- পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার একটি গ্রামে “সিড গোট ব্যাংক” নামে প্রকল্পের মাধ্যমে, কমছে মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণীর সংঘাত।
- মাংসাশী প্রাণীর আক্রমণে মারা যাওয়া ছাগলের বদলে ব্যাংক থেকে আরেকটি ছাগল দেওয়া হয়, এই প্রকল্পের আওতায়।
- এর আগে ২০১৭ সালে হাওড়া জেলার সারদা গ্রামেও নেওয়া হয়েছিল একই রকম প্রকল্প, তবে দুই বছরের মধ্যে সেটি বন্ধ হয়ে যায়।
কলেজ ছুটি পেলেই নিজ পরিবারের পালিত ছাগলগুলো দেখাশোনা করেন বিমল মাহাতো। তার বয়স তেইশ বছর। বিমলদের ছাগলের সংখ্যা ১৫টি। পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার হারাতন গ্রামে তাদের বাড়ি। বাড়ির কাছের একটি জঙ্গলে তিনি ছাগলগুলো চরাতে নিয়ে যান নিয়মিত।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে এমনই এক দিনে ছাগল চড়িয়ে জঙ্গল থেকে ফেরার পথে লক্ষ করেন, একটি ছাগল কম। গুনে দেখেন সত্যি তাই।
মাহাতো বলেন, “আমাদের গ্রামের পাশের এই জঙ্গলে, যার ওপারেই ঝাড়খণ্ড, সেদিকটায় বেশ কিছু মাংসাশী প্রাণী আছে। আমি দেখেছিলাম কিছু একটা আমার ছাগলটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, তবে ঠিক কোন প্রাণী বুঝতে পারিনি। এই জঙ্গলে নেকড়ের সংখ্যা খুব বেশি নয়, আর শিয়ালের মতো ছোট প্রাণীর পক্ষে এত দ্রুত ছাগলটি টেনে নিয়ে যাওয়াও কঠিন।”
এটি হয়তো চিতাবাঘের মতো বড় কোনো প্রাণীই ছিলো বলে ধারণা মাহাতোর। তিনি আরও বলেন, গত বছর কয়েকবার চিতাবাঘ দেখা গিয়েছিল, তাই আমার ছাগলটি চিতাবাঘও নিয়ে যাওয়ার সম্ভাববনা উড়িয়ে দেয়া যায়না।

যে সময় মাহাতোর ছাগল খোয়া গেলো, সে মাসেই সিড গোট ব্যাংক-এর মাধ্যমে তিনি আর একটি বদলি ছাগল পান। “সিড গোট ব্যাংক” ২০২৪ সালে সিমনি এলাকায় পরিচালিত একটি প্রকল্প যা পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক পরিবেশবাদী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হিউম্যান অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট অ্যালায়েন্স লিগ বা এইচইএএল-এর মাধ্যমে চলে। তারা ক্ষতিগ্রস্থদের মধ্যে আনুপাতিক হারে এই ছাগল বিতরণ করে।
এইচইএএল-এর গবেষক বাসুধা মিশ্র মঙ্গাবে-কে জানান, ডাব্লিউ ডাব্লিউ এফ-ইন্ডিয়ার অর্থায়নে এই পাইলট প্রকল্পটি শুরু হয়, যার লক্ষ্য ছিল কমিউনিটি-ভিত্তিক মাংসাশী প্রাণী সংরক্ষণ।
গবাদিপশু হত্যার ক্ষোভ, প্রায়ই বন্যপ্রাণী হত্যার প্রতিশোধমূলক ঘটনা বাড়িয়ে তুলছে। বিশেষ করে যখন শিকারি প্রাণীর আবাসস্থল মানুষের বাসাবাড়ির এলাকা ও অরক্ষিত জঙ্গলে ঘেরা থাকে। মিশ্র বলেন, “পুরুলিয়ায় বিভিন্ন ধরনের বন্যপ্রাণী থাকলেও নির্দিষ্ট সংরক্ষিত এলাকা নেই। এখানে চিতাবাঘ, নেকড়ে, হায়েনা ও শিয়ালের মতো প্রাণী আছে, যারা গবাদিপশু শিকার করে। এর ফলে অতীতে প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ড হয়েছে। আমাদের এই প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি হলো এই হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা।”
