- মাছের মজুদ কমে যাওয়া, যান্ত্রিক সরঞ্জামের ব্যবহার এবং আর্থিক অস্থিতিশীলতার কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, পশ্চিমবঙ্গের খোটিতে মাছ ধরার পুরনো অনুশীলন।
- ২০১৭ সালের জাতীয় সামুদ্রিক নীতিতে মাছের মজুদ বৃদ্ধি এবং জেলেদের জীবিকা নিশ্চিত করার জন্য টেকসই মৎস আহরণের কথা বলা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের দাবি, দুর্বল বাস্তবায়ন এবং বাজেট সহায়তার অনিশ্চয়তার কারণে এটি মূলত অকার্যকর রয়ে গেছে।
- বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ট্রলারের মাধ্যমে মাছ ধরা এবং পার্স সেইন জালের ব্যবহারের মতো চর্চাগুলো পুনর্বিবেচনা এবং নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। কারণ এটি অতিরিক্ত মৎস আহরণের অন্যতম একটি কারণ, যা সামুদ্রিক প্রতিবেশের স্থায়িত্বকে হুমকির মুখে ফেলে।
১২ বছর বয়স থেকে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরছেন, পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর জেলার থানাবেড়িয়া গ্রামের ৫৯ বছর বয়সী কীর্তিবাস পাত্র । প্রায় ৭০ বছর আগে, মাছ ধরার জন্য সরকার তার পরিবারকে একটি নির্দিষ্ট জায়গা দিয়েছিল অগভীর সাগরে। এলাকাটি ‘খোটি’ নামে পরিচিত। এখানে জেলেরা সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত অর্থাৎ মাছ ধরার মূল মৌসুমে, মাছ ধরে এবং সেগুলোর শুঁটকি বানিয়ে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করে। বরাদ্দের সময় কীর্তিবাসের পরিবারসহ অন্যান্য জেলে পরিবারগুলোকে মাছ শুকানোর জন্য জমি এবং থাকার জন্য অস্থায়ী কুঁড়েঘর তৈরির অনুমতিও দেওয়া হয়েছিল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এভাবে মাছ ধরে ও শুকিয়ে বিক্রি করেই জীবিকা নির্বাহ করছেন তারা।
খোটিতে সাধারণত দুই বা তিনজন জেলের ছোট ছোট দল মাছ ধরে। মাছ ধরার পর, গ্রামের নারীরা মাছগুলো মান অনুযায়ী বাছাই করে রোদে শুকিয়ে নেন। প্রতিটি খোটি একটি কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। মাছ ধরার নিয়ম মানা হচ্ছে কি না তা দেখা এবং সবার মধ্যে সহযোগিতার মনোভাব নিশ্চিত করাই কমিটির উদ্দেশ্য।
পূর্ব মেদিনীপুর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় এই খোটি পদ্ধতি প্রচলিত। সেপ্টেম্বর মাসে মাছ ধরার মৌসুম শুরু হলে, সরকার নির্দিষ্ট জমির মানচিত্র তৈরি করে এবং সীমানা নির্ধারণ করে দেয়। সে সময় পরিবারগুলো তাদের বরাদ্দকৃত জায়গা ব্যবহার করতে পারে। মার্চের মধ্যে মাছ ধরা শেষ হলে তারা আবার বাড়ি ফিরে যায়।
কীর্তিবাস পাত্র থানাবেড়িয়া মৎস্য খোটির সচিব। এই প্রাচীন মাছ ধরার পদ্ধতির ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন চিন্তিত তিনি। তিনি জানান, মাছের পরিমাণ আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে এবং তরুণ প্রজন্ম আর এই পেশায় আগ্রহী নয়।
তিনি বলেন, “যখন আমি মাছ ধরা শুরু করি, তখন আমাদের খোটিতে ৫৫টি নৌকা ছিল। এখন মাত্র ২৬টি নৌকা আছে। আবার মাছ কমে যাওয়ায় অনেক জেলে পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন।”
কীর্তিবাসের নিজের সন্তানরাই টানা তিন বছর লোকসান করার পর, গত বছর মাছ ধরা ছেড়ে দিয়ে এখন বেঙ্গালুরুর একটি কারখানায় কাজ করছে।

এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “পরিবার চালানোই এখন সবচেয়ে জরুরি।”
নিজের শেষ মাছ ধরার দিনটির কথা মনে করেন কীর্তিবাস। দিনটি ছিল ১১ জানুয়ারি। সেদিন তিনি আটটি ‘ডেল জাল’ ফেলে, সবমিলিয়ে ৬০ কেজি মাছ ধরতে পেরেছিলেন।
