- সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৮৭ হাজার টন একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক উৎপাদন হয়, এর মধ্যে ৯৬ শতাংশই সরাসরি ফেলে দেওয়া হয় আবর্জনা হিসেবে।
- এই প্লাস্টিক বর্জ্য শহরজুড়ে ছড়িয়ে থাকে মূলত সচেতনতার অভাবে । বিশেষ করে নদী ও খালের ধারে জমা হচ্ছে এগুলো। এরপর তা পানি ও মাটির সঙ্গে মিশে প্রভাব ফেলছে সেখানকার প্রতিবেশ ও খাদ্যশৃঙ্খলে।
- প্রচলিত আইন অনুয়ায়ী বর্তমান সরকার ১ অক্টোবর থেকে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করেছে।
দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই বাংলাদেশের নতুন সরকার ধাপে ধাপে সব ধরনের প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহারে বিধিনিষেধ আনতে যাচ্ছে। এই পদক্ষেপের প্রথম ধাপেই নিষিদ্ধ করা হলো একবার ব্যবহার উপযোগী প্লাস্টিক সামগ্রী।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট নাগরিক সমাজের অরাজনৈতিক প্রতিনিধিরা একটি অন্তবর্তী নির্দলীয় সরকার গঠন করেন। এর আগে ৫ আগস্ট নানা অনিয়মের প্রতিবাদে গণবিক্ষোভের মুখে দেশ ছাড়েন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর মন্ত্রিসভার বেশিরভাগ সদস্য।
নতুন সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান মঙ্গাবে-কে বলেন, “প্রথম ধাপে আমরা সুপার শপ/মুদি দোকান থেকে পলিথিনের তৈরি ব্যাগের ব্যবহার নিষিদ্ধ করছি। ধীরে ধীরে সম্ভাব্য সব ধরনের ব্যবহার বন্ধ করবো।”
তিনি আরও বলেন, “২০০২ সাল থেকেই প্লাস্টিক পণ্য/প্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধে আমাদের আইন আছে। তবে তা বাস্তবায়ন হয়নি। পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষায় বর্তমান সরকার আইন বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ২০০২ (সংশোধিত)–এর ধারা ৬(এ) অনুযায়ী, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় পলিথিনের তৈরি পণ্য, যেমন একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ব্যাগ ও পানির বোতল উৎপাদন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাখে।
এই আইন অমান্যকারীদের আর্থিক জরিমানা বা কারাদণ্ড দেয়ার বিধান রয়েছে।
আইন বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ১ অক্টোবর থেকে মুদির বাজারে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ব্যাগ নিষিদ্ধ হয়েছে। সরকারি দপ্তরগুলোও মেনে চলছে এই নিষেধাজ্ঞা। প্লাস্টিক পণ্যের বদলে কাঁচ বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে দপ্তরগুলোতে।
এর আগে গত ২৮ আগস্ট ১৭ ধরনের প্লাস্টিক পণ্যকে একবার ব্যবহারযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার, যেগুলো ধাপে ধাপে বন্ধ করা হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, ১ নভেম্বর থেকে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার বন্ধে অভিযানে নামবে তারা। এ সময় পণ্য জব্দ ছাড়াও উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়া হবে বলে জানানো হয়।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৮৭ হাজার টন একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সামগ্রী উৎপাদন হয়, যার মধ্যে ৯৬ শতাংশই ফেলে দেওয়া হয় বর্জ্য হিসেবে।
কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০২১ এবং বাধ্যতামূলক পাটজাত মোড়ক আইন ২০১০—এই দুটি আইন, ব্যবহৃত প্লাস্টিকের পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যাগ ব্যবহারে উৎসাহিত করার মাধ্যমে প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার কমানোর সুযোগ করে দেয়। পরিবেশ ও প্রতিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাবের কথা বিবেচনা করে ২০২১ সালে, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ধাপে ধাপে বন্ধের নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট।
তবে এসব আইন কার্যকর হয়নি। উল্টো প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহারের মাত্রা এমন অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নদী, খাল ও মাটিতেও মিশে গেছে এই উপাদান। গবেষকরা বলছে অতিমাত্রায় প্লাস্টিক দূষনের কারণে কৃষি উৎপাদন, মাছ ও শস্যে প্লাস্টিকের কণা খুঁজে পেয়েছেন তারা, যা খাদ্যশৃঙ্খলে চরম প্রভাব ফেলছে।

একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বন্ধে বিকল্প ব্যবস্থা প্রচার
২০১০ সালে করা বাধ্যতামূলক পাটজাত মোড়ক আইন অনুযায়ী- ধান, চাল, গম, সার ও চিনিসহ ১৯টি পণ্যের মোড়কে প্লাস্টিকের বদলে পরিবেশবান্ধব পাটের বস্তা ব্যবহার করার কথা। তবে নজরদারির অভাব এবং বাজার চাহিদার তুলনায় পাটজাত বস্তার স্বল্পতার কারণে, আইনটি কার্যকর হয়নি। যদিও আইন অমান্যের জন্য মোটা অংকের আর্থিক জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার পরিসংখ্যান উল্লেখ করে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) জানিয়েছে, বছরে ১৬ লাখ টন উৎপাদন নিয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাট উৎপাদনকারী দেশ বাংলাদেশ।
২০১৭ সালে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি) একবার ব্যবহারযোগ্য পলিথিন ব্যাগের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব পাটজাত ব্যাগ সামনে আনে। বাজার চাহিদা মেটাতে এসব ব্যাগ উৎপাদনে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের নির্দেশ দেয় সরকার।
এক গবেষণা বলছে, ২০২০ সালে বাংলাদেশের শহর এলাকায় মাথাপিছু প্লাস্টিকের ব্যবহার দেখা যায় ৯ কেজি, যা ২০০৫ সালে ছিলো ৩ কেজি। রাজধানী ঢাকা, যা বিশ্বের জনবহুল (জনসংখ্যা ১ কোটি ৬৫ লাখের বেশি) শহরগুলোর একটি; ২০২২ সালে সেখানে মাথাপিছু প্লাস্টিকের ব্যবহার গিয়ে দাঁড়ায় ২৪ কেজিতে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, যদিও সঠিক তথ্য এখনো নেই, “আমার ধারণা, একবার ব্যবহারযোগ্য পলিথিন ব্যাগের মোট ব্যবহারের প্রায় ৩০ শতাংশই মুদির দোকানে চলে।”
তিনি আরও বলেন, “যদি আমরা সময়মতো পাট ও অন্যান্য পরিবেশবান্ধব উপকরণের তৈরি বিকল্প পণ্য সরবরাহ করতে পারি, তাহলে এই ব্যবহার কমানো সম্ভব।”
ব্যানার ছবি: পুনর্ব্যবহারের জন্য সংগ্রহ করা প্লাস্টিক বর্জ্য বাছাই করছেন দুই কর্মী। ছবি: মুমতাহিনা তন্নি via Pexels
সাইটেশন:
Mim, F. I., Md. J., & Abdullah, M. S. (2024). Plastic tsunami: Bangladesh’s maritime ecosystem under siege. Environmental Forensics, 1-3. doi:10.1080/15275922.2024.2330026
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে গ্লোবাল-এ – এ, ২০২৪ সালের ২ অক্টোবর।