গোট ব্যাংক কীভাবে কাজ করে
পুরুলিয়ার সিমনি এলাকায় প্রধান জীবিকা কৃষি ও ছাগল পালন। সেখানেই এই গোট ব্যাংক গড়ে তোলা হয়েছে।
মাহাতো বলেন, “এখানকার বেশিরভাগ পরিবারের ১০ থেকে ১২টি ছাগল থাকে। একটি ছাগলের দাম প্রায় ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা। আমরা এগুলো মাংসের জন্য বড় করি। পরে কসাইখানা, ক্যাটারিং বা বড় অনুষ্ঠানে বিক্রি করে দেই।”
তিনি আরও বলেন, “পুরুলিয়ায় ধান ও সবজিও চাষ করি, তবে ভূপ্রকৃতির গঠন ও পানির অভাবে কৃষিকাজ কঠিন। তাই জীবিকার জন্য আমরা ছাগল পালনের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।”
পুরুলিয়ার অবস্থান ছোটনাগপুর মালভূমিতে, যেখানে আধা-শুষ্ক পরিবেশ ও মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা কম।

গোট ব্যাংকটি একটি গ্রামভিত্তিক ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। যারা এর কার্যক্রম ও ক্ষতিপূরণ তদারকি করে। এখন পর্যন্ত, এক বছরের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে ব্যাংকটি শিকারী প্রাণীদের আক্রমণে হারানো তিনটি ছাগলের ভর্তুকি হিসেবে নতুন ছাগল দিয়েছে।
সিমনির বাসিন্দা ও কমিটির সদস্য মানিকচাঁদ মণ্ডল বলেন, “ স্বেচ্ছাসেবী ছাগল-রক্ষাকারীদের নির্বাচন করে কমিটি, যাদের ১০টি মাদি ছাগল দেওয়া হয়। শর্ত হিসেকে থাকে- এসব ছাগলের যত বাচ্চা হবে প্রত্যেকের কাছ থেকে একটি করে বাচ্চা ব্যাংকে দিতে হবে, যা ক্ষতিপূরণ হিসেবে ব্যবহার করা হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্য থেকে যখন কোনো দাবি আসে, আমরা যাচাই করি সেটি সত্যিই বন্যপ্রাণীর আক্রমণে হয়েছে কি না। তারপর ব্যাংক থেকে একটি ছাগল দেওয়া হয়।”
যাচাইয়ের জন্য প্রথমে মৃতদেহ পরীক্ষা করা হয়। মৃতদেহের অবশিষ্টাংশ ব্যবহার করা হলে দাবি গ্রহণ করা হয় না।
মিশ্র জানান, এই ব্যবস্থা সফল হয়েছে কারণ এটি স্থানীয় “ভাগি” পদ্ধতির মতো, যেখানে কেউ নিজে ছাগল পালতে না পারলে অন্যের কাছে দেয় এবং বিনিময়ে ছাগলের বাচ্চা পায়।
হাওড়ার সারদা গ্রামে একই প্রকল্পের ব্যর্থতার কারণ
২০১৭ সালে হাওড়ার সারদা গ্রামে একই প্রকল্প শুরু হয়েছিল। এটি জলাভূমি ঘেরা একটি এলাকা। যেখানে মেছোবাঘের আবাস। তবে জলাভূমি কমতে থাকায় মাছের ঘের ও গবাদিপশুর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে প্রানীটি। ফলে বাড়তে থাকে সংঘাত। এই সংঘাত কমাতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গোট ব্যাংক চালু করে। তবে যাচাই প্রক্রিয়া কঠিন হওয়ায় সেসময় টিকতে পারেনি এটি।

