- প্যারিস চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের করা পরিকল্পনায় (এনডিসি) দেখা যায়, দেশের মোট গ্রিনহাউজ গ্যাসের প্রায় ৯ শতাংশ আসে পরিবহন খাত থেকে। এই খাতে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩ দশমিক ৪ মিলিয়ন মেট্রিক টন সমতুল্য কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।
- এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার ২০২১ সালে Automobile Industry Development Policy 2021 গ্রহণ করেছে। এ নীতিতে কর ছাড়, দেশে বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) উৎপাদনে আর্থিক প্রণোদনা এবং জ্বালানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নের মতো সুবিধা রাখা হয়েছে।
- আশা করা হচ্ছে দুই, তিন এবং চার চাকার বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহারকে উৎসাহিত করে, বাংলাদেশ তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে।
- শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে লিথিয়াম ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক যানবাহন তৈরি শুরু হলে, এটি পরিবহন খাতে কার্বন নিঃসরণ কমানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় ভূমিকা রাখবে।
প্যারিস চুক্তির আওতায় জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (NDC) পূরণের অংশ হিসেবে গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ (GHG) কমানোর লক্ষ্যে, ১ গিগাওয়াট বার্ষিক ক্ষমতাসম্পন্ন লিথিয়াম ব্যাটারি কারখানা স্থাপনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে বাংলাদেশ। একইসঙ্গে ইলেকট্রিক ভেহিকেল বা বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) উৎপাদনের লক্ষ্যেও বেশকিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছে দেশটি। ব্যবসায়ীরা মনে করেন, এসব উদ্যোগ দেশের জ্বালানি খাতে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসবে।
এনডিসি হলো শতাব্দীর শেষ নাগাদ বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রির নিচে রাখতে সহায়তা করার জন্য, প্রতিটি দেশের নিজস্ব পরিকল্পনা।
২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ পরিবহন খাতে নিঃশর্তভাবে ৩ দশমিক ৪ মিলিয়ন মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য গ্রিনহাউজ গ্যাস কমানোর প্রস্তাব করেছে। এটি দেশের মোট কার্বন নিঃসরণের প্রায় ৯ শতাংশ।
দূষণ কমানো ও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে, ধীরে ধীরে অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিনের (আইসিই) ব্যবহার কমিয়ে বৈদ্যুতিক যানবাহন বৃদ্ধির কথা ভাবছে বাংলাদেশ। ইভি চালাতে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি প্রযুক্তি অন্য সব ব্যাটারির তুলনায় বেশি কার্যকর। তাই প্রথম ধাপে লিথিয়াম ব্যাটারি উৎপাদনকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বৃদ্ধি করে, কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের প্রথম পদক্ষেপ হলো লিথিয়াম ব্যাটারি উৎপাদন। এই উদ্যোগে সবার প্রথমে এগিয়ে এসেছে, বাংলাদেশ লিথিয়াম ব্যাটারি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি এরইমধ্যে কারখানার অবকাঠামো তৈরি শেষ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ সালের শুরুতে উৎপাদন শুরু করতে পারবে বলে আশা করছে। এক সাক্ষাৎকারে এ তথ্য জানান, প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মাসুদ কবির ।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের মতে, দেশের রাস্তায় প্রায় ১৫ লাখ লিড অ্যাসিড–ভিত্তিক ব্যাটারিচালিত তিন চাকার গাড়ি চলছে। এ বাহনগুলো জাতীয় গ্রিড থেকে প্রচুর বিদ্যুৎ খরচ করে। প্রস্তাবিত লিথিয়াম ব্যাটারিটি সেগুলো প্রতিস্থাপনের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে।
লিথিয়াম ব্যাটারির কারখানা তৈরির পাশাপাশি, প্রতিষ্ঠানটি ইভি তৈরির জন্যও কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করছে।
কবির জানান, ধীরে ধীরে তারা ইভি উৎপাদনের দিকে অগ্রসর হবে। ইভি উৎপাদনের একটি ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ হিসেবে কাজ করবে ব্যাটারি ইউনিট ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, নিটল মোটরস লিমিটেড, ওমেগা সেইকি এবং অন্যান্য দেশীয় বিনিয়োগকারীরা এরইমধ্যে টয়োটার মতো আন্তর্জাতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় দেশে ইভি উৎপাদনের কাজ শুরু করেছে।
এনডিসির লক্ষ্য পূরণে সরকার Automobile Industry Development Policy 2021 প্রণয়ন করেছে। এ নীতিমালায় কর ছাড়, আর্থিক প্রণোদনা, কম জ্বালানি প্রয়োজন এমন গাড়ির প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং অবকাঠামো সম্প্রসারণের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান Mordor Intelligence জানিয়েছে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির বাজারের আকার ছিল ২৫৬ মিলিয়ন ডলার। এটি ২০২৮ সালের মধ্যে বেড়ে ৩৭৩ দশমিক ৮৯ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। তাহলে এর বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি হার হবে ৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
সুবিধা ও অসুবিধা
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ জানায়, কম খরচ এবং সরকারি প্রণোদনার কারণে দেশে হাইব্রিড গাড়ির জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। শুধু ২০২২ সালেই প্রায় ৩ হাজার হাইব্রিড গাড়ি নিবন্ধিত হয়েছে।
তবে বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে অগ্রগতি এখনও ধীর। ২০২১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র ৩৩টি বৈদ্যুতিক গাড়ি নিবন্ধিত হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য সিদ্দিক জুবায়ের বলেন, “লিথিয়াম ব্যাটারি তুলনামূলকভাবে হালকা এবং দ্রুত চার্জ হয়। তাই গ্রাহকরা এই পরিবর্তনকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করবেন। একইসঙ্গে, জীবাশ্ম জ্বালানি দ্বারা চালিত গাড়ির পরিবর্তে ইভি ব্যবহৃত হলে, শহরের বায়ু দূষণ অনেক কমে যাবে।”
তবে তিনি আরও বলেন, “যদি দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য উৎস ব্যবহার না করা হয়, তাহলে শুধু এই উদ্যোগে গ্রিনহাউজ গ্যাস কমবে না।”
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে বর্তমানে ৪৯ দশমিক ০৭ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস, ১১ দশমিক ৪৬ শতাংশ কয়লা, ২৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ ফার্নেস অয়েল এবং ৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ ডিজেল অবদান রাখে। এক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানির (সৌর ও জলবিদ্যুৎসহ) অংশ মাত্র ২ দশমিক ০৮ শতাংশ।
অবশ্য ইভির ব্যাপক ব্যবহার শুরু হলে বিদ্যুৎ চাহিদার সময়সূচির সমস্যা তৈরি হতে পারে। দিনের বেলায় যখন চাহিদা কম, তখন চার্জিং সুবিধা থাকলে হয়তো ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ হবে।
তবে সরকার চার্জিং স্টেশন তৈরি এবং ইভির জন্য বিদ্যুৎ ব্যবহারের নিয়ম-কানুন স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিলে, এ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যানার ছবি: দূষণ ও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিন ব্যবহার কমিয়ে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বৃদ্ধির প্রয়াস চালাচ্ছে। ছবি: Andrew Roberts via Unsplash (Public domain).
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে, মঙ্গাবে গ্লোবাল (https://news.mongabay.com/) – এ, ২০২৩ সালের ২৮ আগস্ট।