- ২০২৪ সালের শুরুর দিকে, বিশেষ কৃত্রিম প্রজননে জন্ম নেয়া ৩৭টি বাচ্চা ঘড়িয়ালকে পূনর্বাসনের লক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গের গঙ্গা নদীতে ছেড়ে দেয়া হয়। এই গঙ্গাই তাদের ঐতিহাসিক আবাসস্থল।
- এই প্রকল্পের ওপর প্রকাশিত প্রতিবেদন নিয়ে বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর মধ্য দিয়ে নতুন প্রজননক্ষম ঘড়িয়ালদের বংশ বিস্তারের প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর হচ্ছে। যদিও ভারত জুড়ে নতুন প্রজনন নিয়ে এ ধরণের উদ্যোগ এর আগে সফল হয়নি।
- এই সংরক্ষণ প্রচেষ্টার সাফল্য বেশ কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। সেগুলোর মধ্যে নদীর গতিপথ পরিবর্তন ও শুকিয়ে যাওয়া রোধ, নদী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধ, নদী এলাকার বাসিন্দাদের এই প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা অন্যতম।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে কোচবিহারের রাসিকবিল মিনি চিড়িয়াখানা থেকে গাড়িতে করে ৫৫০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে ৩৭টি ঘড়িয়াল (Gavialis gangeticus)। গন্তব্য পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে গঙ্গা নদীর তীর। এদের বয়স ছিলো ১ থেকে ৩ বছরের মধ্যে। বিশেষ প্রকল্পের অংশ হিসেব কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে জন্ম নেয় এরা।
২০২১ সালের শেষ দিকে এদের প্রজনন প্রক্রিয়া শুরু হয়। ছোট ছোট এই ঘড়িয়ালগুলো যেনো সুস্থভাবে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে এজন্য আলাদাভাবে বাতাস চলাচল করে এমন পিভিসি পাইপে রাখা হয়েছিল এদের। প্রায় ১৫ ঘণ্টা যাত্রা ছিলো সেদিন। এই পুরো সময়ে ঘড়িয়ালগুলোর শরীরের আদ্রতা ধরে রাখতে বন বিভাগের কর্মীরা, প্রতি এক থেকে দুই ঘণ্টা পরপর পানি ছিটাতে থাকেন। প্রজাতিটির ঐতিহাসিক আবাসস্থলে ফিরে যাওয়ার লক্ষ্যেই ছিলো এই যাত্রা। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর ন্যাচার-ইন্ডিয়ার (WWF-India) অ্যাকুয়াটিক হ্যাবিট্যাটস বিভাগের প্রধান শাহনেওয়াজ খান বলেন, সেদিন সংরক্ষণবাদী সবার জন্য বিষয়টি ছিলো এক সন্তোষজনক ঘটনা।
মঙ্গাবে-ইন্ডিয়াকে পাঠানো এক ইমেইলের জবাবে এভাবেই নিজের ভালোলাগা জানান তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, দীর্ঘ এই যাত্রায় ঝুঁকি ছিল, প্রানীগুলোর শারীরিক অবস্থা নিয়ে ছিলো উদ্বেগ। তবে, শেষ পর্যন্ত বাচ্চা প্রাণিগুলো ঠিকমত নাড়াচাড়া করছিল, সাড়া দিচ্ছিলো এবং তারা সুস্থ ছিল। নদীতে নামানোর আগে একটু থমকে গেলেও শেষ পর্যন্ত সফল হন তারা।
ঘড়িয়ালের প্রজনন প্রকল্পটি ছিল পশ্চিমবঙ্গ বন অধিদপ্তর এবং ডাব্লিউডাব্লিউএফ-ইন্ডিয়া এই দুটি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত প্রচেষ্টা। ‘রেপটাইলস অ্যান্ড অ্যাম্ফিবিয়ানস’ জার্নালে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে, গঙ্গা অববাহিকায় ঘড়িয়ালদের দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়ানোর লক্ষ্যে পরিচালিত এই প্রকল্পটির রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।
বাঁধ নির্মাণ, বালু উত্তোলন এবং অবাধ মাছ শিকারের কারণে বছরের পর বছর ধরে ঘড়িয়ালের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমছে। বন্য পরিবেশে এখন প্রায় ৬৫০টি পূর্ণবয়স্ক ঘড়িয়াল টিকে আছে, যা ভীষণ আশংকার বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনটিতে।

কমছে ঘড়িয়ালের সংখ্যা
কুমিরের সঙ্গে ঘড়িয়ালের গায়ের আঁশের পার্থক্য হলো, এদের আঁশ কুমিরের মত চওড়া না, বরং লম্বা ও সরু। একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষ ঘড়িয়াল সাত মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে এবং স্ত্রী ঘড়িয়াল প্রায় চার থেকে পাঁচ মিটার লম্বা হয়।
ঐতিহাসিকভাবে ঘড়িয়াল পাকিস্তান, ভারত, ভুটান, বাংলাদেশ, নেপাল এবং মায়ানমারে পাওয়া যেতো। বর্তমানে শুধুমাত্র বাংলাদেশ, নেপাল এবং ভারতে পাওয়া যায় এই প্রজাতিটি। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে, বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদে ঘড়িয়ালের উপস্থিতি নথিভুক্ত করা হয়। তবে পরবর্তীতে নদীতে বাঁধ, ব্যারেজ এবং অন্যান্য কৃত্রিম অবকাঠামো তৈরির ফলে নদীর পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং ঘড়িয়ালদের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে ওঠে। এছাড়া মাছ ধরার জালে আটকে পড়ার কারণেও প্রজাতিটির সংখ্যা কমছে। আর এভাবে চলতে থাকলে নির্দিষ্ট সময় পর প্রজাতিটি বিলুপ্ত হওয়ার আশংকা তৈরি হবে।
বিশ্বব্যাপী, মানুষের এ ধরনের কাজের ফলে ঘড়িয়ালের সংখ্যা ৯৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। ফলে এই প্রজাতিটিকে রেড লিস্টে জায়গা দিয়ে ‘মহাবিপন্ন’ ঘোষণা করে আইইউসিএন (IUCN)।
বর্তমানে বিশ্বের প্রাপ্তবয়স্ক ঘড়িয়ালের প্রায়, ৭৭ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ ভারতেই পাওয়া যায়। রাজস্থান, মধ্য প্রদেশ ও উত্তর প্রদেশের চম্বল নদীতেই এদের বিচরণ সীমাবদ্ধ।
বাধ্য হয়ে এ রকম একটি নির্দিষ্ট এলাকায় বিচরণ, পুরো প্রজাতিটিকেই নানামুখী হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। খান উল্লেখ করেন, ২০০৭ থেকে ২০০৮ সালে চম্বল নদীতে ঘরিয়ালদের একাধারে মৃত্যু এই প্রজাতির চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থাকে স্পষ্ট করে তোলে। ওই ঘটনায় চম্বলের ভাটিতে প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে ১০০টিরও বেশি ঘড়িয়ালের মৃত্যু হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, অধিকাংশ ঘড়িয়ালের মৃত্যুর কারণ ছিলো কিডনি বিকল হয়ে যাওয়া। আর এটি ঘটেছিলো সম্ভবত কোনো অজ্ঞাত বিষাক্ত উপাদানের কারণে।
এই প্রসঙ্গে আইইউসিন-এর ক্রোকোডাইল বিশেষজ্ঞ দলের সদস্য তরুণ নায়ার বলেন, “কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব কিংবা বড় কোনো অবকাঠামো প্রকল্পই পুরো প্রজাতির অধিকাংশ অংশকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।”

পুনর্বাসন প্রকল্প নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত বিশেষজ্ঞরা