সংগঠনের প্রধান জয়দেব প্রধান মঙ্গাবে-কে বলেন, “যখন এনজিওর সদস্যরা সচেতনতা বাড়াতে গ্রামে ঘুরে ঘুরে প্রাণীটির ছবি দেখাচ্ছিলেন, তখন গ্রামবাসীরা সম্মতি জানাচ্ছিলো এটা বলে যে- ‘এটাই তো সেই প্রাণী, যে আমাদের ছাগল নিয়ে যায়, আমরা এটাকে কেন রক্ষা করব?’ এই নেতিবাচক মনোভাব এবং মানুষ ও প্রানীদের মধ্যে সংঘাত কমাতে সংগঠনটি পরে ‘সিড গোট ব্যাংক’-এর ধারণা নিয়ে আসে।
এই প্রকল্পের আওতায় সারদা গ্রামের স্থানীয়দের গর্ভবতী ছাগল দেওয়া হয়। শর্ত থাকে দ্বিতীয়বার বাচ্চা হওয়ার পর একটি মেয়ে ছাগলছানা ‘গোট ব্যাংক’-এ দিতে হবে। পরবর্তীতে মেছোবাঘের আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া হয় এই ছাগলগুলো।
সারদা গ্রামের এই প্রকল্প সম্পর্কে তিনি বলেন, “দুই বছর ধরে প্রকল্পটি খুব মসৃণভাবে চলেছে। গ্রামের মানুষদের মধ্যে আস্থা ছিল, এবং তারা কোনো লোভ ছাড়াই প্রকৃত ঘটনাগুলো জানাতেন। তবে কর্মসূচিটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পর এবং আরও বড় পরিসরে বেশি সংখ্যক গ্রাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ভুক্তভোগী যাচাই-বাছাই কঠিন হয়ে পড়ে। অন্য গ্রাম থেকে মানুষ ভুয়া অভিযোগ জানাতে শুরু করে। আর ক্ষতিপূরণ না পেলে ক্ষোভ জানাতো তারা এবং প্রকল্প সম্পর্কে খারাপ কথা ছড়াতো।”
মেছোবাঘ বিশেষজ্ঞ এবং জীববিজ্ঞানী তিয়াসা আঢ্য, যিনি সারদা প্রকল্পের কারিগরি উপদেষ্টাও ছিলেন, তিনি এই পরিস্থিতির জন্য রাজনীতিকেও দায়ী করেন। তিনি বলেন, “ভুল তথ্য দেওয়া এবং যথাযথ প্রমাণ না থাকায় যখন কিছু মানুষকে ছাগল দেওয়া হয়নি, তখনই বিষয়টির সঙ্গে রাজনীতি জড়িয়ে পড়ে। তহবিল আত্মসাতের গুজব এবং ভুক্তভোগী অন্য গ্রামের হলে ছাগল দেয়া হয়না এমন কথাবার্তা ছড়িয়ে পড়তে থাকে এলাকায়। এরপর থেকেই এই কর্মসূচি ও প্রজাতিটির প্রতি মানুষের ক্ষোভ বাড়তে থাকে। ফলে আমরা মনে করেছি প্রকল্পটি বন্ধ করাই ভালো।”
তিনি আরও বলেন, “দাবির সংখ্যা আক্রমণের গড় ঘটনার তুলনায় অনেক বেশি ছিল। সবাই আক্রমণের অভিযোগ জানাচ্ছিল, তবে আমাদের অনুসন্ধানকারী দল মাঠে কোনো প্রমাণ খুঁজে পাচ্ছিল না। তখনই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অন্য গোষ্ঠীগুলোও জড়িয়ে পড়ে পুরো কর্মসূচিটিকেই জটিল করে তোলে।” আঢ্যর মতে, এটিই ছিল ভারতের প্রথম ‘গোট ব্যাংক’ প্রকল্প।

মিশ্র আরও উল্লেখ করেন যে, পুরুলিয়ার প্রকল্পটি সফল হয়েছে কারণ তাদের কমিটিটি স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে গঠিত ছিল এবং কোনো নেতা ছিল না। “গ্রামবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য দুই জন নির্দিষ্ট প্রতিনিধি ছিলেন। এছাড়া স্বচ্ছতা বজায় রাখতে আমরা ইংরেজি ও বাংলা-দুই ভাষায় প্রকল্পের একটি নথি তৈরি করি এবং এইচইএএল ও স্থানীয় কমিটির সব অংশীজনের স্বাক্ষর নিই।”
ব্যানার ছবি: পুরুলিয়ায় ‘সিড গোট ব্যাংক’ থেকে পাওয়া একটি ছাগল নিয়ে ফিরেছেন বিমল মাহাতো। ছবি: এইচইএএল।
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে ইন্ডিয়া-তে, ২০২৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি।