- বিভিন্ন সংরক্ষণ উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও, বাংলাদেশে মানুষ ও হাতির মধ্যকার সংঘাত বাড়ছে। ফলে ভয়াবহ অস্তিত্ব সংকটে পড়ে গেছে এই প্রজাতিটি।
- সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি দুর্গম গ্রামে মৃত হাতির শরীরের বিভিন্ন অংশ কেটে নিয়ে যেতে চেষ্টা করেন স্থানীয়দের একটি দল। এ ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, প্রজাতিটি রক্ষায় বন বিভাগের ব্যর্থতা। এছাড়া সামনে এসেছে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসচেতনতার বিষয়টি।
- বন বিভাগের তথ্য বলছে, ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশে মানুষ ও হাতির মধ্যকার সংঘাতে অন্তত ১৫১টি হাতির মৃত্যু হয়েছে।
- ২০১৬ সালের শুমারি অনুযায়ী, সে সময় বাংলাদেশের বনে প্রায় ২৭০ টি হাতি ছিল। আইইউসিএন বাংলাদেশ এই প্রজাতিটিকে মহাবিপন্ন হিসেবে ঘোষণা করেছে। মূলত দেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রামের পাহাড়ি বনগুলোতে এদের আবাস।
২০২৬ সালের ২৫ এপ্রিল, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা রাঙামাটিতে অসুস্থ একটি পুরুষ হাতির মৃত্যু হয়। দুর্গম একটি গ্রামে হাতিটির মৃত্যুর পর, সেখানকার কয়েকজন এটির পা ও শুঁড় কেটে ফেলে। বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় বাংলাদেশের বন বিভাগের ব্যর্থতা প্রমাণ করে এই ঘটনা। এছাড়া হাতিটির মৃত্যুর পর তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া নির্মম কাণ্ড মানুষের সচেতনতা ও সংবেদনশীলতার অভাবকে সামনে নিয়ে আসে।
বাংলাদেশের একজন বন সংরক্ষক এ.এস.এম জহির উদ্দিন আকন বলেন, বেশ কয়েক মাস আগে স্থানীয়দের সঙ্গে সংঘাতে আহত হয় ৬০ বছর বয়সী এই হাতিটি (Elephas maximus indicus)। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় সে।
এই ঘটনার আগে মার্চ মাসে পার্শ্ববর্তী বান্দরবান জেলার একটি সংরক্ষিত বনে ৩ মাস বয়সী একটি হাতির শাবক মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। ধারণা করা হয় স্থানীয়দের হাতে মারা যায় শাবকটি।
এরও আগে, ১৯ জানুয়ারি বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব জেলা সিলেটে ট্রেনের ধাক্কায় একটি পোষা হাতি মারা যায়।

বন বিভাগের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশে অন্তত ১৪৮টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ছিল দেশীয়, বহিরাগত এবং পোষা হাতি। এখানে ‘দেশী’ বলতে বাংলাদেশের বনাঞ্চলে বসবাসকারী বন্য হাতিগুলোকে বোঝানো হয়েছে, আর ‘বহিরাগত’ বলতে বোঝানো হয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার থেকে নিয়মিত বাংলাদেশে আসা-যাওয়া করা হাতিগুলোকে।
এ বছর মারা যাওয়া তিনটিসহ মোট মৃত হাতির সংখ্যা এখন পর্যন্ত ১৫১টি।
বিভিন্ন সংরক্ষণ উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও হাতি মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে বন বিভাগের হাতি সংরক্ষণ প্রকল্পের প্রধান আকন মঙ্গাবে-কে বলেন, “সংকট সমাধানে আমরা অনেকভাবেই কাজ করছি। তবে ঘটনাগুলো বাড়ছেই।”
সাম্প্রতিক ঘটনাটি নিয়ে তিনি বলেন, “স্থানীয় লোকজন বর্শা দিয়ে হাতিটিকে আহত করে। পরে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি হাসপাতালে এর চিকিৎসা চলে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে হাতিটি বাঁচানো যায়নি। সবচেয়ে খারাপ বিষয় হলো, স্থানীয়রা মৃত প্রাণীর শরীরের বিভিন্ন অংশ কাটতে চেষ্টা করে। এ ঘটনায় এটা স্পষ্ট যে, বন্যপ্রাণী সম্পর্কে তারা যথেষ্ট সংবেদনশীল নন।”

