- দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে পাওয়া যায় মেঘলা চিতা। তবে দ্রুত ধ্বংস হচ্ছে তাদের আবাসস্থল। ২০২১ সালে আইইউসিএন প্রজাতিটিকে বিপন্ন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।
- বাংলাদেশে এ প্রজাতির সরকারি রেকর্ড নেই, তবে সম্প্রতি অন্যান্য বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণের সময়, গবেষকদের ক্যামেরা ট্র্যাপে মেঘলা চিতার ছবি ধরা পড়ে। আর তাই এখনই নিতে হবে প্রজাতিটির আবাসস্থল রক্ষার উদ্যোগ।
- গবেষকরা বলছেন, দেশে বিপন্ন প্রজাতি নিয়ে নিবিড় গবেষণা ও কার্যকর সংরক্ষণের অভাব, এই প্রাণীর টিকে থাকার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের সঙ্গে কিছু নাম খুব পরিচিত। এদের মধ্যে সুন্দরবনের বাঘ, এশিয় হাতি, গঙ্গা নদীর ডলফিন, লেঙ্গুর ও উল্লুকসহ বেশ কিছু বিপন্ন ও সংকটাপন্ন প্রাণীদের সংরক্ষণ, আবাস্থল রক্ষা নিয়ে কয়েক দশক ধরে কাজ হচ্ছে দেশটিতে।
তবে এখন আরও বেশ কিছু প্রাণী, গবেষক ও সংরক্ষণবাদীদের নজর কাড়ছে। মূলত কিছু বন্যপ্রাণী নিয়ে গবেষণার অংশ হিসেবে, বিভিন্ন জায়গায় বসানো ক্যামেরায় ধরা পড়ছে এমন সব প্রাণী, যাদের অনেক বছর ধরে দেখাই যেতো না। গবেষকরা বলছেন, এসব ছবির মধ্যে বেশ কিছুতে মেঘলা চিতার বিচরণের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এই মাংসাশী প্রাণী দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর কিছু অংশে দেখা মেলে, তবে নানা কারণে দ্রুত হারাচ্ছে তাদের আবাসস্থল। আইউসিএন, ২০২১ সালে বিশ্বব্যাপী এই প্রজাতিটিকে বিপন্ন হিসেবে ঘোষণা করে।
”বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে ২০২৩ সালে এশিয় ভাল্লুক আর বুনো কুকুর নিয়ে গবেষণার করার সময় ক্যামেরা ট্র্যাপে একটি মেঘলা চিতা খুঁজে পাই” বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক মুনতাসির আকাশ।
তিনি বলেন, যদিও বাংলাদেশে এই প্রজাতির কোনও সরকারি রেকর্ড নেই, তবে ২০০৬ সাল থেকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় মাঝে মধ্যেই দেখা গেছে মেঘলা চিতা।
মাংসাশী প্রজাতির ওপর গবেষণায় বিশেষজ্ঞ আকাশ, গত ২০ বছর ধরে বাংলাদেশে মেঘলা চিতার অস্তিত্ব সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছেন। তিনি জানান, তাদের কাছে যেসব তথ্য আছে সেগুলোর বেশিরভাগ তারা পেয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে। বন থেকে জ্বালানি কিংবা খাবার সংগ্রহের সময় মেঘলা চিতা দেখেছেন বলে স্থানীয় অনেক বাসিন্দা দাবি করেন। আর আইন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে চোরা শিকারীরা ধরা পড়লে তাদের কাছেও পাওয়া যায় কিছু তথ্য।
২০০৬ সালে জামালপুর জেলায় ১টি, ২০০৯ সালে রাঙামাটিতে ৩টি, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে বান্দরবানে ২টি, ২০১৮ সালে সাঙ্গু-মাতামুহরী বনে ১টি, ২০২১ সালে কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানে ২টি এবং ২০২২ সালে রাঙামাটির বরকল এলাকায় ১টি মেঘলা চিতার দেখা পাওয়ার তথ্য আছে আকাশের কাছে।
বাংলাদেশে আইইউসিএন ঘোষিত ১৭টি অতিগুরুতর বিপন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণীর একটি হলো মেঘলা চিতা। বন্যপ্রাণী গবেষক মুনতাসির আকাশের মতে, দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকার সাঙ্গু-মাতামুহুরি বনাঞ্চলই এখন সম্ভবত এ প্রজাতির শেষ নিরাপদ আবাসস্থল।
বর্তমানে দেশে একমাত্র ক্লাউডেড লেপার্ড বা মেঘলা চিতা রয়েছে কক্সবাজারের ডুলাহাজরা সাফারি পার্কে। রাঙামাটি জেলার একটি এলাকায় ২০২৩ সালে, স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় এটিকে আটক করা হয়। প্রাণীটি লোকালয়ের আশপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছিল বলে জানান, চট্টগ্রাম ফরেস্ট সার্কেলের কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম চৌধুরী।
মেঘলা চিতাকে বড় ও ছোট বিড়ালের মাঝামাঝি একটি বিশেষ প্রজাতি ধরা হয়। দাঁত বড় হলেও, শরীর আকারে ছোট। বনে সাধারণত বানর ও ইঁদুরের মতো ছোট প্রাণী শিকার করে এটি। মানুষের ওপর আক্রমণ করার কোনো পরিসংখ্যান নেই এই চিতার।

বন বিড়াল রক্ষায় চাই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ
বাংলাদেশে বাঘ সংরক্ষণে কাজ হয়েছে মূলত বেঙ্গল টাইগার (Panthera tigris tigris) ও ইন্ডিয়ান চিতা (Panthera pardus fusca) নিয়ে। বাঘের সরকারি হিসাব থাকলেও, চিতা ও অন্যান্য বন বিড়াল নিয়ে নেই কোনো আনুষ্ঠানিক জরিপ ও সংরক্ষণ পরিকল্পনা।
২০১৭ সালের এক গবেষণায় কক্সবাজারের পাহাড়ি বনে ইন্ডিয়ান চিতার উপস্থিতি পাওয়া যায়। ২০১২ সালের জুলাই থেকে ২০১৪ সালের মার্চ পর্যন্ত করা জরিপে গবেষকরা একবার সরাসরি চিতা দেখতে পান। শেখ জামাল ইনানী জাতীয় উদ্যানের তিনটি স্থানে চিতার পায়ের ছাপ পান তারা। ওই গবেষণায় বলা হয়, বন দখল, কাঠ ও জ্বালানি সংগ্রহের জন্য অতিরিক্ত বন ধ্বংস এবং বন্যপ্রাণী শিকার- এসব কারণ চিতাবাঘসহ বন বিড়ালের আবাস ধ্বংসের জন্য বড় হুমকি।
আকাশ মনে করেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাহাড়ে এখনো বন বিড়াল, বিশেষ করে মেঘলা চিতা থাকার সম্ভাবনা প্রবল। কারণ সেখানকার বনে এমন কিছু অংশ আছে যা এখনো অক্ষত এবং প্রতিবেশী দেশ ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরামের বনের সঙ্গে সংযুক্ত।
তবে এই প্রাণীর দেখা পাওয়া খুব একটা সহজ না। নিশাচর স্বভাব এবং ঘন পাহাড়ি বনে বসবাসের কারণে সাধারণত দেখা যায়না এদের। আবার স্থানীয়দের নজরে এলে আরো বিপত্তি। চিতার সঙ্গে গুলিয়ে ক্ষতির আশংকায় মেরে ফেলারও ঘটনা অহরহ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ফরিদ আহসান বলেন, মেঘলা চিতা মানুষ খেকো- এই ভুল ধারণা প্রজাতিটির অস্তিত্বের জন্য আশংকাজনক।
এই দুই প্রাণীবিজ্ঞানীর মতে, মাঝে মাঝে এই চিতার দেখা পাওয়া, চট্টগ্রাম পাহাড়ের বনে প্রজাতিটির উপস্থিতির আভাস দেয়। তাই সরকারের পাশাপাশি, সংরক্ষণ সংস্থাগুলোর এখনই উচিত এই প্রজাতির সঠিক অবস্থা ও সংখ্যা জানতে গবেষণা প্রকল্প হাতে নেয়া, যাতে প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ পরিকল্পনা সম্ভব হয়।
ব্যানার ছবি: বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে ভাল্লুক ও বুনো কুকুরে বর্তমান অবস্থা, পরিবেশ ও সংরক্ষণ নিয়ে গবেষণার সময় ক্যামেরা ট্র্যাপে ধরা পড়া মেঘলা চিতা। ছবি: মুনতাসির আকাশ
সাইটেশন:
Kabir, M. T., Ahsan, M. F. & Khatoon, A. (2017). Occurrence and conservation of the Indian Leopard (Mammalia: Carnivora: Felidae: Panthera pardus) in Cox’s Bazar District of Bangladesh. Journal of Threatened Taxa, Vol. 9 No. 6. doi:10.11609/jott.1898.9.6.10320-10324
Zakir, T., Akash, M., Rahman, S., Mila, F. T. Z. K., Trageser, S. & Ghose, A. (2021). Detecting the spots: A review on leopard occurrences in Bangladesh. Retrieved from https://www.researchgate.net/publication/353776637_Detecting_the_spots_A_review_on_leopard_occurrences_in_Bangladesh
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে গ্লোবাল-এ – এ, ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর।