- বাংলাদেশে ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে পোড়ামাটির ইটের বদলে কংক্রিট ব্লকসহ বিকল্প সামগ্রী ব্যবহার বাধ্যতামূলক হলেও, বেশিরভাগ সরকারি প্রকল্পতেই তা মানা হচ্ছেনা। ব্যতিক্রম গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।
- প্রতি বছর প্রায় ৯ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনমিটার, কৃষি জমির ওপরের স্তরের মাটি (টপ সয়েল) কেটে নেওয়া হয়। দেশের প্রায় ৭,০০০টি ইট ভাটায় ব্যবহার হয় এই মাটি। ফলে বহু কৃষিজমি দীর্ঘ সময়ের জন্য অনাবাদী হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি দেশের মোট গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনের প্রায় তিন ভাগের জন্য দায়ী ইট ভাটা শিল্প।
- সরকার কম খরচের বিকল্প ব্যবস্থা, যেমন কম্প্রেসড স্ট্যাবিলাইজড আর্থ ব্লকসহ (CSB) বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী তৈরি করলেও সেগুলোর ব্যবহার এখনো সীমিত।
- বিকল্প নির্মাণ সামগ্রীর ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট থাকায়, পোড়ামাটির ইটের তুলনায় কম প্রতিযোগিতামূলক হয়ে পড়ছে এগুলো। ফলে বাড়ছেনা চাহিদা, বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বিনিয়োগ। তাই সরকার নতুন সময়সীমা নির্ধারণ ও আইনের কঠোর প্রায়োগিক পরিকল্পনা করবে বলে ভাবছে।
২০২৫ সালের জুনের মধ্যে সরকারি সব নির্মাণ কাজে প্রচলিত ইটের ব্যবহার বন্ধ করা হবে, এরকম একটি লক্ষ্য ঠিক করে বাংলাদেশ সরকার। এটি বাস্তবায়ন করতে ২০১৯ সালে একটি পরিপত্র জারি করে তারা। সেখানে বলা হয়, সরকারি সব নির্মাণ কাজে এখন থেকে পোড়ামাটির ইটের বদলে, ব্যবহার হবে কংক্রিট ব্লকসহ অন্যান্য পরিবেশবান্ধব উপকরণ। এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য ছিল, ইটভাটার কারণে কৃষিজমি হারানো এবং উচ্চমাত্রার গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন রোধ করা। তবে একজন শীর্ষ কর্মকর্তার মতে, এই উদ্যোগটি মূলত ব্যর্থ হয়েছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান মঙ্গাবে-কে বলেন, “শুরুর দিকে আমাদের লক্ষ্য ছিল সরকারি সব ধরনের কাজ, যেমন অবকাঠামো, সড়কসহ অন্যান্য নির্মাণকাজে কংক্রিট ব্লক ও হোলো ব্রিক ব্যবহার করা। তবে দুঃখজনকভাবে অধিকাংশ সরকারি প্রকল্পেই এখনো ব্যবহার হচ্ছে প্রচলিত ইট। ফলে ধরে নেয়া যায়, এই লক্ষ্যটি মূলত ব্যর্থ হয়েছে।”
বিভিন্ন সরকারি দপ্তর নানা ধরনের নির্মাণ প্রকল্প পরিচালনা করে, যার মধ্যে রয়েছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর।
হাসান বলেন, “এদের মধ্যে শুধু গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ই শতভাগ পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার নিশ্চিত করতে পেরেছে, বাকি মন্ত্রণালয়গুলো লক্ষ্য থেকে অনেক পিছিয়ে।”
পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ জিয়াউল হক বলেন, এই রূপান্তরের জন্য নতুন সময়সীমা নির্ধারণের পরিকল্পনা চলছে।
তিনি জানান, “আমাদের হিসাব অনুযায়ী এখন পর্যন্ত মোট সরকারি নির্মাণকাজের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ ভাগে বিকল্প নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার শুরু হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “আমরা একটি নতুন সময়সীমা নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর ওপর কঠোর নির্দেশনা আরোপের পরিকল্পনা করছি, যাতে শতভাগ পরিচ্ছন্ন ইট ব্যবহারের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়।”
হাসান বলেন, “এদের মধ্যে শুধু গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ই একশভাগ পরিচ্ছন্ন নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার নিশ্চিত করতে পেরেছে, বাকি মন্ত্রণালয়গুলো লক্ষ্য থেকে অনেক পিছিয়ে আছে।”
পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক বলেন, এই রূপান্তরের জন্য নতুন সময়সীমা নির্ধারণের পরিকল্পনা চলছে।
তিনি জানান, “আমাদের হিসাব অনুযায়ী এখন পর্যন্ত মোট সরকারি নির্মাণ কাজের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশে বিকল্প নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার শুরু হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “আমরা একটি নতুন সময়সীমা নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর ওপর কঠোর নির্দেশনা আরোপের পরিকল্পনা করছি, যাতে পোড়ামাটির ইটের শতভাগ পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহারের লক্ষ্য অর্জন করা যায়।”
মাটি ও জলবায়ূর জন্য হুমকি
দেশজুড়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, সরকারি ও বেসরকারি খাতে অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যাপক বিস্তার হয়েছে। ফলে বেড়েছে নির্মাণ সামগ্রীর চাহিদা। বিশেষ করে ইটের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। তবে এটি পোড়ামাটির ইট। যা তৈরিতে ব্যবহার করা হয় জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি। অথচ ভালো ফসলের জন্য মাটির এই অংশটিই অপরিহার্য।
