorat, S., Chanda, A., & Hazra, S. (2021). A geospatial assessment of growth pattern of aquaculture in the Indian Sundarbans biosphere reserve. Environment, Development and Sustainability, 24(3), 4203-4225. doi:10.1007/s10668-021-01612-9
Mandal, T. K. (2023). Intervention of soil salinity in agriculture of Indian Sundarbans: A review. International Journal of Bioresource Science, 10(1). doi:10.30954/2347-9655.01.2023.12
Giri, S., Daw, T. M., Hazra, S., Troell, M., Samanta, S., Basu, O., … Chanda, A. (2022). Economic incentives drive the conversion of agriculture to aquaculture in the Indian Sundarbans: Livelihood and environmental implications of different aquaculture types. Ambio, 51(9), 1963-1977. doi:10.1007/s13280-022-01720-4
ব্যানার ছবি: মাছ চাষে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে সুন্দরবনের এই ঘেরে। ছবি: নীলাদ্রি সরকার / মঙ্গাবে।
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে-ইন্ডিয়া-তে, ২০২৪ সালের ১৯ জুন।