- ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ায় প্রথমবারের মতো দেখা গেছে, মরচে-ছোপের বনবিড়াল (Rusty-spotted cat)। বিশ্বের সবচেয়ে ছোট বনবিড়াল প্রজাতি হিসেবে পরিচিত এটি। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পুরুলিয়ার বনে ক্যামেরা ট্র্যাপে ধরা পড়ে এই বিড়ালের ছবি।
- International Union for Conservation of Nature (IUCN)-এর রেড লিস্টে বিপন্ন তালিকাভুক্ত এই প্রজাতিটি। আবাসস্থল ধ্বংস, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি এবং কৃষিজমিতে নির্বিচারে কীটনাশক ব্যবহারের কারণে হুমকির মুখে রয়েছে এটি।
- বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরুলিয়ার বনাঞ্চলে মরচে-ছোপের বনবিড়ালের উপস্থিতি, ওই বনভূমির উন্নত প্রতিবেশেরই আভাস দিচ্ছে।
নেপাল, ভারত আর শ্রীলংকা এই তিন দেশ মরচে-ছোপের বনবিড়ালের আবাসস্থল হলেও, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবাস হিসেবে পরিচিত ভারত। বর্তমানে দেশটির বিভিন্ন বনাঞ্চল, শুষ্ক পাতাঝরা বন,ঝোপঝাড় এলাকা, তৃণভূমি ও পাথুরে ভূখণ্ডে এদের উপস্থিতি পাওয়া যায়। এ বছরের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ায় প্রথমবারের মতো দেখা যায় এই বিড়াল। বন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি, সংরক্ষণবিদদের মধ্যেও ব্যাপক উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করে এই ঘটনা। এই প্রজাতিটি পশ্চিমবঙ্গে শনাক্ত হওয়া নবম বনবিড়াল প্রজাতি।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে কলকাতাভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা হিউম্যান অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট অ্যালায়েন্স লীগ (HEAL)-এর ক্যামেরায় মরচে-ছোপের বন বিড়ালের ছবি ধরা পড়ে। ডুলিপ মাথাই নেচার কনজারভেশন ট্রাস্টের সহায়তায় পরিচালিত একটি স্বতন্ত্র প্রকল্পের অংশ হিসেবে এসব ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। HEAL-এর পরিবেশবিদ বসুধা মিশ্র মঙ্গাবে-ইন্ডিয়াকে বলেন, “গত বছরের (২০২৪) জুনে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটি মূলত, পুরুলিয়া জেলায় বনরুইয়ের সংরক্ষণ পরিস্থিতি এবং তারা কী ধরনের হুমকির মুখে রয়েছে তা বোঝার জন্য একটি অনুসন্ধানধর্মী গবেষণা। শুরুতে আমরা ছয়টি ক্যামেরা ট্র্যাপ স্থাপন করেছিলাম। বর্তমানে আমাদের কাছে ১৭ থেকে ১৮টি ক্যামেরা ট্র্যাপ রয়েছে, যেগুলো ধাপে ধাপে জেলার বিভিন্ন বনাঞ্চলে স্থাপন করার চেষ্টা করছি।”
HEAL সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানায়, এর আগে পরিচালিত কোনো জরিপ কিংবা ব্রিটিশ আমলের সংরক্ষিত নথিপত্রেও এই অঞ্চলে এই প্রাজাতির বিড়ালের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া যায়নি।
পোস্টে আরও বলা হয়, “পুরুলিয়ার বনাঞ্চলে এই বিরল প্রাণীটির দেখা মিলেছে। পুরুলিয়ার এই অংশটি ছোট নাগপুর মালভূমির প্রতিবেশগত অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। এই অঞ্চলের পরিবেশগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে ঝাড়খণ্ড ও উডিশার বিস্তীর্ণ এলাকার মিল রয়েছে। এর আগে ওই দুই রাজ্যেই মরচে-ছোপের বন বিড়ালের উপস্থিতি নথিভুক্ত করা হয়।”
পুরুলিয়ার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা অঞ্জন গুহ মঙ্গাবে-ইন্ডিয়াকে বলেন, “ক্যামেরা ট্র্যাপে শাবকসহ একটি মরচে-ছোপের বনবিড়ালের পরিবার ধরা পড়েছে, যা খুবই ইতিবাচক লক্ষণ। আমাদের ধারণা, পুরুলিয়ার বনাঞ্চলে এ ধরনের আরও বিড়াল থাকতে পারে।”

নতুন আবাসে এই বিড়ালের উপস্থিতি আশা জাগানিয়া
মরচে-ছোপের বন বিড়াল, এই প্রজাতির প্রায় ৮০ শতাংশেরই আবাস ভারতের বিভিন্ন বনাঞ্চলে। উত্তর প্রদেশ, তামিলনাড়ু, রাজস্থান, উত্তরাখণ্ড, অন্ধ্রপ্রদেশ, গুজরাট, জম্মু ও কাশ্মীর, কর্ণাটক, কেরালা, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র এবং উডিশায় এর উপস্থিতি আগে থেকেই নথিভুক্ত ছিল। আর পুরুলিয়ায় সাম্প্রতিক এই উপস্থিতির খবরে, পশ্চিমবঙ্গও এখন মরচে-ছোপের বন বিড়ালের বিস্তৃতির তালিকায় নতুন সংযোজন হলো।
একটি পূর্ণবয়স্ক মরচে-ছোপের বিড়ালের আনুমানিক ওজন এক থেকে দেড় কেজি হয়। আমাদের ঘর-গৃহস্থালির আশপাশে যেসব বিড়াল থাকে, তার চেয়েও কম ওজনের এই বন বিড়াল। অন্যদিকে, সদ্য জন্ম নেওয়া শাবকের আকার একটি মুরগির ডিমের চেয়েও ছোট।
অঞ্জন গুহ বলেন, “মরচে-ছোপের বন বিড়াল নিজেদের দেহের ওজনের প্রায় তিন গুণ ভারী প্রাণীকেও শিকার করতে পারে। তাদের ধারালো দাঁত গভীর ক্ষত সৃষ্টি করতে সক্ষম। শিকারের জন্য এরা পাখির বাসায় হানা দেয় এবং ইঁদুর, বিভিন্ন পোকামাকড়, খরগোশের বাচ্চা ও সাপ শিকার করে থাকে এরা।”
ভারতের Salim Ali Centre for Ornithology and Natural History-এর জেষ্ঠ্য মূখ্য বিজ্ঞানী এবং ছোট বনবিড়াল প্রজাতি বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ শমিতা মুখার্জি নিশ্চিত করেছেন, ক্যামেরা ট্র্যাপে ধরা ছবিগুলোে এই বিড়ালেরই।
মঙ্গাবে-ইন্ডিয়াকে দেওয়া এক ই-মেইল সাক্ষাৎকারে মুখার্জি বলেন, এই প্রজাতির উপস্থিতি শনাক্ত হওয়া নিঃসন্দেহে সুখবর। যে এলাকায় এটির দেখা মিলেছে, সেখানকার প্রতিবেশের কারণে এটি পাওয়ার সম্ভাবনা ছিলো।
তার ভাষায়, “এই প্রজাতির উপস্থিতি এমন অনেক নতুন এলাকায় পাওয়া গেছে, যেগুলোকে আগে এদের আবাসস্থল বলে মনে করা হতো না। এখনো এই বিড়ালকে কেন্দ্র করে হয়না কোনো গবেষণা কিংবা নিবিড় জরিপ। তবে অন্যান্য প্রাণী, বিশেষ করে বাঘের ওপর পরিচালিত ক্যামেরা ট্র্যাপ জরিপ থেকে পাওয়া তথ্য থেকে, নতুন নতুন এলাকায় এদের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, ক্যামেরা ট্র্যাপে মরচে-ছোপের বন বিড়ালের ছবি ধরা পড়ার হার খুবই কম। কারণ বেশিরভাগ ক্যামেরা স্থাপন করা হয় মূলত বাঘের মতো বড় প্রাণী শনাক্তের জন্য।
”প্রাণীর আকার, চাল চলন, সম্ভাব্য জায়গা হিসেব করেই নকশা করা হয় জরিপের। যা ওই প্রজাতিকে শনাক্ত করার সাফল্যের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে,” উল্লেখ করেন মুখার্জি।
মুখার্জি আরও বলেন, “নিজেদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংলগ্ন কৃষিজমিতেও এদের দেখা পাওয়া যায়।”

IUCN-এর তথ্য অনুযায়ী, মরচে-ছোপের এই বিড়াল বর্তমানে বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে এবং ক্রমাগত কমছে তাদের সংখ্যা ।
মুখার্জি জানান, “আবাসস্থল ধ্বংস এবং সড়ক দুর্ঘটনা এদের জন্য বড় হুমকি। প্রসস্থ সড়ক, রেলপথ ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের ফলে আবাসস্থল খণ্ডিত হয়ে যাওয়াই এর প্রধান কারণ। এছাড়া কৃষিজমিতে নির্বিচারে কীটনাশক ব্যবহারও এদের জন্য নতুন সম্ভাব্য হুমকি।”
নিরাপদ বনাঞ্চল
পুরুলিয়ার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা অঞ্জন গুহ বলেন, পুরুলিয়ায় মরচে-ছোপের বন বিড়ালের উপস্থিতি জেলার বনাঞ্চলের সুস্বাস্থ্য ও প্রতিবেশগত স্থিতিশীলতারই ইঙ্গিত দেয়।
তিনি বলেন, “এই বনবিড়ালের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, এখানে একটি কার্যকর খাদ্যশৃঙ্খল রয়েছে এবং তা টিকে আছে। এছাড়া পুরুলিয়ার বনাঞ্চল ভালো অবস্থায় রয়েছে এরও নির্দেশ দেয় এই প্রতিবেদন। এমন পরিবেশ, বাঘ ও চিতাবাঘের মতো বড় শিকারী প্রাণীর টিকে থাকার জন্য সহায়ক। তাদের উপস্থিতির সম্ভাবনাও বাড়াবে এই পরিবেশ। আমরা পুরুলিয়ায় প্রায় ছয়টি চিতাবাঘের উপস্থিতি শনাক্ত করেছি। এছাড়া উডিশার সিমলিপাল পাহাড় কিংবা পুরুলিয়ার সীমান্তবর্তী ঝাড়খণ্ড থেকে বাঘেদেরও চলাচল রয়েছে এদিকে।”
তিনি জানান, সম্প্রতি এই জেলায় প্রথমবারের মতো মধুখেকো বেজির (Honey Badger) উপস্থিতিও নথিভুক্ত হয়েছে।
এছাড়া “এখানে হায়েনা, নেকড়ে ও শিয়ালের মতো মাংসাশী প্রজাতিও রয়েছে,” জানান গুহ।
গুহ বলেন, “এসব মাংসাশী বন্য প্রাণীর প্রতি নানা রকম হুমকি কমাতে আমরা স্থানীয় জনগণকে নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছি। এর ফলে জেলায় প্রতিশোধমূলকভাবে বন্য প্রাণী হত্যার ঘটনা কমে এসেছে। একই সঙ্গে পুরুলিয়ার বনে আগুন লাগার ঘটনাও কমিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি আমরা।”
ব্যানার ছবি: একটি মরচে-ছোপের বন বিড়াল। ছবি: ডেভিড ভি. রাজু, via Wikimedia Commons (CC BY-SA 4.0).
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে ইন্ডিয়া-তে ২০২৫ এর ১৯ আগস্ট।