বাংলাদেশে প্রায় ৭,০০০ ইট ভাটা থেকে, বছরে আনুমানিক ২৩ বিলিয়ন ইট উৎপাদন হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, এই কাজে ব্যবহার হয় প্রায় ৯ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনমিটার (৩.৩৫ বিলিয়ন ঘনফুট) কৃষি জমির উপরিভাগের মাটি। যেসব জমি থেকে এই মাটি সংগ্রহ করা হয়, তা অন্তত তিন বছর আর চাষের উপযোগী থাকেনা। ফলে কমতে থাকে কৃষি উৎপাদনের জন্য জমির পরিমাণও।
এদিকে, প্রচলিত ইট তৈরির প্রক্রিয়া নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। ইট পোড়াতে ভাটায় জ্বালানি হিসেবে কাঠ ও কয়লা ব্যবহার করা হয়, যা গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ বাড়ায়। প্যারিস জলবায়ু চুক্তির অধীনে বাংলাদেশ এই গ্যাস নির্গমন কমাতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। দেশের মোট নির্গমনের প্রায় ৩ শতাংশের জন্য দায়ী ইটভাটা শিল্প।
ইটভাটার কারণে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকার উর্বর মাটির স্তর অপসারণ হওয়ায়, বহু জমি চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। যা খাদ্য উৎপাদন ও কৃষি পরিবেশের জন্য বড় ধরনের হুমকি ডেকে আনছে প্রতিনিয়ত।

কার্যকর হয়নি প্রস্তাবিত বিকল্প
সমস্যাগুলোকে সামনে রেখে, ২০১৯ সালের একটি আইনে “ইট” এর সংজ্ঞা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। নতুন সংজ্ঞা অনুযায়ী, মাটি ব্যবহার হয়না এবং ভাটায় পোড়ানো লাগে না এরকম অন্য নির্মাণ উপকরণকেও (কংক্রিট ব্লক) ইট হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এই আইন বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে, সরকার ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে সরকারি প্রকল্পগুলোতে প্রচলিত ইট ধাপে ধাপে বন্ধ করে বিকল্প নির্মাণসামগ্রী পুরোপুরি চালুর নির্দেশ দেয়।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বাংলাদেশ হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট এইচবিআরআই-কে বিকল্প উপকরণ উদ্ভাবনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। গবেষণার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি দেখায় যে সিমেন্ট, বালু, ড্রেজিং করা মাটি এবং লোহার জালের মতো বিকল্প উপকরণ ব্যবহার করে, অনেকাংশে জমির উপরিভাগের মাটি সংরক্ষণ করা সম্ভব।
কম্প্রেসড স্ট্যাবিলাইজড আর্থ ব্লক অর্থাৎ সিএসইবি, যা সিমেন্ট ও ড্রেজিং করে আনা নদীর পলিমাটি মিশিয়ে তৈরি করা হয়। এইচবিআরআই–এর তথ্য অনুযায়ী, এই ব্লকের উৎপাদন খরচ প্রচলিত ভাটায় পোড়ানো ইটের প্রায় অর্ধেক।
তবে এসব বিকল্প নির্মাণ সামগ্রীর চাহিদা তেমন দেখা যাচ্ছে না। মূলত সরকারের আরোপিত অতিরিক্ত করের কারণে এর দিকে ঝুঁকছেনা উৎপাদকরা। তাদের মতে, এই কর কংক্রিট ব্লকসহ অন্যান্য বিকল্প উপকরণকে প্রচলিত ইটের তুলনায় কম প্রতিযোগিতামূলক করে তুলেছে।
বাংলাদেশ কংক্রিট ব্লকস অ্যান্ড পেভার্স ম্যানুফ্যাকচারার সোসাইটি’র সভাপতি মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “দেশের মোট ইটের চাহিদা পূরণের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আমরা পর্যাপ্ত পরিমাণে পরিবেশবান্ধব ইট উৎপাদন করতে পারছি না, কারণ বিনিয়োগকারীরা পর্যাপ্ত লাভ পাচ্ছেন না তাদের উদ্যোগ থেকে।”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে আমরা উৎপাদন খরচের ওপর অতিরিক্ত ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর দিচ্ছি, যা অনেক ক্ষেত্রে বিনিয়োগই উঠে আসছেনা। অন্যদিকে প্রচলিত ইটভাটার ক্ষেত্রে নিয়ম ভিন্ন, কারন তারা প্রথম ৫ লাখ ইট উৎপাদনের ওপর একটি নির্দিষ্ট হারে কর দেয়। এটাই মূল পার্থক্য তৈরি করছে।”
হোসেন আরো বলেন, “যদি আমরা পণ্যের দাম প্রচলিত ইটের তুলনায় কমাতে পারি, তাহলে ব্যবহারকারীদের মধ্যে চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে।”
ব্যানার ছবি: ঢাকার সাভারে একটি ইটভাটায় ইট পোড়ানোর জন্য শ্রমিকরা বালতিতে করে কয়লা বহন করছেন। ছবি: AP Photos/A.M. Ahad।
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে গ্লোবাল-এ, ২০২৬ সালের ২ জানুয়ারি।
সাইটেশন:
Biswas, D., Gurley, E. S., Rutherford, S., & Luby, S. P. (2018). The drivers and impacts of selling soil for brick making in Bangladesh. Environmental Management, 62(4), 792-802. doi:10.1007/s00267-018-1072-z
Sarker, M. A. H., & Ishtiak, M. I. (2018). Alternative building material in Bangladesh: A way towards sustainability. International Journal of Research Studies in Science, Engineering and Technology, 5, 41-45. Retrieved from https://www.researchgate.net/publication/342261891