- সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাঙ্গর ও রে প্রজাতির মতো সংরক্ষিত মাছ শিকার ও খাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে বাংলাদেশ।
- একদিকে প্রচলিত সামুদ্রিক মাছের সরবরাহ ঘাটতি ও বাড়তি দাম, অন্যদিকে শাপলা পাতার মত মাছের সহজলভ্যতার কারণে মানুষের নিয়মিত খাদ্য তালিকায় জায়গা করে নিচ্ছে এটি। এছাড়া এ জাতীয় মাছের চামড়া এবং হাঙ্গরের শরীরের বিভিন্ন অংশ পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে বিপনণের সুযোগ থাকায় ব্যবসায়ীদের কাছে এটির চাহিদা রয়েছে।
- বাংলাদেশে হাঙ্গর ও শাপলা পাতার মতো রে জাতীয় মাছ সংরক্ষিত। আইন অনুযায়ী এসব মাছ ধরা, বিক্রি, পরিবহণ এবং খাওয়া নিষিদ্ধ।
- সংরক্ষণবিদরা বলছেন, এই মাছ সংরক্ষণে প্রচলিত আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকার পাশাপাশি রয়েছে সচেতনতার অভাব। এই প্রজাতিগুলো রক্ষা করতে হলে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে, দরিদ্র জেলেদের ভর্তুকি দিতে হবে বলে মনে করেন তারা।
বাংলাদেশে আমিষের অন্যতম উৎস হলো সামুদ্রিক মাছ। তবে এই তালিকায শাপলা পাতা (স্টিংরে) ও হাঙ্গরের মতো মাছ কিছুদিন আগেও সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় ছিল না। শুধুমাত্র কিছু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে এসব মাছ খাওয়ার প্রচলন দেখা যেতো। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে এসব প্রজাতির মাছের অবৈধ শিকার বেড়ে চলেছে।
গণমাধ্যমে আসা বিভিন্ন ঘটনা থেকে প্রায়ই শাপলা পাতা মাছের অবৈধ শিকারের বিষয়টি সামনে আসছে। এ বছর ২১ ফেব্রুয়ারি সুন্দরবন উপকূল এলাকায় প্রশাসনের এক অভিযানে ২২ জেলেকে আটক করা হয়। তাদের কাছ থেকে জব্দ করা হয় প্রায় ৪০০ কেজি শাপালা পাতা মাছ।
সংরক্ষণবিদ ও মৎস্য খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন প্রয়োগে দুর্বলতাই এর বড় কারণ। এছাড়া রয়েছে জেলেদের মধ্যে সচেতনতার অভাব, তার ওপর বাড়ছে অবৈধ চাহিদাও। এছাড়া জেলে সম্প্রদায়ের দারিদ্র্যও এ মাছের অবৈধ আহরণ একটি অন্যতম কারণ। ফলে বাংলাদেশে সংরক্ষিত এই সামুদ্রিক প্রজাতিটির শিকার বাড়ছে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ওয়াইল্ড লাইফ কনজার্ভেশন সোসাইটি বা ডাব্লিউসিএ-এর এক গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় ১০ ধরণের হাঙ্গর এবং ১২ ধরণের রে মাছের প্রজাতি দেখতে পাওয়া যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় স্টিংরে ও হুইপরে (Dasyatidae family), যা স্থানীয়ভাবে ‘শাপলা পাতা’ মাছ নামে পরিচিত। বাংলাদেশে হাঙ্গর ও রে মাছের অর্ধেকের বেশি প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানানো হয় গবেষণাটিতে।
২০১৮ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে শাপলা পাতা মাছ মূলত প্রান্তিক জেলেরাই শিকার করে। এই মাছ ধরতে তারা ব্যবহার করে গিলনেট, সেট ব্যাগ নেট (উপকূল ও মোহনায় ব্যবহৃত কম খরচের পদ্ধতি) এবং লংলাইন হুকের মতো উপকরণ। সমুদ্রতীর ও উপকূলীয় নদীতে ৫ মিটার থেকে ৪০ মিটার গভীরে এসব মাছ ধরা হয়। বিশেষ করে নোয়াখালী, ভোলা, পটুয়াখালী এবং বাগেরহাট জেলার উপকূলীয় এলাকায় এ প্রবণতা বেশি।

সাধারণ মাছের মতো চাহিদা না থাকায় এই মাছের দাম তুলনামূলক কম। মূলত সস্তা হওয়ার কারণেই সমাজের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে শাপলা পাতা মাছ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। গবেষণাটি বলছে, এসব মাছের চামড়া সাধারণত শুকিয়ে চীন, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর এবং মায়ানমারে পাঠানো হয়। শাপলা পাতা মাছের মতো হাঙ্গরও খাবার হিসেবে বাংলাদেশে খুব একটা জনপ্রিয় নয়। তবে হাঙ্গরের শুকানো পাখনা (ফিন) চীন, হংকং, সিঙ্গাপুর এবং থাইল্যান্ডসহ আরো কিছু দেশে রপ্তানি করা হয়। এছাড়া হাঙ্গরের পাখনা, মাংস ও হাড়ের চালানের বড় একটি অংশ স্থল সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমারেও পাচার করা হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে গবেষণাটিতে।
বিপন্ন প্রজাতি হওয়ায় বাংলাদেশ বন্য প্রাণী আইন ২০১২ এর আওতায়, স্টিং রে বা শাপলা পাতা সংরক্ষিত মাছ। তাই এই প্রজাতিটির শিকার, বিক্রি, পরিবহণ ও খাওয়া নিষিদ্ধ। আইন অনুযায়ী, এসব সংরক্ষিত প্রজাতির ব্যবসা করা দণ্ডনীয় অপরাধ।
বাংলাদেশ ফিসারিজ রিসার্চ ইন্সস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, বেশ কয়েক বছর ধরে জেলেদের মধ্যে অবৈধভাবে এ ধরনের সংরক্ষিত মাছ শিকারের প্রবণতা বাড়ছে। “আমরা শুধু গণমাধ্যমে আসা খবরগুলোই জানতে পারি। তবে এর বাইরে আরো অসংখ্য ঘটনা থেকে যায় আড়ালে। আইন প্রয়োগে দুর্বলতা এবং প্রজাতি সংরক্ষণ বিষয়ে জেলেদের অজ্ঞতাই এ ধরনের অপরাধের মূল কারণ। তিনি বলেন, “অবৈধভাবে ঠিক কী পরিমাণ মাছ ধরা হচ্ছে, এবং এর কারণে কোন কোন প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ছে এ বিষয়ে আমাদের কোনো সুনির্দিষ্ট গবেষণা নেই। এমনকি সরকারের ‘বার্ষিক মৎস্য আহরণ প্রতিবেদনে’ এসব সংরক্ষিত প্রজাতির নামও উল্লেখ করা হয় না।”
ডাব্লিউসিএস-এর বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছে না। উপকূলজুড়ে সংরক্ষিত সামুদ্রিক এ ধরণের প্রজাতি উদ্ধার করার উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, “এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। তবুও সরকার এখনো এই অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করতে পারেনি।”

সামুদ্রিক মাছের অবাধ শিকার ও জেলেদের বাস্তবতা
২০২৩-২৪ অর্থ-বছরের বাংলাদেশ মৎস্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত চার দশকে দেশের মোট সামুদ্রিক মাছ আহরণ বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ১৯৮৩-৮৪ সালে যেখানে সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ ছিল ১ লাখ ৬৫ হাজার টন, সেখানে ২০২৩-২৪ এ তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ২৯ হাজার টনে।
২০২১ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ৩৯৪টি প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ রয়েছে। ১৯৭১ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪৭৫টি। অর্থাৎ হারিয়ে গেছে অনেক প্রজাতি। গবেষণাটিতে বলা হয়, পরিবেশবিরোধী মানুষের নানা কার্যক্রম এর জন্য দায়ী। অপরিণত মাছ ধরা, অবাধ আহরণ এবং মাছের চলাচলের পথে বাধা তৈরি মাছের বৈচিত্র্য কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
নোয়াখালী জেলার একজন মাছ ব্যবসায়ী মাহবুবুল আলম ইউসুফী, পঁচিশ বছর ধরে আছেন আড়তদারী ব্যবসার সঙ্গে। তিনি মঙ্গাবে-কে বলেন, “খাবার হিসেবে এ ধরনের অপ্রচলিত মাছের চাহিদা এক দশক আগেও তেমন ছিল না। কিন্তু এখন চাহিদার ধরণ বদলে গেছে।” তিনি আরও বলেন,“জেলেদের জালে যখন এ ধরনের মাছ আটকা পড়ে তারা খুশী হন কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সমুদ্র থেকে মাছ পাবার পরিমাণ কমে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই, বড় মাছ ধরতে পারলে অন্য সব দিনের চেয়ে একটু বাড়তি আয় আসে তাদের।”
নোয়াখালী জেলার কদমতলা এলাকার পরাগোলা গ্রামের বাসিন্দা রুস্তম আলী হাওয়ালাদার। তিনি গত ৩০ বছর ধরে আছেন মাছ ব্যবসার সঙ্গে। মঙ্গাবে-কে বলেন, “সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জেলের সংখ্যা বেড়েছে। স্বাভাবিকভাবে মোট মাছ ধরার পরিমাণ বাড়লেও, ব্যক্তিগতভাবে তারা আর আগের মতো নিজেদের ভাগে পর্যাপ্ত মাছ পাচ্ছেন না। ফলে কমেছে আয়। আগের মতো মাছ না পাওয়ায় অনেক জেলে শাপলা পাতা মাছ শিকারের দিকে ঝুঁকছেন, কারণ এসব মাছ আকারে বড় এবং তুলনামূলকভাবে বেশি আয় নিশ্চিত করে।”

বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তরের ব্লু-ইকোনোমি বিভাগের উপ-পরিচালক মুহাম্মদ তানভীর হোসেন চৌধুরী বলেন, সামুদ্রিক মাছ অনিয়ন্ত্রিত হারে ধরা হচ্ছে, ফলে স্বাভাবিকভাবে কমে যাচ্ছে পরিমাণ। এই পরিস্থিতিতে জেলেরা বাধ্য হয়ে শাপলা পাতা এবং হাঙরের মতো সংরক্ষিত প্রজাতিও ধরতে শুরু করেছে। অর্থাৎ, অবাধ আহরণ পরোক্ষভাবে এসব প্রজাতির অবৈধ শিকার বাড়াচ্ছে। তিনি আরও বলেন, “পলি জমে উপকূলীয় নদী ও মোহনাগুলোতে নাব্য সংকট তৈরি হচ্ছে। এ কারণে শাপলা পাতা মাছ সহজেই ধরা পড়ছে জেলেদের জালে।”
নোয়াখালী জেলার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু নাসের মঞ্জু, মঙ্গাবে-কে জেলেদের বাস্তবতা তুলে ধরে বলেন, “প্রথমত, এসব প্রজাতি সংরক্ষণের ধারণাটি জেলেদের মধ্যে স্পষ্ট নয়, যে কারণে তারা সচেতনও নন। দ্বিতীয়ত, আকারে বড় হওয়ায় এই মাছগুলো তাদের ভালো আয় নিশ্চিত করে, যা প্রচলিত মাছ পর্যাপ্ত পরিমাণে না পাওয়ার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সাহায্য করে তাদের।”
এসব সামুদ্রিক প্রজাতি সংরক্ষণে সরকারকে সচেতনতা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে-পরামর্শ এই সাংবাদিকের। এছাড়া অবৈধ শিকার থেকে বিরত রাখতে দরিদ্র জেলেদের জন্য আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার বিকল্প নেই বলেও মনে করেন তিনি।
এ ধরনের সামুদ্রিক প্রজাতি সংরক্ষণের বিষয়ে, চৌধুরী মঙ্গাবে-কে বলেন, “প্রজাতিগুলোকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে সরকার ২০১২ সালের বন্যপ্রানী সংরক্ষণ আইনের আওতায় এদের সংরক্ষিত ঘোষণা করেছে। কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি, এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতির বিলুপ্তি রোধে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা আছে সরকারের।”
ব্যানার ছবি: নিজের শিকার করা দুটি শাপলা পাতা মাছ হাতে এক জেলে। ছবি: মুহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান।
সাইটেশন:
Mansur, E. F., Billah, G. M. M., Parves, N., Kauser, R., Shamsuddoha, M., … Smith, B. D. (2022) Shark and rays of Bangladesh -a guide to identifying protected species and their commonly traded parts. Wildlife Conservation Society Bangladesh. Retrieved from: https://www.researchgate.net/publication/378239777_Shark_and_rays_of_Bangladesh_-a_guide_to_identifying_protected_species_and_their_commonly_traded_parts
Hasan, M. D. M. (2018). Threatened shark biodiversity in the Bay of Bengal, Bangladesh: conservation needs. Journal of Aquatic Marine Biology, 7(3), 136. doi:10.15406/jamb.2018.07.00199
Rahman, M. J., Nahiduzzaman, M., & Wahab, M. A. (2021). Threats to Fish Biodiversity in Bangladesh Waters and Measures for Revival of Declining Population. Journal of the Indian Society of Coastal Agricultural Research, 39(2), 66-79. doi:10.54894/JISCAR.39.2.2021.111076
Uddin, M. N., Rahman, M., Hossain, M. J., Tumpa, I. J., & Hossain, Z. (2018). Study of stingray harvesting, marketing and utilization in Cox’s Bazar, Bangladesh. Journal of the Bangladesh Agricultural University, 16(3), 539-544. doi:10.3329/jbau.v16i3.39452.