তার দাবি, ২০ বছর আগে চারটি জালেই একদিনে ৩০০ কেজি মাছ ধরা যেত।
ডোল জাল দিয়ে মাছ ধরা এক ধরনের পুরনো মাছ ধরার পদ্ধতি। এতে জোয়ারের স্রোত ব্যবহার করে একটি স্থির, শঙ্কু বা ফানেল আকৃতির জালে মাছ ধরা হয়।
দাদনপত্রবার খোটির ৭০ বছরের বেশি বয়সী জেলে শ্রীকান্ত দাসও একই অভিজ্ঞতার কথা বলেন – “আমরা এক ট্রিপে ৩০০ কেজিরও বেশি মাছ ধরতাম। এখন তা মাত্র ৬০-৭০ কেজিতে এসে ঠেকেছে।”
দুই দশক আগে দাদনপত্রবার খোটিতে প্রায় ৭ হাজার জেলে ছিল। বর্তমানে সেই সংখ্যা অর্ধেকেরও কম। সক্রিয় নৌকার সংখ্যাও ২০০ থেকে কমে ১০৮-এ নেমে এসেছে।
কীর্তিবাস ও শ্রীকান্তের এই অভিজ্ঞতা মূলত পশ্চিমবঙ্গের পুরো ১৫৮ কিলোমিটার উপকূলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এক সংকটের প্রতিচ্ছবি।
দক্ষিণবঙ্গ মৎস্যজীবী ফোরামের সভাপতি দেবাশীষ শ্যামল জানান, এই সমস্যা উপকূলের মোট ৪২টি খোটিকে প্রভাবিত করছে।
জেলেদের মতে মাছ ধরায় যন্ত্র ব্যবহারের বাড়বাড়ন্ত বিশেষ করে ট্রলার দিয়ে মাছ ধরা, মাছ কমে যাওয়ার প্রধান কারণ।
শ্রীকান্ত দাস বলেন, “ট্রলার সব মাছ তুলে নেয়, ফলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য কমে যাচ্ছে। এতে আমাদের মতো ছোট জেলেদের জন্য খুব কম মাছই অবশিষ্ট থাকে”
প্রায় ২০ বছর আগে থেকেই এখানে মাছের পরিমাণ কমতে শুরু করে। বর্তমানে তা একেবারেই অস্থিতিশীল পর্যায়ে পৌঁছেছে। উপকূলবর্তী হোটেল ও রিসোর্টের কারণে হওয়া দূষণও পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলছে।
এছাড়া, উপকূল ক্ষয়ে যাওয়ায় মাছ শুকানোর জন্য জমি কমে যাচ্ছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া ও অকাল বৃষ্টিপাতও মাছ ধরায় বাধা সৃষ্টি করছে।
কীর্তিবাস পাত্র জানান, মাছ ধরার কাজ সাধারণত ১৫ দিনের চক্রে হয়। এ সময়ের মধ্যেই মাছ ধরা ও শুকানোর কাজ শেষ করতে হয়। অকাল বৃষ্টির জন্য তিনি একটি পূর্ণ চক্র হারিয়েছেন।
তিনি বলেন, “এখন আমার হাতে বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার মোট সময় থেকে ১৫ দিন কমে গেছে।”
চলতি মৌসুমে ডিজেল ও শ্রমিকের পেছনে তার প্রায় তিন লাখ টাকা খরচ হয়েছে বলেও জানান তিনি।
শ্যামল বলেন, “উপকূলের পরিবেশ রক্ষায়, খোটি পদ্ধতিতে কাজ করা এই উপকূলীয় জনগোষ্ঠীগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা বহু প্রজন্ম ধরে এই কাজ করছে। তাদের উপস্থিতি স্বাভাবিক উপকূলের প্রতিনিধিত্ব করে।”

ঝুঁকির মুখে জীবিকা
National Federation of Small-Scale Fishworkers (NFSF) এর সভাপতি প্রদীপ চ্যাটার্জি জানান, ভারতের উপকূলজুড়ে প্রান্তিক জেলেরা এখন কঠিন সময় পার করছে। Central Marine Fisheries Research Institute এর ২০২২ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৬০ সালে ক্ষুদ্র এবং অ-যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ৮৮ শতাংশ মাছ ধরা হতো, সেখোনে ২০২২ সালে তা কমে মাত্র ১ শতাংশে নেমে এসেছে।
১৯৬০-এর দশকে ইন্দো–নরওয়েজিয়ান প্রকল্পের মাধ্যমে যান্ত্রিক ট্রলিং শুরু হয় এবং তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৬ সালের মেরিন ফিশারিজ শুমারি অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় ৩০ হাজার ৪৮৬টি ট্রলার কাজ করছে। ২০২২ সালে এসব ট্রলার প্রায় ২০ দশমিক ০২৭ মিলিয়ন টন মাছ ধরেছে। এটি ভারতের মোট সামুদ্রিক মৎস আহরণের ৫৮ শতাংশ।
তিনি আরও বলেন, “আগে অনেক ছোট নৌকা হাতে চালানো হতো। এখন বড় নৌকার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে সেগুলোকেও মোটরচালিত করা হয়েছে। এতে তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে খরচও অনেক বেড়েছে। ডিজেল ও অন্যান্য খরচ মেটাতে অনেক জেলে ঋণ নিচ্ছেন। কিন্তু মাছ ধরার হার কম হওয়ায় ঋণ শোধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে তাদের আর্থিক ঝুঁকিও বাড়ছে।”
দাদনপত্রবার খোটির জেলে শ্রীকান্ত দাস বলেন, “ঋণ দেয়া বড় ঠিকাদাররা প্রায়ই ঋণ শোধ না হলে জাল ও নৌকা দখল করে নেয়।”
NFSF-এর সাধারণ সম্পাদক সেবাস্তিয়াও রড্রিগেজ বলেন, “ছোট জেলেরা প্রায়শই মহাজনের কাছ থেকে ব্যক্তিগত কারণে ঋণ নেয়। বিনিময়ে পুরো মৌসুমে ধরা মাছ মহাজনকে দিয়ে দিতে হয়। এই মহাজনেরা সে সব মাছ দেশজুড়ে, এমনকি বিদেশেও বিক্রি করে লাভ করে। মাছ কম ধরা হলে জেলেদেরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়।”
ট্রল ফিশিং এবং পার্স সেইন জালের ব্যবহারের চর্চাকে পুনর্বিবেচনা এবং নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি বলে মনে করেন, রড্রিগেজ।

কাগজে কলমে থাকা উচ্চাভিলাষী নীতি
এ সকল সংকট মাথায় রেখে ভারত সরকার ২০১৭ সালে একটি জাতীয় সামুদ্রিক মৎস্যনীতি ঘোষণা করে। এর লক্ষ্য হলো, টেকসই মৎস আহরণ ও ভারতের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের (EEZ) প্রতিবেশগত অখণ্ডতা রক্ষা করা। প্রথমবারের মতো এতে মাছের আবাসস্থল রক্ষা, প্রজাতি সংরক্ষণ, জেলে নৌকার সংখ্যা কমানো, এলাকা ও প্রজাতি অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা, মাছের জন্য সংরক্ষিত এলাকা তৈরি এবং বংশ পরম্পরায় মাছ ধরা জেলেদের জমি ও জীবিকা সুরক্ষার কথা বলা হয়।
তবে আট বছর পেরিয়ে গেলেও নীতিটি বাস্তবে কার্যকর হয়নি। চ্যাটার্জি বলেন, “সরকারের প্রয়োজন একটি বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা এবং যথেষ্ট বাজেট সহায়তা। এগুলো ছাড়া প্রান্তিক জেলেরা পিছিয়ে থাকবে।”
২০২৩ সালে Nature Conservation Foundation (NCF) এর গবেষক ময়ূরেশ গঙ্গাল সামুদ্রিক নীতি মাছের জীববিজ্ঞানের সাথে কীভাবে মিথস্ক্রিয়া করেছে তা তুলে ধরে একটি গবেষণা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেন, “সামুদ্রিক নীতিমালা সাধারণত রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত কারণে পরিচালিত হয়। এ নীতিগুলো মাছ ধরার পরিমাণ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেয়। এতে যে মাছের বৈচিত্র্যের দিক কিছুটা বিবেচনা করা হয়েছে, এটা ভালো পদক্ষেপ। তবে এটি কার্যকর হবে তখনই, যখন এগুলো পরিকল্পনা অনুযায়ী সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হবে।”
ভারতের সামুদ্রিক খাতে টেকসই মৎস আহরণ ও মাছের সংখ্যা বৃদ্ধিতে এই পদক্ষেপ যথেষ্ট কি না – এই প্রশ্নের জবাবে গঙ্গাল বলেন, “যদি এই নীতিগুলো ভালোভাবে কার্যকর করা যায়, তাহলে কিছু সময়ের জন্য মাছের মজুদ কমে যাওয়া রোধ করা সম্ভব। তবে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই মৎস আহরণ নিশ্চিত করা যাবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। তবুও এটি টেকসই মৎস আহরণের ক্ষেত্রে একটি ভালো পদক্ষেপ।”
ব্যানার ছবি: পশ্চিমবঙ্গের পুরনো জেলেরা নির্দিষ্ট সময়ে একটি খোটিতে একত্রিত হয়। এখানে জেলেরা সাধারণত সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত, মাছ ধরার মূল মৌসুমে একত্রিত হয়ে মাছ ধরেন। ছবি: দেবাশিস শ্যামল
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে, মঙ্গাবে-ইন্ডিয়া তে, ২০২৫ সালের ২৩ জানুয়ারি।