সংঘাতের পেছনের কারণ
বাংলাদেশে হাতির অবস্থা নিয়ে আইইউসিএন (IUCN) ২০১৬ সালের এক কটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, দেশে তখন মাত্র ২৬৮টি হাতি ছিল।
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যেসব হাতির পাল দেখা যায় সেগুলো সাধারণত প্রতিবেশী দেশ ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে বছরে কয়েক সপ্তাহের জন্য বাংলাদেশে আসে। এরপর আবার নিজেদের এলাকায় ফিরে যায় তারা। মূলত খাবারের খোঁজেই তাদের এই আসা যাওয়া।
দীর্ঘদিন ধরেই হাতিদের এই প্রবণতা লক্ষ করছিলেন বন বিশেষজ্ঞরা। তবে ২০১৯ সাল থেকে কিছু হাতি বাংলাদেশে আটকা পড়ে আছে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া নির্মানের কারণে এই হাতিগুলোর চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বাংলাদেশ অংশেই আটকা পড়ে তারা।
বন্যপ্রাণী গবেষকরা দেশের উত্তর-পূর্ব ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে হাতি হত্যা ও স্থানীয়দের সঙ্গে তাদের সংঘাত নিয়ে বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম অঞ্চলে সরকারি ও বেসরকারি খাতের অপরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সীমান্তে বেড়া নির্মাণ।
২০১৮ সালে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০৩ কিলোমিটার (৬৪ মাইল) দীর্ঘ একটি রেলপথ নির্মাণ করে সরকার। এর মধ্যে ২৭ কিলোমিটার (১৬.৭ মাইল) পথ দেশের তিনটি সংরক্ষিত এলাকার ভেতর দিয়ে গেছে। এগুলো হলো চুনতি ও ফাঁসিয়াখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এবং মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যান। দেশের প্রায় অর্ধেক হাতি এসব এলাকায় বাস করে।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম জেলায় কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন এবং চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন নামে দুটি বড় অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলায় মানুষ ও হাতির সংঘাত আরও বেড়ে গেছে। কারণ এসব স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে হাতির চলাচলের পথে।
সংঘাত বেড়ে যাওয়ার আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, মানুষের বাড়তি চাহিদা মেটাতে হাতির চলাচলের পথ ও আবাসস্থলের আশপাশে মানুষের বসতি স্থাপন।
আইইউসিএন ঘোষিত এই মহাবিপন্ন প্রজাতি বর্তমানে ১৩টি দেশের বন্য পরিবেশে বাস করে। এদের সংখ্যা ৫২ হাজারের মত।
হাতির সংখ্যা সম্পর্কে বন সংরক্ষক আকন বলেন, “বর্তমান মৃত্যুর সংখ্যা এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আটকে পড়া বহিরাগত হাতিগুলোর কারণে বাংলাদেশে এর সঠিক সংখ্যা আমরা জানিনা। এছাড়া সবশেষ শুমারি করা হয়েছিলো ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে। তাই চলমান প্রকল্পের আওতায় আমরা নতুন একটি শুমারির পরিকল্পনা করছি, যাতে বর্তমান পরিস্থিতি জানা যায়।”

সংরক্ষণ উদ্যোগ এবং ব্যর্থতা
২০১৮ সালে দেশে হাতি সংরক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য একটি ১০ বছরের ‘হাতি সংরক্ষণ কর্মপরিকল্পনা’ নেয় সরকার।
এছাড়া ‘সাসটেইনেবল ফরেস্টস অ্যান্ড লাইভলিহুডস (SUFAL)’ নামে একটি প্রকল্পের আওতায় বন বিভাগ, আইইউসিএন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে মিলে সংঘাতপ্রবণ এলাকায় কাজ শুরু করে। প্রকল্পের আওতায় হাতি সংরক্ষণে স্থানীয়দের যুক্ত করে তারা। এর কর্ম প্রক্রিয়ার নাম দেন ‘এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম (ইআরটি)’। যা মানুষ ও হাতির মধ্যকার সংঘাত কমানোর একটি টেকসই উপায় হিসেবে কাজ করতে পারে বলে মনে করে বন বিভাগ ।
এই ইআরটি বিভিন্নভাবে হাতি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করে। হাতির পাল কোথায় যাচ্ছে সেই তথ্য হালনাগাদ করা এবং সাধারণ মানুষকে হাতি সংরক্ষণ সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া, পাশাপাশি বন্য হাতির ক্ষেত্রে কী করা উচিৎ বা উচিৎ নয়- এসব বিষয়ে সচেতন করাই হলো ইআরটি’র কাজ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এবং বন্যপ্রাণী গবেষক মনিরুল এইচ. খান বলেন, “ইআরটি গঠন ভালো উদ্যোগ হলেও দুটি কারণে এটি কার্যকর হচ্ছে না। প্রথমত, প্রতিটি এলাকায় ইআরটি-এর সংখ্যা অপর্যাপ্ত, এবং দ্বিতীয়ত ইআরটি‘র সদস্যরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন, কোনো বেতন বা ভাতা পান না। কোনো ধরনের প্রনোদনা না দিলে তাদের এই কাজে যুক্ত রাখা কঠিন।”
২০১০ সালে হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণ সেবা চালু করে সরকার। আক্রমণে কেউ মারা গেলে এবং তাদের সম্পদ অর্থাৎ তাদের ঘরবাড়ি ও ফসলের ক্ষতি হলে এই ক্ষতিপূরণ পাবেন তারা।
২০২১ সালে এই ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বাড়ায় সরকার। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, নিহত ব্যক্তির পরিবার ১ লাখ টাকার পরিবর্তে ৩ লাখ টাকা করে পাবেন, এবং আহত ব্যক্তি পাবেন ৫০ হাজার টাকার পরিবর্তে ১ লাখ টাকা। ঘরবাড়ি ও ফসলের ক্ষতির ক্ষেত্রে দাবি করা যাবে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ।
খান বলেন, “যদিও ধারণা করা হয়েছিল ক্ষতিপূরণ মানুষ ও হাতির মধ্যে সংঘাত কমাবে, বাস্তবে সব ভুক্তভোগী এটি দাবি করার সাহস পান না। কারণ চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বেশিরভাগ বসতি ও কৃষিজমি, সরকারি খাস জমির অংশ। ক্ষতিপূরণ চাইতে হলে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পত্তির জন্য জমির মালিকানা প্রমাণ করতে হয়।”
বন্য প্রাণীর প্রতি মানুষের কঠোর আচরণ নিয়ে খান বলেন, “মানুষের আচরণে পরিবর্তন আনা জরুরি, কারণ এখন মানুষ আরও বেশি অস্থির হয়ে উঠছে।” তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাতি মৃত্যুর বড় একটি কারন ফসল রক্ষার জন্য বৈদ্যুতিক বেড়া নির্মাণ। এর আগে স্থানীয়দের মধ্যে, হাতির আক্রমণ থেকে সম্পদ রক্ষায় আতশবাজি ও উচ্চ শব্দ ব্যবহারের প্রচলন ছিলো।
এদিকে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রটোকলের আওতায় আটকে পড়া বহিরাগত হাতির সমস্যা নিয়ে ভারতের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ।
বসতি স্থাপন ও চাষবাসের চাপ থাকা সত্ত্বেও, ২০২৫ সালে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি অংশকে হাতির জন্য সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার।
ব্যানার ছবি: রাঙামাটিতে সম্প্রতি মারা যাওয়া পুরুষ হাতিটি। ছবি: সমির মল্লিক।
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে গ্লোবাল-এ, ২০২৬ সালের ৭ মে।