‘মহাবিপন্ন’ (Critically Endangered) কোনো প্রজাতিকে নির্দিষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ না রেখে, বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে পূনর্বাসন প্রকল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। এতে প্রজাতিটি একই জায়গার মধ্যে একই ধরনের ঝুঁকিতে থাকেনা। তবে কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, ভারতের কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার প্রায় পঞ্চাশ বছরের পূনর্বাসন প্রকল্পের যে ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছিলো তার সব কিছুকেই উপেক্ষা করেছে এই উদ্যোগটি।
একই সঙ্গে ঘড়িয়াল সংরক্ষণ প্রচেষ্টায় আবাসস্থল সংরক্ষণকেও সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করেন বিশষজ্ঞরা। তারা বলছেন, নদীগুলোই নানাভাবে দূষণের চাপে আছে। তার ওপর বালু উত্তোলন, বাঁধ নির্মাণ, পয়ঃবর্জ্য নির্গমন এবং পরিত্যক্ত মাছ ধরার জাল ব্যবহার আরো কঠিন করে তোলে, যেকোনো প্রাণীর প্রতিবেশের ভারসাম্য টিকিয়ে রাখতে।
প্রতিবেদনটিতে উল্লিখিত পূনর্বাসন প্রক্রিয়া নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে, ভারতের ঘড়িয়াল সংরক্ষণে কাজ করেছেন এমন বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগের সাফল্য নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে গঙ্গা নদীর মুর্শিদাবাদ অংশ নিয়ে তাদের আপত্তি বেশি, যেখানে এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
ঘড়িয়াল প্রজনন সক্ষমতা অর্জন করতে প্রায় এক দশক (কখনো কখনো দুই দশক) সময় নেয়। তাই সফলতার চূড়ান্ত মানদণ্ড কেবল বেঁচে থাকা নয়, বরং একটি ‘স্বনির্ভর, প্রজননক্ষম প্রজাতি’ গড়ে তোলা- বলেন আইইউসিন- এর ক্রোকোডাইল বিশেষজ্ঞ দলের সদস্য তরুণ নায়ার। তিনি আরও বলেন,৭০ দশকের শেষ থেকে এখন পর্যন্ত ভারত ১০,০০০ থেকে ১২,০০০ ঘড়িয়াল অবমুক্ত করলেও নতুন প্রজননক্ষম প্রজাতি তৈরির ক্ষেত্রে সফলতার তেমন প্রমাণ নেই।
মাদ্রাস ক্রোকোডাইল ব্যাংক ট্রাস্টের ঘড়িয়াল ইকোলজি প্রকল্পের পরিচালক জয়লাবদিন এ. জানান, “সরীসৃপের ক্ষেত্রে সদ্যজাতদের প্রাকৃতিকভাবে বেঁচে থাকার হার সাধারণত ১ শতাংশেরও কম। এমন অবস্থায় কৃত্রিম প্রজননে জন্মানো ৩৭টি ঘড়িয়ালকে একসঙ্গে অবমুক্ত করায় এদের টিকে থাকা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থেকে যায়।”
নর্থ ডাকোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক এবং ভারতের ঘড়িয়াল ইকোলজি প্রকল্পের জেষ্ঠ্য বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা জেফ্রি ডব্লিউ. ল্যাং ব্যাখ্যা করেন, সংরক্ষিত পরিবেশে একটি ঘড়িয়াল সংগ্রহ, লালন-পালন ও বড় করার ক্ষেত্রে প্রতিটি প্রাণীর পেছনে আনুমানিক এক লাখ টাকা এবং কখনো কখনো দুই থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। সীমিত অর্থায়নের কারণে, পূর্ববর্তী কর্মসূচি থেকে শিক্ষণীয় বিষয়গুলো গ্রহণ করা জরুরী ছিলো বলে মনে করেন তিনি।
জয়লাবদিন বলেন, “এই ধরনের কার্যক্রম এমনিতে তেমন সমস্যার কিছু না, তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংরক্ষণ উদ্যোগে আবাসস্থল রক্ষা করাকে প্রাধান্য দেয়া উচিৎ। চম্বল নদীতে যত ঘড়িয়াল আছে, তারা বালু উত্তোলনের কারণে হুমকির মুখে রয়েছে। তাই যদি নদীর প্রতিবেশ রক্ষা করতে না পারি, তাহলে পূনর্বাসন করে কি লাভ!”

