- ১৯৯৯ সাল থেকে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের আওতায় জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ ১৩টি এলাকাকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন’ হিসেবে ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ।
- বছরের পর বছর ধরে কয়েকটি প্রকল্পভিত্তিক উদ্যোগ ছাড়া সংকটাপন্ন এলাকা রক্ষায় তেমন সাফল্য নেই। সেইন্ট মার্টিন, টাঙ্গুয়ার হাওর, হাকালুকি হাওর, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত ও সোনাদিয়া দ্বীপের মতো কিছু পর্যটন এলাকার এখন বেহাল দশা।
- জীববৈচিত্র্যপূর্ণ এসব গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রতিবেশ ঠিক রাখতে পর্যটন সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
- প্রথম ধাপেই দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেইন্ট মার্টিন ও বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমিগুলোর একটি টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটন সীমিত হবে।
প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকাগুলো রক্ষার জন্য, সেসব এলাকায় পর্যটকদের বিচরণসহ পর্যটনের সব কার্যক্রম সীমিত করতে যাচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে পর্যটকদের জন্য নতুন নিয়ম ও নির্দেশিকাও তৈরি করা হবে।
দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ হিসেবে সেইন্ট মার্টিন এবং বৃহত্তম জলাভূমির একটি টাঙ্গুয়ার হাওর, যা মাছের প্রজনন এলাকা হিসেবে পরিচিত। শিগগরই এই দুইটি স্থানে প্রথম ধাপে পর্যটন কাজ সীমিত করা হচ্ছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “প্রথমে সেইন্ট মার্টিনে রাতযাপন নিষিদ্ধ করবো, যাতে দ্বীপের ওপর চাপ কমে। ধীরে ধীরে এই নিয়ন্ত্রণের মাত্রা ও প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকার সংখ্যা দুটোই বাড়ানো হবে।”
তিনি জানান, এই বিধিনিষেধের আওতায় থাকবে, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ, পর্যটকের সংখ্যা সীমিত রাখা এবং বন্যপ্রাণীর প্রজনন মৌসুমে পর্যটন পুরোপুরি বন্ধ রাখার মতো নিয়ম।
“সেইন্ট মার্টিনে ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার পর আমরা টাঙ্গুয়ার হাওরে নজর দিবো” যোগ করেন রিজওয়ানা হাসান। সরকার এরইমধ্যে পর্যটন স্পটগুলো রক্ষায় ভ্রমন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে টেকসই সুরক্ষা পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছে।
১৯৯৯ সাল থেকে, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫ এর আওতায় ১৩টি জীব-বৈচিত্র্যসমৃদ্ধ অঞ্চলকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আইন অনুযায়ী, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের জন্য হুমকি, এরকম যে কোনো উন্নয়নমূলক কাজ বা পর্যটনসহ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সেসব এলাকায় কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তবে আগের সরকারগুলো এই আইন কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়। সেইন্ট মার্টিন, টাঙ্গুয়ার হাওর, হাকালুকি হাওর, কক্সবাজার সৈকত, সুন্দরবন ও সোনাদিয়া দ্বীপে কিছু প্রকল্পভিত্তিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া তেমন কোনো কাজ বাস্তবায়ন হয়নি।
গত আগস্টে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নাগরিক সমাজের সদস্যদের নিয়ে গঠিত হয় নতুন অরাজনৈতিক সরকার। জীববৈচিত্র সুরক্ষা আইন প্রয়োগ করে ঝুঁকিপূর্ণ পর্যটন এলাকাগুলো রক্ষা করতে উদ্যোগী হন তারা।

সেন্ট মার্টিন দ্বীপ ও টাঙ্গুয়ার হাওরের গুরুত্ব
বঙ্গোপসাগরের কোলে অবস্থিত ১২ বর্গকিলোমিটারের এই দ্বীপ কক্সবাজার জেলার অংশ। ১৯৯৯ সালে ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া বা প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয় একে। এরপর ২০২২ সালে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন ২০১২ এর আওতায় দ্বীপটিসহ ১,৭৪৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা মেরিন প্রটেকটেড এরিয়া বা সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা হয়।
পাথর, বালু ও ম্যানগ্রোভ বেষ্টিত এই দ্বীপে প্রায় ১০ হাজার মানুষের বসবাস। জীবিকা মূলত মাছ ধরা, সামুদ্রিক শৈবাল চাষ আর পর্যটন নির্ভর।
বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক গবেষণা বলছে, দ্বীপে রয়েছে ৪৬ প্রজাতির প্রবাল। বিভিন্ন জলজ প্রজাতির পুষ্টির উৎসের পাশাপাশি প্রবাল প্রাচীর; ঝড় ও উপকূলীয় ভাঙনের বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবেও কাজ করে। আবার পর্যটনের মাধ্যমে স্থানীয়দের আয়ের সুযোগও আছে এখানে।
তবে অন্য এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৫ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে দ্বীপে পর্যটনকেন্দ্রিক অবকাঠামো (মূলত পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা) বেড়েছে ১৭৫ ভাগ, অন্যদিকে প্রবালের সংখ্যা কমেছে ৩৮ ভাগ।
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুনামগঞ্জ জেলায় অবস্থিত টাঙ্গুয়ার হাওর। এই জলাভূমির আয়তন ১১৪ বর্গকিলোমিটার, যার মধ্যে ২৮ বর্গকিলোমিটার মূল জলাভূমি। ১৪১ প্রজাতির মিঠা পানির মাছের আবাস, দেশের তিনটি রামসার সাইটের (“রামসার সাইট” হলো আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি, যা রামসার কনভেনশনের অধীনে স্বীকৃত। এই কনভেনশনটি ১৯৭২ সালে স্বাক্ষরিত হয় এবং এর মূল লক্ষ্য হলো জলাভূমির সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা।) একটি এই টাঙ্গুয়ার। এছাড়া ৬৯ প্রজাতির পাখির আশ্রয়স্থল এই জলাভূমি।


অন্যান্য সংকটাপন্ন এলাকা
এ পর্যন্ত বাংলাদেশে ঘোষিত প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকাগুলো হলো সেইন্ট মার্টিন দ্বীপ, সোনাদিয়া দ্বীপ, সুন্দরবন, কক্সবাজার সৈকত, টাঙ্গুয়ার হাওর, হাকালুকি হাওর, মারজাত বাওড়, গুলশান-বারিধারা লেক, ঢাকার আশপাশের চার নদী (বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, বালু) ও সিলেটের পিয়াইন নদী।
এদিকে রুই জাতীয় মাছের প্রজনন ক্ষেত্র রক্ষা করতে পরিবেশ অধিদপ্তর এরই মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান—হালদা নদীকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করার প্রস্তুতি শেষ করেছে।
এর বাইরে দৃশ্যমান কার্যকর উদ্যোগ হিসেবে ২০২২ সালে সুন্দরবনে, প্রতি বছর জুন থেকে আগস্ট মাসে পর্যটকদের প্রবেশে নিষেোজ্ঞা দেয়া হয়েছে। বন্যপ্রাণীর প্রজনন মৌসুমে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতেই এই ব্যবস্থা।
ব্যানার ছবি: সেইন্ট মার্টিন দ্বীপে পর্যটক। ছবি: মুহাম্মদ মোস্তাফিজু রহমান
সাইটেশন:
Ara, S., Alif, M. A. U. J., & Islam, K.M.A. (2021) Impact of Tourism on LULC and LST in a Coastal Island of Bangladesh: A Geospatial Approach on St. Martin’s Island of Bay of Bengal. J Indian Soc Remote Sens 49, 2329–2345. doi:10.1007/s12524-021-01389-4
Das, J., Kabir, M. H., Taimur, F. M., Hossain, M., & Kumar. U. (2022). Evaluating governability challenges of Saint Martin’s Island (SMI) in Bangladesh. World Development Perspectives. Elsevier Vol-27. doi:10.1016/j.wdp.2022.100434
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে গ্লোবাল-এ – এ, ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর।