- সুন্দরবনের মোহনার বাঁধ বরাবর স্থাপিত পোড়ামাটির (টেরাকোটা) রিংগুলো কার্যকরভাবে জোয়ার-ভাটার সঙ্গে আসা পলি ধরে রেখে, বাঁধের পাদদেশকে শক্তিশালী করে এবং ভূমিক্ষয়ের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়।
- জমা হওয়া পলি ম্যানগ্রোভ বীজের অঙ্কুরোদ্গম ও বৃদ্ধির জন্য একটি অনুকূল স্তর তৈরি করে। ফলে প্রাকৃতিক বনায়ন প্রক্রিয়া আরও সক্রিয় ও স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে।
- টানা ১৬ মাসের মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এই পলি ফাঁদগুলো উপকূলরেখাকে স্থিতিশীল করতে এবং উপকূলীয় ভূমিক্ষয়ের হার কমাতে বাস্তবিকই কার্যকর ভূমিকা রাখে।
- প্রকৃতিনির্ভর এই উদ্ভাবনী পদ্ধতি ঝুঁকিপূর্ণ ও জলবায়ু-সংবেদনশীল অঞ্চলে টেকসই উপকূল সুরক্ষার জন্য এক ব্যয়সাশ্রয়ী ও সহজে সম্প্রসারণযোগ্য সমাধান হিসেবে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
“একটি আংটি সবাইকে শাসন করার জন্য, একটি আংটি সবাইকে খুঁজে বের করার জন্য, একটি আংটি সবাইকে একত্র করার জন্য, আর অন্ধকারে বেঁধে রাখার জন্য।”
লাইনগুলো ফ্যান্টাসি উপন্যাস ‘দ্য লর্ড অফ দ্য রিংস’ এর। সমগ্র মধ্য-পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দেওয়া দুষ্টু শক্তির প্রতীক উপন্যাসের এ সোনার আংটি।
ভারতের ক্ষয়প্রাপ্ত জলাভূমিতে এমন কোনও জাদুর আংটি নেই। এখানে প্রতিবেশ ধ্বংসের মূল কারণ মানুষই।
তবে ভারতে আশার আলো দেখাচ্ছে পোড়ামাটির রিং। এই আংটি বদলে দিতে পারে ভারতের সুন্দরবনের জলাভূমির ভবিষ্যৎ —
“একটি আংটি পলি ও মাটি ধরে রাখবে, একটি আংটি সবুজ ফিরিয়ে আনবে, একটি আংটি সবাইকে একত্রিত করবে এবং একটি আংটি বাঁধকে শক্ত করে ধরে রাখবে।”
সুন্দরবন বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের ডুবে যাওয়া দ্বীপগুলোকে রক্ষা করতে পারে, দুই থেকে চার ফুট ব্যাস ও এক থেকে দুই ফুট উচ্চতার বড় বড় পোড়ামাটির রিং। এগুলো বাঁধের পাশে ৯২ মিটার লম্বা ও ঢালে সাড়ে ৬ মিটার চওড়া গ্রিড আকারে বসানো হয়। মূলত পোড়ামাটির এই আংটি বা রিং পলি আটকানোর ফাঁদ।
দীর্ঘ ১৬ মাসের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এই পলি ফাঁদগুলো বাঁধের ক্ষয় কমিয়েছে। এগুলো পলি জমিয়ে রেখেছে। এতে জমা হওয়া পলির পরিমাণ ছিল, বার্ষিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হারের ২-৩ গুণ বেশি। যা থেকে বোঝা গেছে, ডুবে যাওয়া দ্বীপগুলো বাঁচাতে এটি কার্যকর এবং তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী পদ্ধতি। এছাড়া, জমা হওয়া পলি স্থানীয় ম্যানগ্রোভ গাছ ও ঝিনুকের পরিমাণ বাড়াতেও সাহায্য করেছে। ফলে আশা করা হচ্ছে, এই কাঠামো ভবিষ্যতে উপকূল রক্ষায় একটি প্রাকৃতিকভাবে ‘সক্রিয় উপকূলরেখা’ তৈরি করতে পারে।
কেন এই পোড়ামাটির রিং?
World Wide Fund for Nature (WWF)-India এর সুন্দরবন ডেল্টা প্রোগ্রামের পরিচালক অনামিত্র অনুরাগ ডান্ডা বলেন, “প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল, উপকূল এলাকায় লম্বা টিউব বসানো। জোয়ারের সময় টিউবগুলো পলি দিয়ে ভরে বাঁধকে শক্তিশালী করবে। তাই আমরা জল সরবরাহে ব্যবহৃত বড় লোহার পাইপ এনে বাঁধের সামনে বসানোর চেষ্টা করি।”
এর আগে সুন্দরবনে ভূপৃষ্ঠের উচ্চতা মাপার জন্য ১০-২৫ মিটার দীর্ঘ রড (rSET-MH রড) বসানো হয়েছিল। বড় ফাঁপা পাইপ বসানো ছিল একেবারেই আলাদা ব্যাপার।
অনুরাগ ডান্ডা বলেন, “সেই লোহার পাইপগুলো উল্লম্বভাবে বসানো খুব কঠিন ছিল বলে আমরা তা করতে পারিনি। এটা ছিল আমাদের প্রথম ব্যর্থতা। তারপর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক পরিচালক সুগত হাজরা বললেন – কেন টেরাকোটার রিং ব্যবহার করা হবে না? এই রিংগুলো প্রাচীনকাল থেকে কূপ ও পয়ঃনিষ্কাশনে ব্যবহার হয়। সহজে তৈরি করা যায় এবং স্থানীয়ভাবেই পাওয়া যায়।”
প্রত্নতাত্ত্বিক খননে পাওয়া রিং-কূপগুলো জল জমিয়ে রাখতে এবং পলি ফাঁদ হিসেবে কাজ করত। সুন্দরবনের এই প্রকল্পে সেই প্রাচীন ধারণাটিকেই আধুনিক উপায়ে ব্যবহার করা হয়েছে। রিংগুলো পলি আটকাতে ব্যবহার করা হচ্ছে। এগুলো পলি আটকিয়ে বাঁধকে প্রাকৃতিকভাবে শক্তিশালী করছে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব মোকাবিলা করছে।
দলটি বাংলাদেশে ব্যবহৃত একটি পদ্ধতি থেকেও অনুপ্রাণিত হয়েছে। সেখানে কংক্রিটের রিং ঝিনুকের বেড়ে ওঠার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করেছিল, ব্রেকওয়াটার রিফ তৈরির মাধ্যমে। এগুলো ভাঙন রোধ, কাদা জমা এবং লবণাক্ত জলাভূমির বিস্তারে সাহায্য করে।

প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ এবং একটি অনন্য আবিষ্কার
২০২২ সালের জুন থেকে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মধ্যে, সুন্দরবনের সাতটি স্থানে টেরাকোটা রিং এর পলি ফাঁদ বসানো হয়। এগুলোর তিনটি বসানো হয়, নিম্ন মোহনায় এবং বাকি চারটি মধ্য মোহনায়। মানব বসতির কাছে হলেও কোনও গাছপালা এর আশপাশে ছিল না।
পরবর্তী ১৬ মাসে (মে ২০২৩ থেকে আগস্ট ২০২৪), প্রতি মাসে জোয়ারের সময় পলি জমা হওয়ার পরিমাণ মাপা হয়। ফাঁদের তলায় টিনের পাত বসিয়ে, ইস্পাত রুলার দিয়ে পলির উচ্চতা মাপা হতো। দেখা যায়, গড়ে ২২ সেন্টিমিটার করে পলি জমেছে। স্থান ও ঋতুভেদে তা ৪ থেকে ৪২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত ছিল। প্রাক-বর্ষায় সবচেয়ে বেশি এবং বর্ষা-পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে কম পলি জমেছিল।
১২ মাস শেষে, মোট পলি জমা ছিল ১ দশমিক ৪ সেন্টিমিটার থেকে ১৬ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার। ১ ও ৪ নম্বর স্থানে সবচেয়ে কম জমা হয়, কারণ এগুলো বালুতট ও দ্বীপে ঢাকা ছিল। সর্বাধিক জমা হয়, ২ নম্বর স্থানে (নিম্ন মোহনায়)। ৩ ও ৫ থেকে ৭ নম্বর স্থানে তুলনামূলকভাবে বেশি পলি জমা হয়। গ্রানুলোমেট্রিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোহনার মুখের কাছাকাছি (১-৩ নম্বর) পলিতে বালি বেশি, আর দূরের জায়গায় কাদামাটি বেশি ছিল – ঠিক প্রাকৃতিক পরিবেশের মতো।
এছাড়া একটি অপ্রত্যাশিত ভালো ফলাফল ছিল, পলি ফাঁদে প্রাকৃতিকভাবে ম্যানগ্রোভ গাছ জন্মানো। কাদামাটি সমৃদ্ধ পলির জায়গায় (৩-৬ নম্বর) উড়িধান (Porteresia coarctata), গেরুয়া শাক (Sueda maritima), এবং সাদা বাইন (Avicennia marina) গাছ জন্মেছিল। ৪ থেকে ৬ নম্বর স্থানে এদের সবচেয়ে ভালো বৃদ্ধি দেখা গেছে। ১ নম্বর স্থানে ছোট কস্তুরা (Saccostrea cuculata) ও কাটাক ঝিনুকসহ (Crassostrea cuttackensis) অন্যান্য প্রজাতির আরও কিছু ঝিনুক জন্মায়। তবে ২ ও ৭ নম্বর স্থানে কিছুই জন্মায়নি।
প্রথমদিকে চারা রোপণের চেষ্টা ব্যর্থ হলেও পরবর্তীতে এখানে প্রাকৃতিকভাবেই চারা জন্মানো দেখে সবাই অভিভূত হয়েছিলেন বলে জানান, অনুরাগ ডান্ডা।

সাফল্যের পথে বাধা
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জের বিষয়ে অনুরাগ ডান্ডা বলেন, “বাঁধ সুরক্ষা হিসেবে পোড়ামাটির রিং ব্যবহারের ধারণাটি সম্পূর্ণ নতুন। ফলে প্রকল্পটি অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল।”
তিনি বলেন, “যখন নতুন কিছু করা হয়, তখন ভুল হয়, প্রতিনিয়ত শিখতে হয়। আমাদের প্রথম সমস্যা ছিল, পোড়ামাটির রিং পরিবহন। এগুলো ভঙ্গুর ছিল বলে হাওড়া থেকে সুন্দরবনের দ্বীপে আনা কঠিন ছিল। তবে পরে এই সমস্যার সমাধান হয়েছে। এছাড়া, আরেকটি সমস্যা ছিল মানুষের সন্দেহ। রিং বসানোর অনুমতি পাওয়াই কঠিন ছিল।”
এটি একটি পাইলট প্রকল্প বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে তিনি বলেন, “আমরা দেখতে চেয়েছিলাম, পলি আটকিয়ে দ্বীপ ডুবে যাওয়ার ক্ষতি সামলানো যায় কি না, এছাড়া পলি ম্যানগ্রোভ বৃদ্ধি করতে পারে কি না। প্রাথমিকভাবে এই ফলাফল উৎসাহজনক হলেও আরও দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ দরকার। এছাড়া, এখনো বড় কোনও ঘূর্ণিঝড় হয়নি, তাই চরম পরিস্থিতিতে এই পদ্ধতি টিকবে কি না, আমাদের জানা নেই।”
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলের অধ্যাপক সুনন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “গুগল আর্থের সাতটি স্থানের স্থানাঙ্ক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, রিংগুলোর সবই কাদামাটির জমিতে, যেখানে ভাঙনের প্রমাণ নেই। এর মানে, রিংগুলো স্থিতিশীল জায়গায় ভালো কাজ করবে। ভাঙনপ্রবণ এলাকায় এ পদ্ধতি কাজ নাও করতে পারে। আর এই সীমাবদ্ধতা সহজে দূর করা যাবে না।”
তিনি আরও বলেন, “ম্যানগ্রোভ বন ভাঙন বিলম্বিত করতে পারলেও, তা পুরোপুরি বন্ধ করতে পারে না।”
এছাড়া শক্তিশালী ঢেউ ও জোয়ার, পলি জমার ওপর প্রভাব ফেলে। এটি বাঁধ রক্ষার যেকোনো প্রচেষ্টায় অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
ওয়েস্টবেঙ্গল স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক কৃষ্ণা রায় বলেন, “ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রকৃতি-ভিত্তিক পদ্ধতির সমন্বয়ে গঠিত হাইব্রিড পদ্ধতি, ক্ষয়প্রাপ্ত ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার ও উপকূল রক্ষায় কার্যকর। তবে ক্ষয়প্রবণ এলাকার জন্য কোনো একক নিয়ম নেই – এক জায়গায় কাজ করা পদ্ধতি অন্য জায়গায় ব্যর্থ হতে পারে।”

ব্যয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বর্তমানে সেচ ও জলপথ বিভাগ (IWD) মাটি ভর্তি ব্যাগ ও ইউক্যালিপটাস খুঁটি দিয়ে বাঁধ রক্ষা করে। ১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ২ থেকে ৩ মিটার প্রস্থের কাঠামো বানাতে প্রায় ১ লাখ মার্কিন ডলার খরচ হয়, আর বছরে ১২ শতাংশ রক্ষণাবেক্ষণ খরচ লাগে। তবে এগুলো পলি ধরে রাখতে পারে না, ব্যাগগুলোও প্রায়ই ভেসে যায়।
অন্যদিকে, ১ কিলোমিটার লম্বা ও সাড়ে ৬ মিটার প্রস্থের পোড়ামাটির পলি ফাঁদ বানাতে খরচ হয় প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন ডলার।
অনুরাগ ডান্ডা জানান, এই পলি ফাঁদের খরচ কম, রক্ষণাবেক্ষণ লাগে না। স্থাপনের পর ৬ থেকে১২ শতাংশ রিং ভাঙলেও প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন পড়ে না। এখন দেখার বিষয়, এগুলো বাঁধের আয়ু (যা বর্তমানে গড়ে ১০ বছর) বাড়াতে পারে কি না।
বর্তমান পলি ফাঁদগুলোর পর্যবেক্ষণ চললেও, নতুন ধারণাগুলো নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।
অনুরাগ ডান্ডা আরও জানান, “একজন বনকর্মীর প্রস্তাবে আমরা এখন ভাঙনপ্রবণ জমি রক্ষার জন্য বাঁশের ফ্রেমে রিং বসিয়েছি। এটি ভাঙন কমানোর কাঠামো হিসেবে কাজ করতে পারে। ভাঙন রোধ বা কমানোর জন্য বর্তমানে দুটি এমন স্থাপনা আছে– একটি নিম্ন মোহনায়, অন্যটি মধ্য মোহনায়।”
ব্যানার ছবি: সুন্দরবনের একটি দ্বীপ, এখানে প্রথমবারের মতো ভাঙন-প্রতিরোধ কাঠামো স্থাপন করা হচ্ছে। ছবি: Saifis
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে, মঙ্গাবে ইন্ডিয়া-তে ২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল।