- হাওর, বাওড় ও বিলের মতো বিশেষ প্রাকৃতিক জলাভূমি সংরক্ষণের জন্য, বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো একটি স্বতন্ত্র আইন করা হয়েছে।
- আগের কিছু সংরক্ষণ সম্পর্কিত আইনের সঙ্গে, নতুন এই আইনটির অনেক নির্দেশনার কার্যগত মিল রয়েছে। তাই এটিকে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
- তাদের পরামর্শ, প্রত্যাশিত ফল পেতে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে।
এ বছর ৭ এপ্রিল ‘হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ আইন, ২০২৬’ সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে । নতুন এই আইনে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে- হাওর, বাওড় ও বিলের মতো প্রাকৃতিক জলাভূমি দখল, অনুমতি ছাড়া খনিজ উত্তোলন, জলজ প্রাণীকে বিষ প্রয়োগ বা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করে হত্যা। এছাড়া জলাভূমির স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করতে পারে, এমন কোনো স্থাপনা নির্মাণেও রয়েছে নিষেধাজ্ঞা।
নতুন আইন অনুযায়ী, এসব অপরাধ আমলযোগ্য (cognizable) ও জামিনযোগ্য নয় বলে বিবেচিত হবে।
বাংলাদেশ পানি আইন-২০১৩ অনুযায়ী, হাওর বলতে দুইটি স্বতন্ত্র নদীর মাঝখানে অবস্থিত অবতল আকারের বড় ও অগভীর প্রাকৃতিক নিচু ভুমিকে বোঝানো হয়।
অনেক সময় নদীর প্রবাহপথ বদলে, নদীটি ঘেষেই ইংরেজি ইউ আকৃতির আলাদা একটি জলাশয় তৈরি হয়, যা এক সময় মূল নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং বাংলাদেশে এটিকে বলা হয় বাওর। আর বিল বলতে প্রাকৃতিক নিচু এলাকা বোঝানো হয়, যা বর্ষাকালে প্লাবিত থাকে এবং সারা বছর অথবা বছরের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিমজ্জিত থাকে পানিতে।
বাংলাদেশে আনুমানিক ৩৭৩টি হাওর এবং প্রায় ৬,৩০০টি বিল রয়েছে। সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার উত্তর-পূর্ব ও পূর্বাঞ্চলে বিস্তৃত এসব জলাভূমির আয়তন প্রায় ১৯ লাখ ৯০ হাজার হেক্টর (৪৯ লাখ একর)।
দেশের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচটি জেলায় ২৩টি বাওড় রয়েছে, যেগুলোর প্রতিটির আয়তন ৪ থেকে ৮৯ হেক্টর (১০ থেকে ২২০ একর) পর্যন্ত বিস্তৃত।

সমন্বয় জটিলতায় একাধিক আইন
প্রাকৃতিক জলাভূমিগুলোর জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য ১৯৭৭ সালে হাওর উন্নয়ন বোর্ড (HDB) গঠন করে সরকার । মৎস্য ও কৃষি খাতে উন্নয়নের জন্য অবকাঠামো, সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে কাজ করতো এটি। এছাড়া এসব কার্যক্রমের সঙ্গে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার আওতায় জলাভূমিগুলোকে যুক্ত করার কাজ ছিলো এই বোর্ডের। পরে একই উদ্দেশ্যে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর (DBHWD) প্রতিষ্ঠা করে সরকার।
সংসদে নতুন আইনটি বিল আকারে উত্থাপনের সময় পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী বলেন, “অধিদপ্তর গঠনের পরও একটি পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামো না থাকায় জলাভূমি এলাকায় অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, নদীপথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, মাছ শিকারে নির্বিচার বিষাক্ত উপকরণ ব্যবহার এবং অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের নেতিবাচক প্রভাব বন্ধ হচ্ছিলো না। তাই এই আইন খুব জরুরি ছিল।”
নতুন আইনে কোনো প্রাকৃতিক জলাভূমি দখল বা ভরাট করা, জলাভূমিকে সাধারণ ভূমি হিসেবে দেখানো, এর থেকে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ, জলজ প্রাণী শিকারে বিষ প্রয়োগ, এবং যেকোনো অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টি করার মতো অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা দুই বছরের কারাদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
এই আইনে পরিযায়ী পাখি শিকার এবং জলাবন (swamp forest) ও জলাভূমির বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংসও নিষিদ্ধ। এসব বিধান না মানলে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা জরিমানা অথবা সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
তবে আইনটি প্রণয়ন নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। তাদের মতে, এটি আগের কয়েকটি আইনের সঙ্গে কিছুটা সাংঘর্ষিক।
DBHWD-এর সাবেক মহাপরিচালক মো. মজিবুর রহমান বলেন, (২০১৬ সালের এপ্রিল থেকে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন) “আমি আইনটি প্রণয়নকে স্বাগত জানাই, কারণ এটি সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের কাজের এখতিয়ারের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।”
তবে হাওর উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক মহাপরিচালক ম. ইনামুল হক মনে করেন, DBHWD-এর দায়িত্বের পরিধি অন্য কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রধান দায়িত্বগুলোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।
ইনামুল হক মনে করেন “এখন মূল বিষয় হলো সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়।”

