- ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে ভারসাম্য আনতে, ২০২৫ সালের শেষ দিকে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ২৫টি উপজেলাকে পানি সংকটপূর্ণ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ।
- সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে সেচকে চিহ্নিত করে, কৃষকদের তাৎক্ষণিকভাবে উচ্চ সেচনির্ভর বোরো ধানের আবাদ বন্ধ করার নির্দেশ দেয় সরকার।
- তবে সংকটাপন্ন ওই ২৫টি উপজেলা ধান উৎপাদনের অন্যতম ভাণ্ডার হওয়ায়, খাদ্য সংকট এড়াতে সরকার বোরো চাষ নিয়ে তার সিদ্ধান্তটি আপাতত স্থগিত করে।
- উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট মোকাবিলা করতে হলে বোরোর বিকল্প ফসল চাষের দিকে যেতে হবে কৃষকদের। কম সেচ লাগে এমন ফসল চাষের প্রতি তাদের আগ্রহ বাড়ানো দরকার বলে মনে করেন তারা।
বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বরেন্দ্র অঞ্চলজুড়ে আশংকাজনক হারে নিচে নেমে গেছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এই অঞ্চলের ২৫টি উপজেলাকে পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে সরকার।
এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কৃষকদের উচ্চ সেচনির্ভর বোরো ধানের চাষ, দ্রুত কমিয়ে আনার নির্দেশনা দেয় সরকার। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (বিএমডিএ) কৃষকদের সেচ সুবিধা বন্ধ করার নির্দেশ দেয় তারা।
বিএমডিএ মূলত পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি সংস্থা। উত্তরাঞ্চলে প্রায় ১৬ হাজার গভীর নলকূপের মাধ্যমে তোলা ভূগর্ভস্থ পানি, ৫ লাখ হেক্টরের বেশি (১২ লাখ একর) কৃষিজমিতে সরবরাহ করে সেচ কার্যক্রম পরিচালনা করে সংস্থাটি।
বিএমডিএর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আবুল কাসেম বলেন, “এই অঞ্চলে পানির সংকট নতুন কিছু নয়। তবে হঠাৎ করে সেচ ও বোরো চাষ বন্ধের ঘোষণা, বিএমডিএ এবং কৃষকদের মধ্যে বিরোধপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করে।”
তিনি আরও বলেন, “প্রজ্ঞাপন জারির পরপরই আমরা পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করি এবং পরবর্তী আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত, সেচ চালিয়ে যাওয়ার মৌখিক নির্দেশনা পাই।”
বাংলাদেশ পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (ডাব্লিএআরপিও)-এর সুপারিশের ভিত্তিতে এই ঘোষণা আসে। সংস্থাটি সরকারকে দেশের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া ঠেকাতে পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেয়।
ডাব্লিউএআরপিও’র তথ্য অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৫টি, রাজশাহীর ও নওগাঁর ১০টি করে উপজেলা বিভিন্ন মাত্রার ভূগর্ভস্থ পানির সংকটে রয়েছে। এই ২৫টিকে আবার উচ্চ, মাঝারি ও নিম্ন মাত্রার সংকট এলাকা হিসেব ভাগ করা হয়।
২০২৪ সালের এক গবেষণায় বলা হয়- বৃষ্টিপাত স্বল্পতা, বাড়তে থাকা তাপমাত্রা এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায়, দেশের সবচেয়ে খরাপ্রবণ এলাকায় পরিণত হয়েছে বরেন্দ্র অঞ্চল। এর ফলে উল্লেখযোগ্য হারে পুরো এলাকায় কমে গেছে গাছপালার পরিমাণ।
গবেষণায় আরও বলা হয়, অঞ্চলটির কেন্দ্রীয় অংশে- বছরে গড়ে ১ হাজার ৬২৫ মিলিমিটার (৬৪ ইঞ্চি) বৃষ্টিপাত হয়, যেখানে দেশের গড় বৃষ্টিপাত ২ হাজার ৫৫০ মিলিমিটার (১০০ ইঞ্চি)। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী ও নওগাঁ-এই তিন জেলাকে বরেন্দ্র অঞ্চলের মূল এলাকা হিসেবে ধরা হয়।


বরেন্দ্র অঞ্চল দেশের অন্যতম খাদ্য ভাণ্ডার
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খরাপ্রবণ এলাকাকে কৃষির আওতায় আনতে আশির দশকেই একটি নতুন উদ্যোগ নেয় সরকার। সে অনুযায়ী ১৯৮৫ সালে বিএমডিএর মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলে সরকারি সেচ সুবিধা চালু করা হয়।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ টন খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ টন ছিল ধান। বাংলাদেশে তিন মৌসুমে ধান চাষ হয়: আউশ (বর্ষার আগে), আমন (বর্ষাকালে) এবং বোরো (শুষ্ক মৌসুমে)।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ওই বছরের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হয় বোরো ধান, প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ টন। আমন ধানের উৎপাদন ছিল প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টন এবং আউশ ছিল প্রায় ৩০ লাখ টন। একই তথ্য বলছে, বরেন্দ্র অঞ্চলের মূল তিন জেলা মিলিয়ে বোরো উৎপাদনের পরিমাণ ছিলো প্রায় ১৪ লাখ টন।
ইউনিভার্সিটি কলেজ অব লন্ডনের ঝুঁকি ও দুর্যোগ প্রশমন বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ শামসুদ্দোহা বলেন, “সরকারের এই উদ্যোগ দেশে পর্যাপ্ত ধান উৎপাদন নিশ্চিত করলেও, বরেন্দ্র অঞ্চলের ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর সেচ এই এলাকাকে আরো শুষ্ক করে তুলেছে।”
এদিকে, ২০২১ সালের এক গবেষণায় বলা হয়, বোরো উৎপাদনের জন্য বরেন্দ্র অঞ্চলের “ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন ব্যবস্থাপনা” একটি অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার উদাহরণ।
গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল দেশের অন্যতম খাদ্য ভাণ্ডার হিসেবে বিবেচিত। গত তিন দশকে এখানে ব্যাপকভাবে বেড়েছে বোরো চাষ। সে সঙ্গে বেড়েছে ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার। এই সেচ সুবিধার কারণেই বোরো চাষের জমি ১ লাখ ১৬ হাজার ৭ হেক্টর (২ লাখ ৮৭ হাজার একর) থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ হেক্টরে (প্রায় ৪০ লাখ একর)।
শামসুদ্দোহা বলেন, “দেশের এই অংশে হঠাৎ করে ধান উৎপাদনে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে তা বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় বিপর্যয় হয়ে দাঁড়াবে এবং রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার প্রায় ৭০ লাখ বাসিন্দার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এই সিদ্ধান্ত।”
ধান উৎপাদনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আগে বিকল্প ব্যবস্থা তৈরির পরামর্শ দেন তিনি।


যেসব বিকল্প টেকসই ব্যবস্থার আশ্বাস দেয়
গত কয়েক বছর ধরে এই অঞ্চলের কৃষকরা ধান চাষ থেকে সরে আসতে চেষ্টা করছে। বিকল্প হিসেবে তারা কম সেচ লাগে এমন অর্থকরী ফসল চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। সবজি ও ফলের বাগানকে ভালো বিকল্প বলে মনে করেন কৃষকরা।
কৃষকদের চাষবাসের এই পরিবর্তনে সহযোগিতা করছে সরকার এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক গত তিন বছর ধরে নওগাঁ জেলার সাপাহার উপজেলায় আদা, পেঁয়াজ, আলু, রসুন এবং লাউয়ের মতো সবজি চাষ শুরু করেছে।
ব্র্যাকের জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচির প্রধান আবু সাদাত মনিরুজ্জামান খান বলেন, “আমরা বিকল্পগুলো পরীক্ষামূলকভাবে চালু করেছি। আমরা লক্ষ্য করলাম, দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা এটি ইতিবাচকভাবে নিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে যদি এটি সফল হয়, তাহলে পুরো খরাপ্রবণ অঞ্চলে বোরোর বিকল্প চাষ ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছি আমরা ।”
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হলো গবাদি পশু লালন-পালন। যা পারিবারিক এবং বাণিজ্যিক দুই-ভাবেই করা যেতে পারে।
“একটি পাইলট কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা এরই মধ্যে প্রমাণ পেয়েছি, দুধ উৎপাদনের জন্য গরু পালন একটি ভালো সমাধান হতে পারে,” বলেন
কৃষি ও জলবায়ু বিষয়ক নীতি নির্ধারনী একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক আহসান উদ্দিন আহমেদ, যিনি খরাপ্রবণ এলকার মানুষের বিকল্প জীবিকা নিয়ে কাজ করছেন।
তিনি আরও বলেন, “গরু পালনের জন্য প্রয়োজনীয় ঘাস এবং অন্যান্য উপকরণ সহজলভ্য। তবে এই উদ্যোগ সফল করতে পুরো অঞ্চলে দুধের সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সংরক্ষণ সুবিধা চালু করতে হবে সরকারকে।”
বাংলাদেশ রাইস নলেজ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অলটারনেটিভ ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রায়িং প্রযুক (Alternate Wetting and Drying) ব্যবহার করলে ধান উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। কারণ এতে বর্তমান পদ্ধতির তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম সেচ লাগে। অথচ বর্তমান পদ্ধতিতে ১ কেজি (২.২ পাউন্ড) ধান উৎপাদনে প্রায় ৩,০০০ লিটার (৭৯০ গ্যালন) থেকে ৫,০০০ লিটার (১,৩২০ গ্যালন) পানি প্রয়োজন হয়।
ব্যানার ছবি: বরেন্দ্র অঞ্চলের এক কৃষক একটি পাম্প ব্যবহার করে তার ধানক্ষেতে সেচ দিচ্ছেন। ছবি: Ranak Martin / CIMMYT, ফ্লিকার (CC BY-NC-SA 2.0)।
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে গ্লোবাল-এ, ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল।
সাইটেশন:
Tahasin, A., Haydar, M., Hossen, M. S. & Sadia, H. (2024). Drought vulnerability assessment and its impact on crop production and livelihood of people: An empirical analysis of Barind Tract. Heliyon. doi:10.1016/j.heliyon.2024.e39067
Peña-Arancibia, J. L., mahboob, M. G., Islam, AFM, T., Maiunddin, M et all., (2021). The Green Revolution from space: Mapping the historic dynamics of main rice types in one of the world’s food bowls. Remote Sensing Applications: Society and Environment. doi:10.1016/j.rsase.2020.100460