- সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঐতিহ্যবাহী জুম চাষ থেকে বের হয়ে, অর্থকরী ফসল চাষে ঝুঁকছে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের কৃষকরা।
- জুম চাষের প্রায় ৪০,০০০ হেক্টর জমির বড় একটি অংশকে, বিভিন্ন অর্থকরী ফসল চাষের জন্য এরই মধ্যে রূপান্তর করা হয়েছে। এসব ফসলের মধ্যে আদা, হলুদ, আনারস ও কলা উল্লেখযোগ্য।
- এই পরিবর্তনে লাভবান হচ্ছে কৃষক ও বিনিয়োগকারী। তবে পাহাড়ি এলাকার প্রতিবেশের ওপর পড়তে শুরু করেছে নেতিবাচক প্রভাব। বিশেষ করে মাটির ক্ষয় বৃদ্ধি, ছোট ছোট ঝর্ণা ও পানির উৎস শুকিয়ে যাওয়া, ভূমিধস ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের পানির সংকট তৈরির মতো সমস্যা সামনে এসেছে।
গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অনেকেই ঐতিহ্যবাহী জুমভিত্তিক কৃষি পদ্ধতি ছেড়ে, লাভজনক অর্থকরী ফসল চাষের দিকে ঝুঁকছে। তবে এই অর্থনৈতিক লাভের ধারা ধীরে ধীরে পরিবেশগত ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে তীব্র মাটিক্ষয় এবং পানির সংকটসহ দেখা দিচ্ছে বিভিন্ন পরিবেশগত সমস্যা।
রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এই তিন জেলা নিয়ে গঠিত হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল। অনন্য পাহাড়ি বনভূমি ও সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত এই অঞ্চল। এখানে রয়েছে বেশ কয়েকটি আদিবাসী জনগোষ্ঠির বসবাস।
পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের কৃষিনির্ভর মানুষ ঐতিহ্যগতভাবেই জুম চাষে অভ্যস্ত। মূলত একটি জমিতে তিন থেকে পাঁচ বছর চাষবাসের পর, তা পাঁচ থেকে বিশ বছর পর্যন্ত পতিত অবস্থায় রাখা হয়। এরপর সেখানকার আগাছা ও গাছপালা কেটে সেখানেই শুকিয়ে এবং পরে পুড়িয়ে ফেলার মধ্য দিয়ে আবার জমিটিকে চাষযোগ্য করে তোলাই হলো জুম চাষ।
২০১৬ সালের একটি গবেষণায়দেখা যায়, এ অঞ্চলের মানুষ আনারস, কলা, পেঁপে, হলুদ ও আদার মতো অর্থকরী ফসল চাষের সঙ্গে ধীরে ধীরে যুক্ত হচ্ছেন। সাধারণত একই জমিতে প্রতি বছর নিয়মিতভাবে চাষ করা হয় এসব ফসল।
বাংলাদেশের একটি অলাভজনক সংস্থা আনন্দ-এর সাবেক প্রকল্প ব্যবস্থাপক রতন কুমার দে বলেন, “বর্তমানে এই অঞ্চলে অর্থকরী ফসল চাষ খুবই সাধারণ প্রবণতা এবং এসব ফসলের জন্য জমি দীর্ঘ সময় পতিত রেখে চাষযোগ্য করার প্রয়োজন হয় না। সরকার ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রকল্প, পাশাপাশি সামাজিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও করপোরেট উদ্যোগের মাধ্যমে এসব পরিবর্তন এসেছে।” গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নে কাজ করা এই সংস্থাটির সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ১৮ বছর কাজ করেছেন তিনি।

২০২৪ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, পাহাড়ি জমিতে জুম চাষের প্রায় ৪০,০০০ হেক্টর এলাকার বড় একটি অংশকে বিভিন্ন অর্থকরী ফসল চাষের জন্য রূপান্তর করা হয়েছে। এসব ফসলের মধ্যে আদা, হলুদ, আনারস ও কলা উল্লেখযোগ্য।
গবেষণাটিতে উল্লেখ করা হয়, পাহাড়ি এলাকায় প্রাকৃতিক বনভূমির পরিমাণ সময়ের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। ১৯৬৩ সালে যেখানে বনভূমির আয়তন ছিল প্রায় ১,৭২,০০০ হেক্টর, যা ২০০৫ সালে প্রায় ৭০,০০০ হেক্টরে নেমে আসে। এছাড়া বননির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবিকা নির্বাহ কঠিন হওয়ার একটি অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় বনভূমির পরিমাণ কমে যাওয়াকে।
এদিকে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনেগুলোতে<দাবি করা হচ্ছে, বর্তমানে বাংলাদেশের মৌসুমি ফল উৎপাদনের একটি বড় অংশই আসে পাহাড়ি জেলাগুলো থেকে।
এটা ঠিক যে ঐতিহ্যবাহী কৃষি পদ্ধতিতে চাষবাষের তুলনায় বর্তমানে অর্থকরী ফসল চাষ স্থানীয়দের জন্য অর্থনৈতিক লাভ নিশ্চিত করছে। তবে আশংকার বিষয় হলো আধুনিক এই চাষাবাদ পদ্ধতি এলাকায় তীব্র মাটিক্ষয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সরকার পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রতি হেক্টরে বছরে মাটি ক্ষয় হয়েছে সর্বোচ্চ ৮৬ দশমিক ৬২ টন। তবে এসব এলাকায় হেক্টর প্রতি মাটি ক্ষয়ের মাত্রা ৪০ টনকে স্বাভাবিক হিসেবে ধরা হয়।
বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তন, অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি এবং ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তনকে, মাটি ক্ষয়ের জন্য দায়ী করা হয় গবেষণাটিতে। তবে বন উজাড় এবং পাহাড়ি ঢালে অর্থকরী ফসল চাষের জন্য ব্যাপকভাবে জমির ব্যবহার মাটিক্ষয়ের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অঞ্চলে কয়েকটি তীব্র ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন অনেক স্থানীয় বাসিন্দা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আবাসন, সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য অবকাঠামো।
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি ও উন্নয়ন বিষয়ক নীতি গবেষণাকারী একটি প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক আহসান উদ্দিন আহমেদ জানান, “অধিকাংশ অর্থকরী ফসলের জন্য নরম মাটির প্রয়োজন। কৃষকরা স্বাভাবিকভাবেই জমি প্রস্তুত করতে গিয়ে কেটে ফেলেন ঝোপ-ঝাড় ও গাছপালা। এতে নষ্ট হয় জমির স্থিতিস্থাপকতা, যা বাড়িয়ে দেয় মাটি ক্ষয়ের ঝুঁকি।”
আহসান উদ্দিন আহমেদ গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের স্বতন্ত্র প্রযুক্তিগত উপদেষ্টা প্যানেলের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি আরো বলেন, “ভারী বর্ষায় ঝর্নার পানির সঙ্গে মাটি ধুয়ে চলে যায় এবং জলাধার ভরে ওঠে মাটিতে। এর ফলে নষ্ট হয় সেখানকার প্রাণ প্রকৃতির আবাসস্থল।
পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমিধসের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে ভারী বর্ষণ, পাহাড় কাটা এবং বন উজাড় অন্যতম। ২০২০ সালের এক গবেষণাতেও উল্লেখ করা হয় এটি।
এছাড়াও, বন উজাড় এবং ভূমিধসের প্রভাবে পাহাড়ি এলাকায় মানুষের দৈনন্দিন পানির প্রধান উৎস ছোট ছোট ঝর্ণা ও ঝিরিগুলোও শুকিয়ে যাচ্ছে।
২০২৩ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়, বছরের পর বছর ধরে খাবার পানির মূল উৎস ঝর্ণা ও নদীগুলো শুকিয়ে গেছে। ফলে পাহাড়ি জেলার বাসিন্দারা পড়েছেন, খাবার পানি তীব্র সংকটে।

সংকটকে তরান্বিত করছে বাণিজ্যিক উদ্যোগ
স্থানীয়দের পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শুরু হওয়া কিছু বাণিজ্যিক উদ্যোগ জটিল করে তুলছে পরিস্থিতি।
এই সংকট আরো তীব্র হওয়ার আশংকা তৈরি হয়, যখন আমরা দেখি বাংলাদেশের অন্যতম বড় খাদ্য ও পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, প্রাণ ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ কাসাভা চাষে বিনিয়োগ করছে।
গণমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এরই মধ্যে তারা খাগড়াছড়ি জেলায় প্রায় ৪৮৬ হেক্টর মিশ্র প্রাকৃতিক বনভূমি উজাড় করেছে।
যদিও সংখ্যায় কম, তবুও কিছু স্থানীয় বাসিন্দা অর্থকরী ফসল চাষের বাণিজ্যিক উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন এবং পাহাড় ও পরিবেশের ক্ষতি বিবেচনা করে সরকারের কাছে এই চর্চা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
খাগড়াছড়িতে অবস্থিত পিটাছড়া নামে একটি ব্যক্তিগত সংরক্ষণ উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত মাহফুজ আহমেদ রাসেল। তিনি মঙ্গাবে-কে বলেন, “স্থানীয়দের পাশাপাশি, কিছু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বড় আকারে অর্থকরী ফসল চাষ শুরু করেছে। আর এসব উদ্যোগে চাষী হিসেবে কাজ করছেন ওইসব এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠী থেকে আসা মানুষ, যা উদ্বেগজনক।”
জলবায়ু ঝুঁকি এবং সম্ভাব্য সমাধান
গত কয়েক দশক ধরে পাহাড়ি অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। যা আগামী দিনগুলোতে ভূমিধসের আশংকা বাড়িয়েই চলেছে।
২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের মৌসুম বদলেছে। কমেছে বর্ষা ঋতুর সময়কাল। তবে বেড়েছে বৃষ্টির তীব্রতা। যা ভূমিধস এবং বন্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলছে।
পরিবেশগত ক্ষতি থাকা সত্বেও, এই অঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কৃষি পদ্ধতির পরিবর্তন প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান শেখ সালেহ আহমেদ।
“প্রথমেই সবার জন্য খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা আমাদের প্রধান লক্ষ্য। অর্থকরী ফসল মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়িয়েছে। এখন পরিবারের সবার জন্য খাবার নিশ্চিত করতে পারছেন তারা। এছাড়া তাদের সন্তানদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের নূন্যতম সুবিধা দেয়া, এই অর্থকরী ফসলের মাধ্যমেই সম্ভব হচ্ছে। যা আগে ছিল না” -বলেন আহমেদ।
জলবায়ু ঝুঁকি এবং পরিবেশগত সংকট সম্পর্কে আহমেদ মঙ্গাবে-কে বলেন, “আমরা বর্তমানে একটি বড় প্রকল্প পরিকল্পনা করছি, যার মাধ্যমে এ অঞ্চলের প্রতিবেশগত ঝুঁকি কমানো এবং পানির সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।”
এই অঞ্চল দরিদ্র এবং অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে, তাই স্থানীয় মানুষের জন্য অর্থকরী ফসল এড়িয়ে যাওয়া খুব একটা সহজ হবেনা।
মাহফুজ রাসেল বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের পর্যটকদের প্রিয় গন্তব্যগুলোর মধ্যে একটি। তাই সরকারিভাবে অঞ্চলটিতে, টেকসই পর্যটন ব্যবস্থা বিস্তার করার পরামর্শ তার।
স্থানীয়দের সরাসরি অর্থনৈতিকভাবে লাভবান করতে ‘হোমস্টে পর্যটন’ একটি ভালো বিকল্প বলে মনে করেন মাহফুজ।
ব্যানার ছবি: চট্টগ্রামে বিক্রির জন্য স্তুপ করে রাখা কলা। ছবি: Moheen Reeyad via Wikimedia Commons (CC BY-SA 4.0)।
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে গ্লোবাল-এ, ২০২৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি।
সাইটেশন:
Chakma, S. (2023). Water Crisis in the Rangamati Hill District of Bangladesh: A Case Study on Indigenous Community. International Journal of Disaster Risk Management, 5(2):29-43 doi:10.18485/ijdrm.2023.5.2.3
Chakma, P., Moniruzzaman Muzib, M., Bhowmik, D., Rahat Jui, J., Kumar Saha, S., & Mahmood Shaon, S. (2025). Transformative Harvests: Agricultural Diversification and Economic Resilience in the Chattogram Hill Tracts of Bangladesh. MBSTU Journal of Science and Technology, 11(2), 62-72. doi:10.69728/jst.v11.83
Misbahuzzaman, K. (2016). Traditional farming in the mountainous region of Bangladesh and its modifications. Journal of Mountain Science. 13, 1489–1502. doi:10.1007/s11629-015-3541-7
Nadiruzzaman, M., Shewly, H. J., Rashid, M. B., Mukul, S. A., & Dutta, O. (2025). Beyond Climate Reductionism: Environmental Risks and Ecological Entanglements in the Chittagong Hill Tracts of Bangladesh. Earth, 6(3), 63. doi:10.3390/earth6030063
Rasul, G. & Gurung, P. (2024). Unlocking the potentials of sustainable livelihoods in Chattogram Hill Tracts of Bangladesh. Nature-Based Solutions. 5, 100108. doi:10.1016/j.nbsj.2023.100108
Feedback: Use this formto send a message to the author of this post. If you want to post a public comment, you can do that at the bottom of the page.