নতুন আইন অনুযায়ী, হাওর ও জলাভূমির পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংরক্ষণ, রক্ষা ও উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারবে DBHWD। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে “লিখিত” নির্দেশনা অথবা আদেশ দিতে পারবে এই আইনের আওতায়।
হাওর ও জলাভূমিতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা, টেকসই ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে পলি ব্যবস্থাপনা এবং পাড় সংরক্ষণের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে DBHWD-কে।
এই আইন অনুযায়ী, হাওর ও অন্যান্য জলাভূমি এলাকায় সব উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য, আগে থেকেই DBHWD-এর অনুমোদন নিতে হবে। সংস্থাটি প্রকল্প প্রস্তাব পর্যালোচনার সময় সম্ভাব্য পরিবেশগত ও প্রতিবেশগত প্রভাব, এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ বা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি স্পষ্টভাবে মূল্যায়ন করে বিষয়টি অনুমতির বিবেচনা করবে।
অন্যদিকে, ২০১৩ সালের পানি আইন অনুযায়ী পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, বিশেষ করে পানিসম্পদমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন ২৪ সদস্যের নির্বাহী কমিটির কাছেও প্রকল্প অনুমোদনের এমন ক্ষমতা আগে থেকেই রয়েছে।
পানি আইনে আরও বলা হয়, কোনো কর্তৃপক্ষ বা স্থানীয় সরকার পানি সম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে, সেই পরিকল্পনা সম্পর্কে নির্বাহী কমিটির কাছে আবেদন জমা দেবে।
DBHWD মনে করলে, কোনো হাওর বা জলাভূমিকে প্রয়োজনে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবেও ঘোষণা করতে পারে, এমন ক্ষমতাও দিয়েছে আইনটি। পাশাপাশি জলাভূমির জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ ও প্রতিবেশের জন্য ক্ষতিকর কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ, সংরক্ষিত এলাকায় পরিযায়ী পাখি ও বিভিন্ন বিপন্ন প্রাণীর আবাসস্থল সুরক্ষা, জলাবন ও পাড়ের উদ্ভিদ সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে সংস্থাটিকে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ও, ২০১২ সালে প্রণিত বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে (২০২৬ সালে সংশোধিত) একই ধরনের সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা রেখেছে।
নতুন আইনে DBHWD-কে হাওর ও জলাভূমির সীমানা নির্ধারণ, মানচিত্র তৈরি, তালিকা প্রণয়ন এবং প্রয়োজনে তা হালনাগাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মজার বিষয় হলো, ২০০৯ সালের জলমহল ব্যবস্থাপনা নীতি অনুযায়ী জলাভূমির মূল অভিভাবক হিসেবে ভূমি মন্ত্রণালয়ও এসব কাজ করে আসছে।
আইনটি কার্যকরের আগেই ২০২৫ সালের একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়, জলাভূমি ব্যবস্থাপনায় বহু প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে জটিল করে তুলছে। একই সঙ্গে সম্পদ ব্যবহারকারী ও ব্যবস্থাপকদের মধ্যে তৈরি করেছে নানা ধরণের ধরনের বিরোধ।
গবেষণাটি করেছেন পানি রাজনীতি বিশেষজ্ঞ এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুস সালাম। তিনি বলেন, “হাওর ও জলাভূমি বিষয়ক কাজে চার থেকে পাঁচটি সরকারি সংস্থা জড়িত, তবে তাদের মধ্যে দৃশ্যমান কোনো সমন্বয় নেই।”
DBHWD-এর সাবেক মহাপরিচালক রহমান বলেন, “নতুন আইনে এখনও কিছু আন্তঃসম্পর্কিত বিষয় রয়ে গেছে। তাই সংস্থাটির দায়িত্বের পরিধি স্পষ্ট করে সহায়ক বিধিমালা প্রণয়ন প্রয়োজন।”

সমন্বয়েই আসতে পারে কার্যকর সমাধান
নতুন আইন অনুযায়ী, DBHWD-কে পরিবেশ, মৎস্য, বন, প্রাণিসম্পদ, কৃষি সম্প্রসারণ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল, ভূমি রেকর্ড এবং ভূতাত্ত্বিক জরিপ-সংক্রান্ত বিভাগগুলোর সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।
এছাড়া DBHWD-কে নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট (RRI), জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন (NRCC), বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (BWDB), বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (BIWTA), পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (WARPO), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (BADC) এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে এই আইনটি।
রহমান এবং হাওর উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক মহাপরিচালক হক মনে করেন, দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালনের জন্য DBHWD-কে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে শক্তিশালী ও কার্যকর সমন্বয় রাখতে হবে।
তাদের মতে, অন্যান্য প্রতিবেশ ব্যবস্থা থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্যের জলাভূমিগুলোর জন্য বিশেষায়িত সংস্থা প্রয়োজন, যেখানে সংরক্ষণ সংক্রান্ত নির্দিষ্ট কাঠামো ও দক্ষ জনবল থাকবে।
“তাই সংস্থাটির প্রয়োজন, সহায়ক বিধিমালা ও নির্দিষ্ট কার্যপ্রক্রিয়া। যাতে অন্য সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে পারে DBHWD,”- বলেন রহমান ও হক।
ব্যানার ছবি: বাংলাদেশের একটি হাওরে জাল দিয়ে মাছ ধরছেন এক জেলে। ছবিটি তুলেছেন Balaram Mahalder via Wikimedia Commons (CC BY-SA 3.0).
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে গ্লোবাল-এ ২০২৬ এর ১২ মে।
সাইটেশন:
Salam, M. F. (2025). Historical insights into wetland management in Bangladesh: Policies, practices, and transformations. Law and Humanities Quarterly Reviews, 4(2), 1–14. doi:10.31014/aior.1996.04.02.146