অবমুক্তের জন্য উপযুক্ত জায়গা বাছাই
পূনর্বাসনের এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে, প্রথমেই আবাসস্থল উপযুক্ত কিনা তা যাচাই করা হয়। শাহনেওয়াজ খান এ প্রসঙ্গে বলেন, যেখানে নদীর প্রবাহ বাধাহীন, বালুচর এবং বিস্তৃত পরিসর রয়েছে, ঘড়িয়াল পূনর্বাসনের জন্য সে জায়গাটেই উপযুক্ত। আর এ কারণেই গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকাকে পূনর্বাসনের জন্য ঠিক করা হয়।
দলটি টিকটিকপাড়ার শাখা-নদীর একটি অংশকে বাচ্চা ঘড়িয়ালদের অবমুক্ত করার জন্য একটি শান্ত পরিবেশ হিসেবে চিহ্নিত করে।
তবে জয়লাবদিন এই আবাসস্থল বাছাইয়ের প্রক্রিয়াকে সমালোচনা করে বলেন, এ ধরনের মূল্যায়ন আরও গভীর ও বিস্তারিত হওয়া উচিৎ।
“পশ্চিমবঙ্গের পূনর্বাসন প্রক্রিয়ায় যেসব অবমুক্তের জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে সেগুলো বিচার করলে এই প্রকল্প সফল হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা প্রায় নেই,”- বলেন ল্যাং।
তিনি আইইউসিন-এর রেড লিস্টের সাম্প্রতিক ‘গ্রিন স্ট্যাটাস’ মূল্যায়নের কথা উল্লেখ করেন। যেখানে বলা হয়েছে, গঙ্গার ভাটিতে ও বদ্বীপ অঞ্চল ঘড়িয়াল টিকিয়ে থাকার জন্য উপযুক্ত নয়। ওই মূল্যায়নে ঘড়িয়ালের ছয়টি এমন প্রজাতি চিহ্নিত করা হয়, যেখানে প্রজননের কিছু প্রমাণ পাওয়া যায়, এবং আরও ১৪টি এলাকা চিহ্নিত করা হয় যেখানে এক সময় অনেক ঘড়িয়াল দেখা যেতো। তবে বর্তমানে এসব জায়গায় ঘড়িয়াল চোখেই পড়েনা।
নদীজুড়ে প্রতিবেশগত ভিন্নতার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, গঙ্গার হুগলি অংশ নিশ্চিতভাবেই ঘড়িয়াল পূনর্বাসনের জন্য অনুপোযুক্ত।
তবে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া দক্ষিণ বিভাগের ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসার প্রদীপ বাউরি বলেন, “আমাদের মূল্যায়ন বিবেচনা করেই মুর্শিদাবাদকে উপযুক্ত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “একই নদীতে, একই ধরনের মানবসৃষ্ট চাপের মধ্যেও ডলফিন টিকে আছে।”
আন্তর্জাতিক সীমান্তের বিড়ম্বনা
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই প্রকল্পের অবমুক্তকরণ এলাকা বাংলাদেশের সীমান্ত ঘেঁষা অঞ্চল। আন্তর্জাতিক সীমান্তের কাছাকাছি থাকায়, সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ-এর নিয়মিত কার্যক্রম চলে এসব এলাকায়। ফলে এখানে ঘড়িয়াল পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হবে বলে মনে করেন তারা। তরুণ নায়ারের ভাষায়, সীমান্ত এলাকায় মানুষের চলাচল সীমান্তবর্তী দেশের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করতে পারে।”
জয়লাআবদিন আর একটি আশংকার কথা জানান, “বর্ষাকালে ঘড়িয়াল ভেসে বাংলাদেশে চলে যেতে পারে, যেমন করে পাঞ্জাবের বিয়াস নদীর ক্ষেত্রে ঘটেছিল।এরপর আর সেগুলো ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া বাস্তবসম্মত নয়।”
এদিকে খান, এই প্রতিবন্ধকতাকে সীমান্তে তুই দেশের সমন্বয় জোরদারের একটি সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “প্রচলিত উপায়ে সীমান্ত অতিক্রম করে নজরদারি চালানো সম্ভব না হলেও, এই পরিস্থিতি স্যাটেলাইট টেলিমেট্রির মতো উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের একটি ইতিবাচক সুযোগ তৈরি করছে।” বর্তমান প্রকল্পটিতে পর্যবেক্ষণের কাজে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে না; দলটি নৌকার মাধ্যমে নজরদারির চেষ্টা করছে।

বালু উত্তোলন, মাছ ধরা ও পরিত্যাক্ত জালের ঝুঁকি
নায়ার ও জয়লাবদিন দুজনেরই মতে, গঙ্গা অববাহিকায় ঘড়িয়ালের জন্য মাছ ধরার জাল ও বালু উত্তোলন বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে অবমুক্ত করার প্রথম ১৫ দিনের মধ্যেই তিনটি ঘড়িয়াল পরিত্যক্ত মাছ ধরার জালে আটকা পড়ে মারা যায়। এরপর দ্রুত ১৫০ কেজি পরিত্যক্ত জাল নদীর সে অংশ থেকে অপসারণ করে বন অধিদপ্তর। নায়ার বলেন, “এটা ভালো যে তারা অবমুক্তির পর পর্যবেক্ষণ করছেন, যা অনেক কর্মসূচিতে করা হয় না। তবে এই কাজ আগে করা উচিত ছিল।”
পূনর্বাসন প্রকল্পের দলটি উল্লেখ করে যে, নদীনির্ভর স্থানীয় জনগোষ্ঠী, যারা আগে কখনো ঘড়িয়াল দেখেননি, তাদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। সচেতনতামূলক কার্যক্রম প্রসঙ্গে খান বলেন, “শুরুর প্রতিক্রিয়া অনেক সময় ভীতিকর ছিল, কারণ অনেক বাসিন্দাই সরু মুখের ঘড়িয়ালকে আক্রমণাত্মক কুমিরের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছিলেন। পরে দলটি যখন ব্যাখ্যা করে যে ঘড়িয়াল মূলত মাছ খেকো এবং সাধারণত মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকে, তখন মানুষের প্রতিক্রিয়া সমর্থনে রূপ নেয়।”
এছাড়া “বন্দী পরিবেশে বড় হওয়া ঘড়িয়াল, যাদের মৃত মাছ খাওয়ানো হতো, তারা প্রায়ই জালে আটকে থাকা মাছ খাওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় নিজেরাও জালে আটকে যায় তারা এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দ্রুত ডুবে মারা পড়ে” -জানান ল্যাং। তিনি আরও বলেন, “যদি জেলেরা অবমুক্তির এলাকায় জাল ফেলে মাছ ধরা বন্ধ করতে রাজি না হন, তাহলে এর করুণ পরিণতি ভোগ করবে অবমুক্ত করা ঘড়িয়ালগুলো।”
মঙ্গাবে-ইন্ডিয়া যেসব বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেছে, তারা বদ্ধ পরিবেশে প্রজনন করা ঘড়িয়াল নিয়েও সমালোচনা করেছেন। ট্যাংকে বড় হওয়া এবং মৃত মাছ খেয়ে বেড়ে ওঠা ঘড়িয়ালদের মধ্যে দ্রুত স্রোতের পানিতে টিকে থাকার মতো শক্তি এবং জীবন্ত শিকার ধরার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি অনেক সময় তৈরি হয় না। এছাড়া বন্দী পরিবেশে বড় হওয়া ঘড়িয়াল প্রায়ই অস্বাভাবিক আচরণ করে। মানুষের কাছ থেকে খাবারের আশায় তাদের খুব কাছে চলে যায় তারা, তার স্বাভাবিক লাজুক আচরণ না থাকায়, তাকে শিকারের ঝুঁকিতে ফেলে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
নায়ার ও জয়লাবদিন দুজনেই ‘সফট রিলিজ’ পদ্ধতির পরামর্শ দিয়েছেন। এ পদ্ধতিতে নদীর সঙ্গে সংযুক্ত ঘের বা পুকুরে কিছুদিন ঘড়িয়ালগুলোকে রাখা হবে, যাতে তারা পুরোপুরি অবমুক্ত হওয়ার আগে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে এবং জায়গাটিকে নিজের বলে মনে করতে পারে।
তবে পশ্চিমবঙ্গ বন অধিদপ্তরের বাউরি বলেন, ‘সফট রিলিজ সাধারণত উদ্ধার করা প্রাণীর ক্ষেত্রে করা হয়।’
তিনি বলেন, “এগুলো ছিল সুস্থ, বদ্ধ পরিবেশে বড় হওয়া বাচ্চা ঘড়িয়াল। রাতারাতি এগুলো পরিবহন করা হয় এবং পৌঁছেই অবমুক্ত করা হয়।”
তিনি আরও বলেন, যদিও ঘড়িয়ালগুলোকে গঙ্গার একটি শাখা নদীতে ছাড়া হয়েছিলো, যা সফট রিলিজের মতো কাজ করেছে। তবে আনুষ্ঠানিক সফট রিলিজ পরিচালনার মতো অবকাঠামোগত সুযোগ সেখানে ছিল না। কারণ এগুলো নজরদারির জন্য আশেপাশে কোনো বনকর্মী নেই এবং অবমুক্তির জায়গাটি সংরক্ষিত এলাকার বাইরে।
ব্যানার ইমেজ: পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে একটি কিশোর ঘড়িয়াল অবমুক্ত করছেন মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ খান। ছবি: মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ খান।
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে মঙ্গাবে ইন্ডিয়া-তে ২০২৫ সালের ৪ ফ্রেব্রুয়ারি।