- বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে কয়েক দশক ধরে চলা চিংড়ি চাষ গুরুত্ব হারাচ্ছে। মিঠা পানির সংকটসহ পরিবেশের ওপর নানা নেতিবাচক প্রভাবে, কৃষকরা ধীরে ধীরে আবার ফিরছেন কৃষিকাজে।
- সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উজান থেকে মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, জমিতে লবণাক্ততা ও সামাজিক চাপে প্রায় চার দশক আগে উপকূলীয় কৃষকরা চিংড়ি চাষে ঝুঁকেছিলেন।
- গত কয়েক বছরে মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততা এবং চিংড়ি ঘেরে প্রায়ই ভাইরাসের আক্রমণ কৃষকদের নজর ঘুরিয়েছে কৃষিভিত্তিক চাষবাসে।
- এই পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রেখেছে ফসলের বৈচিত্র। তবে উপকূল জুড়ে মিষ্টি পানির সংকট বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে।
সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক শেখ সিরাজুল ইসলাম, এ বছরের আগস্টে তার চার একর জমিতে আমন ধান রোপণ করেছেন। ভালো ফলনের আশা করছেন তিনি।
দুই দশক বন্ধ রাখার পর, দুই বছর আগে আবার ধান চাষ শুরু করেন তিনি। মাঝের এই সময়টিতে সিরাজুল বাণিজ্যিকভাবে চিংড়ি চাষ করতেন। প্রথম দিকে যা লাভজনক বলে মনে করেছিলেন তিনি। তবে ধীরে ধীরে লোকসানের হার বাড়তে থাকে। ৫৩ বছর বয়সী এই কৃষক, যার পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ধান চাষ করে এসেছে, আবার ফিরে আসেন কৃষিতে ।
সিরাজুল মঙ্গাবে-কে বলেন, ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব চিংড়ি উৎপাদন কমিয়ে দেয়, আর অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে ঘেরের চারদিকের মাটিতেও ফলেনা অন্য ফসল।
তার মতো অনেক প্রান্তিক কৃষক, বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমের সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট জেলায়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব; সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় পুরোনো পছন্দ কৃষিকে আবার বেছে নিচ্ছেন তারা।
আগে শুধু সারা বছর ওই একবার চিংড়ি চাষ করতেন, এর বদলে এখন তারা ভরা বর্ষা মৌসুমে আমন ধান, আর শুষ্ক মৌসুমে তরমুজ, ভুট্টা, সূর্যমুখী ও সরিষার মতো তেলবীজ ছাড়াও নানা সবজি, বোরো ধান ও অন্যান্য ফসল ফলাচ্ছেন। পলিমাটির জমিনের সর্বোচ্চ ব্যবহার করছেন তারা। “যেখানে আগে বেশি লবণাক্ততা ছিল, এখন বর্ষায় সেই জমিতেই ধান আর শুষ্ক মৌসুমে সবজি কিংবা ফল চাষ করি”- বলেন সিরাজুল।
কয়েক বছর আগে, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে একটি গবেষণা পরিচালনা করা হয় উপকূল এলাকায়। উপকূলে চিংড়ি থেকে কৃষিভিত্তিক চাষবাসে রূপান্তর ছিলো গবেষণার বিষয়।
হারুন লক্ষ্য করেন, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা আর আগের মতো নদী থেকে জোয়ার-ভাটার লবণাক্ত পানি ঘেরে ঢুকতে দিচ্ছেন না। “লবণাক্ততা ঠেকিয়ে তারা নিজেদের জন্য ফসল উৎপাদন করছেন। পাশাপাশি প্রায় বিরান হয়ে যাওয়া ভূমিতে সবুজ ফিরিয়ে আনছেন তারা,” বলেন হারুন।


ফসলের বৈচিত্রেই আসে এই রুপান্তর
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বন্যার প্রকোপ, ঘূর্ণিঝড়, ভাঙন ও লবণাক্ততার ঝুঁকি থাকায় বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলে চিংড়ি, মাছ ও কৃষিভিত্তিক জীবিকা সবসময় ঝুঁকিপূর্ণ।
এ অবস্থায় ফসলের বৈচিত্র্য ক্ষুদ্র কৃষকদের এই ঝুঁকির মধ্যেও আশা জাগাচ্ছে। এছাড়া বিরূপ প্রতিবেশে ফসলের সহনশীলতা বাড়ানোর অভিযোজন কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, বৈচিত্রময় ফসল চাষ। যদিও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ফসলের বৈচিত্র্য তুলনামূলকভাবে কম, তবে উপকূলে এর প্রসার ঘটছে বলে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জানা গেছে।
গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা উপকূল সংলগ্ন কয়েকটি এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে গবেষকরা। চিংড়ি চাষ হতো এমন সব এলাকায় নতুন করে কৃষিকাজের প্রবৃদ্ধি লক্ষ করেন তারা। সরকারি কৃষি উৎপাদনের তথ্যও এই গবেষণার সঙ্গে মেলে।
২০১৮-১৯ অর্থবছরের পর থেকে এখন পর্যন্ত খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় আমন ধান উৎপাদন বেড়েছে ১১ থেকে ১৪ শতাংশ। ।
খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে উপকূলের তিন জেলায় সবজি উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৫০ ভাগ। একই সঙ্গে ২০১৮-১৯ সালের তুলনায় ২০২২-২৩ সালে সূর্যমুখী, সরিষা ও ভুট্টা উৎপাদনও বেড়েছে। আর এসব তেলবীজ উৎপাদনের শীর্ষে রয়েছে খুলনা জেলা।
গত পাঁচ বছরে খুলনা ও সাতক্ষীরায় ফল উৎপাদন বেড়েছে যথাক্রমে ১৯৭ ও ১১৪ শতাংশ। আর তরমুজ উৎপাদন তিন জেলায় বেড়েছে ৬ থেকে ১০ গুণ । তরমুজের পাশাপাশি আম, নারকেল, পেয়ারা ও কলাও এখন এসব অঞ্চলের অর্থকরী ফসল হিসেবে বিবেচিত।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অঞ্চলে ধান ও সবজির মিশ্র চাষের প্রবণতা বাড়তে দেখছেন বলে জানান গবেষকরা।
সবজিগুলোর মধ্যে রয়েছে মূলা, বেগুন, টমেটো, শিম, মটরশুঁটি, ওলকপি, সজনে, ফুলকপি, বাঁধাকপি, কাঁচাকলা, গাজর, ঢেঁড়স, আলু, কচু, বিভিন্ন ধরনের শাক ছাড়াও রয়েছে লাউ, ঝিঙা, পটল, কাঁকরোল, করলা, কুমড়ো ও শসা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগের প্রধান বিভাস চন্দ্র সাহা বলেন, ক্ষুদ্র কৃষকরা কৃষিজমিকে জীবিকার একমাত্র অবলম্বন মনে করেন এবং অনেকেই আর লবণাক্ত পানি ঢুকিয়ে পুরো বছরের কৃষি নষ্ট করতে চান না।
“ফসলের বৈচিত্র্য আর উৎপাদন বাড়ার মধ্যে কৃষকদের প্রবল ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছে,” বলেন বিভাস।

লবণাক্ততাই যেখানে জীবিকার পথ ঠিক করে
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে কৃষির প্রধান শত্রু লবণাক্ততা। ষাটের দশকে কৃষিজমিতে লবণাক্ততা ঠেকাতে ডাচ পদ্ধতিতে পোল্ডার বা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিলো, যা শুরুতে কার্যকর ছিলো।
সত্তরের দশকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ফারাক্কায় বাঁধ দেয়ার ফলে লবনাক্ততার সমস্যা প্রবল হয়ে ওঠে। বাঁধের ফলে গঙ্গা নদীর পানিপ্রবাহ কমে যায়। বাংলাদেশ ভাটির দেশ হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে কমতে থাকে নদ-নদীর পানি। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষির প্রাণ হিসেবে বিবেচিত গড়াই, কপোতাক্ষ, পশুর ও শিবসা নদীতে একবারেই কমে যায় পানি।
এরপর আশির দশকে শুরু হয় চিংড়ির বাণিজ্যিক চাষ। যা লবণাক্ততার কারণে ধুকতে থাকা কৃষককে ধান থেকে চিংড়িতে ঠেলে দেয়। খুলনার দাকোপের কৃষক নির্মল গায়েনও লবণাক্ত পানি ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে চিংড়ি চাষে যান।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বন্যার প্রকোপ বাড়ায় ও ভাইরাস আক্রমণে চিংড়ি চাষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
“শেষবার চিংড়ি চাষে আমি যা বিনিয়োগ করেছি তার অর্ধেক ফেরত পেয়েছিলাম। ভাইরাসের ক্রমাগত আক্রমণে লোকসান হয়,” বলেন নির্মল, যিনি কয়েক বছর আগে ধান-তরমুজের লাভজনক চাষ শুরু করেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, ধান-তরমুজ চাষ, চিংড়ি চাষের চেয়ে বেশি লাভজনক।
পরিসংখ্যাণ অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে খুলনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরগুনা ও নোয়াখালী জেলা মিলিয়ে প্রায় ৩০ হাজার টন চিংড়ি উৎপাদন হয়।
তবে ২০২২-২৩ সালে উৎপাদন ৭ শতাংশ কমে আসে, আর চিংড়ি চাষের জমি প্রায় ৫ ভাগ কমে। শুধুমাত্র খুলনাতেই চিংড়ি চাষ কমেছে ৮ ভাগ।

বছর জুড়ে মিঠা পানির সংকট কৃষিকাজের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ
দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের মানুষ মূলত বর্ষাকালে মিঠা পানি সংগ্রহ করেন।
গবেষণায় দেখা যায়, এই অঞ্চলে উপরিতলের পানিতে লবণাক্ততা সবসময় বেশি থাকে এবং গ্রীষ্মকালীন ফসল চাষের সময়-ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে, এর পরিমাণ থাকে সর্বোচ্চ।
বর্ষা শেষে কৃষকরা অস্থায়ী বাঁধ দিয়ে পার্শ্ববর্তী নদীর সঙ্গে খালের সংযোগ বন্ধ করে দেন, যাতে লবণ পানি ঢুকতে না পারে। সংরক্ষিত পানি পরে শুষ্ক মৌসুমে সেচ কাজে ব্যবহার হয়।
তবে সিরাজুল বলেন, “গ্রীষ্মে এখানে তীব্র পানি সংকট থাকে। পুকুর-খালে বৃষ্টির সময় যতটুকু পানি মজুদ করা হয়, তা ফসলের সেচে ব্যবহার করি। কিন্তু কখনো কখনো সেটাও কম পড়ে যায়।”
ইউনিভার্সিটি কলেজ অব লন্ডনের ঝুঁকি ও দুর্যোগ প্রশমন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ শামসুদ্দোহা বলেন, লবণাক্ততা এখনো বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার মাটি ও পানির জন্য হুমকি।

তিনি মনে করেন, টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা ও কৃষি উৎপাদন বাড়াতে বর্ষায় বৃষ্টির পানি ধারণের জন্য খাল ও ছোট নদী আবার খনন কিংবা নতুন খাল খনন করা জরুরি।
এছাড়া, তাঁর মতে অভিযোজন কৌশলে, মৌসুমভিত্তিক মাটি ও নদীর পানির লবণাক্ততার পরিবর্তন এবং ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুমি প্রভাব মোকাবিলার বিষয়ও থাকতে হবে, যাতে টেকসই অভিযোজন নিশ্চিত করা যায়।
শামসুদ্দোহা বলেন, “সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লোনা পানি প্রবেশের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কমাতে এই কৌশলগুলোর ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ, নিয়মিত মূল্যায়ন ও প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করা জরুরি।”
ব্যানার ছবি: ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় তরমুজ উৎপাদন ৬ থেকে ১০ গুণ বেড়েছে। ছবি: নূর এ. আলম
সাইটেশন:
Wadud, J., & Chowdhury, A. H. (2018). A Study on Changing of Farming from Shrimp to Rice in Coastal Bangladesh: Adaptation, Economic Evaluation and Impact of Women. doi:10.13140/RG.2.2.26132.83849
Bernzen, A., Sohns, F., Jia, Y., & Braun, B. (2023). Crop diversification as a household livelihood strategy under environmental stress. Factors contributing to the adoption of crop diversification in shrimp cultivation and agricultural crop farming zones of coastal Bangladesh. Land Use Policy, Volume 132. doi:10.1016/j.landusepol.2023.106796
Maniruzzaman, M., Sarangi, S.K., Mainuddin, M., Biswas, J.C., … Mahanta, K.K. (2024). A novel system for boosting land productivity and income of smallholder farmers by intercropping vegetables in waterlogged paddy fields in the coastal zone of the Ganges Delta. Land Use Policy, Volume 139. doi:10.1016/j.landusepol.2024.107066
Anisuzzaman, M., Islam, M. A., Rahman, K. M. M., Shetu, M. S. R. (2015). Shifting from rice production to shrimp culture in coastal zones of Khulna: Determination of the determinants; J. Bangladesh Agril. Univ. 13(2):257–264. Retrieved from https://baures.bau.edu.bd/wp-content/uploads/2017/07/13.13-2-2015.pdf
Islam, M. A., Islam, M. S., & Wahab, M. A. (2016). Impacts of climate change on shrimp farming in the South-West coastal region of Bangladesh. Research in Agriculture Livestock and Fisheries, 3 (1): 227-239. doi:10.3329/ralf.v3i1.27881
Haq, M. I., Shamsudduha, M., Zahid, A., Ahmed, K.M., Kamal, A. S. M. M., & Taylor, R. G. (2024). What drives changes in surface water salinity in coastal Bangladesh? Frontiers, Vol. 6: 1220540. doi:10.3389/frwa.2024.1220540
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে গ্লোবাল-এ – এ, ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর।